Ajker Patrika

সুপেয় পানি

সম্পাদকীয়
সুপেয় পানি

পানিবেষ্টিত হাওরাঞ্চলে খাওয়ার জন্য সুপেয় পানির সংকট দেখা দিয়েছে। ৭ এপ্রিল আজকের পত্রিকায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, কিশোরগঞ্জ জেলায় ৩২ লাখ মানুষের মধ্যে প্রায় ৩৫ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষ নিরাপদ পানি থেকে বঞ্চিত। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তথ্যমতে, জেলার ১৫ হাজার সরকারি টিউবওয়েল দিয়ে মাত্র দেড় লাখ পরিবারের জন্য পানির চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছে। ফলে এখানকার একটি বিশাল জনগোষ্ঠী বাধ্য হয়ে নদী, পুকুর ও হাওরের দূষিত পানি পান করছে, যা তাদের স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জেলার দরিদ্র জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশই এই পানিসংকটের প্রধান শিকার। একদিকে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় সাধারণ টিউবওয়েল থেকে পানি উঠছে না, অন্যদিকে উচ্চবিত্তরা ব্যক্তিগত অর্থায়নে সাবমার্সিবল পাম্প বসিয়ে পানির সংস্থান করছেন। কিন্তু সেই আর্থিক সামর্থ্য দরিদ্র মানুষের নেই। আধা মাইল দূর থেকে পানি বয়ে আনা কিংবা পুকুরের ঘোলা পানিতে রান্না ও গোসল করার কারণে পানিবাহিত রোগের যে বিস্তার ঘটছে, তার দায়ভার প্রশাসন এড়াতে পারে না।

আরও বিস্ময়কর তথ্য হলো, কেবল দুর্গম গ্রামাঞ্চলই নয়, কিশোরগঞ্জ পৌর এলাকার ৩০ শতাংশ মানুষও সুপেয় পানি পাচ্ছে না। ১০ দশমিক ৩৭ বর্গকিলোমিটারের এই ক্ষুদ্র পৌরসভায় শতভাগ পাইপলাইন দিয়ে পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারা প্রশাসনের দুর্বলতার দিকটিই প্রকাশ করে। বর্তমানে দৈনিক মাত্র পাঁচ ঘণ্টা পানি সরবরাহ এবং সীমিতসংখ্যক পাম্প ও ট্যাংকের মাধ্যমে যে সেবা দেওয়া হচ্ছে, তা সেখানকার মোট জনসংখ্যার তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল।

অনিরাপদ পানি পানের কারণে শিশু ও বৃদ্ধরা সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে আছে। একই সঙ্গে পেটের পীড়া থেকে শুরু করে চর্মরোগের প্রকোপ এই অঞ্চলে দিন দিন বাড়ছে। একটি জাতির সুস্থ ও সবলভাবে বেড়ে ওঠার জন্য নিরাপদ পানি খুব প্রয়োজনীয় বস্তু।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর গ্রামাঞ্চলেও পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি সরবরাহের যে নতুন পরিকল্পনার কথা বলছে, তা নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। একটি শক্তিশালী প্রোডাকশন টিউবওয়েল স্থাপন করে একাধিক বাড়িতে সংযোগ দেওয়ার যে পাইলট প্রজেক্ট নেওয়া হয়েছে, তা দ্রুত সারা জেলায় ছড়িয়ে দিতে হবে। তবে কেবল পরিকল্পনা গ্রহণই যথেষ্ট নয়, এর দ্রুত বাস্তবায়ন জরুরি।

আমরা মনে করি, কিশোরগঞ্জের এই পানিসংকট নিরসনে সরকারকে জেলাজুড়ে গভীর নলকূপ ও পাইপলাইনের নেটওয়ার্ক বিস্তার করতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। পাইপলাইনের সীমাবদ্ধতা দূর করে দ্রুত শতভাগ মানুষকে সংযোগের আওতায় আনতে হবে। যারা ব্যক্তিগতভাবে পাম্প বসাতে অক্ষম, তাদের জন্য সরকারি ভর্তুকিতে কমিউনিটিভিত্তিক পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। নদী ও পুকুরের পানি সংরক্ষণে দূষণমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে বিকল্প উৎস হিসেবে সেগুলো নিরাপদভাবে ব্যবহার করা যায়।

পানির অপর নাম জীবন—এই কথাটি যেন কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ না থাকে। জনগণের জন্য সুপেয় পানির ব্যবস্থা করা সরকারের দায়িত্ব। সেটা নিশ্চিত করা হবে বলেই আমাদের প্রত্যাশা।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত