Ajker Patrika

অপুষ্টি নিয়ে শিশুর জন্ম, ঝুঁকিতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম

  • গর্ভবতী মায়েরা পুষ্টিহীন খাবারে নির্ভর করেই গর্ভকাল পার করেন।
  • অল্প আয়ের কারণে বেশি অপুষ্টিতে চর এলাকার মায়েরা।
  • অপুষ্টিতে জন্ম নেওয়া শিশুদের শরীরে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম।
আব্দুল বাশির, চাঁপাইনবাবগঞ্জ
প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি

‘জুন মাসের ৬ তারিখ আমার ছেলের জন্মের সময় ওজন ছিল মাত্র ১ কেজি ৭০০ গ্রাম। ডাক্তাররা বলেছিল, মায়ের শরীর ঠিকমতো শক্তি পায়নি বলেই শিশুটি দুর্বল হয়েছে। এখন সামান্য ঠান্ডা লাগলেই বাচ্চা অসুস্থ হয়ে পড়ে।’—কথাগুলো বলছিলেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার বেগপুর গ্রামের ইতি খাতুন (২২)।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সন্তান প্রসব করেন তিনি। কিন্তু নবজাতকের ওজন কম হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্যত্র স্থানান্তরের পরামর্শ দেন চিকিৎসকেরা। এদিকে গত ৭ জুন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেই সন্তান প্রসব করেন উম্মে তোহরা (৩০) নামের আরেক প্রসূতি। জন্মের সময় তাঁর সন্তানের ওজন ছিল ২ কেজি।

গৃহবধূ ইতি ও উম্মে তোহরার ভাষ্য, শুধু তাঁদের পরিবারের নয়, জেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিনই এমন দুর্বল শিশু জন্ম নিচ্ছে। সরকারি হিসাব বলছে, প্রতিবছর চাঁপাইনবাবগঞ্জে কয়েক হাজার শিশু জন্ম নেয়। তাদের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য অংশ জন্ম নিচ্ছে অপুষ্ট অবস্থায়, যাদের ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম।

২০২৪ সালের সরকারি তথ্যমতে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর হাসপাতালে ৪ হাজার ৫০১টি শিশু জন্ম নেয়। তাদের মধ্যে ৭৫টি শিশুর ওজন আড়াই কেজির কম। এ ছাড়া শিবগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১ হাজার ৯২৩টি শিশু জন্ম নিয়েছে। তাদের মধ্যে ৩০ জনের ওজন কম।

অন্যদিকে, নাচোল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৩৫৬টি শিশু জন্মগ্রহণ করে। তাদের মধ্যে ২০টির ওজন কম। এ ছাড়া ভোলাহাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জন্ম নেওয়া ৪৩৮ শিশুর মধ্যে ১৮টির শিশুর ওজন কম। আর গোমস্তাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৫১৮ শিশু জন্মগ্রহণ করে। তাদের মধ্যে ৩১ শিশুর ওজন ছিল আড়াই কেজির নিচে।

দারিদ্র্য ও অজ্ঞতার ফাঁদে শিশু

চাঁপাইনবাবগঞ্জ মূলত কৃষিনির্ভর এলাকা। আম, ধান আর গম চাষের জন্য বিখ্যাত হলেও এখানকার অনেক পরিবার দারিদ্র্যের শিকার। কৃষকেরা নিজেরা মাঠে পরিশ্রম করলেও তাদের পরিবারের খাবার তালিকায় থাকে মূলত ভাত, ডাল আর সবজি। মাছ, মাংস বা দুধ তাদের নাগালের বাইরে। ফলে গর্ভবতী মায়েরা পুষ্টিহীন খাবারের ওপর নির্ভর করেই গর্ভকাল পার করেন।

শিক্ষক রুহুল আমীন বলেন, ‘খাদ্যের অভাবই একমাত্র সমস্যা নয়, সচেতনতারও বড় ঘাটতি আছে। অনেক মা জানেন না গর্ভাবস্থায় কেমন খাবার খেতে হয় কিংবা নিয়মিত ডাক্তার দেখানো কতটা জরুরি।’

চিকিৎসকদের শঙ্কা

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর হাসপাতালের শিশুবিশেষজ্ঞ মাহফুজ রায়হান বলেন, অপুষ্টিতে জন্ম নেওয়া শিশুদের শরীরে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম থাকে। তারা সহজে শ্বাসকষ্ট, ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, হাইপোথার্মিয়া, রক্তে ইনফেকশন, জন্ডিসের মতো রোগে আক্রান্ত হয়। দীর্ঘ মেয়াদে তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশও বাধাগ্রস্ত হয়। কানে কম শুনতে পায়। চোখে রেটিনার সমস্যা হয়।

ডা. মাহফুজ রায়হানের মতে, সমস্যার মূল কারণ তিনটি—গর্ভবতী মায়েদের সুষম খাদ্যের অভাব, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও সেবা না পাওয়া, সামাজিক কুসংস্কার ও সচেতনতার অভাব।

সরকারি উদ্যোগ ও সীমাবদ্ধতা

জেলার সিভিল সার্জন কার্যালয় জানিয়েছে, কমিউনিটি ক্লিনিক ও উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে গর্ভবতী মায়েদের জন্য বিনা মূল্যে চিকিৎসা ও ভিটামিন দেওয়া হয়। কিন্তু অনেক মা সময়মতো এসব সেবা নেন না।

সিভিল সার্জন এ কে এম শাহাব উদ্দিন আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি প্রত্যেক মাকে মাতৃত্বকালীন কমপক্ষে চারবার চেকআপের আওতায় আনতে। কিন্তু অনেকে সামাজিক এবং আর্থিক কারণে হাসপাতালে আসেন না।’

জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় মত

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা সদরের পার্বতীপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, স্বাস্থ্য বিভাগ একা কিছু করতে পারবে না। সমাজের মানুষকে সচেতন হতে হবে।

চরাঞ্চলের বাসিন্দা ও সহকারী প্রধান শিক্ষক আব্দুল বারী বলেন,‘শিশু বয়সেই সন্তান প্রসব করছে অনেক মা। সচেতনতার অভাব, অল্প আয়ের কারণে চর এলাকার মায়েরা বেশি অপুষ্টিতে ভুগছেন। এসব এলাকার গর্ভবতী মায়েদের প্রসব করা সন্তানের অনেকে অপুষ্টিতে ভোগে।’

বিশেষজ্ঞের দৃষ্টিতে সমাধান

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য ও পুষ্টি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. আলমগীর হোসেন বলেন, গর্ভবতী মায়েদের জন্য প্রোটিন, আয়রন ও ক্যালসিয়াম অত্যন্ত জরুরি। এ ছাড়া দৈনিক খাদ্যতালিকায় দুধ, ডিম, ডাল থাকতে হবে। তার সঙ্গে সবজি, মাছ ও মাংস থাকবে। এ ছাড়া ফলমূল ও আয়োডিনযুক্ত লবণ খেতে হবে। এসব খাদ্য তালিকায় থাকলে মায়ের পুষ্টির ঘাটতি হবে না। মায়ের পুষ্টি নিশ্চিত হলেই শিশুর পুষ্টি সম্পন্ন হবে। শিশুদের সুস্থ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে হলে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে।

মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা ওয়ার্ল্ড ভিশনের চাঁপাইনবাবগঞ্জের এরিয়া প্রোগ্রাম ম্যানেজার জেমস বিশ্বাস বলেন, সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি দরিদ্র পরিবারগুলোকে সরাসরি পুষ্টি সহায়তা দিতে হবে। নইলে পরিবর্তন আসবে না।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

সেই মেরুন টি-শার্ট পরা হামলাকারীর পরিচয় জানালেন প্রেস সচিব

বাসররাতে দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার নববধূ, স্বামীসহ আটক ৭

যশোরে চায়ের দোকানে বসে থাকা আওয়ামী লীগ নেতাকে বুকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা

‘ইউএস ব্র্যান্ড এখন টয়লেটে’—ভারতের ওপর মার্কিন শুল্ক নিয়ে জেক সুলিভানের ক্ষোভ

মেয়েকে ১০ মাস আটকে রেখে ধর্ষণ, মা ও সৎবাবা গ্রেপ্তার

এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত