Ajker Patrika

নিজস্ব প্রযুক্তি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের স্টেলথ মিথ ভেঙে দিল ইরান, যা বলছেন চীনা সমরবিদ

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ২১ মার্চ ২০২৬, ১৯: ২৭
নিজস্ব প্রযুক্তি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের স্টেলথ মিথ ভেঙে দিল ইরান, যা বলছেন চীনা সমরবিদ
পঞ্চম প্রজন্মের এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান। ছবি: এএফপি

বিশ্বের অন্যতম অত্যাধুনিক পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান মার্কিন এফ-৩৫ স্টেলথ ফাইটার প্রথমবারের মতো আকাশযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) ইরানের আকাশে একটি অভিযানের সময় ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রে যুদ্ধবিমানটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে সেটি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিতে জরুরি অবতরণ করে বলে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। তবে কোন ঘাঁটিতে সেটি স্পষ্ট করা হয়নি।

এ ঘটনা প্রমাণ করে, রাডার ফাঁকি দিতে সক্ষম ‘স্টেলথ’ প্রযুক্তির যুদ্ধবিমানও অত্যাধুনিক ‘ইলেকট্রো-অপটিক্যাল/ইনফ্রারেড’ (ইও/আইআর) সেন্সর সিস্টেমের মাধ্যমে শনাক্ত করা সম্ভব।

ওই ঘটনার পর মধ্যপ্রাচ্যে ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইরানে অভিযান চালানোর সময় ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে স্টেলথ ফাইটারটি জরুরি অবতরণ করতে বাধ্য হয়। মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স বলেন, ‘আমরা এই খবর সম্পর্কে অবগত। আমাদের একটি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান ইরান মিশন শেষে আঞ্চলিক একটি মার্কিন বিমানঘাঁটিতে জরুরি অবতরণ করেছে। বিমানটি নিরাপদে অবতরণ করেছে এবং পাইলট স্থিতিশীল অবস্থায় আছেন। বর্তমানে এ ঘটনার তদন্ত চলছে।’

যদিও সঠিক তথ্য ও সময় এখনো যাচাই করা সম্ভব হয়নি, তবে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে ইরানি বাহিনীর হাতে এটিই প্রথম কোনো মার্কিন ফাইটার জেট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা।

ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) পৃথক এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা মধ্য ইরানের আকাশে একটি মার্কিন যুদ্ধবিমানকে সফলভাবে লক্ষ্যবস্তু করেছে।

লকহিড মার্টিনের তৈরি এফ-৩৫ পঞ্চম প্রজন্মের বহুমুখী যুদ্ধবিমান। বিশেষ নকশা এবং স্টেলথ প্রযুক্তির কারণে এটি রাডার ফাঁকি দিতে পারে। এটির রাডার ফাঁকি দেওয়ার সক্ষমতা ফরাসি রাফাল বিমানের তুলনায় ২০ থেকে ১০০ গুণ। বর্তমানে ইসরায়েলসহ যুক্তরাষ্ট্রের ২০টি মিত্র রাষ্ট্রের কাছে এই বিমান আছে।

চীনের সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল এবং প্রখ্যাত সামরিক বিশ্লেষক ইউ গ্যাং সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টকে জানিয়েছেন, তেহরানের প্রকাশিত ইনফ্রারেড ছবি দেখে মনে হচ্ছে বিমানটি সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত হলেও এর মৌলিক কার্যকারিতা বজায় ছিল। তিনি বলেন, ‘বিমানটিকে যদি রাশিয়ার তৈরি এস-৩০০-এর মতো শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দিয়ে আঘাত করা হতো, তাহলে এটি কোনোভাবে ঘাঁটিতে ফিরতে পারত না, যেমনটি যুক্তরাষ্ট্র বলেছে। কারণ, এস-৩০০ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা রাডার গাইডেড এবং এর ইন্টারসেপ্টর (ক্ষেপণাস্ত্র) অনেক শক্তিশালী।’

ইউ গ্যাংয়ের ধারণা, ইরান সম্ভবত তাদের হাতে থাকা ‘আর-২৭টি’ ইনফ্রারেড গাইডেড আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রকে কিছুটা পরিবর্তন করে ভূমি থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য ব্যবস্থায় রূপান্তর করেছে। এই ক্ষেপণাস্ত্রটির ব্যাস মাত্র ০.২৩ মিটার হলেও এর গতি শব্দের পাঁচ গুণ (মাক ৫), যা বর্তমান যেকোনো স্টেলথ বিমানের চেয়ে বেশি। তিনি আরও বলেন, এফ-৩৫ মূলত রাডারের তড়িৎ চৌম্বকীয় তরঙ্গ ফাঁকি দিতে পারলেও ইনফ্রারেড বা তাপীয় সেন্সরের কাছে এটি দুর্বল। কারণ, উড়ন্ত জেটবিমান যে তাপ উৎপন্ন করে—তা আইআর সিস্টেম সহজেই শনাক্ত করতে পারে। অর্থাৎ ইরান তাদের ‘আর-২৭টি’ ইনফ্রারেড গাইডেড আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র দিয়েই এফ-৩৫ বিমানে আঘাত করেছে।

চীনের সাবেক সেনা কর্মকর্তা সং ঝংপিং বলেন, এফ-৩৫ কোনো তড়িৎ চৌম্বকীয় তরঙ্গ প্রতিফলিত করে না। যা স্টেলথ প্রযুক্তির প্রধান বৈশিষ্ট্য। এ কারণেই হয়তো আগের হামলাগুলোতে এটি ধ্বংস হয়নি। তবে এবার ইরান সম্ভবত ইও/আইআর সেন্সর ব্যবহার করে এটিকে শনাক্ত করেছে। তিনি আরও বলেন, এফ-৩৫ রাডারে ধরা পড়ে না—এই ধারণাটি একটি মিথ। চীন বর্তমানে অত্যাধুনিক ইলেকট্রো-অপটিক্যাল রাডার এবং স্টেলথ লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ শনাক্তকরণ ব্যবস্থার অধিকারী।

গত বৃহস্পতিবারের ঘটনাটি লাইভ কমব্যাট বা প্রত্যক্ষ যুদ্ধে এফ-৩৫ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার প্রথম ঘটনা। ২০১৮ সাল থেকে যুদ্ধক্ষেত্রে মোতায়েন থাকলেও এর আগে প্রতিপক্ষের হামলায় এই বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কোনো রেকর্ড নেই। তবে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে মার্কিন বাহিনী বেশ কিছু বড় ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১২টি এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন ধ্বংস হয়েছে এবং ৫টি কেসি-১৩৫ রিফুয়েলিং বিমান সৌদি আরবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া ১ মার্চ কুয়েতে যুক্তরাষ্ট্রের ভাষ্যমতে ‘ফ্রেন্ডলি ফায়ার’ বা কুয়েতি প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রতিরোধের মুখে তিনটি মার্কিন এফ-১৫ই স্ট্রাইক ইগল বিমান বিধ্বস্ত হয়েছে।

ইউ গ্যাং মনে করেন, নিজেদের আকাশে নিয়ন্ত্রণ না থাকায় ইরান রকেট ইঞ্জিনচালিত ইনফ্রারেড গাইডেড ক্ষেপণাস্ত্রগুলোকে ভূমি থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় রূপান্তর করে মার্কিন বাহিনীকে বিপাকে ফেলছে। চীনও বর্তমানে এইচকিউ-৯ এবং এইচকিউ-১৯-এর মতো শক্তিশালী অ্যান্টি-স্টেলথ রাডার ও প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ব্যবহার করছে, যা এফ-৩৫-এর মতো বিমানকে বিভিন্ন কোণ থেকে শনাক্ত ও ধ্বংস করতে সক্ষম।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

নিজস্ব প্রযুক্তি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের স্টেলথ মিথ ভেঙে দিল ইরান, যা বলছেন চীনা সমরবিদ

ইরান যুদ্ধ গুটিয়ে আনার সময়সীমা বললেন ট্রাম্প

তেলের যুদ্ধে জিতে যাচ্ছে ইরান: জাপানের সঙ্গে আলোচনায় তেহরান, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিল

ইউক্রেনকে গোয়েন্দা তথ্য দেওয়া বন্ধ করলে আমরাও ইরানকে দেব না—যুক্তরাষ্ট্রকে রাশিয়া

বাংলাদেশ সিরিজ কেন বাতিল করল আয়ারল্যান্ড

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত