Ajker Patrika

পয়লা বৈশাখ এবং শিল্প-সমৃদ্ধ ভাবনা

মামুনুর রশীদ নাট্যব্যক্তিত্ব
পয়লা বৈশাখ এবং শিল্প-সমৃদ্ধ ভাবনা
শিল্পের সংকোচন নয়, বরং শিল্পকে যতটা সম্ভব উন্মুক্ত করতে হয়। ছবি: আজকের পত্রিকা

সংস্কৃতিমন্ত্রী এবারের পয়লা বৈশাখের আয়োজন নিয়ে অনেকগুলো ইতিবাচক কথা বলেছেন, তার মধ্যে একটি হলো পয়লা বৈশাখের শোভাযাত্রার নাম মঙ্গল শোভাযাত্রাই থাকবে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তিনি নামটি পরিবর্তন করে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ নামকরণ করেন।

স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় মঙ্গল শোভাযাত্রার সঙ্গে আমার শুধু স্মৃতি নয়, আবেগও জড়িয়ে আছে। আমি সেই সময় এর প্রথম থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার শিক্ষার্থী-শিক্ষকদের সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করেছি এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত থেকে। ওই সময়টা সবাই দল-মতনির্বিশেষে এই শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করেছিলেন।

আজকের যে সরকার তারাও সেই সময়ে প্রত্যক্ষভাবেই পয়লা বৈশাখ উদ্‌যাপনে অংশ নিয়েছিল। আমরা এরপর বড় আয়োজনে ১৪০০ সাল উদ্‌যাপনও করেছিলাম। সেই উদ্‌যাপন কমিটির আহ্বায়ক ছিলাম আমি এবং শিল্পী রফিকুন নবী। তারপর ৩২ বছর পার হয়ে গেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এর নাম পরিবর্তনের একটা হুজুগ সৃষ্টি হলো। এ অকারণ হুজুগ এবং ক্ষমতার দাপটে নামটি পরিবর্তনও হয়েছিল। এবারে আবার মঙ্গল শোভাযাত্রা ফিরে আসাতে আমরা আনন্দিত হয়েছি। মঙ্গলে অসুবিধাটা কী? আমাদের মঙ্গলকাব্যে এই অঞ্চলের অসাম্প্রদায়িক চেতনারই প্রতিফলন ঘটেছে, বিষয়টি কোনো অবস্থাতেই হিন্দুয়ানি নয়। তাই অনুরোধ করব আবার মঙ্গল নামে ফিরিয়ে আনা হোক।

দ্বিতীয় বিষয়টি হলো, প্রাথমিক থেকে শিক্ষার সঙ্গে সংগীত যুক্ত হবে এবং স্কুলগুলোতে সংগীতের শিক্ষক নিয়োগ করা হবে। এটি নিঃসন্দেহে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ। বিভিন্ন টেলিভিশনের অডিশনে দেখা যায়, যোগ্য তরুণ শিল্পীদের পাওয়াই যায় না। বিশেষ করে মুসলিম পরিবারের ছেলে-মেয়েদের। সংগীতের চর্চা মুসলিম পরিবারে একসময় খুবই গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করা হতো।

কিন্তু কালক্রমে পড়ালেখার চাপে সংগীত, ক্রীড়া, নাটক, আবৃত্তি বিষয়গুলো গৌণ হতে থাকে। হিন্দু পরিবারে চর্চাটা কিছুটা অক্ষুণ্ন থাকলেও ছেলেরা তেমন এগিয়ে আসে না, মেয়েরা সেই অভাবটাকে পূরণ করে। ষাটের দশক পর্যন্ত এবং পরেও সত্তরের দশকে বাড়িতে বাড়িতে হারমোনিয়ামের শব্দ শোনা যেত। কিন্তু পরবর্তী সময়ে যদিও ব্যান্ড সংগীতের একটা রেওয়াজ লক্ষ করা গেল। কিন্তু চর্চার বিষয়টি গৌণই রয়ে গেল। এই সময়ে শিশু-কিশোরদের ওপর পড়ালেখার চাপ এত বেশি বেড়ে গেল যে শিক্ষার্থীরা অতিরিক্ত লেখাপড়ার চাপে দিশেহারা হয়ে পড়ল। অভিভাবকেরাও তাঁদের সন্তানদের পরীক্ষার ভালো ফল করাকেই শুধু শিক্ষার মূলমন্ত্র হিসেবে গ্রহণ করল।

শিক্ষক ও অভিভাবকেরা ছাত্রদের স্বাস্থ্যের প্রতি কোনো গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেন না। অথচ আমরা ভেবে দেখেছি শিক্ষার আগেই এবং সমান্তরালে স্বাস্থ্যটি ভালো থাকা চাই। এখন শিক্ষার্থীদের খাবারের অনীহা দেখেই অনুমান করা যায় তাদের স্বাস্থ্যটি ভালো নেই। শহরে এমনকি এখন গ্রাম পর্যায়েও স্বাস্থ্যকর খাবারের পরিবর্তে অস্বাস্থ্যকর খাবার এবং জাংফুডের ছড়াছড়ি। শরীরচর্চা, খেলাধুলা এগুলো একেবারে গৌণ হয়ে গেছে। তবে অধিকাংশ অভিভাবক সন্তানদের ক্রিকেট খেলায় খুব আগ্রহ দেখান। কারণ, একবার ভালো খেলতে পারলে অনেক টাকা উপার্জন করা যাবে। ভালো খেলোয়াড় হওয়া থেকে অর্থ উপার্জনটাই এখানে মুখ্য। শিশুদের মনন গঠনে একটি গানের সুর কীভাবে প্রভাবিত করে, তা আমরা জানি। যারা শিল্পকে ধর্মের বিপরীতে দাঁড় করাতে চান, তাঁদের হয়তো জানা দরকার উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ শিল্পীরা সবাই ধার্মিক ছিলেন। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁ, বিসমিল্লা খাঁ—সবাই মনে করতেন তাঁদের উপাসনার প্রধান ক্ষেত্র হচ্ছে সংগীত। সংগীতের মাধ্যমে তাঁরা সৃষ্টিকর্তার নৈকট্য লাভ করতে চাইতেন। ওস্তাদ আব্দুল করিম খাঁ একেবারে মন্দিরে গিয়ে ভজনও গাইতেন। এই ওস্তাদরা আবার নামাজ, রেওয়াজ ও ধর্মীয় অনুশাসন মানার ক্ষেত্রে ছিলেন কট্টর।

অথচ দেখা গেল ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর জন্মস্থানে কিছু উগ্র ধর্মপন্থী গোষ্ঠী তাঁর গৃহে আক্রমণ করে মূল্যবান সংগীতের যন্ত্রাদি ধ্বংস করে ফেলেছিল। অনেক ইসলাম ধর্মাবলম্বী সংগীতের আশ্রয় নিয়ে থাকেন। মাজারে মাজারে সংগীতের চর্চা আমরা বহু শতাব্দী ধরে দেখে আসছি। সংগীত মানুষের সুকুমার বৃত্তিকে বিকশিত করে। এ দেশে অসংখ্য লোকগীতি, মানুষের জীবনকে সুরের মধ্যে বেঁধে ফেলে মানুষের চিন্তাকে একটা সুশৃঙ্খল ধারায় প্রবাহিত করে। তেমনি নিয়মিত শরীরচর্চা, সংগীতচর্চা যেকোনো শিশু-কিশোর এবং তরুণদের জীবনকে একটা সুশৃঙ্খল জীবনযাপনের মধ্যে নিয়ে আসতে কাজ করে থাকে। বহু আগে থেকেই প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে ছবি আঁকা শেখানোর জন্য একটি ড্রইং শিক্ষক থাকত। অসাধারণ সব ছবি শিশুদের মননকে প্রকাশ করত। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর আবৃত্তিশিল্প একটা জনপ্রিয় মাধ্যম হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। শিক্ষার্থীদের সঠিক উচ্চারণ শেখাতে এই শিল্প অত্যন্ত সহায়ক। বাক্যের সঙ্গে যে ভাবনা বা গভীরতা লুকিয়ে থাকে আবৃত্তি তা শেখায়। এরপর আছে বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় মাধ্যম নাট্যাভিনয়। দেশে অনেকগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে নাটকের ওপর অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রি চালু হয়েছে। কিন্তু প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে এর কোনো চর্চা নেই। একেবারে বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে তা শুরু করতে হয়। কাজেই অন্তত মাধ্যমিক থেকে যদি নাটকের বিষয়গুলো পড়ানো শুরু হয়, তাহলে একটা রুচিশীলতার সূচনা হতে পারে। যার প্রতিফলন বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গিয়ে দেখা যাবে। এর বাইরেও অনেক বিবেচনা থেকে স্কুলে শিল্পের বিষয়গুলো পাঠদানের যে গুরুত্বের কথা সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ভেবেছে, তা শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত হয়ে আমাদের সংস্কৃতি অনেক বেশি বেগবান হবে বলে মনে করি।

শিল্পের ওপর হামলা করে বলপূর্বক কোনো আঙ্গিককে চাপিয়ে দিলে তা সফল হয় না। তার প্রমাণ হলো, শিল্পকলা একাডেমির একজন মহাপরিচালক হঠাৎ করে শিল্পকলা একাডেমিগুলোতে কাওয়ালির সূচনা করলেন এবং তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ নানান ধরনের নতুন ন্যারেটিভ নির্মাণের অপচেষ্টাও করলেন। কোনো কোনো উসকানিতে দেখা গেল মাজার ভাঙা, বাউলদের ওপর আক্রমণ করা হলো—এসব ঘটনা একটা নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরি করল। সবশেষে ছায়ানট, উদীচীর অফিস এবং দুটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকার অফিসে অগ্নিসংযোগ ও হামলা করা হলো।

একটা দেশের সংস্কৃতির ওপর কোনো জবরদস্তি চলে না। তা যদি চলতই তাহলে আমাদের ভাষা আন্দোলন ব্যর্থ হতো এবং পাকিস্তান আমলের যতসব সংস্কৃতিতে সংকোচনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, সেসব সফল হতো। কিন্তু সেইসব অপচেষ্টা ব্যর্থ তো হয়েছেই, বরং একটি রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধের জন্ম দিয়েছে এবং আমাদের এই মুক্তিযুদ্ধ সংস্কৃতির একটা বড় অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোনো দেশের সংস্কৃতির ওপর কারোরই একাধিপত্য থাকে না, একটা মিশ্র সংস্কৃতি দাঁড়িয়ে যায়। যেমন বাংলাদেশে বাংলা ভাষা ছাড়াও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের প্রায় ৪০টি ভাষা আছে এবং ভাষার সঙ্গে সঙ্গে তাদের নিজস্ব সংস্কৃতিও আছে। দেশে যেসব ধর্ম আছে তাদেরও একটা ধর্মীয় সংস্কৃতি আছে, গ্রামীণ সংস্কৃতি আছে, নাগরিক সংস্কৃতিও আছে। সর্বোপরি কৃষিভিত্তিক সমাজে কৃষকেরও একটা সংস্কৃতি রয়েছে। এসব কিছু মিলিয়ে আবহমান কাল ধরে মানুষ এগিয়ে চলেছে। এর মধ্যে অনেক নতুন উপাদান এসে যুক্ত হচ্ছে। সমাজ সেইসব উপাদান থেকে কিছু কিছু গ্রহণ করছে আর কিছু উপাদান পরিত্যক্ত হয়ে যাচ্ছে। এখানেও কোনো বলপ্রয়োগ চলে না। তবে প্রতিনিয়ত একটা চর্চা সব সমাজেই ধরে রাখা প্রয়োজন। মানুষের উন্নত জীবনের আকাঙ্ক্ষায় সংস্কৃতি সব সময়ই কিছু না কিছু পথ দেখায়। সেই পথের অন্বেষণ করতে গেলে অবশ্যই যাঁরা রাজনীতি করেন তাঁদেরও যুক্ত হওয়া দরকার।

মানুষের জীবনযাপন তার প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, অর্থনৈতিক জীবন স্বপ্নের জায়গাটি এসবের প্রতি মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন। রাজনৈতিক ক্ষমতায় থাকা মানুষেরা নিজেদের প্রতিদিনের টিকে থাকার সংগ্রামটা এত মুখ্য হয়ে যায় যে জীবনের বৃহত্তর মাত্রাগুলোকে দেখার সময় পান না। রাজনৈতিক কর্মীদের পাঠাভ্যাস, নাটক, সিনেমা দেখা, গান শোনা, আর্ট গ্যালারিতে যাওয়া এসবে কমই তাঁদের দেখা যায়। এই অভ্যাসগুলো খুব নিয়মিত হওয়া প্রয়োজন। যাঁরা দেশ চালাবেন তাঁরা ভালো নাটক দেখবেন না, গান শুনবেন না, সিনেমা দেখবেন না এবং দেখে সমালোচনা করবেন না, তাহলে চলবে কী করে? এ দেশের শিক্ষকদের মধ্যেও এই শূন্যতা লক্ষ করার মতো। অধিকাংশ শিক্ষকই ক্লাসরুমের চেয়ে কোচিংয়ে বেশি মনোযোগী। অনেকে ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত তাই তাঁদের সময় কোথায়? একটি ভালো গান শুনে বা নাটক দেখে ছাত্রদের সঙ্গে কথা বলবেন সেই সময় তাঁদের নেই, কোনো মতে, সিলেবাসের পড়াটা পড়িয়েই তিনি ক্লান্ত হয়ে যান। শিক্ষকেরা যখন দরিদ্র ছিলেন তখন তাঁদের বৈষয়িক ভাবনাও ছিল সীমিত পর্যায়ের। শিক্ষাকে জীবনের ব্রত হিসেবে ভাবতেন। আজকের দিনে হয়তো তা সম্ভব নয়। কারণ, জীবনযাপনের চাপ অনেক বেড়েছে। কিন্তু তবু শিক্ষকদের হাতেই শিক্ষার্থীদের রুচি উন্নয়নের দায়িত্ব রয়ে গেছে।

আমাদের প্রাচীনকাল থেকে যে ছবিগুলো থাকে তা জনজীবনের নানান ধরনের অমঙ্গল এবং সুন্দরের আকাঙ্ক্ষা ধৃত হয়ে আছে। গ্রামাঞ্চলের শিল্পীরাও এইসব চিত্রকল্পকে তাঁদের শিল্পকর্মে ফুটিয়ে তুলে থাকেন, নানান ধরনের মুখোশ তৈরি করা হয় যার ফলে লোকায়ত শিল্প সমৃদ্ধ হয়ে থাকে। সেইসব দিক বিবেচনা করে শিল্পের সংকোচন নয়, বরং শিল্পকে যতটা সম্ভব উন্মুক্ত করা যায়, সেটাই হওয়া উচিত আজকের দিনের আকাঙ্ক্ষা।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত