Ajker Patrika

সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রে হামলা চালানোর মতো ক্ষেপণাস্ত্র কি ইরানের আছে

আবদুল বাছেদ, ঢাকা
সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রে হামলা চালানোর মতো ক্ষেপণাস্ত্র কি ইরানের আছে
নর্থরপ গ্রুম্যানের নতুন আইসিবিএম ডিজাইনের একটি প্রতিচ্ছবি। ছবি: সংগৃহীত

ইরানের আকাশসীমা এখন মার্কিন ও ইসরায়েলি বোমারু বিমানের দখলে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যু হয়েছে। এই অপারেশনে ট্রাম্প কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। এমতাবস্থায় প্রশ্ন উঠছে, তেহরানের কোন দুর্বলতা আমেরিকাকে এই ভয়াবহ হামলার সাহস জুগিয়েছে?

এতে কোনো সন্দেহ নেই যে মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র শিল্পে সবচেয়ে এগিয়ে ইরান। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে দেশটি সস্তা ‘শাহেদ’ ড্রোন ও ক্রুজ মিসাইল দিয়ে হামলা চালিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের ১০টি দেশকে নাকানি-চুবানি খাওয়াচ্ছে। তবে দেশটির সমর ভান্ডারে কি কোনো আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (আইসিবিএম) আছে, যা দিয়ে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রে হামলা চালানো সম্ভব।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি (ডিআইএ) গত বছর একটি প্রতিবেদনে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে, ইরানের কাছে বর্তমানে এমন কোনো ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নেই যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত হানতে সক্ষম। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ইরান যদি আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (আইসিবিএম) তৈরির সিদ্ধান্ত নেয়, তবে ৬০টি ক্ষেপণাস্ত্রের একটি বহর তৈরি করতে ২০৩৫ সাল বা তার চেয়েও বেশি সময় লেগে যেতে পারে। ডিআইএর মূল্যায়ন অনুযায়ী, এই নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে উক্ত সক্ষমতা অর্জন করতে হলে ইরানকে অত্যন্ত সুসংগঠিত ও কঠোর প্রচেষ্টা চালাতে হবে।

ইরান বর্তমানে কৃত্রিম উপগ্রহ উৎক্ষেপণ সক্ষমতা বৃদ্ধি করছে, যা আইসিবিএম তৈরির ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা সম্ভব। তবে একটি স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ যানকে (এসএলভি) আইসিবিএমে রূপান্তর করতে গেলে তেহরানকে এখনো বেশ কিছু প্রযুক্তিগত বাধার সম্মুখীন হতে হবে।

আইসিবিএম হলো ৫ হাজার ৫০০ কিলোমিটারের বেশি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র। এই মারণাস্ত্র না থাকায় ইরান এই যুদ্ধে কেবল একটি ‘আঞ্চলিক শক্তি’ হিসেবেই সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে। ইরান গত কয়েক দশক ধরে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির ব্যাপক উন্নতি করলেও তারা মূলত ২ হাজার ৫০০ কিলোমিটার পাল্লার ভেতরেই আটকে আছে। বর্তমান যুদ্ধে এই সীমাবদ্ধতা ইরানের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র নির্ভয়ে তেহরানে বোমাবর্ষণ করে চলেছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যখন ইরানের ভেতরে ঢুকে হামলা চালাচ্ছে, তখন ইরানকে কেবল মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে হামলা চালিয়েই সীমাবদ্ধ থাকতে হচ্ছে। আমেরিকার মূল ভূখণ্ডে সরাসরি কোনো হুমকি তৈরি করতে না পারাটা তেহরানের জন্য একটি বড় মনস্তাত্ত্বিক ও সামরিক অনগ্রসরতা।

মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল বা তুরস্কের মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালানো গেলেও যুদ্ধের মূল কেন্দ্রবিন্দু ওয়াশিংটন বা নিউইয়র্কে সরাসরি আঘাত করার কোনো ক্ষমতা ইরানের নেই। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র অনেকটা ‘নিরাপদ দূরত্ব’ থেকে ইরানের ভেতরে ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে পারছে। উত্তর কোরিয়া যেমন আইসিবিএমের ভয় দেখিয়ে সরাসরি মার্কিন আক্রমণ ঠেকিয়ে রাখতে পারে, ইরান তা পারছে না। আইসিবিএম থাকলে ট্রাম্প প্রশাসন হয়তো এত সরাসরি ‘রেজিম চেঞ্জ’ অভিযানে নামার সাহস পেত না।

আইসিবিএমের জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী রকেট ইঞ্জিন এবং বায়ুমণ্ডলে পুনরায় প্রবেশের সময় প্রচণ্ড উত্তাপ সহ্য করার ক্ষমতা। আজ বুধবার (৪ মার্চ) তুরস্কের আকাশে সাধারণ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত হওয়া প্রমাণ করে, ইরানের বিদ্যমান প্রযুক্তি ন্যাটোর আধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কাছে অত্যন্ত দুর্বল।

ইরান তাদের ‘সিমোরগ’ বা ‘জুলজানাহ’ রকেটের মাধ্যমে দাবি করে আসছিল যে তারা মহাকাশে স্যাটেলাইট পাঠাচ্ছে। সামরিক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এটি আসলে আইসিবিএম তৈরির একটি ছদ্মবেশ ছিল। কিন্তু চলমান যুদ্ধে সেই প্রযুক্তির কোনো সফল প্রয়োগ না থাকা এটাই প্রমাণ করে যে, হয় ইরানের এই প্রযুক্তি এখনো অপক্ব, অথবা তাদের উৎক্ষেপণ কেন্দ্রগুলো যুদ্ধের শুরুতেই গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

বিশ্বের শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো যেখানে এক মহাদেশ থেকে অন্য মহাদেশে নির্ভুল নিশানায় পরমাণু অস্ত্র পাঠানোর ক্ষমতা রাখে, সেখানে ইরান কেবল তার প্রতিবেশীদের ওপর বৃষ্টির মতো ড্রোন ও স্বল্প পাল্লার মিসাইল ছুড়েই সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে। আইসিবিএমের এই অনুপস্থিতি ইরানকে আধুনিক সমরকৌশলের দৌড়ে পিছিয়ে দিয়েছে এবং দেশটিকে একটি বড় ধরনের কৌশলগত পরাজয়ের দিকে ঠেলে দিয়েছে।

আইসিবিএম তৈরি ও মোতায়েন করা অত্যন্ত জটিল এবং ব্যয়বহুল প্রযুক্তি। বর্তমানে বিশ্বের মাত্র কয়েকটি দেশের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে এই সক্ষমতা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ‘মিনুটম্যান-৩’ ক্ষেপণাস্ত্র যেকোনো মহাদেশে আঘাত হানতে সক্ষম। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী আইসিবিএম ভান্ডার রাশিয়ার কাছে, যার মধ্যে ‘সারমাট’ বা ‘শয়তান-২’ অন্যতম। চীনের ‘ডিএফ-৪১’ ক্ষেপণাস্ত্র বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে পৌঁছাতে পারে। ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের কাছেও সাবমেরিন থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য আইসিবিএম প্রযুক্তি রয়েছে। অতি সম্প্রতি উত্তর কোরিয়া ‘হাসং-১৮’ আইসিবিএম তৈরি করে যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি হুমকির মুখে ফেলেছে। ভারতের ‘অগ্নি-৫’ এবং নির্মীয়মাণ ‘অগ্নি-৬’ আইসিবিএমের সমতুল্য।

লেখক: আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত