Ajker Patrika

প্রেম, বিয়ে ও একই সঙ্গে বিজেএস জয়

শাহ বিলিয়া জুলফিকার
আপডেট : ২৯ মার্চ ২০২৬, ১২: ১৪
প্রেম, বিয়ে ও একই সঙ্গে বিজেএস জয়
বাঁ থেকে মহিউদ্দীন ও জীবন নাহার নয়ন। ছবি: সংগৃহীত

ফেসবুকে পরিচয়, নিয়মিত কথোপকথন। এরপর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম দেখা। বন্ধুত্ব থেকে প্রেম, প্রেম থেকে বিয়ে—তবে গল্পটি থেমে থাকেনি এখানেই। জীবন নাহার ৩৮তম এবং মহিউদ্দীন ৭৩তম হয়ে বাংলাদেশ জুডিশিয়ারি সার্ভিসে (বিজেএস) সাফল্য পেয়েছেন। ভালোবাসা আর স্বপ্ন পূরণের এই অনুপ্রেরণামূলক যাত্রার গল্প তুলে ধরেছেন শাহ বিলিয়া জুলফিকার

জীবন নাহার নয়ন পড়াশোনা করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। আর মহিউদ্দীন ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। সালটা ২০১৮। একই ব্যাচে পড়লেও তাঁদের পরিচয় হয় ফেসবুকে। ২০১৯ সাল থেকে শুরু হয় নিয়মিত যোগাযোগ। কখনো পড়াশোনা, কখনো ক্যাম্পাস, কখনো জীবন—এভাবেই কথোপকথনের মধ্য দিয়ে বাড়তে থাকে আন্তরিকতা। একসময় তাঁরা প্রথমবারের মতো দেখা করার সিদ্ধান্ত নেন।

প্রথম দেখা, প্রথম অনুভূতি

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ-নির্জন পরিবেশে তাঁদের প্রথম দেখা হয়। চারপাশের শান্ত প্রকৃতি আর প্রথম সাক্ষাতের আবেগ—সব মিলিয়ে মুহূর্তটি হয়ে ওঠে বিশেষ। সেখান থেকে শুরু হয় ভালো লাগা, ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে একসঙ্গে পথচলার গল্প। সেকেন্ড ইয়ারের ফাইনাল পরীক্ষার সময় বন্ধুত্ব রূপ নেয় প্রেমে। আর সময়ের পরিক্রমায় সে প্রেম পরিণত হয় প্রণয় ও পরিণয়ে।

ভিন্ন দুই মানুষ, এক লক্ষ্য

জীবন নাহার শুরু থেকেই মেধাবী শিক্ষার্থী ছিলেন। নিয়মিত ক্লাস, গভীর মনোযোগে পড়াশোনা এবং ডিপার্টমেন্টে সেরা ফল—সব ক্ষেত্রে ছিল তাঁর ধারাবাহিকতা। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। চাকরির ব্যস্ততা তাঁকে থামিয়ে রাখতে পারেনি; শুরু করেন জুডিশিয়ারি পরীক্ষার প্রস্তুতি। অন্যদিকে মহিউদ্দীনের লক্ষ্য ছিল স্থির। তিনি হতে চান বিচারক। স্নাতকোত্তর শেষ করার পর নিয়মিত লাইব্রেরিতে গিয়ে পড়াশোনা করেন।

একে অপরের শক্তি

দীর্ঘ প্রস্তুতির সময়ে তাঁরা ছিলেন একে অপরের সবচেয়ে বড় শক্তি। কোনো বিষয় বুঝতে সমস্যা হলে জীবন নাহারকে বুঝিয়ে দিতেন মহিউদ্দীন, আবার অনেক ক্ষেত্রে জীবন নাহারের পরামর্শও নিতেন মহিউদ্দীন। তবে মহিউদ্দীনের জীবনে জীবন নাহার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তিনি নিয়মিত পড়াশোনায় উদ্বুদ্ধ করতেন, জোর করেই কোচিংয়ে ভর্তি করিয়েছেন। ক্লাস বা পরীক্ষায় অনুপস্থিত থাকলে অভিমানও করতেন। জীবন নাহারের উচ্চ প্রত্যাশাই মহিউদ্দীনের ভেতরে বড় পরিবর্তন আনে এবং পড়াশোনার প্রতি জন্ম নেয় আগ্রহ।

জীবন নাহার প্রায়ই বলতেন, ‘আমার বাবার সামনে দাঁড়াতে হলে তোমাকে অবশ্যই জজ হতে হবে।’ এ কথাই ধীরে ধীরে মহিউদ্দীনের প্রেরণার উৎস হয়ে ওঠে। মজার ছলে তিনি আরও বলতেন, একদিন তিনি হবেন ‘দ্য মোস্ট হ্যান্ডসাম জাজ’।

প্রস্তুতির গল্প

প্রস্তুতির ধরন দুজনের আলাদা হলেও লক্ষ্য ছিল এক। মহিউদ্দীন নীলক্ষেত থেকে প্রয়োজনীয় বই সংগ্রহ করে জাহাঙ্গীরনগরে গিয়ে জীবন নাহারের হাতে তুলে দিতেন। মানসিক চাপের সময় জীবন নাহারের উপস্থিতিই ছিল সবচেয়ে বড় শক্তি।

প্রিলিমিনারি প্রস্তুতিতে তাঁদের মূল ভরসা ছিল বেয়ার অ্যাক্ট। জীবন নাহার মুখস্থের চেয়ে বোঝার ওপর জোর দিতেন, আর মহিউদ্দীন প্রতিটি ধারা খুঁটিয়ে পড়তেন। তাঁরা বিজেএস ও বিসিএসের অন্তত ১০ থেকে ১৫ বছরের প্রশ্ন বিশ্লেষণ করে প্রশ্নের ধরন আয়ত্ত করেন। পাশাপাশি বাংলা, ইংরেজি ও সাধারণ জ্ঞানের জন্য নিয়মিত পত্রিকা পড়া এবং মানসম্মত ডাইজেস্ট অনুসরণ ছিল তাঁদের অভ্যাস।

প্রথমবার প্রিলিমিনারিতে ব্যর্থ হওয়ার পর জীবন নাহার মহিউদ্দীনের জন্য নির্দিষ্ট দৈনিক টার্গেট ঠিক করে দেন। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পড়া শেষ করা এবং ছোট ছোট মক টেস্ট—এভাবেই গড়ে ওঠে তাঁদের নিয়মিত রুটিন।

লিখিত ও ভাইভা প্রস্তুতি

লিখিত পরীক্ষায় তাঁদের প্রস্তুতি ছিল আরও গভীর ও পরিশ্রমনির্ভর। জীবন নাহার প্রতিটি বিষয়ের জন্য আলাদা নোট তৈরি করেন। নোটে গুরুত্বপূর্ণ কেস স্টাডি ও নজিরগুলো সুচারুভাবে সাজানো ছিল। সময় ব্যবস্থাপনার দক্ষতা বাড়াতে তাঁরা নিয়মিত ঘড়ি ধরে লিখিত অনুশীলন করতেন। এ পর্যায়ে জীবন নাহার প্রায়ই মানসিক চাপে ভুগতেন। পরীক্ষা ভালো হলেও খারাপ হয়েছে মনে করে ভেঙে পড়তেন। তখন মহিউদ্দীন তাঁর মানসিক শক্তি হয়ে পাশে দাঁড়ান, আত্মবিশ্বাস ফিরে পেতে সাহায্য করেন।

ভাইভা প্রস্তুতিতে তাঁরা গুরুত্ব দেন আত্মবিশ্বাস ও ব্যক্তিত্ব গঠনে। নিজেরাই নিজেদের মক ভাইভা নিতেন, প্রশ্নোত্তর, উত্তর দেওয়ার ভঙ্গি এমনকি পোশাক-আশাক নিয়েও একে অপরকে ফিডব্যাক দিতেন। ভাইভা শেষে জীবন নাহার ভয়ে ফোন ধরা বন্ধ করে দিলেও মহিউদ্দীন ধৈর্য ধরে পাশে ছিলেন।

প্রস্তুতির পুরো সময় তাঁরা ‘শেয়ারিং ইজ কেয়ারিং’ নীতি মেনে এগিয়েছেন। জীবন নাহার লিখিত উত্তরের কাঠামো তৈরিতে ছিলেন দক্ষ, আর মহিউদ্দীন আইনের ধারা ও সেকশন মনে রাখতে পারতেন ভালো। এই পারস্পরিক সহযোগিতাই তাঁদের সাফল্যের ভিত্তি গড়ে তোলে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

যুক্তরাষ্ট্রে ‘ভয়ংকর অপরাধে’ গ্রেপ্তার ১০ বাংলাদেশির ছবিসহ পরিচয় প্রকাশ

জোড়া লাল কার্ডের ম্যাচে ভারতকে রুখে দিল বাংলাদেশ

বেরোবিতে ছাত্রীর সঙ্গে অন্তরঙ্গ অবস্থায় ঢাবি ছাত্র, থানায় নিয়ে মুচলেকা

বগুড়ায় বাজার সমিতির সাধারণ সম্পাদক প্রার্থীকে তুলে নিয়ে হাত-পা ভেঙে দিয়েছে দুর্বৃত্তরা

প্রেম, বিয়ে ও একই সঙ্গে বিজেএস জয়

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত