Ajker Patrika

এম্পটি নেস্ট ডিভোর্স ও দাম্পত্যের নতুন সমীকরণ

ফারিয়া রহমান খান 
এম্পটি নেস্ট ডিভোর্স ও দাম্পত্যের নতুন সমীকরণ
ছবি: পেক্সেলস

দাম্পত্যজীবনের এক দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার পর অনেক যুগল এমন একপর্যায়ে পৌঁছান, যখন তাঁদের সন্তানেরা বড় হয়ে পড়াশোনা বা কাজের প্রয়োজনে ঘর ছেড়ে চলে যায়। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এই সময়টাকে বলা হয় ‘এম্পটি নেস্ট’ বা খালি বাসা। গত কয়েক দশকে বিশ্বজুড়ে একটি বিশেষ প্রবণতা দেখা যাচ্ছে—সন্তানেরা ঘর ছাড়ার পরপরই অনেক দম্পতি বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। এই বিষয়কে বিশেষজ্ঞরা এম্পটি নেস্ট ডিভোর্স হিসেবে অভিহিত করছেন।

কেন বিচ্ছেদ বাড়ছে

সন্তান লালন-পালন করার সময় মা-বাবার সব মনোযোগ থাকে সন্তানের ওপর। কিন্তু সন্তান চলে যাওয়ার পর যখন স্বামী-স্ত্রী একা হয়ে পড়েন, তখন সম্পর্কের কিছু ধামাচাপা পড়া সত্য সামনে চলে আসে। যেমন—

সম্পর্কের পুনর্মূল্যায়ন: দীর্ঘ ২০-২৫ বছর পর দম্পতিরা যখন একে অপরের মুখোমুখি বসেন, তখন তাঁরা নিজেদের সামঞ্জস্য নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেন। অনেক সময় দেখা যায়, সন্তানের জন্য তাঁরা একসঙ্গে ছিলেন ঠিকই, কিন্তু নিজেদের মধ্যে ভালোবাসার টানটুকু আর অবশিষ্ট নেই।

আগ্রহের ভিন্নতা: সন্তানের পেছনে সময় দিতে দিতে স্বামী-স্ত্রী হয়তো ভুলেই যান, তাঁদের ব্যক্তিগত শখ বা লক্ষ্য কী ছিল। একা হওয়ার পর দেখা যায়, দুজনের রুচি ও আগ্রহ সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে গেছে।

যোগাযোগের অভাব: বছরের পর বছর ধরে কেবল সন্তানসংক্রান্ত আলাপ করতে করতে দম্পতিদের মধ্যে মানসিক ও আবেগময় যোগাযোগের ঘাটতি তৈরি হয়। সন্তান চলে গেলে তাঁরা বুঝতে পারেন, তাঁদের মধ্যে কথা বলার মতো কোনো সাধারণ বিষয় আর নেই।

মধ্যবয়সের সংকট: জীবনের অর্ধেকটা পার করার পর অনেকের মনে এক ধরনের অপূর্ণতা তৈরি হয়। তাঁরা নতুন করে নিজেকে খুঁজে পেতে চান, যা অনেক সময় পুরোনো সম্পর্ক ছিন্ন করার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

চিকিৎসক, কাউন্সিলর ও সাইকোথেরাপি প্র‍্যাকটিশনার সানজিদা শাহরিয়া বলেন, ‘সন্তানদের মানুষ করতে গিয়ে আমরা প্রায়ই নিজেদের ভালোবাসাকে অবহেলা করি। কিন্তু খালি বাসার নিঃসঙ্গতা যেন আমাদের আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। এটা বিচ্ছেদের গল্প নয়, বরং নিজেদের নতুন করে চিনে নেওয়ার সময়। একসঙ্গে বার্ধক্যকে আলিঙ্গন করার শপথ নেওয়ারই দিন এটি। মা-বাবা এখন মুখোমুখি, খালি বাসায় হঠাৎ দেখতে পান, সন্তানের জন্য ভালোবাসা ছিল, কিন্তু দুজনের মধ্যে সেই টানটা আর নেই। এই বোধটা বড় মর্মান্তিক। তবু ভাবতে হবে, বিচ্ছেদ কি একমাত্র পথ? নাকি এটিই সুযোগ নতুন করে চেনার? জীবনের এই অধ্যায়টা শূন্যতার নয়, ভালোবাসার; বার্ধক্যকে আলিঙ্গন করার।’

তিনি আরও বলেন, জীবনের শেষ প্রান্তে দাম্পত্য মানে শুধু অভ্যাস নয়, পরস্পরের বার্ধক্যের সহযাত্রী হওয়া।

ছবি: পেক্সেলস
ছবি: পেক্সেলস

মনোবিজ্ঞানীদের পরামর্শ

এই ক্রান্তিলগ্নে হুট করেই কোনো সিদ্ধান্ত না নিয়ে মনোবিজ্ঞানীরা বরং কিছু বিষয়ের ওপর জোর দিতে বলেছেন—

প্রথাগত ধারণার বাইরে চিন্তা করা

সমাজ কী ভাববে তার চেয়ে বেশি জরুরি আপনারা কিসে ভালো থাকবেন। বিচ্ছেদই যে একমাত্র পথ, তা কিন্তু নয়। আপনারা চাইলে নতুনভাবে বিয়ের সংজ্ঞা নির্ধারণ করতে পারেন। একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে আলাদা থাকতে পারেন বা নতুন কোনো জায়গায় গিয়ে একসঙ্গে কিছু সময় কাটাতে পারেন। তবে বিচ্ছেদই যদি একমাত্র সমাধান হয়, তবে সেটিকে ব্যর্থতা হিসেবে না দেখাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

সন্তানেরা বিদেশে গেছে, এখন ঘর শূন্য। কিন্তু এই বয়সে বিচ্ছেদ? বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় এর মূল্য দিতে হবে সন্তানদেরই। প্রবীণ বাবা-মায়ের দেখভাল, অসুখ-বিসুখ—সব দায়িত্ব পড়বে তাদের ঘাড়ে। পশ্চিমের মতো এখানে ওল্ড হোমের সংস্কৃতি নেই। এম্পটি নেস্ট ডিভোর্স শুধু দুজনের সিদ্ধান্ত নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাঁধেও বাড়তি বোঝা চাপায়। সানজিদা শাহরিয়া চিকিৎসক, কাউন্সিলর ও সাইকোথেরাপি প্র‍্যাকটিশনার, ফিনিক্স ওয়েলনেস সেন্টার বিডি

আর্থিক বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া

যৌবনে বিচ্ছেদের চেয়ে শেষ বয়সের বিচ্ছেদে আর্থিক ঝুঁকি বেশি থাকে। অবসরের পরিকল্পনা, চিকিৎসার খরচ বা সন্তানদের পড়াশোনার ব্যয়, সবকিছুই বড় চাপের কারণ হয়ে পারে। তাই যেকোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ঠান্ডা মাথায় আর্থিক পরিকল্পনা সেরে নেওয়া এবং সঙ্গীর সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করা জরুরি।

ছবি: পেক্সেলস
ছবি: পেক্সেলস

আশাবাদী হওয়া

গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের মানসিক সুখ এবং ইতিবাচকতা বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে ৫৫ বছর বয়সের পর মানুষ জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অনেক বেশি অভিজ্ঞ ও ধৈর্যশীল থাকে। তাই এই বয়সে কোনো সংকটে পড়লেও মনে রাখবেন, ২০ বা ৩০ বছর বয়সের চেয়ে যেকোনো পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ক্ষমতা এখন আপনার অনেক বেশি।

মনে রাখবেন, সন্তানেরা ঘর ছেড়ে চলে যাওয়ার পর জীবন থেমে যায় না, বরং এটি নিজেকে ও নিজের সঙ্গীকে চেনার একটি বড় সুযোগ। খোলামেলা যোগাযোগ, একে অপরের প্রতি সম্মান এবং প্রয়োজনে পেশাদার কাউন্সিলরের সাহায্য নিলে এই ‘এম্পটি নেস্ট’ অনুভূতি কাটিয়ে দাম্পত্যজীবনে নতুন সূচনা সম্ভব। ভালোবাসা মানে কেবল একসঙ্গে সন্তান লালন-পালন করা নয়, বরং একসঙ্গে বার্ধক্যকে আলিঙ্গন করে একে অপরের পাশে থাকা।

সূত্র: ফোর্বস ডটকম

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

নদীর পাড়ে পড়ে ছিল অজ্ঞাতনামা যুবকের গলাকাটা ও মাথাবিহীন লাশ

অপারেশন থিয়েটারে মির্জা আব্বাস, মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচার

ভৈরবে ১ কোটি ৮৫ হাজার টাকাসহ আটক দুই স্বর্ণকার, ২১ ঘণ্টা পর মুক্ত

চট্টগ্রামে ৭ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে সাইবার আইনে মামলা

ম্যানেজিং কমিটিতে শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিলের প্রশ্নই ওঠে না: শিক্ষামন্ত্রী

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত