Ajker Patrika

পৃথিবীকে অবশ্যম্ভাবী পরমাণু যুদ্ধ থেকে বাঁচানো এক অজানা নায়ক

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ২৯ মার্চ ২০২৬, ১২: ২০
পৃথিবীকে অবশ্যম্ভাবী পরমাণু যুদ্ধ থেকে বাঁচানো এক অজানা নায়ক
ভাসিলি আরখিপভ। ছবি: সংগৃহীত

১৯৬২ সালের ২৭ অক্টোবর। মানব সভ্যতার ৩ লাখ বছরের ইতিহাসে সম্ভবত এটিই ছিল সবচেয়ে বিপজ্জনক দিন। ১০ কোটি ৯ লাখ দিনের ইতিহাসে এমন মুহূর্ত আর দ্বিতীয়টি আসেনি যখন আমাদের প্রজাতি নিজেদের অস্তিত্ব মুছে ফেলার এত কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। সেদিন পারমাণবিক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে ছিল গোটা বিশ্ব। দুই পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যকার স্নায়ুযুদ্ধের সেই চরম মুহূর্তে একটি ভুল সিদ্ধান্তই পারত পৃথিবী থেকে মানবজাতির চিহ্ন মুছে দিতে। কিন্তু এক শান্ত স্বভাবের সোভিয়েত নৌ-কর্মকর্তা ভাসিলি আরখিপভের অসীম ধৈর্য ও সাহসিকতায় সেদিন নিশ্চিত ধ্বংসের হাত থেকে বেঁচে গিয়েছিল এই গ্রহ।

প্রেক্ষাপট

১৯৫৯ সালে মার্কিন সরকার ইংল্যান্ডে থর পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করে, যা প্রজেক্ট এমিলি নামে পরিচিত। ১৯৬১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইতালি ও তুরস্কে জুপিটার পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করে। সবগুলোই মস্কোর পাল্লার মধ্যে ছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিউবায় প্রবাসীদের নিয়ে একটি আধাসামরিক বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছিল, যার নেতৃত্বে ছিল সিআইএ। উদ্দেশ্য ছিল কিউবা আক্রমণ করে ফিদেল কাস্ত্রো সরকারকে উৎখাত করা। সেই বছরের নভেম্বর থেকে মার্কিন সরকার কিউবায় সন্ত্রাসবাদ ও অন্তর্ঘাতের এক সহিংস অভিযান শুরু করে। এর নাম ছিল কিউবান প্রজেক্ট। ১৯৬০-এর দশকের প্রথমার্ধ জুড়ে এই অভিযান চলে। সোভিয়েত প্রশাসন চীনের দিকে কিউবার ঝুঁকে পড়া নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল, কারণ চীনের সঙ্গে তখন সোভিয়েতদের সম্পর্ক ক্রমশই তিক্ত হচ্ছিল। এই কারণগুলোর প্রতিক্রিয়ায়, ১৯৬২ সালের জুলাই মাসে সোভিয়েত নেতা নিকিতা ক্রুশ্চেভ এবং ফিদেল কাস্ত্রোর মধ্যে এক বৈঠকে সোভিয়েত ও কিউবা সরকার ভবিষ্যৎ মার্কিন আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য কিউবায় পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনের বিষয়ে সম্মত হয়। এর অল্প কিছুদিন পরেই উৎক্ষেপণ কেন্দ্র নির্মাণের কাজ শুরু হয়।

১৯৬২ সালের অক্টোবর মাসে শুরু হয় কিউবার ক্ষেপণাস্ত্র সংকট। মার্কিন গোয়েন্দা বিমান ‘ইউ-২’ কিউবায় সোভিয়েত পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাঁটির অস্তিত্ব খুঁজে পেলে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা চরমে পৌঁছায়। যুক্তরাষ্ট্র থেকে মাত্র ১০০ মাইলেরও কম দূরত্বে এই ক্ষেপণাস্ত্রের উপস্থিতি মার্কিন নিরাপত্তার জন্য ছিল বড় হুমকি। এর প্রতিক্রিয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি কিউবা অভিমুখে ‘কোয়ারেন্টাইন’ বা নৌ-অবরোধ ঘোষণা করেন এবং সোভিয়েত ইউনিয়নকে ক্ষেপণাস্ত্র সরিয়ে নিতে আল্টিমেটাম দেন। ঠিক এই সময়েই কিউবার কাছাকাছি আন্তর্জাতিক জলসীমায় অবস্থান করছিল সোভিয়েত সাবমেরিন ‘বি-৫৯ ’।

টানটান উত্তেজনার মুহূর্ত

সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতা নিকিতা ক্রুশ্চেভ এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির মধ্যে গোপন চুক্তির ফলে উভয় দেশ ক্ষেপণাস্ত্র সরিয়ে নিতে শুরু করে। কিন্তু আন্তর্জাতিক জলসীমায় থাকা সাবমেরিন বি-৫৯-এ ছিল ১০ কিলোটন ক্ষমতাসম্পন্ন একটি পারমাণবিক টর্পেডো, যার ধ্বংসলীলা সম্পর্কে মার্কিন নৌবাহিনী তখন পর্যন্ত অবগত ছিল না। ২৭ অক্টোবর সাবমেরিনটি যখন পানির নিচে ছিল, তখন ১১টি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ এবং বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস র‍্যান্ডলফ এটিকে ঘিরে ফেলে। মার্কিন জাহাজগুলো সাবমেরিনটিকে পৃষ্ঠে উঠে আসতে বাধ্য করতে ডেপথ চার্জ (এক ধরনের বিস্ফোরক) নিক্ষেপ শুরু করে।

সাবমেরিনের ভেতরে পরিস্থিতি ছিল বর্ণনাতীত ভয়াবহ। কয়েক দিন ধরে পানির নিচে থাকায় ব্যাটারি প্রায় শেষ হয়ে আসছিল, এসি কাজ না করায় তাপমাত্রা বেড়ে ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে চলে গিয়েছিল। কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বিপজ্জনকভাবে বাড়ছিল এবং বাইরের জগতের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ ছিল না। ডেপথ চার্জের তীব্র শব্দে সাবমেরিনটি থরথর করে কাঁপছিল। ক্রু সদস্য ভাদিম অরলভের ভাষায়, ‘মনে হচ্ছিল আমরা একটা ধাতব ড্রামের ভেতর বসে আছি আর কেউ বাইরে থেকে বড় হাতুড়ি দিয়ে অবিরাম পেটাচ্ছে। আমরা ভেবেছিলাম এটাই আমাদের শেষ মুহূর্ত।’

ভাসিলির একার সিদ্ধান্তে বেঁচে গেল বিশ্ব

মস্কোর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় সাবমেরিনের ক্যাপ্টেন ভ্যালেন্তিন সাভিৎস্কি এবং ক্রুরা ধরে নিয়েছিলেন যে উপরিভাগে হয়তো ইতিমধ্যে বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে ক্যাপ্টেন সাভিৎস্কি পারমাণবিক টর্পেডো ছোড়ার নির্দেশ দেন। তিনি গর্জে উঠে বলেন, ‘আমরা এখনই ওদের উড়িয়ে দেব! আমরা মরব ঠিকই, কিন্তু আমরা ফ্লিটের লজ্জা হয়ে থাকব না—সব কটাকে ডুবিয়ে দেব।’

সোভিয়েত নিয়ম অনুযায়ী, এই ধরনের মরণঘাতী অস্ত্র প্রয়োগের জন্য সাবমেরিনের তিনজন শীর্ষ কর্মকর্তার সর্বসম্মত সম্মতি প্রয়োজন ছিল। ক্যাপ্টেন সাভিৎস্কি এবং রাজনৈতিক কর্মকর্তা ইভান মাসলেনিকভ টর্পেডো ছোড়ার পক্ষে সায় দিলেও দ্বিতীয় ক্যাপ্টেন এবং ব্রিগেড চিফ অব স্টাফ ৩৬ বছর বয়সী ভাসিলি আরখিপভ দৃঢ়ভাবে এর বিরোধিতা করেন।

আরখিপভ যুক্তি দেন, মার্কিন জাহাজগুলো সাবমেরিন ডুবিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে না, বরং তারা পৃষ্ঠে উঠে আসার সংকেত দিচ্ছে—কারণ এ ছাড়া সাবমেরিনের সঙ্গে যোগাযোগের আর কোনো পথ মার্কিনীদের কাছে খোলা ছিল না। দীর্ঘ বাগ্‌বিতণ্ডা ও চরম উত্তেজনার মাঝেও আরখিপভ তাঁর সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। শেষ পর্যন্ত তাঁর ব্যক্তিত্ব ও যুক্তির কাছে বাকিরা হার মানেন। সাবমেরিনটি কোনো অস্ত্র না ছুড়েই পানির ওপরে উঠে আসে এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের দিকে ফিরে যায়।

ইতিহাসের নায়ক

সেদিন যদি আরখিপভ সম্মতি দিতেন, তবে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিমানবাহী রণতরি মুহূর্তেই বাষ্পীভূত হয়ে যেত এবং কয়েক হাজার নাবিক মারা যেতেন। কেনেডি ও ক্রুশ্চেভ তখন চাইলেও পারমাণবিক যুদ্ধের দাবানল থামাতে পারতেন না। ফলস্বরূপ, বিশ্বের প্রধান শহরগুলো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতো এবং কোটি কোটি মানুষের মৃত্যু ঘটত।

ভাসিলি আরখিপভ ১৯৯৮ সালে মারা যান। তাঁর এই বীরত্বগাথা দীর্ঘকাল সোভিয়েত নথিপত্রে গোপন ছিল। ২০০২ সালে প্রথম এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ জনসমক্ষে আসে। ২০১৭ সালে ‘ফিউচার অব লাইফ ইনস্টিটিউট’ তাঁকে মরণোত্তর সম্মাননা দেয়। প্রতিষ্ঠানটির প্রেসিডেন্ট ম্যাক্স টেগমার্কের মতে, আরখিপভ সম্ভবত আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি।

ইউক্রেন ও ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে বর্তমান বিশ্বে যখন আবারও পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহারের প্রচ্ছন্ন হুমকি ও ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিচ্ছে, তখন ভাসিলি আরখিপভের মতো ব্যক্তিদের স্মরণ করা আজ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তিনি প্রমাণ করেছেন, ধ্বংসাত্মক শক্তির চেয়ে জীবনের প্রতি মমতা ও ঠান্ডা মাথার সিদ্ধান্ত অনেক বেশি শক্তিশালী হতে পারে।

থ্যসূত্র: ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক, ফিউচার অব লাইফ ইনস্টিটিউট ও ন্যাশনাল সিকিউরিটি আর্কাইভ।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত