Ajker Patrika

চীন–মার্কিন বিরোধের আরেক কেন্দ্র হয়ে উঠছে ইসরায়েল

জাহাঙ্গীর আলম
আপডেট : ২০ মে ২০২১, ১৩: ৪০
চীন–মার্কিন বিরোধের আরেক কেন্দ্র হয়ে উঠছে ইসরায়েল

ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় প্রধানমন্ত্রীত্ব করছেন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। এই দীর্ঘ সময়ে চীন-ইসরায়েল সম্পর্কে গভীর প্রভাব ফেলেছেন তিনি। ১৯৯২ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার পর সবচেয়ে বিস্তৃত এবং দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে চীন।

তবে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক ও সামরিক ক্ষেত্রে চীনের দ্রুত প্রভাব বিস্তার ইসরায়েলের পশ্চিমা মিত্রদের নাখোশ করেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে টানাপোড়েন বাড়িয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, নেতানিয়াহুর প্রশাসন দ্রুত পরিবর্তিত বাস্তবতার সাথে খাপ খাইয়ে নিতে যথেষ্ট কাজ করছে কি–না?

২০১০ সালে চীন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। দ্বাদশ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় উন্নত প্রযুক্তিকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করে চীন। সেই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জগুলোর উদ্ভাবনী সমাধানের জন্য ‘স্টার্ট-আপ নেশন’ সন্ধান করতে শুরু করে।

একই সময়ে নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপকে ছাড়িয়ে ইসরায়েলের অর্থনীতিতে বৈচিত্র্য আনতে এশিয়ায় নজর দিতে শুরু করেন।

এ লক্ষ্যে দূতাবাস এবং চীনে থাকা নিজেদের চারটি কনস্যুলেটের সবাইকে বেইজিংয়ের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্কের উন্নয়ন প্রচার চালানোর নির্দেশ দেয় ইসরায়েল। সে সময় থেকে ব্যাপক বিনিয়োগের স্রোত আসার এক প্রতিশ্রুত উৎস হিসেবে চীনকে ‘একটি সুসংবাদের গল্প’ হিসেবে দেখছে ইসরায়েল। অন্যদিকে ২০১২ সালে সেন্ট্রাল পার্টি স্কুলের ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের প্রতিনিধিরা তেল আবিব সফরের পর ইসরায়েলকে ‘উদ্ভাবনের মূল উৎস’ হিসেবে চিহ্নিত করে চীন।

পরে ইসরায়েলের উদ্ভাবনী প্রযুক্তি সংস্থা এবং গবেষণা ও উন্নয়ন কেন্দ্রগুলোতে চীন থেকে কয়েক শ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রবাহ আসে। টোগা নেটওয়ার্কস লিমিটেড চীনা টেলিযোগাযোগ জায়ান্ট হুয়াওয়ের জন্য একটি গবেষণা ও উন্নয়ন কেন্দ্রে পরিণত হয়। ২০১৬ সালের শেষ নাগাদ ইসরায়েলি কোম্পানিটি অধিগ্রহণ করে হুয়াওয়ে। এখন আলিবাবা, কেমচিনা, কুং-চি, লিজেন্ড, লেনোভো ও শাওমি ইসরায়েলজুড়ে তাদের স্টোর খুলেছে। এর মধ্যে অনেকগুলো বিনিয়োগ এবং অধিগ্রহণ ক্লাউড কম্পিউটিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), সেমিকন্ডাক্টর (চিপ) ও যোগাযোগ নেটওয়ার্কগুলোকে কেন্দ্র করেই বাস্তবায়ন করেছে চীন। এসব উদ্যোগের নিঃসন্দেহে এই অঞ্চলে দুর্দান্ত কৌশলগত ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে।

ইসরায়েলের অবকাঠামোগত প্রয়োজনের জন্যও নেতানিয়াহু সরকার চীনের দিকে নজর দেয়। বিশেষত যখন মার্কিন সংস্থাগুলো টেন্ডারে প্রতিযোগিতা করার জন্য আমন্ত্রিত হয় এবং প্রত্যাখ্যাত হতে থাকে, তখন বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০১৫ সালে ইসরায়েল হাইফা বন্দরের নতুন বেসরকারি বিভাগ পরিচালনার জন্য বিদেশি সংস্থাগুলোর কাছ থেকে যখন টেন্ডার আহ্বান করেছিল, তখন এমন ঘটনাই ঘটেছে।

ইসরায়েলে চীনের প্রসারিত পদচিহ্নগুলো কর্মকর্তাদের মনে ভীতি ধরিয়ে দেয়। ২০১৪ সালেই তারা আশঙ্কার কথা বলতে শুরু করেন। ওই সময় চীনা রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন উদ্যোগ ব্রাইট ফুড যখন ইসরায়েলি দুগ্ধ করপোরেশন টানুয়ার অধিগ্রহণ করে, তখন ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক প্রধান ইফ্রাইম হেলভি তার সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, খাদ্য সুরক্ষা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় স্বার্থ। এটি বিদেশি সরকারের হাতে থাকা উচিত নয়।

তবে স্পর্শকাতর ক্ষেত্রগুলোতে চীনা বিনিয়োগের সুযোগ করে দেওয়া বা বিদেশি সংস্থাগুলোকে আহ্বান করার ঝুঁকি সম্পর্কে ইসরায়েল পুরোপুরি অজ্ঞ ছিল—এমন কিন্তু নয়। পুঁজিবাজারের কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় দরিত স্যালিংগার ইসরায়েলি বীমা কোম্পানি ফিনিক্স এবং ক্লালের চীনা অধিগ্রহণ ঠেকিয়ে দেন। তবুও, আর্থিক ক্ষেত্রের বাইরে ইসরায়েল চীনাদের স্বাগত জানানোর সিদ্ধান্ত থেকে সরে যায়নি।

২০০০–এর দশকের গোড়ার দিকে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক ছিন্ন করে ইসরায়েল–চীন। কারণ, ওই সময় ওয়াশিংটন ইসরায়েলকে বেইজিংয়ের সাথে একাধিক প্রতিরক্ষা চুক্তি বাতিল করতে বাধ্য করেছিল। ২০০৪ সাল থেকে বেসামরিক খাতগুলোতে সিনো–ইসরায়েল সহযোগিতা ব্যাপকভাবেই চলেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট ও বর্তমান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সঙ্গে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ফাইল ছবি: রয়টার্সতবে তেল আবিবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র (যুক্তরাষ্ট্র) চীনকে কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে চিহ্নিত করার পর ২০১৭ সালে ভূরাজনৈতিক চিত্র পরিবর্তিত হতে শুরু করে। চীনা কোম্পানিগুলোর বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করতে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। এসব কোম্পানি চীন সরকারের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তিতে লিপ্ত এবং সারা দুনিয়ায় চীনের অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্প ও উন্নত প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জনকে যুক্তরাষ্ট্র তার বৈশ্বিক নেতৃত্বের জন্য হুমকি হিসেবে দেখতে শুরু করে।

মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো থেকে চীনা বহুজাতিক সংস্থাগুলোতে রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। সেই সঙ্গে চীনের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে মিত্রদের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে শুরু করে। ২০১৮ সালে হাইফা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত মেরিটাইম কনফারেন্সে মার্কিন থিংক ট্যাঙ্করা ২০১৫ সালে সাংহাই ইন্টারন্যাশনাল পোর্ট গ্রুপের সঙ্গে হাইফা বন্দরের চুক্তি–সংক্রান্ত ইসরায়েলি সিদ্ধান্তের কড়া প্রতিবাদ জানান।

যা হোক, নেতানিয়াহু সরকার অবকাঠামো প্রকল্প এবং উচ্চ-প্রযুক্তি শিল্পে বিনিয়োগের জন্য চীনা সংস্থাগুলোকে টেন্ডার দেওয়া কিন্তু অব্যাহত রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখেও ইসরায়েল চীনের সাথে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময় থেকে শুরু হওয়া মার্কিন-চীন বাণিজ্যযুদ্ধের উত্তাপ যেভাবেই হোক ইসরায়েল–চীন সম্পর্ক আরও গভীর করেছে। ইসরায়েলের সেমিকন্ডাক্টর শিল্প ২০১৮ সালে চীনে তাদের রপ্তানিতে ৮০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেখেছে। যুক্তরাষ্ট্র চীনা প্রযুক্তি সংস্থাগুলোর জন্য দরজা বন্ধ করার সাথে সাথে সিলিকন ওয়াদির (ইসরায়েলের সিলিকন ভ্যালি) দিকে নজর দিতে শুরু করে বেইজিং।

চীন–ইসরায়েল প্রযুক্তি সহযোগিতা অব্যাহত থাকায় ওয়াশিংটন চীনা অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর বিষয়ে ইসরায়েলের ওপর চাপ বাড়িয়েছে। কারণ, গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলোতে ইসরায়েলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠার লাইনে উঠেছে চীন। অতি সম্প্রতি উচ্চ-প্রযুক্তি খাতে চীনা সংশ্লিষ্টতা বৃদ্ধির বিষয়ে ইসরায়েলকে প্রকাশ্যেই সতর্ক করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেনি ইসরায়েল। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের স্বতন্ত্র পর্যালোচনা পদ্ধতি অনুসরণ করার পর এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ঘনিষ্ঠ পরামর্শেই তেল আবিব ফাইভ–জি অবকাঠামো নির্মাণে চীনা সংস্থাগুলোকে টেন্ডার থেকে বাদ দেবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। ২০১৯ সালে একটি বিদেশি বিনিয়োগ তদারকি কমিটিও করেছে নেতানিয়াহু সরকার।

২০১০ সাল থেকে ইসরায়েল ও চীনের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য দ্বিগুণ হয়েছে। গবেষণা সংস্থা ইস্ট এশিয়া ফোরামের এ সম্পর্কিত প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ইসরায়েলি প্রযুক্তি সংস্থা এবং অবকাঠামো খাতে এরই মধ্যে ১১ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন (১ হাজার ১৫৩ কোটি) মার্কিন ডলার চীনা পুঁজি প্রবেশ করেছে। অবশ্য চীনের বহির্দেশে বিনিয়োগের খুব সামান্য অংশ এটি; মাত্র ৩ শতাংশেরও কম।

নেতানিয়াহু সরকার কিন্তু কখনোই আনুষ্ঠানিকভাবে স্পষ্ট করে কোনো চীন–কৌশল ঘোষণা করেনি। এটি কৌশলগত সামঞ্জস্যের ক্ষেত্রে সরকারকে একটা নমনীয়তা দেয়। যদিও তা এই সম্পর্ক থেকে সুবিধাপ্রাপ্তিও সীমিত করে।

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে উত্তেজনা যেহেতু ক্রমবর্ধমান, সেহেতু ইসরায়েল এমন নাজুক ভারসাম্য কতদিন রক্ষা করে চলতে পারবে, সেটি অনিশ্চিত। ওয়াশিংটন শেষ পর্যন্ত এই সম্পর্কের মাঝখানে সিসার দেয়াল হয়ে দাঁড়ায় কি–না, তা দেখার বিষয়। যেমনটি ২০০০–এর দশকের গোড়ার দিকে ঘটেছিল।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

লতিফ সিদ্দিকী, ঢাবি অধ্যাপক কার্জনসহ ডিবি হেফাজতে ১৫ জন সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেপ্তার

পুলিশের ওপর ৪ দফা হামলা, গাজীপুরের শীর্ষ সন্ত্রাসীকে ছিনিয়ে নিল দুর্বৃত্তরা

বড় ভাইসহ ডিবি হেফাজতে থাকা সবার সসম্মানে মুক্তি চাই: কাদের সিদ্দিকী

‘গ্রেপ্তার জাসদ নেতাকে থানায় সমাদর’, ওসিসহ তিন কর্মকর্তা প্রত্যাহার

এবার কাকে বিয়ে করলেন দুবাইয়ের রাজকন্যা শেখা মাহরা

এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত