Ajker Patrika

মুনাফা-নির্ভর নীতি কি ভারতকে মহামারি থেকে রক্ষা করবে

আপডেট : ২৩ এপ্রিল ২০২১, ২০: ৩৫
মুনাফা-নির্ভর নীতি কি ভারতকে মহামারি থেকে রক্ষা করবে

কোভিড-১৯–এর কারণে সৃষ্ট স্বাস্থ্য সমস্যার যে বিস্তৃতি সেই আকারের জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থার জন্য ভারত কখনোই প্রস্তুত ছিল না। অবশ্য কোনো দেশই ছিল বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। তবে দেশটির সরকার যেভাবে দেশের অগ্রাধিকার তালিকাটি ইচ্ছেমতো এদিক সেদিক করে ফেলেছে তাতে দেশের নির্দিষ্ট কিছু খাতকে যারপরনাই দুর্বল করে দিয়েছে। এই মুহূর্তে ভারত অক্সিজেন ট্যাঙ্ক, ভেন্টিলেটর, অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ এবং হাসপাতালের শয্যাসহ স্বাস্থ্যখাতের মৌলিক অবকাঠামোর বিপজ্জনক সঙ্কটে পড়েছে। প্রতিদিন কয়েক লাখ নতুন সংক্রমণ রেকর্ড হচ্ছে। শুক্রবার দেশটিতে মহামারি শুরু হওয়ার পর থেকে বিশ্বের সর্বোচ্চ দৈনিক সংক্রমণ শনাক্ত করা হয়েছে, ৩ লাখ ৩২ হাজার ৭৩০ জন । মারা গেছেন রেকর্ড ২ হাজার ২৬৩ জন ।  এটি  দেশটিতে এখন পর্যন্ত করোনায় দৈনিক সর্বোচ্চ মৃত্যু।

ভারত কেন্দ্রীয় বাজেটে স্বাস্থ্যখাতে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) মাত্র ১ শতাংশ বরাদ্দ করেছিল।  জনস্বাস্থ্য খাতকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে সূচনা বাজেট হিসেবে এটি খুবই হতাশাজনক। স্বাস্থ্যসেবাকে অগ্রাধিকার খাত হিসেবে বিবেচনায় পর বরাদ্দের হিসেবে ভারত ১৮৯টি দেশের মধ্যে ১৭৯তম স্থানে উঠে আসে। এটি মাথাপিছু বরাদ্দের হিসাবে সিয়েরা লিওনের মতো দাতা–নির্ভর দেশের কাতারে পড়ে।

ভারতে চিকিৎসা সুবিধাগুলো এতটাই অপ্রতুল যে অসুস্থদের জন্য সামগ্রিকভাবে হাসপাতালে ভর্তির হার বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে কম: মাত্র ৩ থেকে ৪ শতাংশ। যেখানে মধ্যম আয়ের দেশগুলোর গড় ৮ থেকে ৯ শতাংশ এবং অন্য কোথাও এর চেয়েও বেশি।

ভারত জনস্বাস্থ্য অবকাঠামোর প্রতি কখনই যথেষ্ট মনোনিবেশ করেনি। বাজেটে নিয়মিতভাবেই খাতটি অবহেলিত থাকছে। গত বছর সংক্রমণের সংখ্যা কম থাকাকে সরকার বরাবরই তাদের সাফল্য হিসেবে উপস্থাপন করছে। কিন্তু এবার সংক্রমণের যে অবস্থা তাতে ভাগ্যক্রমে সাফল্য পাওয়ার সুযোগ নেই।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি স্বাস্থ্যখাতকে বাণিজ্যিকীকরণে গুরুত্ব দিয়েছেন। তার সরকার বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে জমি বরাদ্দ এবং কর ছাড়ের মাধ্যমে এখাতকে উৎসাহিত করেছেন। মোদি সরকারের লক্ষ্য, ২০২২ সালের মধ্যে একটি বৃহৎ স্বাস্থ্যসেবা বাজার তৈরি করা, যে বাজারের আকার হবে ১৩৩ বিলিয়ন ডলার।

এতে করে যা হয়েছে তা কোনোভাবেই সাধারণ মানুষের জন্য সুফল বয়ে আনেনি। উল্টো পরিবারগুলোর কাঁধে ব্যয়ের বোঝা বেড়েছে। ভারতের স্বাস্থ্য-সংশ্লিষ্ট ব্যয় বিশ্বের মধ্যে উচ্চতর স্বাস্থ্যব্যয়ের দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। আর এ ব্যয় ভারতে ক্রমাগত বাড়ছে।

এছাড়া সরকারের স্বাস্থ্য বাজেটের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বেসরকারি পরিষেবা সরবরাহকারীদের ভর্তুকি বাবদ ব্যয় করা হয়। দেশের চিকিৎসা অবকাঠামোগত প্রয়োজনীয়তা বা সরকারের স্বাস্থ্যসেবা লক্ষ্যমাত্রা আরও সম্প্রসারিত করার ক্ষেত্রে এই ভর্তুকি কোনো কাজেই আসছে না। বেসরকারি হাসপাতালগুলো রোগীর মৃত্যুহার বা সংক্রমণ/রোগাক্রান্ত হওয়ার হার কমানোর মতো দৃশ্যমান ফলাফলের প্রতিশ্রুতি না দিয়ে বরং অর্থ উপার্জনের উদ্দেশ্যেই নির্মিত হয়।

মৌলিক স্বাস্থ্য অবকাঠামো শুধু এটি রাজনৈতিক কর্মসূচির অংশ হওয়াটাই যথেষ্ট নয়। প্রকৃত পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় সরকারি বিনিয়োগ নিশ্চিত করাটা স্বল্পমেয়াদি সুফল পেতে উদগ্রীব উচ্চাভিলাষী রাজনীতিকদের কর্ম নয়। মোদি সরকার এই সদিচ্ছাকে উপেক্ষা করার বা দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ করে দিয়েছে।

দেশটির সর্বশেষ অর্থনৈতিক সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে, উন্নত স্বাস্থ্য অবকাঠামো কোভিড -১৯–এর মতো ধ্বংসাত্মক মহামারিকে আরও ভালোভাবে মোকাবেলা করতে সক্ষম হবে– এমন কোনো গ্যারান্টি নেই। কারণ পরের ধাপটি আলাদারকম হতে পারে।

উদাহরণ হিসেবে মোদি সরকার সম্ভবত ব্রাজিলের দিকেই ইঙ্গিত করবে। লাতিন আমেরিকার দেশটিতে প্রতিদিন হাজার হাজার নতুন করোনা রোগী শনাক্ত হচ্ছে এবং ভাইরাসের সংক্রমণে মৃত্যুতে দেশটির বিশ্বের মধ্যে প্রথম সারিতে রয়েছে। ব্রাজিলের জনসংখ্যা ভারতের বৃহত্তম রাজ্যের সমান এবং ভারত স্বাস্থ্যসেবার জন্য মাথাপিছু যে পরিমাণ ব্যয় করে ব্রাজিল তার ১৬ গুণ বেশি করে। তবুও তো মহামারিতে ব্রাজিলের চিকিৎসা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার দশা।

প্রকৃতপক্ষে ঠিক এই কারণেই এখন ভারতের চিন্তিত হওয়া উচিত। ভারত যদি কোনো ভুল করে তাহলে তার ব্যর্থতার বিপর্যয় ব্রাজিলের চেয়ে বহুগুণ মারাত্মক হবে।

মহামারির শুরু থেকে যারা ভারতকে পর্যবেক্ষণ করেছেন তারা বলতে পারবেন: ভারতে সংক্রমিত অসংখ্য মানুষকে সেরে ওঠার সুযোগটুকুও দেওয়া হয়নি। কারণ সরকার এমন কোনো ব্যবস্থা তৈরি করেনি যা তাদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরবরাহ করতে সক্ষম।

১৪০ কোটি মানুষের দেশটিতে এমন একটি ব্যবস্থা দরকার যেখানে জনগণের সবচেয়ে প্রাথমিক প্রয়োজন: বেঁচে থাকার সুযোগ নিশ্চিত হবে। মুনাফাকেন্দ্রীক একটি বেসরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থা বিশ্বের প্রায় ১৮ শতাংশ জনগণের প্রয়োজন মেটানোর জন্য যথেষ্ট হবে এই ধারণাটিই হাস্যকর।

একটি সত্যিকারের স্বাস্থ্যসেবা জনসাধারণের ঝুঁকি বুঝতে, সে ব্যাপারে থাকতে এবং সে বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারে।

কিন্তু এখন বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ভারতের অনেক রাজ্যে হাসপাতালগুলোতে ধারণক্ষমতার বেশি রোগী। মাত্র কয়েক ঘণ্টার অক্সিজেন সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে, অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ পাওয়া খুব কঠিন হয়ে পড়েছে। আর নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র তো সোনার হরিণ!

এরকম জরুরি পরিস্থিতিতে অ্যাডহক ব্যবস্থা ভারতকে আস্তে আস্তে সঙ্কট সামলাতে সহায়তা করতে পারে। কিন্তু এই ব্যবস্থা যে দীর্ঘমেয়াদে টিকবে সেটির তো গ্যারান্টি নেই। ঠিক যেমন মোদি সরকার প্রথমবার ভেবেছিল তারা ভাইরাসের বিরুদ্ধে অলৌকিকভাবে লড়ছে এবং জিতে যাচ্ছে।

ভারতের জনস্বাস্থ্য খাতে এই নগণ্য ব্যয়ের কৌশলে কিন্তু সামগ্রিক বিবেচনায় কোনো নির্দেশনা নেই। এছাড়া জাতীয়-স্তরে অগ্রাধিকারও এখানে বিবেচনায় থাকে না। রাজ্যভেদে এই ব্যয় আলাদা। সব রাজ্য স্বাস্থ্যখাতে অর্থায়ন কেন্দ্রীয় সরকারের চেয়ে অনেক বেশি করে। যার ফলে বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের মধ্যে বৈষম্য তৈরি হয়। কেন্দ্র এবং প্রাদেশিক সরকার নির্দিষ্ট সঙ্কট নিয়ে কে দায়ী তা নিয়ে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়। ফলে রাজ্যভেদে এই বৈষম্য ও পার্থক্যগুলো শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক তরজার বিষয় হয়ে উঠেছে।

এ সমস্ত কিছুর অর্থ দাঁড়ায়, কোভিড-১৯–এর দ্বিতীয় ঢেউ থেকে বাঁচতে প্রস্তুত হতে চাইলে ভারতে বিশ্বের অন্যান্য সফল দেশকে অনুসরণ করতে হবে। ভারতের বরং এখন দরকার ভবিষ্যৎ সংক্রমণ সামলানোর জন্য সে কতোটা প্রস্তুত। শুধু জাতীয় ঐক্যের বয়ান না দিয়ে সরকারের আরও অনেক কিছু করার বাকি আছে। যেখানে মোদি সরকার প্রথমটির ওপরই জোর দিয়ে বেড়াচ্ছে। গত মঙ্গলবার রাতে জাতির উদ্দেশে ভাষণেও মোদি বাস্তবানুগ কথা রেখে বারবার জাতীয় ঐক্যের কথা বলেছেন।

করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের জন্য ব্যক্তি পর্যায় থেকে আমলাতান্ত্রিক অবহেলাকে দায়ী করা হচ্ছে। এটা সত্য। তবে ভারত যদি স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামো তৈরির মূল বিষয়গুলোতে নজর না দিতে শুরু না করে তাহলে এটি আরও সত্য হয়ে উঠবে। শেষ কথা হলো, নিজের দেশের মানুষের আরোগ্যই নিশ্চিত করতে না পারলে ‘বিশ্বের ফার্মেসি’ হওয়ার গালভরা বক্তৃতা দেওয়া অর্থহীন।

ব্লুমবার্গ অবলম্বনে জাহাঙ্গীর আলম

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

লতিফ সিদ্দিকী, ঢাবি অধ্যাপক কার্জনসহ ডিবি হেফাজতে ১৫ জন সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেপ্তার

পুলিশের ওপর ৪ দফা হামলা, গাজীপুরের শীর্ষ সন্ত্রাসীকে ছিনিয়ে নিল দুর্বৃত্তরা

বড় ভাইসহ ডিবি হেফাজতে থাকা সবার সসম্মানে মুক্তি চাই: কাদের সিদ্দিকী

‘গ্রেপ্তার জাসদ নেতাকে থানায় সমাদর’, ওসিসহ তিন কর্মকর্তা প্রত্যাহার

এবার কাকে বিয়ে করলেন দুবাইয়ের রাজকন্যা শেখা মাহরা

এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত