Ajker Patrika

দুই মাসে নেই দুই ঘনিষ্ঠ মিত্র—তবু চীন কেন চুপ

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
দুই মাসে নেই দুই ঘনিষ্ঠ মিত্র—তবু চীন কেন চুপ
ভেনেজুয়েলার ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো, চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং ও ইরানের নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। ছবি: সিএনএন

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর পর ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি—মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে একজনকে ক্ষমতাচ্যুত ও অন্যজনকে নির্মূল করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। চীনের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত এই দুজনের পরিণতি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তীব্র আলোড়ন তুললেও বেইজিংয়ের প্রতিক্রিয়া তুলনামূলকভাবে সীমিত। প্রশ্ন উঠছে—চীনের মতো পরাশক্তি কেন এখন নীরব দর্শকের ভূমিকায়?

মাদুরোকে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাস থেকে মার্কিন বিশেষ বাহিনী গোপন অভিযানে আটক করে নিউইয়র্কে নিয়ে যায়। আর খামেনি তেহরানের কেন্দ্রে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় নিহত হন। দুই ঘটনাতেই চীন কড়া ভাষায় নিন্দা জানায়, একে ‘সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন’ ও ‘শাসন পরিবর্তনের চেষ্টা’ বলে অভিহিত করে। পাশাপাশি তেহরানের সঙ্গে বন্ধুত্বের বার্তা পুনর্ব্যক্ত করে। কিন্তু বক্তব্যের বাইরে বাস্তবে বড় কোনো কূটনৈতিক বা সামরিক পদক্ষেপ নেয়নি বেইজিং।

বিশ্লেষকদের মতে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং-এর মাথায় এখন কঠোর বাস্তববাদ কাজ করছে। ইরান চীনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা শীর্ষ অগ্রাধিকার নয়। বিশেষ করে, এই মাসের শেষদিকে বেইজিংয়ে ট্রাম্প-সি বৈঠককে সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা চীনের জন্য বেশি জরুরি। উপরন্তু, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তি সামরিক ব্যস্ততা ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ওয়াশিংটনের মনোযোগ ও সামরিক সমাবেশ কমিয়ে দিতে পারে—যা বেইজিংয়ের কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

ওয়াশিংটনভিত্তিক থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিজ’-এর চীনবিষয়ক পরিচালক ক্রেগ সিঙ্গেলটন বলেন, ‘চীন কথায় দীর্ঘ, আর ঝুঁকিতে সংক্ষিপ্ত।’ অর্থাৎ জাতিসংঘে ইরানের পক্ষে বক্তব্য দিলেও তেহরানকে সরাসরি সহায়তা দেওয়ার ঝুঁকি নেবে না বেইজিং।

চীন ইরানি তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা হলেও সামরিক সহযোগিতা সীমিত। বরং বাণিজ্য ও বিনিয়োগের দিক থেকে উপসাগরীয় কয়েকটি দেশের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক আরও বিস্তৃত। বেইজিং মধ্যপ্রাচ্যে ভারসাম্য নীতি অনুসরণ করে—একদিকে ইরান, অন্যদিকে সৌদি আরবের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখে। ২০২৩ সালে ইরান-সৌদি সম্পর্ক সামাজিকীকরণেও চীনের মধ্যস্থতা ছিল।

বেলজিয়ামভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ’-এর বিশ্লেষক উইলিয়াম ইয়াং বলেছেন—ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়িয়ে চীনের আসলে কোনো লাভ নেই। গত এক বছরে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে যে বাণিজ্যিক সমঝোতা ও স্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে, তা ঝুঁকিতে ফেলতে চায় না বেইজিং।

চীন দীর্ঘদিন ধরে ইরানের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভরসাস্থল। চীন বরাবরই ইরানের ওপর মার্কিন একতরফা নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করেছে এবং তেহরানের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচির দাবিকে সমর্থন জানিয়েছে। ইরানকে ব্রিকস ও সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার মতো জোটে অন্তর্ভুক্ত করে আন্তর্জাতিক পরিসরে তার কূটনৈতিক পরিসরও বাড়িয়েছে। তবে সরাসরি নিরাপত্তা গ্যারান্টর হিসেবে নিজেকে তুলে ধরতে চীন অনাগ্রহী। সামরিকভাবে আফগানিস্তান ও ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিন জড়িত থাকার অভিজ্ঞতা বেইজিংকে সতর্ক রেখেছে।

অন্যদিকে ওয়াশিংটনে উদ্বেগ বেড়েছে চীন-ইরান-রাশিয়া-উত্তর কোরিয়ার ঘনিষ্ঠতা নিয়ে। গত সেপ্টেম্বরে বেইজিংয়ে সামরিক কুচকাওয়াজে চার দেশের নেতাদের উপস্থিতি ছিল নজরকাড়া। দেশগুলোর নিয়মিত যৌথ সামরিক মহড়াও হয়েছে। তবু সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির গবেষক জা ইয়ান চং বলেন, ইরান চীনের দীর্ঘমেয়াদি অংশীদার হলেও তা অস্তিত্বগত বা অত্যাবশ্যক নয়। ফলে বড় ঝুঁকি নেবে না বেইজিং।

তবে এই সীমিত সহায়তা চীনের ওপর নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। নিরাপত্তা ইস্যুতে যারা বেইজিংয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে, তারা এখন ভাবতে পারে—সংকটে পড়লে চীন কি পাশে থাকবে?

এই বিষয়ে সিএনএন-এর নিবন্ধে বলা হয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে চীনের জ্বালানি খাতে স্বল্পমেয়াদি ধাক্কা অনিবার্য। কেপলার-এর তথ্য অনুযায়ী, ইরানের প্রায় সব সমুদ্রপথে রপ্তানি হওয়া অপরিশোধিত তেল চীনে যায়, যা চীনের মোট সমুদ্রপথে আমদানির প্রায় ১৩ শতাংশ। ছোট বেসরকারি ‘টিপট’ রিফাইনারিগুলো জটিল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এই তেল আমদানি করে। তবে চীন বহু বছর ধরে সরবরাহে বৈচিত্র্য অবলম্বন করেছে এবং রাশিয়া সহ তাদের আরও বিকল্প উৎস রয়েছে। এ ছাড়া চীনের স্থলভাগে প্রায় ১.২ বিলিয়ন ব্যারেল তেল মজুত রয়েছে—যা সমুদ্রপথে আমদানির প্রায় ১১৫ দিনের সমান।

বর্তমানে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি মূলত হরমুজ প্রণালির অস্থিরতা। সৌদি আরব ও কুয়েতসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল এই পথ দিয়ে চীনে যায়, যা চীনের মোট চাহিদার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পূরণ করে। কিন্তু এখন এই প্রণালির উত্তর অংশে ইরানের নিয়ন্ত্রণ এবং আইআরজিসির এক উপদেষ্টার হুমকি পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি ও নৌপথের নিরাপত্তার আহ্বান জানিয়েছেন।

সব মিলিয়ে, পরিস্থিতিকে কৌশলগত সুযোগ হিসেবেও দেখছে চীন। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের গভীর সম্পৃক্ততা ইন্দো-প্যাসিফিকে চাপ কমাতে পারে। একই সঙ্গে বেইজিং এখন ‘হস্তক্ষেপ করে না’ এমন শান্তিপ্রিয় বিকল্প শক্তি হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করছে—যেখানে ওয়াশিংটনকে দেখানো হচ্ছে ‘আধিপত্যবাদী’ শক্তি হিসেবে। তবে সংকট সহিংস রূপ নিলে চীন সীমিত সক্ষমতা দেখাবে—এ কথাও মানতে নারাজ চীনা বিশ্লেষকেরা।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত