Ajker Patrika

বাংলাদেশ রেলওয়ে

চীনা ঋণে ৯২৭ কোটি টাকায় কোচ কেনার প্রকল্প বাতিল, নতুন প্রস্তাব ৩২৮ কোটিতে

  • শর্তের কারণে চীনের ঋণে ২০০ মিটারগেজ যাত্রী কোচ কেনার প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্ত।
  • ২০১৬ সালে নেওয়া প্রকল্পটিতে ব্যয় ধরা হয় ৯২৭ কোটি টাকা, খরচ ১ কোটি ১৬ লাখ।
  • ২০০ কোচ কেনার নতুন প্রস্তাবে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩২৮ কোটি ১৫ লাখ, অর্থায়ন এডিবির।
তৌফিকুল ইসলাম, ঢাকা 
আপডেট : ৩১ আগস্ট ২০২৫, ১০: ৩৪
যাত্রী নিয়ে ছেড়ে যাচ্ছে ট্রেন। ছবি: আজকের পত্রিকা
যাত্রী নিয়ে ছেড়ে যাচ্ছে ট্রেন। ছবি: আজকের পত্রিকা

৯২৭ কোটি টাকায় ২০০টি মিটারগেজ যাত্রীবাহী কোচ কেনার একটি প্রকল্প ৯ বছর পর বাতিল করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। চীনের একটি কোম্পানি থেকে কোচগুলো কেনার এই প্রকল্প বাতিল হয়েছে ঋণের শর্ত অসামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ায়।

ঋণের শর্তের কারণে চুক্তি না হওয়ায় কয়েক দফা এই প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়। প্রকল্পে সরকারি তহবিল থেকে খরচ হয়েছে ১ কোটি ১৬ লাখ টাকা। রেলওয়ে বলেছে, সহজ ঋণের আওতায় ২০০টি মিটারগেজ যাত্রীবাহী কোচ কেনার নতুন প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এডিবির অর্থায়নে এর ব্যয় ধরা হয়েছে ৩২৮ কোটি ১৫ লাখ ১৬ হাজার টাকা।

প্রকল্প সূত্র জানায়, বাংলাদেশ রেলওয়ে ২০১৬ সালের জুলাইয়ে চীনের একটি কোম্পানি থেকে ৯২৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০০টি মিটারগেজ যাত্রীবাহী কোচ (বগি) কেনার একটি প্রকল্প নেয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হওয়ার কথা ছিল টেন্ডারার্স ফাইন্যান্সিং বা সাপ্লায়ার্স ক্রেডিটের আওতায়, যেখানে চীন মূলত অর্থায়ন করত। কিন্তু ঋণের সুদহার নির্ধারণ করা হয় ছয় মাস মেয়াদি ইউরো আন্তব্যাংক অফার রেটে। পাশাপাশি ২৫% কমিটমেন্ট ফি, ১.৩% অ্যারেঞ্জমেন্ট ফি এবং ১৫ বছর মেয়াদি ঋণের বিপরীতে মাত্র ৩ বছরের গ্রেস পিরিয়ড রাখা হয়। এতে বাংলাদেশের ওপর ঋণের চাপ বাড়ত।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক (ডিজি) মো. আফজাল হোসেন গত বৃহস্পতিবার আজকের পত্রিকাকে বলেন, ঋণের কিছু শর্তে ঝামেলা থাকায় এবং দীর্ঘ দিনেও চুক্তি না হওয়াতে প্রকল্পটি বাতিল করা হয়েছে। কঠিন শর্তের কারণে কেউ এই চুক্তি করতে রাজি হয়নি। এর পরিবর্তে সহজ ঋণের আওতায় মিটারগেজের ২০০টি যাত্রীবাহী কোচ কেনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। ফলে আগের প্রকল্প বাতিল হলেও খুব একটা সমস্যা নেই।

সূত্র জানায়, গত বছরের নভেম্বরে প্রজেক্ট স্টিয়ারিং কমিটির (পিএসসি) সভায় ২০০ যাত্রীবাহী কোচ কেনার প্রকল্পটি অসমাপ্ত রেখে সমাপ্ত করার সিদ্ধান্ত হয়। প্রকল্প অসমাপ্ত রেখে সমাপ্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়ে রেল মন্ত্রণালয়ে ১৮ আগস্ট বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) তাদের মতামতসহ প্রতিবেদন জমা দেয়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রেলওয়ের জন্য ২০০টি মিটারগেজ যাত্রীবাহী কোচ সংগ্রহ প্রকল্পটি টেন্ডারার্স ফাইন্যান্সিংয়ের আওতায় অনুমোদিত হয়েছিল। ২০১৮ সালের ৪ নভেম্বর চীনের সিআরআরসি সাইফাং কোম্পানি লিমিটেডের সঙ্গে বাণিজ্যিক চুক্তিও হয়। শর্ত অনুযায়ী সরবরাহকারীর সক্ষমতা ও পণ্যের মান যাচাইয়ের জন্য প্রতিনিধিদল পাঠানোর কথা থাকলেও কোভিড-১৯-এর কারণে সম্ভব হয়নি। পরে ২০২২ সালের আগস্টে ঋণবিষয়ক স্থায়ী কমিটি অনুমোদন বাতিল করে এবং ঋণচুক্তির প্রক্রিয়া বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়। ওই বছরের সেপ্টেম্বরে প্রজেক্ট স্টিয়ারিং কমিটি বাণিজ্যিক চুক্তিও বাতিল করে। পরে বিকল্প অর্থায়নের বিষয়টি বিবেচনা করা হলেও গত নভেম্বরে প্রকল্পটি অসমাপ্ত রেখেই সমাপ্ত ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত হয়। এ সময়ে সরকারি তহবিল (জিওবি) থেকে ১ কোটি ১৬ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে।

আইএমইডির পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, টেন্ডারার্স ফাইন্যান্সিংয়ের ঋণের শর্ত অসামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ায় চুক্তি সম্পাদন সম্ভব হয়নি। সূত্র জানায়, এই প্রকল্প বাতিলের প্রস্তাব জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) অনুমোদন হলে প্রকল্পটি চূড়ান্তভাবে বাতিল হবে।

ভবিষ্যতে ঋণ চূড়ান্ত হওয়ার আগে যেন সরকারি অর্থ খরচ না হয়, সে বিষয়ে রেলপথ মন্ত্রণালয়কে সতর্ক থাকতে হবে বলে আইএমইডির প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়েছে।

দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. শামসুল হক আজকের পত্রিকাকে বলেন, আগে নেওয়া কিছু প্রকল্পে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থ জড়িত থাকতে পারে। তাই কোনো প্রকল্প বাতিলের পেছনে নিশ্চয়ই যুক্তি রয়েছে। শর্তে জটিলতা থাকলে চুক্তি না করাই ভালো। এ সিদ্ধান্ত সরকার সঠিকভাবে নিয়েছে।

সূত্র বলেছে, এই প্রকল্পে কাজ না হলেও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, যানবাহনের জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ, অফিস আসবাব, স্টেশনারি ও অন্যান্য খাতে সরকারি তহবিল থেকে মোট ১ কোটি ১৬ লাখ ১৬ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। প্রকল্পটি ২০১৬ সালের জুলাই থেকে ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদের জন্য একনেকে অনুমোদিত হয়। পরে কোনো ব্যয় বৃদ্ধি ছাড়া মেয়াদ একবার ২০২১ পর্যন্ত এবং পরে ২০২৪ পর্যন্ত বাড়ানো হয়। তৃতীয় দফায় ২০২৫ পর্যন্ত মেয়াদ বৃদ্ধির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।

২০০ কোচ কেনার নতুন পরিকল্পনা

রেলওয়ের পরিকল্পনা বিভাগের সূত্র জানায়, চীনের ঋণে কোচ কেনার এই প্রকল্প বাতিল হলেও রেলওয়ে ২০০ মিটারগেজ যাত্রীবাহী কোচ কেনার নতুন করে একটি প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৩২৮ কোটি ১৫ লাখ ১৬ হাজার টাকা। এর মধ্যে সরকারের অংশ ৯১ কোটি ৫৩ লাখ ৩০ হাজার টাকা এবং এডিবির সহায়তা ২৩৬ কোটি ৫৯ লাখ ৮৬ হাজার টাকা। প্রকল্পের মেয়াদ হবে ১ জুলাই ২০২৫ থেকে ৩০ জুন ২০২৯ সাল পর্যন্ত।

এই প্রকল্পের আওতায় ২টি মিটারগেজ ও ২টি ব্রডগেজ রিলিফ ক্রেন, ৪টি আন্ডারফ্লোর হুইল লেদ মেশিনও কেনা হবে।

এ বিষয়ে বুয়েটের অধ্যাপক ড. শামসুল হক আজকের পত্রিকাকে বলেন, উইন্ডো শপিংয়ের মতো বিভিন্ন দেশ বা প্রতিষ্ঠান থেকে কোচ-ইঞ্জিন কেনার বদলে নির্দিষ্ট কোনো দেশ বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি (২০-৩০ বছরের) চুক্তি করে রেলের জন্য প্রয়োজনীয় কোচ ও ইঞ্জিন সংগ্রহ করলে রক্ষণাবেক্ষণসহ অন্যান্য জটিলতা এড়ানো যাবে। এতে রেলের লাভ হবে, সেবার মানও বাড়বে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এমন নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া তুলনামূলকভাবে সহজ হবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত