Ajker Patrika

মিডল ইস্ট আই–এর নিবন্ধ /ইরানকে ‘শায়েস্তা’ করতে যুক্তরাষ্ট্রের কাঁধে সওয়ার হতে চায় অক্ষম সৌদি-আমিরাত

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ২১ মার্চ ২০২৬, ১৮: ১৮
ইরানকে ‘শায়েস্তা’ করতে যুক্তরাষ্ট্রের কাঁধে সওয়ার হতে চায় অক্ষম সৌদি-আমিরাত
বাদশাহ ফয়সাল বিমান ঘাঁটিতে মোতায়েনকৃত যুদ্ধবিমানের সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন সৌদি সেনা কর্মকর্তারা। ছবি: এএফপি

চলতি মাসের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ দপ্তর বা ডিপার্টমেন্ট অব ওয়ারের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এলব্রিজ কোলবি সৌদি আরবের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খালিদ বিন সালমানের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। খালিদ বিন সালমান সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ভাই ও প্রধান উপদেষ্টাদের একজন। ফোনালাপের ইস্যু ছিল ইরানে হামলা বাড়াতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আরও প্রবেশাধিকার ও আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি।

লন্ডন থেকে প্রকাশিত মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইয়ের খবরে বলা হয়েছে, ইরান যখন উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে হামলা বাড়িয়ে তুলছে, তখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজন এই অঞ্চলের দেশগুলো বাড়তি প্রবেশাধিকার ও আকাশপথ ব্যবহারের অনুমতি।

বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একাধিক মার্কিন ও পশ্চিমা কর্মকর্তা মিডল ইস্ট আইকে জানান, ফোনালাপের পর সৌদি আরব পশ্চিম সৌদি আরবের তায়েফে অবস্থিত কিং ফাহদ বিমানঘাঁটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে সম্মত হয়েছে।

এই ঘাঁটিটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এটি প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটির তুলনায় ইরানের শাহেদ ড্রোনের নাগালের বাইরে। প্রিন্স সুলতান ঘাঁটি বারবার ইরানি হামলার শিকার হয়েছে। তায়েফ জেদ্দার কাছেও অবস্থিত। লোহিত সাগরের তীরের এই বন্দরটি এখন গুরুত্বপূর্ণ রসদকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। কারণ, ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছে।

বর্তমান ও সাবেক মার্কিন কর্মকর্তারা মিডল ইস্ট আইকে জানান, যদি ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে থাকে, তাহলে জেদ্দা মার্কিন বাহিনীকে টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। পূর্ব এশিয়া থেকে হাজার হাজার মার্কিন স্থলসেনা ইতিমধ্যে এই অঞ্চলের পথে রয়েছে।

বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তাদের মতে, সৌদি আরবের ঘাঁটি ব্যবহারের সুযোগ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত ইঙ্গিত দেয় যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বনাম ইরান যুদ্ধ নিয়ে সৌদি আরবসহ কিছু উপসাগরীয় রাষ্ট্রের অবস্থানে পরিবর্তন এসেছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থানরত এক পশ্চিমা কর্মকর্তা বলেন, ‘রিয়াদের মনোভাব বদলেছে। ইরানের হামলার প্রতিশোধ হিসেবে দেশটিকে শায়েস্তা করতে তারা এখন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ প্রচেষ্টাকে সমর্থন করার দিকে ঝুঁকছে।’

তিন সপ্তাহ ধরে ট্রাম্প ও সৌদি যুবরাজ নিয়মিত ফোনে কথা বলছেন বলেও মার্কিন ও পশ্চিমা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। সংযুক্ত আরব আমিরাতও যুক্তরাষ্ট্রকে জানিয়েছে যে—তারা দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত এবং সংঘাত দ্রুত শেষ করতে ওয়াশিংটনের ওপর কোনো চাপ দিচ্ছে না।

এ মাসের শুরুতে এক ফোনালাপে আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ আবদুল্লাহ বিন জায়েদ মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে জানান, যুদ্ধ ৯ মাস পর্যন্ত স্থায়ী হলেও তার জন্য আমিরাত প্রস্তুত।

যুদ্ধ শুরুর আগে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইরানে হামলা না করার জন্য লবিং করেছিল। যদিও এসব দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, তবুও ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র যখন ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে ইরানে হামলা শুরু করে, তখন তারা তাদের ঘাঁটিগুলোকে আক্রমণের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করতে দিতে অস্বীকৃতি জানায়।

তবু এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয়েছে উপসাগরীয় দেশগুলোকেই। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে একমাত্র সংযুক্ত আরব আমিরাতই ৩৩৮টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ১ হাজার ৭৪০টি ড্রোন প্রতিহত করেছে। মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাতার বরাবর উত্তেজনা কমানোর পক্ষে অবস্থান নিলেও উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ হামলার শিকার হয়েছে তারাই।

সপ্তাহখানেক আগে ইসরায়েল ইরানের সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে হামলা চালানোর পর ইরান পাল্টা হিসেবে কাতারের রাস লাফান শোধনাগারে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। কাতারের জ্বালানিমন্ত্রী সাদ আল-কাবি জানান, ক্ষয়ক্ষতি মেরামত করতে তিন থেকে পাঁচ বছর সময় লাগবে এবং এতে দেশের গ্যাস উৎপাদনের ১৭ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ওমানের মতো কিছু দেশ বলেছে, ইসরায়েল প্রতারণার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের বিরুদ্ধে বেআইনি যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলেছে।

যুক্তরাষ্ট্রকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তাদাতা হিসেবে নিয়েও ক্ষোভ বাড়ছে। উপসাগরীয় দেশগুলোর প্যাট্রিয়ট ও থাড ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় ইন্টারসেপ্টর যুক্তরাষ্ট্র সরবরাহ করতে পারেনি। আরব রাজতন্ত্রগুলোকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য স্থাপিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোই এখন হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। একই সঙ্গে তেল ও গ্যাস রপ্তানিও প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।

ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আল-বুসাইদি এই সপ্তাহে দ্য ইকোনমিস্টে লিখেছেন, এটি ‘আমেরিকার যুদ্ধ নয়’ এবং ওয়াশিংটনের মিত্রদের উচিত স্পষ্ট করে জানানো যে যুক্তরাষ্ট্রকে এমন এক সংঘাতে টেনে আনা হয়েছে, যেখানে লাভের সম্ভাবনা খুবই কম। বুসাইদির এই বক্তব্যের সঙ্গে তীব্র বৈপরীত্য দেখা যায় সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহানের অবস্থানে। রিয়াদ ও ইয়ানবুতে ইরানি হামলার পর তিনি ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের উদ্দেশে কঠোর ভাষায় বার্তা দেন। এক সাবেক মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা এটিকে ‘যুদ্ধংদেহী বক্তব্য’ বলে বর্ণনা করেছেন।

ফারহান বলেন, ইরান ‘জঘন্য হামলা’ চালিয়েছে, যা ‘ইরানের এমন আচরণেরই সম্প্রসারণ—যারা চাঁদাবাজি, মিলিশিয়া পরিপোষণ এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতাকে হুমকির ওপর ভিত্তি করে’। তিনি বলেন, ‘সৌদি আরব বারবার ইরানি ভাইদের দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়েছে...কিন্তু ইরানিরা তার প্রতিদান দেয়নি’ এবং যোগ করেন যে প্রয়োজনে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার অধিকার রাজ্যের রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, উপসাগরীয় অঞ্চলের কেউই ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ চায় না, তবে সংঘাত চতুর্থ সপ্তাহে গড়ালে উপসাগরীয় দেশগুলো ভিন্ন ভিন্ন ও পরিবর্তনশীল দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পরিস্থিতিকে দেখছে। সৌদি আরব অঞ্চলটির বৃহত্তম দেশ এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতোই বিদেশে শক্তি প্রদর্শনের উচ্চাকাঙ্ক্ষা রাখে। আসলে, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর ঠিক আগে ইয়েমেনে সংযুক্ত আরব আমিরাতের মিত্রদের ওপর হামলা চালিয়েছিল সৌদি আরব।

ওমান নিজেকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আলাদা অবস্থানে প্রতিষ্ঠা করেছে। অঞ্চলে ইরানের হামলায় তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি হওয়ায়, এর রাজধানী মাসকাটের নিরাপত্তা দুবাই ছেড়ে যাওয়া প্রবাসীদের নজর কেড়েছে। প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের নিকটপ্রাচ্য-বিষয়ক অধ্যাপক বার্নার্ড হাইকেল বলেন, ‘উপসাগরে একটি বিভাজন তৈরি হচ্ছে।’

তিনি যোগ করেন, ‘এই যুদ্ধের আগে সৌদি আরব ও আমিরাত নিরপেক্ষ ছিল। কিন্তু হামলার শিকার হওয়ার পর তারা বুঝেছে যে এমন কঠোর ইরানি শাসনের পাশেই বসবাস করা সম্ভব নয়, যা মুহূর্তের মধ্যে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে পুরো অঞ্চলকে জিম্মি করতে পারে।’

সৌদি রাজধানী রিয়াদ এবং দেশটির জ্বালানি অবকাঠামো ইরানের লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। তবে অঞ্চলজুড়ে এবং ক্রমেই যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও এই সংঘাতকে ইসরায়েলের ক্ষমতা বিস্তারের প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান বলেছেন, গাজায় ইসরায়েল গণহত্যা চালাচ্ছে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ওই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ৭২ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে।

বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে যুদ্ধ নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ার সমাধান হলো আরব উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলো মরুভূমি পেরিয়ে ইসরায়েল পর্যন্ত নতুন পাইপলাইন নির্মাণ করা, যা কার্যত তাদের জ্বালানি রপ্তানির ওপর ইসরায়েলকে ভেটো ক্ষমতা দেবে।

কুয়েত বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ বাদর আল-সাইফ বলেন, ‘গত ২৪ ঘণ্টায় যা ঘটেছে, তা আমাদের যুদ্ধের এক ভিন্ন পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে। গত তিন সপ্তাহ ধরে আমাদের ধৈর্য ও সংযম পরীক্ষা করা হচ্ছিল।’ তিনি আরও বলেন, ‘তবু ইসরায়েলের ভূমিকা ভুলে গেলে চলবে না। তারা উপসাগরীয় দেশগুলোকে এই যুদ্ধে টানতে চায়। আর স্পষ্ট করে বললে, যুক্তরাষ্ট্রের কোনো পরিষ্কার বেরিয়ে আসার কৌশল নেই।’

উপসাগর ও আরব সাগরের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ইব্রাহিম জালাল বলেন, উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলো এক কঠিন ভারসাম্যের মুখে রয়েছে। একদিকে ইরানি হামলার বিরুদ্ধে নিজেদের সীমারেখা টানতে হচ্ছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ সামলাতে হচ্ছে, পাশাপাশি উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা চালিয়ে যেতে হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘কথিত এক ইসলামি প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি যুদ্ধে পক্ষ নেওয়া রাষ্ট্র হিসেবে ইতিহাসে নাম উঠুক, তা উপসাগরীয় দেশগুলো চায় না।’

একই সঙ্গে জালাল বলেন, ইরানের হামলা উপসাগরীয় সার্বভৌমত্বের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং অঞ্চলকে এক অজানা পরিস্থিতিতে ঠেলে দিয়েছে। তিনি বলেন, ‘ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এখন সব নিষিদ্ধ সীমা ভেঙে দিয়েছে। উপসাগরকে প্রতিরক্ষামূলক নীতির মধ্যেই পদক্ষেপ নিতে হবে।’

ইরান অভিযোগ করেছে, কিছু উপসাগরীয় দেশ তাদের ভূখণ্ড যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জন্য ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করতে দিয়েছে। এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্রকে অতিরিক্ত লজিস্টিক সহায়তা দেওয়াও সৌদি আরবের জন্য স্পর্শকাতর বিষয়। তবে যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবের ওপর চাপ দিচ্ছে যাতে তারা ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি আক্রমণে যোগ দেয়, এমনটাই জানিয়েছেন মার্কিন ও আরব কর্মকর্তারা।

নিউইয়র্ক টাইমসের যাচাই করা ভিডিওতে দেখা গেছে, বাহরাইন থেকে ইরানের দিকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হচ্ছে। তবে এগুলো কে ছুড়েছে তা স্পষ্ট নয়। ছোট এই উপসাগরীয় দেশটি সৌদি আরবের ঘনিষ্ঠ অংশীদার। সৌদি প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক হিশাম আলঘান্নাম বলেন, রিয়াদ একদিকে সংঘাতে জড়িয়ে পড়া এড়াতে এবং অন্যদিকে ডিটারেন্ট বা প্রতিরোধ ক্ষমতা বজায় রাখতে ‘সূক্ষ্ম ভারসাম্য’ বজায় রাখার চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, ‘সৌদি আরব প্রতিশোধের হুঁশিয়ারি দিয়ে প্রতিরোধ প্রদর্শন করছে...সামরিক বিকল্প খোলা রাখছে, একই সঙ্গে কূটনীতি ও ইরানের সঙ্গে গোপন যোগাযোগকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, রিয়াদ ‘পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে জড়িয়ে না পড়ে যুদ্ধপূর্ব সম্পর্কোন্নয়নের অর্জন পুনরুদ্ধার করতে উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করছে।’

সৌদি আরব বহু বছরের বৈরী সম্পর্কের পর ২০২৩ সালের মার্চে ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করে। এই চুক্তিতে মধ্যস্থতা করেছিল চীন। ইরানের হামলার মুখে পড়লেও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো বড় ক্ষতির শিকার হয়নি সৌদি আরব। ইয়েমেনে ইরানের মিত্র হুথি বিদ্রোহীরাও এখন পর্যন্ত রাজ্যটিতে হামলা থেকে বিরত রয়েছে।

গালফ ইন্টারন্যাশনাল ফোরামের জ্যেষ্ঠ ননরেসিডেন্ট ফেলো ও সৌদি নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ আবদুলআজিজ আলঘাশিয়ান মিডল ইস্ট আইকে বলেন, সৌদি আরব ও অন্যান্য উপসাগরীয় দেশ একটি ‘দ্বিধার’ মুখে রয়েছে। তিনি বলেন, ‘যুদ্ধ শেষ হওয়াই সাধারণভাবে সবচেয়ে পছন্দের বিকল্প।’ তবে সংঘাত কালই থেমে গেলেও উপসাগরীয় অঞ্চলের ওপর ইরানের প্রাধান্য থেকেই যাবে।

তাঁর ভাষায়, ‘আমাদের শুধু প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুললেই হবে না, যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতির জন্যও একটি নজির তৈরি করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘ইরান প্রমাণ করেছে যে তারা ব্যাপক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে। গালফ কোঅপারেশন কাউন্সিল (জিসিসি) দেশগুলো নিজেদের অতিরিক্ত সংযত হিসেবে তুলে ধরতে চায় না, তাই কোনো না কোনো নজির প্রয়োজন।’ আলঘাশিয়ান বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক অভিযান চালালে ‘প্যান্ডোরার বাক্স খুলে যেতে পারে’—এটি সৌদি আরব ভালোভাবেই জানে।

যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সামরিক শক্তি গুরুতরভাবে দুর্বল হয়েছে বলে দাবি করলেও দেশটি এখনও মার্কিন ঘাঁটিতে নিখুঁত লক্ষ্যভেদী হামলা চালাতে সক্ষম। দেশটি মোটেও বিচ্ছিন্ন নয়। গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, রাশিয়া থেকে লক্ষ্য নির্ধারণ–সংক্রান্ত গোয়েন্দা সহায়তা পাচ্ছে তারা। মিডল ইস্ট আই জানিয়েছে, চীন থেকেও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও আক্রমণাত্মক অস্ত্র পেয়েছে ইরান।

এই সপ্তাহে ইসরায়েলের সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে হামলার পর উপসাগরীয় জ্বালানি স্থাপনায় ইরানের দ্রুত পাল্টা আঘাত তাদের কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অক্ষত থাকারই প্রমাণ দিয়েছে বলে মিডল ইস্ট আইকে জানান এক সাবেক মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা।

উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলো এটাও জানে যে—তাদের সামরিক বাহিনী বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চেয়ে বেশি ক্ষতি ইরানের ওপর চাপাতে পারবে না। আর প্রতিরোধের নামে কোনো ‘প্রতীকী’ পদক্ষেপ নিলে তা কেবল আরও পাল্টা হামলার ঝুঁকি ডেকে আনবে বলে জানান বিশ্লেষক জালাল। তিনি বলেন, ‘এই পর্যায়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর কোনো পদক্ষেপই যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের পক্ষে সামরিক ভারসাম্য ঘুরিয়ে দিতে পারবে না।’

তবে প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ হাইকলের মতে, সৌদি ঘাঁটিগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের আরও বেশি প্রবেশাধিকার পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, ‘সৌদি বিমানবাহিনী বা ক্ষেপণাস্ত্র হয়তো সমীকরণ বদলাতে পারবে না, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের বিমান যদি বিমানবাহী রণতরী নয়, বরং ধাহরান ঘাঁটি থেকে উড্ডয়ন করে, তাহলে পরিস্থিতি বদলাতে পারে।’ উপকূলীয় এই শহরটি ইরানের উপকূল থেকে মাত্র ১৩০ মাইল দূরে।

বিশ্লেষকদের মতে, প্রথমত উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেদের প্রতিরক্ষা আরও সমন্বিতভাবে সাজাতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চয়তার মূল্য নিয়ে যখন প্রশ্ন উঠছে, তখন এটি গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাম্প প্রশাসন উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একে অপরকে হস্তান্তরের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক মার্কিন অনুমোদন ছাড়াই করার জন্য ছাড়পত্র দিয়েছে। জালাল বলেন, ‘এখন জিসিসির প্রয়োজন একক প্রতিরক্ষা ব্লক হিসেবে কাজ করা এবং যৌথভাবে অস্ত্র সংগ্রহে অগ্রসর হওয়া।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রকে ঘাঁটি ব্যবহারে বেশি সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত হরমুজ প্রণালী নিয়েও ভূমিকা রাখতে পারে। কুয়েত বিশ্ববিদ্যালয়ের আল-সাইফ বলেন, ‘আক্রমণাত্মক আর প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপের সংজ্ঞা কী, সেটাই গত চব্বিশ ঘণ্টার বিতর্ক।’ তিনি বলেন, ‘উপসাগরীয় দেশগুলো চাইলে ইরানের মতো কৌশল নিয়ে তাদের তেল পরিবহন হরমুজ দিয়ে বের হতে বাধা দিতে পারে। কিন্তু এটি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির অংশ নয়। আমরা নির্ভরযোগ্য অংশীদার।’

বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি যে জলপথ দিয়ে যায়, সেই পথ খুলে দিতে পরিচালিত অভিযানে অংশ নিতে ন্যাটো ও এশীয় মিত্ররা অস্বীকৃতি জানিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসনকে। তারা অংশ নিলে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমান ও আক্রমণ হেলিকপ্টার ইরানের উপকূলে হামলা চালানোর সময় আঞ্চলিক সমর্থন দেখাতে পারতেন ট্রাম্প।

এই সপ্তাহে মার্কিন কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টের কূটনৈতিক উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ বলেন, ইরানের নিয়ন্ত্রণ থেকে জলপথ পুনরুদ্ধারে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানে আমিরাত অংশ নিতে পারে। সৌদি বিশ্লেষক আলঘাশিয়ান বলেন, ‘প্রাণঘাতী প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ’ নেওয়াই হতে পারে পরবর্তী ধাপ। তাঁর কথায়, ‘আমার মতে, সেই নজির তৈরি হতে পারে হরমুজ প্রণালীতেই।’

অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

নিজস্ব প্রযুক্তি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের স্টেলথ মিথ ভেঙে দিল ইরান, যা বলছেন চীনা সমরবিদ

ইরান যুদ্ধ গুটিয়ে আনার সময়সীমা বললেন ট্রাম্প

তেলের যুদ্ধে জিতে যাচ্ছে ইরান: জাপানের সঙ্গে আলোচনায় তেহরান, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিল

ইউক্রেনকে গোয়েন্দা তথ্য দেওয়া বন্ধ করলে আমরাও ইরানকে দেব না—যুক্তরাষ্ট্রকে রাশিয়া

বাংলাদেশ সিরিজ কেন বাতিল করল আয়ারল্যান্ড

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত