Ajker Patrika

ক্রুকে উদ্ধারে কী কী প্রযুক্তি ব্যবহার করল যুক্তরাষ্ট্র, ইরানিরা কেন খুঁজে পেল না

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ০৫ এপ্রিল ২০২৬, ১৭: ০৮
ক্রুকে উদ্ধারে কী কী প্রযুক্তি ব্যবহার করল যুক্তরাষ্ট্র, ইরানিরা কেন খুঁজে পেল না
ইরানের নিখোঁজ ক্রুকে উদ্ধারে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযান। ছবি: সংগৃহীত

আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে একজন সেনার জীবন কেবল একটি সংখ্যা নয়, বরং জাতির মর্যাদা ও সামরিক শক্তির প্রতীক। ইরানে ভূপাতিত এফ-১৫এ যুদ্ধবিমানের একজন ক্রুকে উদ্ধার করতে মার্কিন বাহিনীর বিশাল কর্মযজ্ঞের কথা জানা যাচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তথ্য অনুযায়ী, কয়েকশ কমান্ডো, বেশ কয়েকটি যুদ্ধবিমান এই উদ্ধার অভিযানে অংশ নেয়। সেই ক্রুকে তারা ইরানের ভূখণ্ড থেকে সফলভাবে উদ্ধার করেছে। অবশ্য বিনা বাধায় তারা কাজটি করতে পারেনি। কারণ ইরানও সেই ক্রুকে ধরতে বিশাল অঙ্কের পুরস্কার ঘোষণা করেছিল। ইরানি নিরাপত্তা বাহিনীর পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকেরাও হন্যে হয়ে খুঁজেছেন সেই ক্রুকে। ফলে দুই পক্ষে মধ্যে রাতভর গোলাগুলির হয়েছে। এই অভিযানে দুটি পরিবহন বিমান হারিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, বিমান দুটি যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে উড্ডয়নে ব্যর্থ হওয়ায় ইরানি হাতে যাতে না যায় সে জন্য ধ্বংস করা হয়েছে। তবে ইরান বলেছে, প্রতিরোধের মুখে সে দুটি ভূপাতিত হয়েছে।

যাই হোক, শত্রুসীমানায় নিখোঁজ বা বিচ্ছিন্ন হওয়া সেনাকে উদ্ধারের প্রক্রিয়াটি বর্তমানে আর কেবল সাহসিকতা বা শারীরিক সক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল নয়। এটি বর্তমানে ‘কমব্যাট সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ’ (সিএসএআর) নামক এক জটিল ভূ-রাজনৈতিক এবং উচ্চপ্রযুক্তি-নির্ভর সামরিক বিজ্ঞানে পরিণত হয়েছে। পুরো উদ্ধার অভিযানের একটি চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো—

১. কমব্যাট সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ (সিএসএআর) : দ্রুত ও সমন্বিত প্রতিক্রিয়া

উদ্ধার অভিযানের সাফল্যের প্রথম শর্ত হলো সময়। নিখোঁজ হওয়ার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টার মধ্যে উদ্ধার করা সম্ভব না হলে সেনার শত্রু পক্ষের হাতে ধরা পড়ার সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যায়।

প্যারা-রেসকিউ (পিজেএস) ও এলিট ফোর্স: মার্কিন বিমানবাহিনীর ‘প্যারা-রেসকিউ জাম্পার’ (পিজেএস) বিশ্বের একমাত্র বাহিনী যারা বিশেষত এই সিএসএআর মিশনের জন্য প্রশিক্ষিত। এরা একই সঙ্গে ডেলটা ফোর্সের মতো দক্ষ যোদ্ধা এবং ট্রমা সার্জনের মতো দক্ষ প্যারামেডিক।

আকাশপথের নজরদারি: ‘পেভ হক’ হেলিকপ্টার এবং এইচসি-১৩০ কমব্যাট কিং জে-এর মতো বিশেষ বিমানগুলো আকাশ থেকে নিখোঁজ সেনার অবস্থান শনাক্ত করে এবং উদ্ধারকারী দলের জন্য একটি সামরিক সুরক্ষা বলয় বা ‘অ্যান্টি-অ্যাক্সেস/এরিয়া ডিনায়াল’ (এ২ /এডি) জোন তৈরি করে।

২. সেরি (SERE) প্রশিক্ষণ: মানসিক ও শারীরিক কৌশলের সমন্বয়

নিখোঁজ সেনার উদ্ধার নিশ্চিত করতে তাঁর নিজের প্রশিক্ষণের ভূমিকা অপরিসীম। ‘সারভাইভাল, ইভেশন, রেজিস্ট্যান্স অ্যান্ড এস্কেপ’ (SERE) প্রশিক্ষণের মাধ্যমে একজন সেনাকে তিনটি ধাপে প্রস্তুত করা হয়:

ইভেশন: শত্রু এলাকায় নিঃশব্দে চলাচল এবং তাপীয় বা ইনফ্রারেড নজরদারি ফাঁকি দেওয়ার কৌশল।

সারভাইভাল: প্রতিকূল পরিবেশে খাদ্য ও জলের সংস্থান এবং প্রাকৃতিক চিকিৎসায় বেঁচে থাকা।

রেজিস্ট্যান্স: যদি দুর্ভাগ্যবশত ধরা পড়তে হয়, তবে জিজ্ঞাসাবাদে গোপন তথ্য প্রকাশ না করার মানসিক দৃঢ়তা।

৩. সি-সেল (CSEL) : স্যাটেলাইট ভিত্তিক অদৃশ্য জিপিএস

পুরোনো জামানার বিকন রেডিওর পরিবর্তে বর্তমানে ব্যবহৃত হচ্ছে ‘কমব্যাট সারভাইভার ইভেডার লোকেটর’ বা সি-সেল (CSEL)। এর কার্যকারিতা বিশ্লেষণ করলে তিনটি প্রধান বৈশিষ্ট্য দেখা যায়:

দ্বিমুখী এনক্রিপ্টেড যোগাযোগ: এটি কেবল সংকেত পাঠায় না, বরং উদ্ধারকারী দলের সঙ্গে নিরাপদ টেক্সট মেসেজের মাধ্যমে সরাসরি তথ্য আদান-প্রদান করতে পারে।

ওভার-দ্য-হরাইজন (OTH) বিকন: এটি সরাসরি স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ডাটা ট্রান্সমিট করে, যার ফলে রেডিও হরাইজন বা দৃশ্যমান সীমানার বাইরে থেকেও নিখুঁত অবস্থান শনাক্ত করা সম্ভব।

টার্মিনাল এরিয়া গাইডেন্স (TAG) : উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার যখন সেনার কাছাকাছি পৌঁছায়, তখন সি-সেল রেডিওর মাধ্যমে ‘পিং’ পাঠিয়ে পাইলটকে সেনার সুনির্দিষ্ট অ্যাঙ্গেল এবং দূরত্ব জানিয়ে দেয়, যা উদ্ধারের গতি বাড়ায়।

৪. এলপিআই (LPI) প্রযুক্তি: ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ারের ঢাল

শত্রু পক্ষ সব সময় ইলেকট্রনিক সাপোর্ট (ES) সিস্টেমের মাধ্যমে উদ্ধার অভিযানের সংকেত বা সিগন্যাল খুঁজে বের করার চেষ্টা করে। এই ঝুঁকি মোকাবিলায় ‘লো প্রোবাবিলিটি অব ইন্টারসেপ্ট’ (LPI) প্রযুক্তি কাজ করে:

স্প্রেড স্পেকট্রাম (Spread Spectrum) : সংকেতকে একটি নির্দিষ্ট ফ্রিকোয়েন্সির পরিবর্তে বিশাল ফ্রিকোয়েন্সি ব্যান্ডের ওপর ছড়িয়ে দেওয়া হয়। ফলে শত্রুর রিসিভারে এটি সাধারণ ‘ব্যাকগ্রাউন্ড নয়েজ’ হিসেবে ধরা দেয়।

ফ্রিকোয়েন্সি হপিং (FHSS) : সংকেতটি প্রতি সেকেন্ডে হাজারবার ফ্রিকোয়েন্সি পরিবর্তন করে, ফলে এটিকে ট্র্যাক করা বা ইন্টারসেপ্ট করা প্রায় অসম্ভব।

বার্স্ট ট্রান্সমিশন (Burst Transmission) : দীর্ঘ সময় সিগন্যাল না পাঠিয়ে ছোট ছোট ‘বার্স্টে’ বা নির্দিষ্ট বিরতিতে অতি দ্রুত ডাটা পাঠানো হয়, যা শত্রুর শনাক্তকরণ ব্যবস্থার অ্যালগরিদমকে ফাঁকি দেয়।

৫. দীর্ঘমেয়াদি রিকভারি ও ডিএপিপিএ (DPAA)-র ভূমিকা

তাৎক্ষণিক উদ্ধার সম্ভব না হলে বা কোনো সেনা নিহত হলে তাঁর দেহাবশেষ উদ্ধারে কাজ করে ‘ডিফেন্স পিওডব্লিউ/এমআইএ অ্যাকাউন্টিং এজেন্সি’ (DPAA)।

অ্যাডভান্সড ফরেনসিকস: ডিএনএ অ্যানালাইসিস এবং এমনকি মাটির নমুনা থেকে ‘এনভায়রনমেন্টাল ডিএনএ’ (eDNA) ব্যবহারের মাধ্যমে কয়েক দশক আগের নিখোঁজ সেনাদের সন্ধান পাওয়া সম্ভব হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সহযোগিতা: অনেক সময় স্থানীয় সরকার এবং সিভিলিয়ান ইন্টেলিজেন্স ব্যবহার করে দুর্ঘটনাস্থল বা কবরের সন্ধান করা হয়।

সিএসএআর (CSAR) মিশনগুলোর মূল চালিকাশক্তি হলো ‘নো ম্যান লেফট বিহাইন্ড’ আদর্শ। এটি কেবল একটি উদ্ধার অভিযান নয়, বরং এটি শত্রু পক্ষের জন্য একটি বড় ‘সাইকোলজিক্যাল ওয়ারফেয়ার’ বা মানসিক চাপ। আধুনিক প্রযুক্তির সুবাদে একজন সেনার অবস্থান এখন অন্ধকার পাহাড়ের খাঁজে হোক বা গহিন জঙ্গলে, সি-সেল এবং এলপিআই প্রযুক্তির মাধ্যমে তাঁকে খুঁজে বের করা সম্ভব হচ্ছে, যা যুদ্ধের ময়দানে সেনাদের নৈতিক মনোবল বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

এসব প্রযুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের হাতে থাকলেও ইরানে নিখোঁজ সেনাকে উদ্ধার অভিযান সহজ ছিল না। প্রযুক্তির সাহায্যে ওই সেনার অবস্থান পাওয়ার পরও তাঁকে উদ্ধারে মার্কিন বাহিনীকে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। প্রথমে সিআইএ প্রতারণামূলক কিছু চাল খেলেছে। তারা খবর ছড়িয়েছে যে, সেনাকে উদ্ধার করা হয়ে গেছে, যাতে ইরানিরা অনুসন্ধান বন্ধ করে দেয়। এরপর ডজনখানেক যুদ্ধবিমান এবং হেলিকপ্টারে করে শতাধিক স্পেশাল ফোর্স উদ্ধার কার্যক্রমে অংশ নেয়। এরপরও ইরানি গ্রামবাসীরা ঘটনাস্থলে চলে এলে তাদের লক্ষ্য গুলি এবং বোমা বর্ষণ করা হয়। শেষ পর্যন্ত দুটি বিমান ফেলে যেতে হয়েছে তাদের।

সুতরাং আহত ক্রুকে উদ্ধার করাটা যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি ও পরিকল্পনার চমক হলেও, সেটি করতে গিয়ে তাদের যে কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে এবং আর্থিক মূল্য দিতে হয়েছে, সেটিও কম নয়।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

‘ইলন মাস্কের হাত থেকে বাঁচাতে’ কিশোরী কন্যাকে হত্যা করলেন মা

অবশেষে অনশনরত স্বামীর হাত ধরে ঘরে ফিরলেন সেই স্ত্রী

মার্কিন বাহিনীর নতুন মাথাব্যথা ইরানের ‘অদৃশ্য কমান্ডো’

ক্রুকে উদ্ধারে কী কী প্রযুক্তি ব্যবহার করল যুক্তরাষ্ট্র, ইরানিরা কেন খুঁজে পেল না

ইরানে হামলায় সবচেয়ে প্রাণঘাতী ২০০০টি ক্ষেপণাস্ত্র মধ্যপ্রাচ্যে আনছে যুক্তরাষ্ট্র, একটার দাম ১৫ লাখ ডলার

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত