Ajker Patrika

 ‘মৌসুম শেষ হলেও এ বছর ইলিশ খাওয়ার সামর্থ্য হয়নি’

জাহিদ হাসান, যশোর
 ‘মৌসুম শেষ হলেও এ বছর ইলিশ খাওয়ার সামর্থ্য হয়নি’

‘ইলিশ মাছের মৌসুমে ইলিশ মাছ খাইতে পারি নাই। কিনব কি করে; এবার ইলিশের যে দাম। সামর্থ্য হয়নি কেনার। গেল কয়েক বছরের তুলনায় এবার ইলিশের দামও ছিল ডাবল তাই ইলিশ কিনি নাই, কিনার ইচ্ছাও করেনি’। 

এভাবেই আক্ষেপের সুরে কথাগুলো বলছিলেন আলমগীর হোসেন। যশোর শহরের বেজপাড়াতে তাঁর বাড়ি। পেশায় তিনি জুয়েলারির শ্যাকরা (কারিগর)। 

আজ শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে শহরের বড় বাজার মাছ বাজারে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। তিনি আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘বাজারে এলে কিছুই কিনে শান্তি পাই না। সবকিছুতেই আগুন জ্বলা দাম। যে জিনিস কিনতে যাই, সেটারই দাম বেড়ে যায়। যে বাজেট নিয়ে বের হই, তা দিয়ে আর সবকিছু কেনা হয় না। ইলিশ কিনব কি করে? বাজারে এলেই তো ঘাম ছুটে যায়। এভাবে কী চলা যায়?’ 

প্রতিনিয়ত দ্রব্যমূল্যের দাম বৃদ্ধির মধ্যে চড়া দামে জাতীয় মাছ ইলিশ না খাওয়ার অভিযোগ শুধু আলমগীরের নয়; শহরের বিভিন্ন ছাত্রাবাসের শিক্ষার্থীসহ নিম্ন-মধ্যম আয়ের বেতনের চাকরিজীবীদেরও। 

শহরের স্টেডিয়াম পাড়ার ড্রিম হাউস ছাত্রাবাসের শিক্ষার্থী সেলিম হোসেন ও আলামিন হোসেন বাজার করতে এসেছেন বড় বাজারে। তাঁরা জানান, মূলত ছাত্রাবাসে নির্ধারিত টাকার মধ্যে বাজার করতে হয়। তিন দিনের বাজারে ম্যানেজার টাকা দেয় তিন হাজার টাকা। ২২ জনের সদস্যের এই টাকাতে তিন দিনের মাছ-সবজি, এক বেলার মাংস, আর তেল মসলা কিনতে হয়। বর্তমানে সবজি এবং অন্য মাছের যে দাম তাতে খাবারের তালিকাতে ব্যতিক্রম কিছু রাখার ইচ্ছা থাকলেও রাখা যায় না। 

তারা বললেন, এ বছর এক পিছও ইলিশ মাছ খেতে পারেননি তাঁরা। ছাত্রাবাসে নিয়মিত তেলাপিয়া আর পাঙাশ মাছ খাওয়া হয়। সেটার দামও দিনকে দিন বাড়ছে। 

নিষেধাজ্ঞা থাকায় ইলিশ মাছ বিক্রেতারা দোকান বন্ধ রেখেছেন। ছবি: আজকের পত্রিকাবড় বাজারের মিম ফিস সাপ্লাই হাউসের সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ‘এবারের ইলিশের মৌসুম শেষ। গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার যশোরে ইলিশের সাপ্লাইও কম ছিল; দামও ছিল ডাবল। তেমন একটা বেচাকেনা হয়নি। গত বছরের তুলনায় এবার ইলিশ বেচাকেনা কম হয়েছে।’ 

এই বাজারে সবচেয়ে প্রবীণ মাছ বিক্রেতা ধলু শেখ। চার দশক ধরে বিভিন্ন মাছ বিক্রি করেন তিনি। ইলিশের মৌসুমে ইলিশ বিক্রি করেছেন তিনি। 

এই বিক্রেতার ভাষ্য, ‘ইলিশের দাম আমার জীবনে এমন হতে দেখেনি। দেড় কেজি ওজনের ইলিশ প্রতি কেজি ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে। ৪০০ থেকে ৮০০ গ্রামের ইলিশ বিক্রি হয়েছে প্রতি কেজি ৭০০ থেকে হাজার টাকায়। আবার ৮০০ থেকে ৯০০ গ্রামের ইলিশ বিক্রি হয়েছে ১ হাজার টাকা কেজি দরে। আর ১ কেজি কিংবা তার বেশি ওজনের ইলিশ বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা কেজি দরে।’ 

সত্যরঞ্জন দাস নামের আরেক মাছ বিক্রেতা বলেন, ‘এবার জেলেদের জালে ইলিশ ধরা পড়েছে অনেক কম। এ কারণে বাজারগুলোয় আগের মতো ইলিশ পাওয়া যায় না। যা পাওয়া যায়, দাম বেশি।’ তিনি জানান, শুধু যে এবার ইলিশের দাম বেশি ছিল তা নয়; অন্য মাছের দামও বেশি। 

ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ রক্ষায় ২২ দিন ইলিশ ধরায় নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। গত বুধবার দিবাগত রাত ১২টা থেকে ইলিশ মাছ ধরা, পরিবহন, বিক্রি, বিপণন ও সংরক্ষণ বন্ধ রাখার আদেশ কার্যকর হয়েছে। 

এ অবস্থায় কিছু ইলিশ মাছ বিক্রেতাদেরও দোকান বন্ধ পাওয়া গেছে। আবার আগে যারা ইলিশ বিক্রি করছিলেন; নিষেধাজ্ঞার কারণে তারা এখন অন্যান্য দেশি মাছ বিক্রি করতে দেখা গেছে। 

যশোর রেলস্টেশন কাঁচা বাজার। ছবি: আজকের পত্রিকাএদিকে বাজার নিয়ন্ত্রণে ডিম, আলু ও পেঁয়াজের দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে সরকার। এই তিনটি খাদ্যপণ্যের দাম নির্ধারণ করে দিলেও বাজারে এর প্রভাব পড়েনি। বরং সরকারের নির্দেশনা উপেক্ষা করে নানা অজুহাত দেখিয়ে বেশি দামে এই পণ্য তিনটি বিক্রি করছে ব্যবসায়ীরা। 

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, অভিযান শেষ হলে ব্যবসায়ীরা আগের দামেই পণ্য বেচাকেনা করছে। তবে ক্রেতারা বলছেন, সরকারি নির্দেশনা শুধু কাগজে-কলমেই। তাদের বাজার নিয়ন্ত্রণে কোনো ভূমিকা নেই। 

অন্যদিকে খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরকার দাম ঘোষণা করলেও পাইকারি বাজারে সেই দামে তারা কিনতে পারছেন না এই তিন পণ্য। 

গত ১৪ সেপ্টেম্বর ডিম, আলু ও পেঁয়াজ-এই তিনটি খাদ্যপণ্যের দাম নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। কৃষি মন্ত্রণালয়ের সুপারিশের আলোকে আলুর সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ৩৫-৩৬ টাকা, দেশি পেঁয়াজের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ৬৪-৬৫ টাকা আর ডিমের পিস সর্বোচ্চ ১২ টাকা নির্ধারণ করে। এই তিন পণ্যের দাম নির্ধারণ করা হলেও বাজারে বাড়তি দামেই বিক্রি হচ্ছে এগুলো। 

আজ শুক্রবার সরেজমিনে যশোরের বড় বাজার ও রেল বাজার ঘুরে দেখা যায়, খুচরা বাজারে প্রতি কেজি আলু বিক্রি হচ্ছে ৪৫-৪৬ টাকা, পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৮৫-৯০ টাকা, প্রতি পিস ডিম বিক্রি হচ্ছে ১২ টাকা থেকে ১২ টাকা ৫০ পয়সা করে। রেল বাজার

বড় বাজারের খুচরা ব্যবসায়ী আকতার বলেন, ‘পাইকারি বাজারে আগে যে দাম ছিল এখনো সেই দামই আছে। আমরা কমে কিনতে পারলেই তো কম দামে ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করতে পারব। প্রতি কেজি আলু-পেঁয়াজ থেকে দুই-তিন টাকা লাভ করতে পারলে তো আর কিছু লাগে না। কিন্তু পাইকারি বাজারে দাম বেশি।’ 

ক্রেতা শওকত হোসেন বলেন, ‘প্রত্যেকটা পণ্যের দাম বাড়তি। সবাই কোনো না কোনোভাবে কষ্টে আছে। তবে কেউ বলতে পারছে না। রাজনৈতিক লোকেরা বাজার করতে এসে হিমশিম খায় না। তাদের চতুরদিক থেকে ইনকাম। আমাদের মতো অল্প আয়ের মানুষ, বাঁধা ইনকামের মানুষেরা কষ্টে আছে।’ 

সরকার প্রধানের কাছে দাবি তাঁর, নিত্যপণ্যের দাম ভোক্তাদের নাগালের মধ্যে এনে দেওয়া হোক। 

জানতে চাইলে যশোরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এস এম শাহীন বলেন, সংশ্লিষ্টদের বাজার মনিটরিং করতে নির্দেশনা দেওয়া রয়েছে। তাঁরা নিয়মিত মনিটরিং করছে। বাজারে অভিযান চালিয়ে এক প্রকার ক্লান্ত হয়ে গেছে। বাজারে অভিযান চালিয়ে চোখের আড়াল হলেই আবারও আগের অবস্থানে ফেরে ব্যবসায়ীরা।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত