Ajker Patrika

এক হাত কেন জোব্বায় ঢেকে রাখতেন খামেনি

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ০৫ মার্চ ২০২৬, ০১: ১৫
এক হাত কেন জোব্বায় ঢেকে রাখতেন খামেনি
ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। ছবি: রয়টার্সের সৌজন্যে

গত শনিবার তেহরানে নিজ কার্যালয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলায় নিহত হয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। গত রোববার সকালে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আইআরআইবি নিশ্চিত করে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা শাহাদাতবরণ করেছেন।

খামেনি ছিলেন ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা। দেশীয় গণমাধ্যম ছাড়াও তিনি বিভিন্ন সময়ে স্থানীয় মসজিদে তাঁর অনুসারীদের উদ্দেশে ভাষণ দিতেন। এসব ঘটনার সব ছবিতেই একটি সাধারণ বিষয় দেখা যায়, তিনি সব সময় তাঁর ডান হাত ঢেকে রাখতেন। এ থেকে অনেকের মনে কৌতূহল—তিনি কেন তাঁর ডান হাত সব সময় ঢেকে রাখতেন।

খামেনি আশির দশকে এক প্রাণঘাতী হামলার শিকার হয়েছিলেন। তবে ওই হামলা থেকে বেঁচে ফিরলেও তাঁর ডান হাতটি চিরতরে পঙ্গু হয়ে গিয়েছিল। দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে তাঁর সেই অবশ হাতটি জোব্বার নিচে ঢেকে রাখাই ছিল খামেনির চিরচেনা প্রতিচ্ছবি।

১৯৮৯ সালে সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার আট বছর আগে, অর্থাৎ ১৯৮১ সালের ২৭ জুন এক হত্যাচেষ্টার শিকার হন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট খামেনি। ইরান-ইরাক যুদ্ধের সম্মুখভাগ থেকে ফিরে তিনি একটি মসজিদে নামাজ পড়তে যান। নামাজ শেষে অনুসারীদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময় এক যুবক তাঁর সামনের টেবিলে একটি টেপ রেকর্ডার রেখে বোতাম চেপে দেন। কিছুক্ষণ পরই বিকট শব্দে রেকর্ডারটি বিস্ফোরিত হয়।

রেকর্ডারের ভেতরে লেখা ছিল, ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্রের জন্য ফুরকান গ্রুপের উপহার’। ফুরকান গ্রুপ ছিল তৎকালীন শিয়া আলেমশাসিত সরকারের কট্টরবিরোধী একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী।

ওই বিস্ফোরণে খামেনির ডান হাত, কণ্ঠনালি ও ফুসফুস মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সুস্থ হতে কয়েক মাস সময় লাগলেও তাঁর ডান হাতটি চিরতরে অবশ হয়ে যায়। সেই সময় অদম্য সাহসের পরিচয় দিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার হাতের প্রয়োজন নেই। আমার মস্তিষ্ক ও জিহ্বা কাজ করলেই যথেষ্ট হবে।’

এরপর তিনি বাঁ হাতে লেখা রপ্ত করেন এবং ধর্মীয় নেতৃত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে আরোহণ করেন। ১৯৮১ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত দুই মেয়াদে ইরানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ১৯৮৭ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দিতে তিনি একবারই যুক্তরাষ্ট্র সফর করেছিলেন।

১৯৮১ সালের ২৭ জুন হত্যাচেষ্টার শিকার হয়েছিলেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট খামেনি। সে সময় তাঁর ডান হাত, কণ্ঠনালি ও ফুসফুস মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ছবি: খামেনি-আইআর
১৯৮১ সালের ২৭ জুন হত্যাচেষ্টার শিকার হয়েছিলেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট খামেনি। সে সময় তাঁর ডান হাত, কণ্ঠনালি ও ফুসফুস মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ছবি: খামেনি-আইআর

দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে ইরানের রাজনীতি ও ধর্মের নিয়ন্ত্রক থাকলেও খামেনির ব্যক্তিগত জীবন ছিল লোকচক্ষুর অন্তরালে। তিনি স্ত্রী মানসুরেহ খোজাস্তে বাঘেরজাদেহ ও ছয় সন্তান রেখে গেছেন। তাঁর নাতি ও ভাগনেদের কেউ কেউ প্যারিসে বসবাস করেন বলে খবর থাকলেও তাঁর নিকটতম পরিবার ইরানেই অবস্থান করছে। (উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক হামলায় তাঁর স্ত্রী মানসুরেহও আহত হয়ে পরে মারা গেছেন)।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের তথ্যমতে, ৮৬ বছর বয়সী খামেনি টানা ৩৫ বছর ইরান শাসন করেছেন, যা তাঁকে বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘমেয়াদি শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।

খামেনি চেয়েছিলেন ইরানকে বৈশ্বিক পুঁজিবাদ ও নাগরিক সমাজের প্রভাব থেকে দেয়াল তুলে আলাদা রাখতে। তিনি মনে করতেন, পশ্চিমা সংস্কৃতি পশ্চিমা বোমার চেয়ে বেশি বিপজ্জনক।

খামেনি এমন এক বিপ্লবকে রক্ষা করতে চেয়েছিলেন, যা বর্তমান বিশ্বের বাস্তবতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। জর্জ কেনান সোভিয়েত ইউনিয়ন সম্পর্কে লিখেছেন, কোনো মসিহবাদী আন্দোলন চিরকাল বাস্তবতাকে অস্বীকার করে টিকে থাকতে পারে না। কিন্তু খামেনি চার দশক ধরে জোর করে সেই পরিবর্তনকে ঠেকিয়ে রেখেছিলেন।

তবে খামেনির যুক্তরাষ্ট্রবিদ্বেষ কেবল আদর্শিক ছিল না, এটি ছিল তাঁর টিকে থাকারও কৌশল। প্রভাবশালী আলেম আহমদ জান্নাতি একবার বলেছিলেন, ‘যদি ইরানে যুক্তরাষ্ট্রঘেঁষা কেউ ক্ষমতায় আসে, তবে আমাদের সবকিছুকে বিদায় জানাতে হবে।’ খামেনি নিজেও বিশ্বাস করতেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সমঝোতা সম্ভব, কিন্তু ‘ইসলামিক রিপাবলিক’ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে তা অসম্ভব।

শেষ পর্যন্ত খামেনির পতন ঘটেছে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মতো উগ্রবাদীদের হাতে, যাঁদের তিনি চরম ঘৃণা করতেন। সারা জীবন তিনি ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মৃত্যু’ কামনা করেছেন, শেষ পর্যন্ত সেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আঘাতেই তাঁর জীবনের অবসান ঘটেছে!

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত