Ajker Patrika

তিস্তা সেচ ক্যানেল প্রকল্প: নানা অনিয়মে সুফল মিলছে না, ক্ষোভ

মাসুদ পারভেজ রুবেল, ডিমলা (নীলফামারী)
তিস্তা সেচ ক্যানেল প্রকল্প: নানা অনিয়মে সুফল মিলছে না, ক্ষোভ
সদ্য নির্মিত সেচ নালার সিসি ঢালাই ধসে পড়েছে। সম্প্রতি নীলফামারীর ডিমলা চাপানী এলাকায়। ছবি: আজকের পত্রিকা

উত্তরবঙ্গের কৃষকের ভাগ্য বদলের স্বপ্ন দেখিয়ে ১ হাজার ৪৫২ কোটি ৩৩ লাখ টাকার তিস্তা সেচ ক্যানেল সংস্কার ও সম্প্রসারণ প্রকল্প হাতে নিয়েছিল পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। কিন্তু বাস্তবে সেই স্বপ্ন এখন অনেকটাই প্রশ্নবিদ্ধ। কাগজে-কলমে ৯০ শতাংশ কাজ শেষের দাবি করা হলেও মাঠে দেখা যায় ভাঙা সিসি ঢালাই, দুর্বল বাঁধ, শুকনো সেচখাল আর পানির জন্য কৃষকদের নিজের পকেটের টাকা খরচের চিত্র। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে মাটির উপরিভাগ কাটা, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, ব্যাপক বৃক্ষনিধন এবং তিস্তার ভাটিতে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ার অভিযোগ। ফলে প্রকল্পটি কৃষি উন্নয়নের বদলে অনিয়ম, অপচয় ও পরিবেশগত ক্ষতির এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

যা আছে প্রকল্পে: প্রকল্পের নথিপত্র অনুযায়ী, সেচ ক্যানেল যেসব এলাকার মধ্য দিয়ে গেছে সেগুলো ‘কমান্ড এলাকা’ হিসেবে চিহ্নিত। ২০২১ সালে প্রকল্পের এই কমান্ড এলাকার সংস্কার ও সম্প্রসারণ প্রকল্প হাতে নেয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। ২০২২ সালের এপ্রিলে চূড়ান্ত হয় এ প্রকল্পের রূপরেখা। ১ হাজার ৪৫২ কোটি ৩৩ লাখ টাকা বরাদ্দের পর প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পায় পাউবো।

তিস্তা ব্যারাজ থেকে শুরু হয়ে সেচ প্রকল্পের খাল নীলফামারীর ডিমলা, জলঢাকা, কিশোরগঞ্জ, সৈয়দপুর ও সদর; রংপুরের গঙ্গাচড়া, তারাগঞ্জ, বদরগঞ্জ এবং দিনাজপুরের খানসামা ও চিরিরবন্দর মিলিয়ে মোট ৭৬৬ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত। প্রকল্পের আওতায় এই পুরো অংশের পাড় শক্তিশালী করার কথা। এ ছাড়া ৭২ কিলোমিটারে সেচপাইপ, পাড় রক্ষায় ১০ দশমিক শূন্য ৮ কিলোমিটারে কংক্রিটের ব্লক বসানো, ৭ দশমিক ১৩ কিলোমিটার বাইপাস সেচখাল নির্মাণ, ২৭টি কালভার্ট নির্মাণ, ২৭০ হেক্টরে জলাধার পুনঃখনন, সাড়ে ৯ কিলোমিটার নালা পুনঃখনন, ৫২ কিলোমিটার পরিদর্শন রাস্তা মেরামত, ২০টি রেগুলেটর নির্মাণ ও ৮৭ হাজারের বেশি গাছ রোপণের কথা রয়েছে।

পকেটের টাকা খরচ চাষিদের

সরেজমিনে নীলফামারীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কৃষকেরা নিজস্ব অর্থায়নে ক্যানেলের ধারে গভীর নলকূপ ও ব্যক্তিগত সেচপাম্প বসিয়ে পানি তুলছেন শুকনো তিস্তা সেচ নালায়। লক্ষ্য, সেই পানি যেন ক্যানেলের মাধ্যমে কোনোমতে দূরের ফসলি জমিতে পৌঁছায়।

নীলফামারী সদরের সেচ ক্যানেল এলাকার কৃষক রফিকুল ইসলাম, জয়নাল, আলমগীর হোসেনসহ অন্তত ২০ চাষি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘কোটি কোটি টাকা খরচ করে সরকারের এই প্রকল্প দিয়ে আমাদের কী লাভ হলো। যদি নিজেদের টাকাই খরচ করতে হয়।’

নিয়ম ভেঙে মাটির উপরিভাগ কাটা

২০২২ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৪-এ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় তা বাড়ানো হয়েছে ২০২৬ পর্যন্ত। দরপত্র অনুযায়ী, ক্যানেলের পাড় মজবুত ও টেকসইয়ের জন্য বাইরে থেকে ট্রাকে ভরে মাটি এনে ভরাট করার নিয়ম। কিন্তু বাস্তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো খরচ বাঁচাতে খালের তলদেশ এবং পাশের আবাদি জমির উর্বর উপরিভাগের মাটি কেটে এনে পাড় বাঁধানোর কাজ চালাচ্ছে।

কিশোরগঞ্জ সেচ প্রকল্প এলাকার বাসিন্দা বুলবুল আহমেদ ও আব্দুল মজিদসহ অন্তত ১০ জন অভিযোগ করেন, ঠিকাদারের লোকজন খরচ বাঁচাতে নালার তলদেশ ও পাশের ফসলি জমির উর্বর মাটি কেটে ক্যানেলের পাড়ে দিচ্ছে। এতে একদিকে আবাদি জমি নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে ক্যানেলের বাঁধগুলো নরম ও ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় সামান্য পানির চাপেই ভেঙে পড়ছে।

জিও ব্যাগের বদলে চটের বস্তা

ক্যানেল টেকসই করতে যে সিসি ঢালাই ও কার্পেটিং করা হয়েছে, তা অত্যন্ত নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে তৈরি হওয়ায় নির্মাণের কয়েক মাসের মধ্যে ভেঙে ধসে পড়ছে। ক্যানেলের তলদেশ ও পাড় রক্ষায় যেখানে নিয়ম অনুযায়ী টেকসই ও দীর্ঘস্থায়ী জিও ব্যাগ ফেলার কথা, সেখানে ব্যয় কমাতে ফেলা হয়েছে অত্যন্ত নিম্নমানের সাধারণ চটের বস্তা, যা অল্প দিনেই পচে ধসে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

৪ লাখ গাছ নিধন

প্রকল্পের নথিপত্রে যেখানে নতুন করে গাছ রোপণের লক্ষ্যমাত্রা দেখিয়ে পরিবেশ সুরক্ষার কথা বলা হচ্ছে, সেখানে মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই সেচ ক্যানেল সংস্কার ও সম্প্রসারণ করতে গিয়ে ক্যানেলের দুই ধারের প্রায় ৪ লাখ পরিণত ও অপরিণত গাছ কেটে সাবাড় করেছে পাউবো।

কয়েক দশক ধরে ক্যানেলের পাড় বাঁধিয়ে রাখা এসব গাছ কাটার ফলে পুরো উত্তরবঙ্গের পরিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।

৯০ কিলোমিটার নদীপথ পানিশূন্য

এদিকে সেচ ক্যানেলে পানি দিতে গিয়ে শুষ্ক মৌসুমে তিস্তা ব্যারাজের ভাটির প্রবাহ সম্পূর্ণ আটকে দেওয়ায় ব্রহ্মপুত্রের মোহনা পর্যন্ত ৯০ কিলোমিটার নদীপথ এখন পানিশূন্য মরুতে পরিণত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুষ্ক মৌসুমে তিস্তায় যেখানে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ৫ হাজার কিউসেক থাকার কথা, সেখানে উজানে একতরফা পানি প্রত্যাহারের ফলে কোনো কোনো সময় তা মাত্র ৪০০ কিউসেকে নেমে আসে। এই তীব্র পানি সংকটের মূল সমাধান না করে, ৩৫ বছর আগের পুরোনো সমীক্ষাকে পুঁজি করে শুধু খালের অবকাঠামো উন্নয়নে এত বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করা অর্থের অপচয় ছাড়া কিছু নয়।

রিভারাইন পিপলের পরিচালক অধ্যাপক তুহিন ওয়াদুদ বলেন, ‘প্রথম ধাপে ১ লাখ ১০ হাজার হেক্টর জমিতে সেচের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও পানির অভাবে তা কখনোই পূরণ হয়নি। ২০১৪ সাল থেকে উজানে একতরফা পানি প্রত্যাহারের পর এখন যে সামান্য পানি আসে, তা-ও আটকে দিয়ে ভাটির ৯০ কিলোমিটার নদীকে মরুভূমি বানানো হচ্ছে। নদী মেরে সেচ প্রকল্পের এই পরিধি বাড়ানো কোনোভাবেই পরিবেশবান্ধব বা বৈজ্ঞানিক নয়।’

কর্মকর্তাদের দায়সারা বক্তব্য

এ বিষয়ে জানতে পাউবোর বিভাগীয় অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ড. মোহা. সরফরাজ বান্দার মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল দিলেও তিনি ধরেননি।

পাউবো ডালিয়ার নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী এবং সৈয়দপুরের মো. আখিনুজ্জামান জানান, নির্দিষ্ট কোনো এলাকায় কাজে অনিয়ম বা ত্রুটির সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলে তদন্ত সাপেক্ষে অবশ্যই ঠিকাদারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ৪ লাখ গাছ কাটার ফলে পরিবেশগত ক্ষতির সুনির্দিষ্ট প্রশ্নের কোনো সদুত্তর তাঁরা দিতে পারেননি।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত