
ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি অধঃপতনে যাওয়ার এক নতুন উদাহরণ তৈরি করেছে। ভেনেজুয়েলার স্বৈরশাসককে অপহরণের পরপরই ইরানের বিরুদ্ধে তাঁর প্রশাসনের যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রকেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে এবং বিশ্বজুড়ে মানুষ আমেরিকার শক্তিকে কীভাবে দেখে, সেই ধারণা বদলে দেবে।
অবশ্য, বিদেশে দুর্ভাগ্যজনক ও অপরিকল্পিত হস্তক্ষেপে ক্ষেত্রে এটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম ঘটনা নয়। সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনাগুলোর একটি ছিল ১৯৫৩ সালে সিআইএ-এর মাধ্যমে ইরানের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেককে ক্ষমতাচ্যুত করা। তিনি দেশটিতে ব্রিটিশ মালিকানাধীন তেল শিল্প জাতীয়করণ করেছিলেন। যদিও বলা অতিরঞ্জন হবে যে মোসাদ্দেকের অপসারণই ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লব ঘটিয়েছিল, তবু এতে সন্দেহ নেই যে সিআইএ-এর প্রকাশ্য হস্তক্ষেপই ইরানের যুক্তরাষ্ট্রের বসানো রাজতন্ত্রকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে দেয়। এবং এই দৃষ্টিভঙ্গির ফলাফলই ছিল ইরানের ইসলামি বিপ্লব।
এ কারণেই ইরানি সমাজের বড় অংশই—কমিউনিস্ট, রক্ষণশীল এবং উদারপন্থী—প্রাথমিকভাবে শাহকে উৎখাতের পক্ষে ছিল। আয়রনি হলো, আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি মোটেও সর্বসম্মত নেতা ছিলেন না। তিনি দ্রুত তাঁর আগের মিত্রদের বিরুদ্ধেই অবস্থান নেন এবং একটি অত্যন্ত দমনমূলক ধর্মতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন, যা আজও ক্ষমতায়।
ইরানের ১৯৫৩ থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত ঘটনাপ্রবাহের শিক্ষাটা হলো, যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ প্রায়ই বহু অপ্রত্যাশিত পরিণতি ডেকে আনে। এগুলো দীর্ঘস্থায়ী ক্ষোভ সৃষ্টি করে। একই সঙ্গে এগুলো আমেরিকার তথাকথিত সফট পাওয়ার—অর্থাৎ প্রভাবিত করা ও আকর্ষণের ক্ষমতাকেও প্রভাবিত করে। এই সফট পাওয়ার দিয়েই যুক্তরাষ্ট্র তার বৈশ্বিক জোট ব্যবস্থাকে ধরে রেখেছে এবং অন্যদের বোঝাতে পেরেছে যে তার আধিপত্য সদয় এবং এটি আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা ও বৈশ্বিক ঘটনাপ্রবাহের পূর্বানুমান–যোগ্যতা বজায় রাখতে সহায়ক।
এটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আধিপত্যশালী শক্তি যদি গুন্ডার মতো আচরণ করে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই মানুষ আপত্তি জানাবে। অকারণে বারবার কঠোর শক্তির প্রদর্শন সফট পাওয়ার ক্ষয় করে, বিশেষত যখন কোনো হস্তক্ষেপের সুস্পষ্ট যৌক্তিকতা থাকে না। স্নায়ুযুদ্ধের সময় অন্তত যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামগ্রিক লক্ষ্য ছিল—কমিউনিজমের বিস্তার ঠেকানো, যা সত্যিই একটি বাস্তব হুমকি ছিল পুঁজিবাদের জন্য।
কোনো দেশের সফট পাওয়ারের জন্য আরও ক্ষতিকর হলো এমন অভিযান, যা অপরিকল্পিত এবং প্রভাবিত মানুষের জীবনের প্রতি সম্পূর্ণ ঔদাসীন্য দেখায়। মধ্যপ্রাচ্যে আমরা এখন সেটাই প্রত্যক্ষ করছি। ট্রাম্পের আবেগপ্রসূত যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের সফট পাওয়ারকে ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনবে এবং তার প্রশাসনে কেউই হারানো অবস্থান পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে না। সফট পাওয়ারকে মূল্যায়ন করার বদলে হোয়াইট হাউস হুমকি ও দ্বিপক্ষীয় চুক্তিকেই বিদেশি নেতা ও জনগণের হৃদয়-মন জয় করার বিকল্প হিসেবে দেখছে।
এটি আংশিক সত্য যে ইরানি শাসনব্যবস্থা অত্যন্ত নিষ্ঠুর ও দমনমূলক। অনেক ইরানিরই নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি (পূর্ববর্তী সর্বোচ্চ নেতার পুত্র) বা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের প্রতি কোনো ভালোবাসা নেই। কিন্তু তাতে এই শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়বে এমন নয়, কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ অঞ্চলটিতে শান্তি ও স্থিতিশীলতা আনবে—এমনও বোঝায় না।
এই যুদ্ধের সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, স্নায়ুযুদ্ধের সময় সিআইএ যতগুলো বিপর্যয়কর হস্তক্ষেপ করেছে তার তুলনায়ও এটি অনেকটাই দুর্বলভাবে পরিকল্পিত ছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর কাছে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু এবং নির্ভুল বোমা ছিল, কিন্তু কোনো সুস্পষ্ট প্রস্থান কৌশল ছিল না।
এটি স্পষ্ট হওয়া উচিত ছিল যে—ইরানের শাসনব্যবস্থা তাৎক্ষণিকভাবে ভেঙে পড়বে না, এমনকি শীর্ষ নেতৃত্ব ধ্বংস হলেও। একইভাবে পূর্বানুমেয় ছিল যে ইরানের পাল্টা আঘাত অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করবে এবং তেলের দাম বাড়িয়ে দেবে। সবাই সব সময় জানত যে—হরমুজ প্রণালি এই শাসনের সবচেয়ে শক্তিশালী তুরুপের তাস। তবুও ট্রাম্প প্রশাসন এসব বিবেচনা উপেক্ষা করেছে বলেই মনে হয়, অন্তত জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সাম্প্রতিক বক্তব্য থেকে তা বোঝা যায়।
ফলে ইরানি রেজিম হয়তো বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে শক্তিশালী অবস্থান তাদেরই। তারা জানে আমেরিকানরা দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ চায় না, এবং ইসলামিক রিপাবলিক টিকে থাকার জন্য যত দিন প্রয়োজন তত দিন অবরোধ সহ্য করতে ও জনগণকে দমন করতে প্রস্তুত। বৈশ্বিক বাজারের বাড়তে থাকা উদ্বেগ সেটিই প্রতিফলিত করছে।
এমন সময়ে যখন অর্থনীতি আগেই ভঙ্গুর বলে মনে হচ্ছিল—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে সম্ভাব্য বুদ্বুদ তৈরির আলোচনা তারই ইঙ্গিত—জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করতে পারে। তেলের দামের তীব্র বৃদ্ধি বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমাবে এবং মূল্যস্ফীতি বাড়াবে। এর ফলে বেকারত্ব ও মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পাবে, যা ক্ষমতাসীন সরকারগুলোর জন্য ব্যয়বহুল হবে। বিশেষত ইউরোপে, যেখানে ডানপন্থী জনতাবাদী শক্তির চ্যালেঞ্জ রয়েছে (যদিও অধিকাংশ ইউরোপীয় নেতা যুদ্ধের বিরোধিতা করছে এবং প্রণালি পুনরায় খুলতে যুক্তরাষ্ট্রকে সাহায্য করতে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর ট্রাম্পের আহ্বান সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে।
দেশের ভেতরে যুক্তিসংগতভাবেই ধারণা করা যায় যে, আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে এই যুদ্ধের জন্য ট্রাম্পকে বড় রাজনৈতিক মূল্য দিতে হতে পারে। কিন্তু ট্রাম্প নিজেকে তথাকথিত অ্যান্টি-এস্টাবলিশমেন্ট নেতা হিসেবে তুলে ধরেন এবং যদি তার কঠোর সমর্থকেরা অবনতিশীল অর্থনীতির জন্য তাঁকে নয় বরং প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থাকেই দোষ দেয়, তাহলে দেশ আরও বিভাজিত হবে এবং প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়বে।
ট্রাম্প নিজেও সম্ভবত এই আগুনে আরও ঘি ঢালবেন রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে বিভাজন বাড়িয়ে—এমনকি আরও উত্তেজনাপূর্ণ অভ্যন্তরীণ পদক্ষেপ নিয়ে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো ইতিমধ্যেই দুর্বল এবং প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা সীমিত রাখার জন্য যে নিয়ম ও নিয়ন্ত্রণ থাকা উচিত ছিল তার অনেকগুলোই কার্যত কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। এতে ট্রাম্পের রাজনৈতিক এজেন্ডা লাভবান হচ্ছে এবং তিনি প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও দুর্বল করার যেকোনো সুযোগ গ্রহণ করবেন।
ইরানে এই অপরিকল্পিত অভিযানের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্র ও সফট পাওয়ার কতটা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে তাই এখন দেখার বিষয়। তবে একটি বিষয় সম্ভবত নিশ্চিত—এর মূল্য শেষ পর্যন্ত আমেরিকান জনগণকেই দিতে হবে এবং সেই মূল্য আমরা পুরোপুরি কল্পনাও করতে পারি না। যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্র, সামাজিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক সহনশীলতার প্রতি হুমকি এখন জীবিত স্মৃতির যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি।
লেখক: ড্যারন আসেমোগলু ২০২৪ সালে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। তিনি ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি—এমআইটির ইন্সটিটিউট প্রফেসর অব ইকোনমিক্স। জেমস এ. রবিনসনের সঙ্গে তার লেখা বই ‘হোয়াই নেশনস ফেইল: দ্য অরিজিনস অফ পাওয়ার, প্রসপারিটি অ্যান্ড পভার্টি’ বেশ জনপ্রিয়। এ ছাড়া সাইমন জনসনের সঙ্গে তিনি ‘পাওয়ার অ্যান্ড প্রগ্রেস: আওয়ার থাউজেন্ড-ইয়ার স্ট্রাগল ওভার টেকনোলজি অ্যান্ড প্রসপারিটি’ বইটি যৌথভাবে লিখেছেন।
অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান

ইরান নিজ উপকূল থেকে প্রায় চার হাজার কিলোমিটার দূরের মার্কিন-ব্রিটিশ ঘাঁটি দিয়েগো গার্সিয়া লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। এই উৎক্ষেপণ যত না লক্ষ্যভেদ করার উদ্দেশ্যে, তার চেয়েও বেশি হলো—স্পষ্ট বার্তা দেওয়া। ইরান দেখিয়ে দিল, তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের নাগাল মধ্যপ্রাচ্যের সীমানা ছাড়িয়ে অনেক দূর পর্যন্ত...
৬ ঘণ্টা আগে
এফ-৩৫ কোনো তড়িৎ চৌম্বকীয় তরঙ্গ প্রতিফলিত করে না। যা স্টেলথ প্রযুক্তির প্রধান বৈশিষ্ট্য। এ কারণেই হয়তো আগের হামলাগুলোতে এটি ধ্বংস হয়নি। তবে এবার ইরান সম্ভবত ইও/আইআর সেন্সর ব্যবহার করে এটিকে শনাক্ত করেছে।
৭ ঘণ্টা আগে
চলতি মাসের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ দপ্তর বা ডিপার্টমেন্ট অব ওয়ারের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এলব্রিজ কোলবি সৌদি আরবের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খালিদ বিন সালমানের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। খালিদ বিন সালমান সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ভাই ও প্রধান উপদেষ্টাদের একজন। ফোনালাপের ইস্যু ছিল ইরানে হামলা বাড়াতে...
৭ ঘণ্টা আগে
মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে যখন বারুদের গন্ধ, তখন কূটনৈতিক টেবিলে এক ‘মাস্টারস্ট্রোক’ দিয়েছে ইরান। মার্কিন মিত্র জাপানকে নিজেদের পক্ষে টানতে তেহরান যে বিশেষ প্রস্তাব দিয়েছে, তা আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
১১ ঘণ্টা আগে