Ajker Patrika

উত্তরায় শরীর থেকে মন আলাদা করা ‘কেটামিন’ তৈরি করতেন ৩ চীনা নাগরিক, যেত শ্রীলঙ্কায়

নুরুল আমিন হাসান, উত্তরা (ঢাকা)  
উত্তরায় শরীর থেকে মন আলাদা করা ‘কেটামিন’ তৈরি করতেন ৩ চীনা নাগরিক, যেত শ্রীলঙ্কায়
উত্তরায় ৩ চীনা নাগরিকের ‘কেটামিন’ তৈরির ল্যাব। ছবি: আজকের পত্রিকা

রাজধানীর উত্তরায় বাসা ভাড়া নিয়ে চীনা নাগরিকেরা তৈরি করতেন শরীর থেকে মন আলাদা করার মতো ভয়ানক নেশাজাতীয় কৃত্রিম মাদক ‘কেটামিন’। আর এসব মাদক সাউন্ড বক্সে বিশেষ কৌশলে লুকিয়ে চোরাচালান করা হতো শ্রীলঙ্কার কলম্বো ও চীনে। এ ঘটনায় তিনজন চীনা নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁরা হলেন লি বিন, জু ঝি ও চুনসেং ইয়াং।

উত্তরার ১০ নম্বর সেক্টরের ১/এ নম্বর সড়কের ২৯ নম্বর বাসায় (লায়লা গার্ডেন) আজ বুধবার (২৫ মার্চ) রাত ৮টা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে তাঁদের গ্রেপ্তার করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর।

এ সময় তাঁদের কাছ থেকে ৬ কেজি ৩০০ গ্রাম কেটামিন মাদক, মাদকদ্রব্য তৈরির বিপুল কাঁচামাল জব্দ করা হয়। এ ছাড়া কেটামিন মাদক তৈরির কাজে ব্যবহৃত বিকার, ফানেল, হিটার, ডিজিটাল মিটার, ঝাড়, অ্যাপ্রোন, গ্লাভস, মাস্কসহ বিভিন্ন সামগ্রী জব্দ করা হয়।

অভিযানকালে রুহুল আমিন নামের ভবনটির একজন বাসিন্দা বলেন, ‘চীনা নাগরিকেরা এখানে সাত-আট মাস ধরে বসবাস করতেন। আমরা শুরুতে জানতাম, এখানে বিদেশি থাকতেন। কিন্তু তাঁরা কী করতেন, সে বিষয়ে জানতাম না। তাঁরা বাইরে তেমন একটা যাতায়াত করতেন না। গভীর রাতে এই ফ্ল্যাট থেকে বিকট শব্দ হতো। গত রাতেও শব্দ হয়েছিল।’

মাদক তৈরি ও বিক্রির বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে রুহুল বলেন, ‘তারা যে মাদক তৈরি করত, তা কখনোই আমরা বুঝে উঠতে পারিনি। কারণ, তারা আমাদের সঙ্গে কখনো মিশত না। তাদের ফ্ল্যাট সব সময় ভেতর থেকে বন্ধ থাকত।’

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. মেহেদী হাসান বলেন, ‘গোপন তথ্যের ভিত্তিতে উত্তরার ১০ নম্বর সেক্টরের একটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে আমরা কেটামিন মাদক তৈরির একটি ল্যাব পাই। সেই সঙ্গে মাদকের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে তিনজন চীনা নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়।’

মেহেদী হাসান বলেন, ‘ঘটনাস্থল থেকে ৬ কেজি ৩০০ গ্রাম কেটামিন, সালফিউরিক অ্যাসিড, ইথানলসহ কেটামিন মাদক তৈরির সব ধরনের মালপত্র জব্দ করা হয়েছে। তবে বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় ছিল না, তারা এখানে মাদকের ল্যাব তৈরি করেছে।’

মেহেদী আরও বলেন, ‘গ্রেপ্তার হওয়া তিনজনই কেটামিন মাদক তৈরিতে দক্ষ বলে আমাদের মনে হচ্ছে। এ মাদক তৈরির জন্য তারা লোকাল মেডিসিনও ব্যবহার করত। পরে তারা এসব মাদক শ্রীলঙ্কা ও চীনে পাঠাত।’

মাদক তৈরির ল্যাবের সন্ধান প্রসঙ্গে মেহেদী হাসান বলেন, প্রথমে একটি কুরিয়ার সার্ভিস থেকে মাদক উদ্ধার করা হয়। পরে সেখানকার সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ এবং প্রেরকের তথ্য সংগ্রহ করে উত্তরায় অভিযান চালানো হয়।

বাংলাদেশি বিভিন্ন কোম্পানির ওষুধ তাঁদের ল্যাবে পাওয়া গেছে। দেশীয় ওষুধ কোম্পানির কেউ জড়িত কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে উপপরিচালক মেহেদী হাসান বলেন, ‘কেটামিন মাদক তৈরির কাঁচামাল কোথা থেকে কীভাবে সংগ্রহ করা হতো এবং ওষুধ কোম্পানির কেউ এতে জড়িত কি না, এসব বিষয় তদন্ত সাপেক্ষে জানা যাবে।’

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক (গোয়েন্দা) মোহাম্মদ বদরুদ্দীন বলেন, ‘এই চক্রকে ধরতে দীর্ঘদিন ধরে গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত রেখেছি। গত রমজান মাসে কয়েক দিন আমরা এই এলাকায় সেহরি করেছি। গ্রেপ্তার হওয়া চীনা নাগরিকেরা ব্যথানাশক এবং স্লিম হওয়ার ওষুধ দিয়ে বিশেষ মাধ্যমে প্রক্রিয়া করে কেটামিন মাদক তৈরি করত।’

এক প্রশ্নের জবাবে বদরুদ্দীন বলেন, ‘এই চক্রের সঙ্গে একটি চীনা কমিউনিটি সম্পৃক্ত। দেশ-বিদেশের চীনা নাগরিকদের মাঝে এই মাদক বিক্রি করা হতো।’

চোরাচালানের বিষয়ে জানতে চাইলে এই অতিরিক্ত পরিচালক বলেন, ‘চীনা নাগরিকেরা বিশেষ কায়দায় সাউন্ড বক্স, খেলনার মধ্যে বিশেষ কৌশলে লুকিয়ে বিদেশে পাচার করা হতো।’

মোহাম্মদ বদরুদ্দীন বলেন, ‘গ্রেপ্তার হওয়া চীনা নাগরিকেরা দীর্ঘদিন ধরে এই বাসায় থাকতেন এবং লোকাল মার্কেট থেকে বিভিন্ন কাঁচামাল সংগ্রহ করে ল্যাবের মাধ্যমে পাউডারজাত করে কেটামিন মাদক তৈরি এবং চোরাচালান করে আসছিল।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত