Ajker Patrika

মধ্যপ্রাচ্যে রপ্তানি প্রায় বন্ধ, ধাক্কা ইউরোপের বাজারেও

রোকন উদ্দীন, ঢাকা
মধ্যপ্রাচ্যে রপ্তানি প্রায় বন্ধ, ধাক্কা ইউরোপের বাজারেও
প্রতীকী ছবি

টানা সাত মাস ধরে কমছে দেশের রপ্তানি। এর ওপর ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের চলমান সংঘাতে মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি বন্ধ হয়ে গেছে; যা রপ্তানি আয়ে আরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা রপ্তানিকারকদের।

রপ্তানিকারকেরা বলছেন, দেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্যে তৈরি পোশাক, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, শাকসবজি, ফলমূল, হিমায়িত মাছ, ক্যাপ ও জুতা রপ্তানি হয়। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্য হয়ে ইউরোপের দেশেও পণ্য রপ্তানি হয়। এই যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে এই রপ্তানি বন্ধের প্রভাবে ছোট ও মাঝারি কোম্পানিগুলো বড় আর্থিক সংকটে পড়বে। যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকট দেখা দিলে পণ্য উৎপাদনও ব্যাহত হবে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যৌথ হামলা চালালে ইরানও পাল্টা হামলা শুরু করে। সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, ওমান, সৌদি আরব, লেবানন, জর্ডান, ইরাকসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে। এই অঞ্চলের অধিকাংশ ফ্লাইট বন্ধ। ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায় ওই পথে জাহাজ চলাচলও বন্ধ রয়েছে।

নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতেও আমাদের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়। এখন এগুলো প্রায় বন্ধ রয়েছে। এ ছাড়া হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকায় ইউরোপগামী পণ্যের জাহাজগুলোকে যেতে হবে আফ্রিকা ঘুরে। কিন্তু এর চেয়ে বড় সমস্যা হবে জ্বালানি আমদানি ব্যাহত হলে। কারণ, আমাদের কারখানাগুলো চলে এলএনজি দিয়ে। তাই কারখানা চালানো নিয়েও আমরা দুশ্চিন্তায় রয়েছি।’

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ তথ্য বলছে, গত ফেব্রুয়ারিতে তৈরি পোশাক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইলসহ প্রায় সব পণ্যের রপ্তানি কমেছে ১২ শতাংশ। এ নিয়ে টানা সপ্তম মাস রপ্তানি কম।

ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ইরানে বাংলাদেশ থেকে সরাসরি ১ কোটি ৯ লাখ মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এর মধ্যে ১ কোটি ৮ লাখ ৩২ হাজার ৮৯৮ ডলারের পাটের সুতা, ৯৫ হাজার ৩১০ ডলারের নিট পোশাক এবং ৯ হাজার ৩৫১ ডলারের ওভেন পোশাক রপ্তানি হয়। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবে রপ্তানি আরও বেশি। বিদায়ী অর্থবছরে আরব আমিরাতে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৩৫ কোটি ডলারের অধিক। সৌদি আরবে রপ্তানি হয় ২৯ কোটি ডলারের বেশি।

ইরান গত সোমবার হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা দেওয়ার পর পারস্য উপসাগর অঞ্চলের আট দেশসহ মধ্যপ্রাচ্যে রপ্তানি কনটেইনার পরিবহনের বুকিং নেওয়া স্থগিত করেছে শিপিং লাইনগুলো। ফলে চট্টগ্রামের বেসরকারি ডিপো, চট্টগ্রাম বন্দর, শ্রীলঙ্কার কলম্বোসহ বিদেশের চার বন্দরে এই আট দেশে রপ্তানির অপেক্ষায় থাকা বিপুলসংখ্যক কনটেইনার আটকা পড়েছে।

অন্যতম শীর্ষ তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক স্প্যারো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম বলেন, ‘এখন আমাদের পিক মৌসুম। গ্রীষ্মের পণ্য রপ্তানির অর্ডার রয়েছে। এ সময় অনেক ক্রেতার পণ্য লিড টাইম কমানোর জন্য উড়োজাহাজে পাঠাতে হয়। কিন্তু এখন সেটি পারছি না।’ তিনি বলেন, ‘আমার কিছু পোশাকপণ্য ঢাকায় বিমানবন্দের আটকে আছে। এগুলো দুবাই বিমানবন্দর হয়ে এয়ার কার্গোর মাধ্যমে যুক্তরাজ্যে যাওয়ার কথা। কিন্তু দুবাই বিমানবন্দর বন্ধ। বিকল্প ছিল নয়াদিল্লি বিমানবন্দর ব্যবহার করে পাঠানো। কিন্তু আমাদের দিল্লি বিমানবন্দর ব্যবহারের সুবিধা আগেই বন্ধ করে দিয়েছে। এখন হংকং হয়ে পাঠাতে হলে খরচ বেড়ে যাবে।’

বাংলাদেশ থেকে প্রতিদিন মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কাঁচা মরিচ থেকে শুরু করে লাউ, কুমড়া, বেগুন, ঢ্যাঁড়স, পেঁপে, চিচিঙ্গা, কাঁকরোল, বরবটি, শিম, টমেটোসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি রপ্তানি হয়। এসব পণ্য রপ্তানি হয় যাত্রীবাহী উড়োজাহাজের কার্গো হোলে অথবা কার্গো উড়োজাহাজে। এই রপ্তানির প্রায় পুরোটাই এখন বন্ধ।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে আট কোটি ডলারের সবজি রপ্তানি হয়। এর মধ্যে সৌদি আরবে ১ কোটি ১৬ লাখ ডলারের, আরব আমিরাতে ৯৯ লাখ ডলারের, কাতারে ৪১ লাখ ডলারের, কুয়েতে ৩১ লাখ ডলারের সবজি রপ্তানি হয়। এর বাইরে যুক্তরাজ্যে ১ কোটি ৫৫ লাখ ডলারের, ইতালিতে ৩৬ লাখ ও কানাডায় ২৩ লাখ ডলারের সবজি রপ্তানি হয়েছে।

বাংলাদেশ ফ্রুটস, ভেজিটেবল অ্যান্ড অ্যালায়েড প্রোডাক্টস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফভিএপিইএ) সভাপতি এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে গ্রীষ্মকালে সবজির উৎপাদন কম থাকে। এতে আমাদের রপ্তানি বাড়ে। সে হিসেবে এখন রপ্তানির এই পিক সিজনে মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা শুরু হয়েছে; যা আমাদের ব্যবসার জন্য বড় দুশ্চিন্তার।’

কৃষিপণ্য রপ্তানিতে বড় প্রতিষ্ঠান প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল বলেন, শুধু মধ্যপ্রাচ্যে নয়, মধ্যপ্রাচ্যের হাব হয়ে ইউরোপে যাওয়া কৃষি ও খাদ্যপণ্যের ট্রানজিটও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে তাঁদের রপ্তানি মারাত্মক ব্যাহত হবে।

বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানির বিকল্প পথগুলো বেছে নিতে হবে। কারণ, এই যুদ্ধ সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলবে জ্বালানি আমদানিতে; যা উৎপাদন ব্যাহত করবে। ব্যবসায়ীদের ক্রেতাদের সঙ্গে ওয়ান টু ওয়ান যোগাযোগ করে রপ্তানি অব্যাহত রাখার চেষ্টা করতে হবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত