Ajker Patrika

দিন দিন বাড়ছে ঘাটতির বোঝা

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎
দিন দিন বাড়ছে ঘাটতির বোঝা
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) প্রধান কার্যালয়, আগারগাঁও, ঢাকা। ফাইল ছবি

অর্থবছরের শেষ চার মাসে প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের বড় চাপ সামনে নিয়ে এগোচ্ছে সরকার। এই লক্ষ্য পূরণ করতে প্রতি মাসে গড়ে ৭৫ হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব সংগ্রহ প্রয়োজন। অথচ চলতি অর্থবছরের কোনো মাসেই আদায় ৪০ হাজার কোটি টাকা ছাড়ায়নি। ফলে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন যে কঠিন হয়ে পড়েছে, তা এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে কঠোর মুদ্রানীতি, ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহার, বিনিয়োগে স্থবিরতা, আমদানি কমে যাওয়া এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ—সব মিলিয়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ধীর হয়ে আছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে রাজস্ব আদায়ের ওপর, যার ফলে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী আদায়ের গতি ধরে রাখা যাচ্ছে না।

এই চাপের পেছনে রয়েছে আগের আট মাসের বড় ঘাটতি। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৭১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, বর্তমান হারে প্রবণতা অব্যাহত থাকলে অর্থবছর শেষে এই ঘাটতি এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।

লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে বাস্তবতার এই ফারাকই এখন মূল উদ্বেগ। এই আট মাসে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ছিল ৩ লাখ ২৫ হাজার ৮০২ কোটি টাকা। বিপরীতে আদায় হয়েছে ২ লাখ ৫৪ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা। অর্থাৎ লক্ষ্যের তুলনায় ২২ শতাংশ রাজস্ব আদায়ে পিছিয়ে রয়েছে সংস্থাটি, যদিও অর্জিত অংশ থেকেই প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ১২ শতাংশ।

হালনাগাদ রাজস্ব প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, আয়কর, আমদানি শুল্ক ও ভ্যাট—এই তিনটি হলো রাজস্ব আয়ের প্রধান খাত, যার কোনোটিই লক্ষ্যমাত্রা ছুঁতে পারেনি। সবচেয়ে বড় ঘাটতি আয়কর খাতে, ৩৩ হাজার ৩৭৩ কোটি টাকা। আমদানি শুল্কে ঘাটতি ১৭ হাজার ১৬৬ কোটি টাকা। আর ভ্যাট খাতে লক্ষ্য ছিল ১ লাখ ১৮ হাজার ২১৪ কোটি টাকা, আদায় হয়েছে ৯৭ হাজার ২৮২ কোটি টাকা।

রাজস্ব আদায়ের এ দৈন্যকে সাময়িক পরিস্থিতি হিসেবে দেখতে নারাজ বিশ্লেষকেরা, বরং তাঁরা বিষয়টিকে গভীর কাঠামোগত সমস্যা হিসেবে দেখছেন। বেসরকারি আর্থিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, অর্থনীতিতে প্রত্যাশিত গতি না থাকায় এত উচ্চ হারে রাজস্ব আদায় সম্ভব হচ্ছে না। বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধির ধীরগতি রাজস্ব কমার প্রধান কারণ। এর সঙ্গে এনবিআরের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা যুক্ত হওয়ায় করজাল সম্প্রসারণ ও কর ফাঁকি রোধে অগ্রগতি হচ্ছে না।

একই ধরনের পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন। তাঁর মতে, দেশে কর-জিডিপি অনুপাত দীর্ঘদিন ধরেই কম। করদাতার সংখ্যা বাড়ানো, প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না করলে এই ঘাটতি কাটানো কঠিন হবে।

সাবেক এনবিআর চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ মনে করেন, কর কাঠামো এখনো অনেকাংশে পরোক্ষ করনির্ভর। আয়কর ভিত্তি বাড়ানো না গেলে টেকসই রাজস্ব বৃদ্ধি সম্ভব নয়।

রাজস্ব ঘাটতির পেছনে অর্থনৈতিক বাস্তবতাও বড় ভূমিকা রাখছে। এনবিআরের কর্মকর্তারা জানান, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সুদের হার বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যে ধীরগতি দেখা দিয়েছে। জাতীয় নির্বাচন ও মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রভাব ফেলেছে।

এদিকে রাজস্ব বাড়ানোর ওপর আন্তর্জাতিক চাপও রয়েছে। আইএমএফের ঋণ শর্ত অনুযায়ী প্রতিবছর জিডিপির অন্তত শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ হারে অতিরিক্ত রাজস্ব বাড়াতে হবে। তবে এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য যে কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন, তা এখনো বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছায়নি।

এনবিআর পুনর্গঠন করে নীতি ও বাস্তবায়ন আলাদা করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা অভ্যন্তরীণ প্রতিবন্ধকতায় থমকে আছে। ফলে কর প্রশাসনের দক্ষতা ও জবাবদিহি বাড়ানোর প্রচেষ্টাও এগোচ্ছে ধীরগতিতে। এ অবস্থায় রাজস্ব বাড়ানো এবং জনস্বার্থ রক্ষার মধ্যে ভারসাম্য রাখা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত