Ajker Patrika

ইরানে কুর্দিদের নিয়ে জুয়ায় যেসব কারণে হারতে পারেন ট্রাম্প

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
ইরানে কুর্দিদের নিয়ে জুয়ায় যেসব কারণে হারতে পারেন ট্রাম্প
ট্রাম্পের কুর্দি জুয়া বুমেরাং হতে পারে বলে মনে করেন অনেক বিশ্লেষক। ছবি: সংগৃহীত

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পশ্চিম ইরানের কিছু অংশ দখলে কুর্দি যোদ্ধাদের স্থল অভিযান শুরুর আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি তাদের যুক্তরাষ্ট্রের আকাশসীমা থেকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের সেনা সরাসরি পাঠানোর বদলে, তিনি প্রক্সি বাহিনী নামানোর পক্ষে মত দিয়েছেন। এই বাহিনী গঠিত হবে ইরানি কুর্দিদের দিয়ে, যাদের যুক্তরাষ্ট্র অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করবে, যাতে তারা ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থাকে উৎখাত করার চেষ্টা করতে পারে।

গতকাল বৃহস্পতিবার কুর্দিদের ইঙ্গিত করে ট্রাম্প বলেন, ‘ওরা এটা করতে চায়—এটা চমৎকার ব্যাপার। আমি পুরোপুরি সমর্থন করব।’ এই অভিযানের লক্ষ্য হবে—ইরানের ভেতরের কুর্দি অধ্যুষিত এলাকায় ভূখণ্ড দখল করা। এরপর সেই অঞ্চলকে কেন্দ্র করে ইরানের শাসনব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করা এবং একটি বৃহত্তর গণবিদ্রোহ উসকে দেওয়া।

ইরানের সামরিক অভিজাত বাহিনী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) ইতিমধ্যে সতর্ক করে বলেছে, তারা ‘যে কোনো সন্ত্রাসী বা বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতাকে জন্মের আগেই শ্বাসরোধ করে দেবে।’ তবুও ইরানি কুর্দি বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো হামলা চালাতে পারে এবং এর মাধ্যমে ইরানের সরকারি বাহিনীকে পশ্চিমাঞ্চলে টেনে আনতে পারে। এতে করে নিরাপত্তা বাহিনীর মনোযোগ ও সম্পদ বিভক্ত হবে এবং তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলার সামনে আরও উন্মুক্ত হয়ে পড়তে পারে।

উত্তর ইরাকের পাহাড়ি অঞ্চলে অবস্থান করা কুর্দি বাহিনী পশ্চিম ইরানের কুর্দি অধ্যুষিত অঞ্চল ঘিরে প্রায় এক হাজার মাইল দীর্ঘ সীমান্তের কাছে অবস্থান করছে। ফলে সেখান থেকে স্থল অভিযান চালানোর জন্য তারা কৌশলগতভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।

ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল, ইরানে শাসন পরিবর্তনের জন্য তাঁর কোনো সুস্পষ্ট পরিকল্পনা নেই। নেতৃত্বকে হত্যা করা বা সাধারণ মানুষকে বিদ্রোহে উসকে দেওয়া ছাড়া অন্য কিছু তিনি ভাবছেন না—এমন সমালোচনাও হয়েছে। এই মন্তব্যগুলো প্রথমবারের মতো ইঙ্গিত দিল, যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে যুদ্ধের শেষ দেখতে চাইছে। তবে এমন কোনো অভিযানের বাস্তব সম্ভাবনা এখনো অনিশ্চয়তায় ঘেরা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মার্কিন ও ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে কয়েকটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বৃহস্পতিবারই একটি স্থল অভিযান শুরু হয়েছে। কিন্তু ইরান এবং ইরাকের কুর্দি কর্মকর্তারা সেই দাবি অস্বীকার করেছেন। এ ধরনের খবর হয়তো মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের অংশ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যখন ইরানে বোমা হামলা চালাচ্ছে, তখন তেহরানকে আরও অস্থির করার উদ্দেশ্যে এমন গুজব ছড়ানো হতে পারে। তবে বড় ধরনের সামরিক পরিকল্পনা আগেভাগে ফাঁস হওয়া সাধারণত অস্বাভাবিক ঘটনা।

খবরে বলা হয়েছে, ট্রাম্প কুর্দি সম্প্রদায়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোর চেষ্টা করছেন। তিনি নাকি ‘বিস্তৃত মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা সহায়তা’ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন। ইরানের ওপর হামলা শুরু করার পরপরই তিনি প্রভাবশালী ইরানি-কুর্দি ও ইরাকি-কুর্দি নেতাদের সঙ্গেও কথা বলেছেন।

এদিকে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ কুর্দি বাহিনীকে অস্ত্র দেওয়ার পরিকল্পনা করছে বলেও খবর এসেছে। লক্ষ্য হলো ইরানের শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে গণ-অভ্যুত্থান উসকে দেওয়া। বিষয়টি সিএনএনকে একাধিক সূত্র জানিয়েছে। সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, এই ধারণাটি প্রথমে ইসরায়েলের পক্ষ থেকেই আসে। এই পরিকল্পনা ইতিমধ্যে অঞ্চলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।

ইরাকের ফার্স্ট লেডি শানাজ ইব্রাহিম আহমেদ বলেন, ‘অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে, কুর্দিদের কথা মনে করা হয় কেবল তখনই, যখন তাদের শক্তি বা আত্মত্যাগ দরকার হয়।’ তিনি এক বিবৃতিতে বলেন, ‘এই সংঘাতে জড়িত সব পক্ষের কাছে আমার আবেদন—কুর্দিদের ছেড়ে দিন। আমরা ভাড়াটে বন্দুকধারী নই।’

ওয়াশিংটন এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিশ্চিত করেনি। তবে ইসরায়েলি বিশ্লেষকদের মতে আদর্শ পরিস্থিতি হবে একটি ‘ডমিনো ইফেক্ট’ তৈরি করা। জেরুসালেম ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক সিকিউরিটির হায় আয়তান কোহেন ইয়ানারোকাক বলেন, আশা করা হচ্ছে—ইরানের অন্যান্য জাতিগত গোষ্ঠীও তখন রাস্তায় নেমে আসবে। তিনি বলেন, ইরানের শাসনব্যবস্থার হাতে নিপীড়িত এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী আকাঙ্ক্ষা থাকা অন্যান্য জনগোষ্ঠী—যেমন বেলুচ ও আজারিরাও নিজেদের সরকার দাবি করে আন্দোলনে নামতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দৃষ্টিকোণ থেকে কুর্দি যোদ্ধাদের ব্যবহার করলে একটি বড় সমস্যা সমাধান হয়। কোহেন ইয়ানারোকাক বলেন, ‘মাঠে সেনা ছাড়া আপনার চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব নয়। কিন্তু ইসরায়েলিরা ইরানের মাটিতে নিজেদের সৈন্য উৎসর্গ করবে না, আর আমেরিকানরাও স্পষ্টত তা করবে না।’

তবে এই কল্পিত ঘটনাপ্রবাহ বাস্তবে নাও ঘটতে পারে। কুর্দি বাহিনী প্রশিক্ষিত, সজ্জিত এবং যুদ্ধের অভিজ্ঞতায় কঠিন হয়ে ওঠা যোদ্ধাদের নিয়ে গঠিত। তারা আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রক্সি স্থলবাহিনী হিসেবেও কাজ করেছে। বিশেষ করে সিরিয়ায় ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক জোটের অভিযানে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

ইসরায়েলও বহু বছর ধরে কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। মধ্যপ্রাচ্যে অ-আরব শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের কৌশলের অংশ হিসেবেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ইরানি-কুর্দি সম্ভাব্য যোদ্ধার সংখ্যা কয়েকশ থেকে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৫০০ জনের মতো। লন্ডনভিত্তিক থিংক ট্যাংক রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিস ইনস্টিটিউটের (রুসি) জ্যেষ্ঠ গবেষক এবং কুর্দি বিষয়ক বিশেষজ্ঞ বারকু ওজেলিক বলেন, ‘ইরানের শাসনব্যবস্থা ও তাদের নিরাপত্তা কাঠামোর জনবল এই সংখ্যার তুলনায় অনেক বেশি। তারা সংখ্যায় কম, অস্ত্রে পিছিয়ে। বাস্তবিক অর্থে এটি কার্যকর পরিকল্পনা নয়।’

তাদের শক্তি হবে মূলত অসম যুদ্ধকৌশলে। আকস্মিক হামলা চালিয়ে শাসনব্যবস্থাকে হয়রান করা, নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার সক্ষমতা নষ্ট করা, কিংবা অন্তত ক্ষমতা হারানোর আশঙ্কা তৈরি করা। তবে ইরানের কুর্দিরা একা কোনোভাবেই শাসন পরিবর্তন করতে পারবে না। এটি সম্ভব হতে হলে দীর্ঘমেয়াদি মার্কিন-ইসরায়েলি বোমা হামলা চালাতে হবে। এতে ইরানি বাহিনীর বড় অংশ নিহত হতে হবে, অথবা অন্তত এতটাই ক্ষয়ক্ষতি হতে হবে যাতে অনেক সৈন্য আত্মসমর্পণ করে বা বিদ্রোহ করে।

যুদ্ধের এই পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে সেনা পলায়নের সম্ভাবনা কতটা, তা বলা কঠিন। তবে ইসরায়েল যদি ইরানের নিরাপত্তা অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালাতে থাকে, তাহলে কিছু সদস্য তাদের অবস্থান ছেড়ে যেতে পারে।

ইরানি-কুর্দি সশস্ত্র বিরোধী শক্তি নিজস্ব কুর্দি সমাজের মধ্যেও পূর্ণ সমর্থন নাও পেতে পারে। আর ইরানের প্রায় ৯ কোটি মানুষের বৈচিত্র্যময় জনসংখ্যার মধ্যেও এটি গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে। ওজেলিক বলেন, ‘কেউ শাসনব্যবস্থার বিরোধী হলেই যে সে যে কোনো গোষ্ঠীকে মেনে নেবে, যারা সেই শাসনের বিরুদ্ধে লড়ছে—এটা ঠিক নয়।’ অনেক ইরানি বর্তমান শাসনব্যবস্থার বিরোধী হলেও, বাইরের শক্তির মাধ্যমে দেশের বিভক্তি চাপিয়ে দেওয়া হলে তারা তা মেনে নাও নিতে পারে।

ওজেলিক বলেন, ‘এই পরিকল্পনা উল্টো ফল দিতে পারে। যদি ইরানিরা মনে করে যে ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিম ইরানে একটি কুর্দি সশস্ত্র অঞ্চল তৈরি করতে চাইছে এবং এতে দেশ ভেঙে যেতে পারে—তাহলে তা বরং ইরানিদের ঐক্যবদ্ধ করে ফেলতে পারে।’

ইরানের কিছু কুর্দি গোষ্ঠীর লক্ষ্য স্পষ্টভাবে স্বায়ত্তশাসন। জানুয়ারির শেষ দিকে কয়েকটি রাজনৈতিক সংগঠন মিলে একটি জোট গঠন করে। তারা ‘আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার’ দাবি করেছে এবং জানিয়েছে, শাসনব্যবস্থা পতন হলে কুর্দি অঞ্চল কীভাবে পরিচালিত হবে সে পরিকল্পনাও তাদের রয়েছে। কুর্দিরা বিশ্বের বৃহত্তম রাষ্ট্রহীন জাতিগোষ্ঠীগুলোর একটি। তারা মূলত ইরাক, সিরিয়া, তুরস্ক ও ইরানে ছড়িয়ে রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে তারা বর্তমান শাসনব্যবস্থা এবং আগের রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধেও বিদ্রোহ করেছে।

তবুও কুর্দি সমাজের বড় অংশের মধ্যে সন্দেহ রয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জোটবদ্ধ হলে শেষ পর্যন্ত তা বিশ্বাসঘাতকতার মধ্যেই শেষ হবে। তাদের দৃষ্টিতে, বড় বিদেশি শক্তিগুলোর সঙ্গে কুর্দিদের অংশীদারত্ব প্রায় সব সময়ই অসম ছিল। ইরাকের প্রথম কুর্দি প্রেসিডেন্ট জালাল তালাবানির সাবেক উপদেষ্টা হিবা ওসমান মিডল ইস্ট ফোরামের এক বিশ্লেষণে লিখেছেন, ‘প্রতিবার ভূরাজনৈতিক অগ্রাধিকার বদলেছে, কুর্দিরাই সবচেয়ে বেশি মূল্য দিয়েছে। আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর প্রতিশোধের মুখে তাদেরই দাঁড়াতে হয়েছে।’

জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত এবং কুর্দি নেতৃত্বাধীন সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস সিরিয়ার নতুন সরকারের অবরোধের মুখে পড়ে। ঐক্য আলোচনা ভেঙে যায়। তারা ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। অনেকের আশঙ্কা, কুর্দিদের আবারও একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে। ওজেলিক বলেন, ‘এবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি কতটা গভীর? কুর্দিদের কি শুধু ইরানের বিরুদ্ধে পদাতিক সৈন্য হিসেবে ব্যবহার করা হবে, আর মিশন শেষ হলেই তাদের ফেলে দেওয়া হবে?’

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যদি ইরানি কুর্দি সশস্ত্র বাহিনীকে সমর্থন দেয়, তাহলে প্রতিবেশী দেশগুলো তীব্র বিরোধিতা করবে। ধারণা করা হচ্ছে, কয়েকটি দেশ ইতিমধ্যেই ওয়াশিংটনের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। ইরানের প্রতিবেশী তুরস্ক বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বিপুলসংখ্যক শরণার্থী তুরস্কে ঢুকতে পারে। এতে ইউরোপেও অভিবাসন সংকট বাড়তে পারে।

কোহেন ইয়ানারোকাক বলেন, ‘তুরস্কের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি একেবারেই বিপর্যয়কর পরিস্থিতি।’ আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো তুরস্কের নিজস্ব কুর্দি জনগোষ্ঠীর ওপর সম্ভাব্য প্রভাব। যদি ইরানের কুর্দিরা বেশি ক্ষমতা বা প্রভাব পায়, তাহলে তারা স্বাধীনতার দাবিও তুলতে পারে। ইতিমধ্যে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সেই ইরাকি-কুর্দি রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছেন, যাদের সঙ্গে ট্রাম্পও যোগাযোগ করেছিলেন।

দ্য টেলিগ্রাফ থেকে অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত