
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের আর্থিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব অনেকটাই নির্ভর করবে যুদ্ধের স্থায়িত্বের ওপর। যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, তত বেশি সময় ধরে তেল, গ্যাস, সার, হিলিয়ামসহ অন্যান্য পণ্যের দাম চড়া থাকবে। পারস্য উপসাগরের তেল উৎপাদন ও রপ্তানি অবকাঠামো যত বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, ততই বাড়বে স্থবির-মুদ্রাস্ফীতির (স্ট্যাগফ্লেশন) চাপ। এর বড় প্রভাব পড়বে বৈশ্বিক শেয়ারবাজার, বন্ডের সুদের হার এবং ঋণঝুঁকির ব্যবধানের ওপর।
উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ও নিম্ন প্রবৃদ্ধি থেকে যে অর্থনৈতিক ক্ষতি হবে, তা সবচেয়ে তীব্রভাবে অনুভূত হবে এশিয়ায়। কারণ, এই অঞ্চলটি একই সঙ্গে জ্বালানির দাম ও সরবরাহ—দুই ধরনের ধাক্কার মুখেই পড়েছে। ইউরোপে বাণিজ্য সক্ষমতার অবনতি এবং গুরুতর মুদ্রাস্ফীতির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, তবে এশিয়ার তুলনায় তাদের জ্বালানি সরবরাহের ধাক্কা কিছুটা সীমিত থাকবে।
বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে চিত্রটা আলাদা। দেশটি নিট জ্বালানি রপ্তানিকারক হওয়ায় তারা ইতিবাচক বাণিজ্য সক্ষমতার ধাক্কা পাচ্ছে। তবু সেখানে মুদ্রাস্ফীতি বাড়বে এবং প্রবৃদ্ধি কমবে। কারণ, জ্বালানি ব্যবহারকারীরা গৃহস্থালি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ব্যয় কমাবে। আর যারা জ্বালানি উৎপাদন করে অতিরিক্ত মুনাফা পাবে, তারা এই সাময়িক পরিস্থিতি বুঝে উৎপাদন বা বিনিয়োগ বাড়াতে আগ্রহী হবে না।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এবং ইসরায়েল দুটি বড় ভুল হিসাব করেছিল। তারা ভেবেছিল, ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে সরিয়ে দিলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। পাশাপাশি তারা ধরে নিয়েছিল, ইরান হরমুজ প্রণালি অবরোধ করতে পারবে না বা উপসাগরীয় জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে বড় ক্ষতি করতে সক্ষম হবে না। বাস্তবে তা হয়নি। ফলে এখন বাজারে ট্রাম্পের ‘পালানোর পথ’ খোঁজার প্রবণতা মূল্যায়িত হচ্ছে, যাকে বলা হচ্ছে ট্যাকো—ট্রাম্প অলওয়েজ চিকেনস আউট পরিস্থিতি। চিকেনস আউট শব্দবন্ধের মানে হলো—ভয়ের কারণে যেকোনো কাজে শেষ মুহূর্তে এসে সরে আসা বা আগে যা সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তা থেকে সরে আসা।
কিন্তু ট্যাকোর ওপর ভরসা করাটাও ভুল হতে পারে। যদি ট্রাম্প যুদ্ধ থামিয়ে বর্তমান অবস্থা ধরে রাখেন, তাহলে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি থেকেই যাবে। তেলের দামে রিস্ক-প্রিমিয়াম বা বিমা স্থায়ীভাবে (কমপক্ষে ২০ শতাংশ) উঁচুতে থাকবে। আর এ বছরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা আরও কমে যেতে পারে। শুধু তা-ই নয়, বর্তমান ইরানি শাসনব্যবস্থা টিকে থাকবে এবং সম্ভবত পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের পথে এগোবে। একই সঙ্গে তারা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং উপসাগর, ইউরোপ ও বৈশ্বিক অর্থনীতিকে হুমকির মুখে ফেলার অন্যান্য সক্ষমতা আরও জোরদার করবে।
নৈতিক মূল্যায়ন যাই হোক, ট্রাম্প ও ইসরায়েল শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ আরও বাড়ানোর প্রয়োজন অনুভব করতে পারে, যাতে তারা ‘কাজটি শেষ’ করতে পারে। এর অর্থ হতে পারে খারগ দ্বীপ দখল করা, যেখান থেকে ইরানের ৯০ শতাংশ জ্বালানি রপ্তানি হয় এবং একই সঙ্গে প্রতিদিন বোমা হামলা জোরদার করা, যাতে ইরানের নতুন নেতৃত্ব ও সামরিক সক্ষমতা ভেঙে দেওয়া যায়। এই কৌশল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, তবে দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে কার্যকরভাবে শাসনব্যবস্থার পতন ঘটাতে পারে এবং মধ্যপ্রাচ্যে তুলনামূলক স্থিতিশীলতা আনতে পারে। তখন বিশ্ব অর্থনীতি ও বাজার আর হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখা একটি শাসনব্যবস্থার স্থায়ী চাপে থাকবে না। উপসাগরীয় দেশগুলো ও তাদের জ্বালানি স্থাপনাগুলোও নিরাপদ হবে।
এটাই ট্রাম্প এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের জন্য সবচেয়ে আশাবাদী চিত্র। কিন্তু যদি খারগ দ্বীপ দখল করা হয়, তবু শাসনব্যবস্থা না ভাঙে, তাহলে লোহিত সাগরের প্রবেশ মুখ বাব এল মান্দেব ও হরমুজ প্রণালি উভয়ই ঝুঁকির মধ্যে থাকবে। ইয়েমেনের হুতি নিয়ন্ত্রিত উপকূল থেকে এই ঝুঁকি আরও বাড়বে। পাশাপাশি উপসাগরীয় দেশগুলো এবং তাদের জ্বালানি স্থাপনাগুলোও অরক্ষিত থেকে যাবে। শাসনব্যবস্থা টিকে থাকলে ১৯৭০-এর দশকের মতো আবারও স্থবির মুদ্রাস্ফীতির পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে।
তবু আমার মতে, যুদ্ধের বিস্তার এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের বিজয় (কয়েক মাসের মধ্যে শাসনব্যবস্থার পতনসহ) হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি, পরাজয়ের তুলনায়। প্রথম পরিস্থিতি নিঃসন্দেহে ইরানবিরোধী সবার জন্য ভালো এবং বর্তমান অস্থিতিশীল অবস্থার চেয়েও উন্নত। তবে দ্বিতীয় পরিস্থিতি বর্তমান অবস্থার চেয়েও খারাপ হতে পারে। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ওপর। তাঁরা দুজনেই রাজনৈতিকভাবে কঠিন অবস্থায় পড়বেন, যদি বর্তমান পরিস্থিতির চেয়ে ভালো কোনো সমাধান এনে নিজেদের অবস্থান রক্ষা করতে না পারেন।
ইরানের ইসলামপন্থী শাসনব্যবস্থাকে সরিয়ে দেওয়ার পক্ষে পশ্চিমা যুক্তি এখনো শক্তিশালী। পশ্চিমারা মনে করে, ৪৭ বছর ধরে ইসলামি প্রজাতন্ত্র নিজ দেশের জনগণ ও পুরো অঞ্চলের জন্য এক অভিশাপ হয়ে আছে। একদিকে তারা ইরানের জনগণকে অর্থনৈতিক দুর্ভোগে রেখেছে, অন্যদিকে ইসরায়েলকে নিয়মিত হুমকি দিয়েছে এবং সুন্নি সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ কিংবা বড় শিয়া জনগোষ্ঠী রয়েছে এমন দেশগুলোতে হস্তক্ষেপে চেষ্টা করেছে। এর মধ্যে লেবানন, সিরিয়া, ইরাক, ইয়েমেন, সুদান ও লিবিয়া—অনেক দেশই ব্যর্থ বা আংশিক ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।
শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, পুরো অঞ্চল অস্থিতিশীল করার পাশাপাশি ইরান বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন সশস্ত্র আন্দোলনে পৃষ্ঠপোষকতা করেছে বলে অভিযোগ পশ্চিমাদের। তারা মনে করে, ইরানের কারণেই ইউরোপে ব্যাপক অভিবাসন-সংকট উসকে উঠেছে এবং ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনকে সমর্থন দিয়েছে। ইরানের দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ইউরোপের সর্বত্র পৌঁছাতে সক্ষম। আর যদি ইরান পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করে, তাহলে তা পুরো মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের জন্য সরাসরি হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে রাশিয়াকে সমর্থন দেওয়ার বিষয়টিও এই প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ট্রাম্পের যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নিয়ে যে মত থাকুক না কেন, সবাই এমন একটি শেষ পরিণতি চাইবে, যেখানে ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা আর বৈশ্বিক অর্থনীতি, আর্থিক স্থিতিশীলতা বা নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে থাকতে পারবে না। স্পষ্ট ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও ‘কাজ শেষ করার’ চেষ্টা অন্য বিকল্পগুলোর চেয়ে ভালো বলে মনে হয়।
জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ ম্যার্ৎজ গত বছরের জুনে ১২ দিনের যুদ্ধের সময় বিষয়টি এভাবেই বলেছিলেন, ইরানকে আঘাত করে, ফিলিস্তিনি এবং লেবানিজদের দমন করে ‘ইসরায়েল আমাদের সবার হয়ে নোংরা কাজটি করছে।’ পশ্চিমা স্বার্থ বিবেচনায়—তাঁর এই কথা তখন যেমন সত্য ছিল, এখনো তেমনি। যদিও ইউরোপ, চীন ও এশিয়া—এই তিন অঞ্চল ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়েও বেশি লাভবান হবে, তবুও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ বাড়ানোর সম্ভাবনা বেশি। সবচেয়ে ভালো পরিস্থিতিতে স্বল্প মেয়াদে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা দেখা দেবে, এরপর দীর্ঘ মেয়াদে স্থিতিশীলতা আসবে। তবে মধ্যম বা দীর্ঘ মেয়াদে বড় ধরনের বিপর্যয়ের ঝুঁকিও বাস্তব।
লেখক: ড. নুরিয়েল রুবিনি বর্তমানে হাডসন বে ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট এলপির সিনিয়র অ্যাডভাইজার এবং নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির স্টার্ন স্কুল অব বিজনেসের ইমেরিটাস প্রফেসর। ২০২২ সালে প্রকাশিত ‘মেগাথ্রেটস: টেন ডেঞ্জারাস ট্রেন্ডস দ্যাট ইম্পেরিল আওয়ার ফিউচার, অ্যান্ড হাউ টু সারভাইভ দেম’ বইটির লেখক তিনি। রুবিনি ক্লিনটন প্রশাসনে হোয়াইট হাউসের কাউন্সিল অব ইকোনমিক অ্যাডভাইজার্সে আন্তর্জাতিক বিষয়ক সিনিয়র ইকোনমিস্ট হিসেবে তিনি কাজ করেছেন।
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), ইউএস ফেডারেল রিজার্ভ এবং বিশ্বব্যাংকেও তাঁর কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। নুরিয়েল রুবিনিকে ‘ডক্টর ডুম’ ডাকার মূল কারণ হলো বিশ্ব অর্থনীতি নিয়ে তাঁর অত্যন্ত নেতিবাচক ও প্রলয়ংকরী পূর্বাভাস। বিশেষ করে ২০০৬ সালে, যখন বিশ্ব অর্থনীতি বেশ চাঙা ছিল, তখন তিনি আইএমএফের এক সভায় দাঁড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আবাসন খাতে ধস এবং আসন্ন ভয়াবহ মন্দার কথা বলেছিলেন। ২০০৮ সালে তাঁর সেই পূর্বাভাস হুবহু মিলে যাওয়ার পর থেকেই এই নামটির সঙ্গে তিনি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে যান। মূলত অর্থনীতি যখন স্থিতিশীল থাকে, রুবিনি তখন মুদ্রাস্ফীতি, ঋণের পাহাড় কিংবা ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার মতো বিষয়গুলো সামনে এনে বড় ধরনের সংকটের সতর্কবার্তা দেন।
প্রজেক্ট সিন্ডিকেট থেকে অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান

ই-৩ সেন্ট্রি মূলত বোয়িং ৭০৭/৩২০-এর একটি পরিবর্তিত সংস্করণ, যার ওপরে একটি ঘূর্ণায়মান রাডার ডোম থাকে। এর রাডারের ক্ষেত্র ৩৭৫ কিলোমিটারের বেশি। এটি আকাশযুদ্ধের কমান্ড ও কন্ট্রোল সেন্টার হিসেবে কাজ করে এবং বিরতিহীনভাবে ৮ ঘণ্টা উড়তে পারে।
২ ঘণ্টা আগে
১৯৬২ সালের ২৭ অক্টোবর। মানব সভ্যতার ৩ লাখ বছরের ইতিহাসে সম্ভবত এটিই ছিল সবচেয়ে বিপজ্জনক দিন। ১০ কোটি ৯ লাখ দিনের ইতিহাসে এমন মুহূর্ত আর দ্বিতীয়টি আসেনি যখন আমাদের প্রজাতি নিজেদের অস্তিত্ব মুছে ফেলার এত কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল।
১৩ ঘণ্টা আগে
ভিক্টোরিয়ান অ্যাডমিরাল স্যার জ্যাকি ফিশার একসময় বলেছিলেন, পাঁচটি কৌশলগত ‘চাবি’ দিয়ে পুরো বিশ্বকে আটকে রাখা সম্ভব। সিঙ্গাপুর, কেপ টাউন, আলেকজান্দ্রিয়া, জিব্রাল্টার এবং ডোভার—এই পাঁচটি জলপথই ছিল বিশ্ব শাসনের মূল চাবিকাঠি। বর্তমান ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সেই তালিকায় আরেকটি নাম যোগ করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
১ দিন আগে
গত তিন সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমানবাহিনী ইরানের আকাশে অনবরত বোমাবর্ষণ করে চলেছে। পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বছরের পর বছর ইসলামিক রিপাবলিককে ভেতর থেকে দুর্বল করার চেষ্টা করেছে। এত কিছুর পরও আশ্চর্যজনক শোনালেও সত্য যে ইরানের বর্তমান নেতৃত্বের সামনে এই যুদ্ধে ‘বিজয়ী’ হওয়ার...
১ দিন আগে