Ajker Patrika

কুর্দিরা কি পারবে ইরানের শাসনব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
কুর্দিরা কি পারবে ইরানের শাসনব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে
ফ্রি লাইফ পার্টি অব কুর্দিস্তানের কয়েকজন যোদ্ধা। ছবি: সংগৃহীত

ইরানে সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনা এবং যৌথ মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার পর দেশটির কুর্দি জনগোষ্ঠীকে ঘিরে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। পশ্চিমা বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, ইরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে বসবাসকারী কুর্দিরা হয়তো শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের সম্ভাব্য শক্তি হয়ে উঠতে পারে। তবে বাস্তবতা হলো, এই গোষ্ঠীর পক্ষে দ্রুত ও সফল সশস্ত্র আন্দোলন গড়ে তোলা এখনো অত্যন্ত অনিশ্চিত।

খবরে বলা হচ্ছে, মার্কিন প্রশাসন ইরানের কুর্দি নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছে। এমনকি গত সপ্তাহান্তে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরাকি কুর্দি নেতাদের সঙ্গে ফোনালাপ করেছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে ধারণা করা হচ্ছে, ইরানের কুর্দি গোষ্ঠীগুলোকে প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র সহায়তা দিয়ে বিদ্রোহে উসকে দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে—যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু নিশ্চিত করা হয়নি।

ইরানের কুর্দিদের অবস্থান

ইরানে কুর্দিদের সংখ্যা আনুমানিক এক থেকে দেড় কোটি। তারা মূলত দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের চারটি প্রদেশে বসবাস করে, যা ইরাক ও তুরস্কের কুর্দি অধ্যুষিত অঞ্চলের সন্নিকটে। তবে ইরাক বা সিরিয়ার কুর্দিদের তুলনায় ইরানের কুর্দিরা আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক যোগাযোগ ও সামরিক অভিজ্ঞতায় অনেক পিছিয়ে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অবশ্য তাদের রাজনৈতিক সক্রিয়তা কিছুটা বেড়েছে। ২০২২ সালে কুর্দি তরুণী মাশা আমিনি পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুবরণ করলে দেশজুড়ে বিক্ষোভ শুরু হয়। ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ স্লোগানে সেই আন্দোলন দ্রুত জাতীয় পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং কুর্দি অঞ্চলগুলোতে এর তীব্র প্রভাব ছিল।

ইরানের কর্তৃপক্ষ ঐতিহাসিকভাবেই কুর্দি আন্দোলন নিয়ে সতর্ক। তাই কুর্দি অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি সব সময়ই বেশি। ২০২৫ সালের শেষদিকে এবং চলতি বছরের শুরুতে যে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে, তাতেও কুর্দি অঞ্চলগুলোতে কঠোর দমনপীড়নের অভিযোগ ওঠে।

ঐক্যবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা

সম্প্রতি উত্তর ইরাকে রাজনৈতিক সদর দপ্তর থাকা পাঁচটি কুর্দি সংগঠন একটি ঐক্যফ্রন্ট গঠনের ঘোষণা দিয়েছে। তাদের লক্ষ্য ইরানের ইসলামি শাসনব্যবস্থার অবসান এবং কুর্দিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা।

এই জোটে দুটি সংগঠন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এর একটি হলো—কুর্দিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টি, অন্যটি ফ্রি লাইফ পার্টি অব কুর্দিস্তান।

এই দুটি সংগঠনের নিজস্ব সশস্ত্র শাখাও রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগ অনেকটা ১৯৯০-এর দশকে সাদ্দাম হুসেইন সরকারের বিরুদ্ধে ইরাকি কুর্দিদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রচেষ্টার মতো।

তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাধাও সামনে এসেছে। উত্তর ইরাকের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল ‘কুর্দিস্তান আঞ্চলিক সরকার’ (কেআরজি) ইতিমধ্যেই সতর্ক করেছে, তাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করে কোনো সামরিক অভিযান চালানো যাবে না। কারণ অতীতে ইরান এই অঞ্চলে কুর্দি বিদ্রোহীদের উপস্থিতির অভিযোগে গোলাবর্ষণ করেছে।

মার্কিন যোগাযোগ ও প্রশিক্ষণের খবর

ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ হামলার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরাকের দুই প্রধান কুর্দি নেতা—মাসউদ বারজানি এবং বাফেল তালাবানির সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। এই নেতাদের আঞ্চলিক কুর্দি রাজনীতিতে ব্যাপক প্রভাব রয়েছে।

কিছু প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষজ্ঞরা ইতিমধ্যে ইরানি কুর্দিদের যুদ্ধ প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করেছেন এবং অস্ত্র সরবরাহের কথাও ভাবা হচ্ছে। বর্তমানে মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলায় ইরানের নিরাপত্তা অবকাঠামো—পুলিশ স্টেশন, বিপ্লবী গার্ডের ঘাঁটি এবং স্থানীয় মিলিশিয়া কেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, বাস্তবে একটি কার্যকর বিদ্রোহ গড়ে তুলতে দীর্ঘ সময় লাগে। নতুন যোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ, সংগঠন গঠন এবং সামরিক সক্ষমতা তৈরি করতে মাস নয়, বরং বছরও লাগতে পারে।

ভবিষ্যৎ কী হতে পারে?

ইরানের কুর্দিদের ভবিষ্যৎ মূলত নির্ভর করছে চলমান সংঘাতের ফলাফলের ওপর। যদি বর্তমান শাসনব্যবস্থা টিকে যায়, তবে বিদেশি যোগাযোগ রয়েছে এমন কুর্দি সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর দমন অভিযান চালানো হতে পারে।

ইতিহাসেও এমন ঘটনা ঘটেছে। ১৯৪৬ সালে সোভিয়েত সমর্থনে প্রতিষ্ঠিত মাহাবাদ প্রজাতন্ত্র মাত্র দশ মাস স্থায়ী হয়েছিল। পরে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে সোভিয়েত সেনা সরে গেলে সেই কুর্দি রাষ্ট্র দ্রুত ভেঙে পড়ে।

অন্যদিকে যদি ইরানে বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটে, তবে কুর্দি ও অন্যান্য সংখ্যালঘু গোষ্ঠী নতুন রাজনৈতিক কাঠামোয় অধিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি তুলতে পারে।

সংখ্যালঘুদের জটিল সমীকরণ

ইরানের মোট জনসংখ্যা প্রায় ৯ কোটি। এর মধ্যে পার্সিয়ান জনগোষ্ঠী ৫০-৬০ শতাংশ। বাকি অংশে রয়েছে আজারি, কুর্দি, লুর, আরব ও বালুচ জাতিগোষ্ঠী। ফলে ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস হলে বহু গোষ্ঠীর দাবি একসঙ্গে সামনে আসবে, যা রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত জটিল পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।

এ ছাড়া আঞ্চলিক রাজনীতিও বড় ভূমিকা রাখবে। তুরস্ক দীর্ঘদিন ধরে কুর্দি প্রশ্নে অত্যন্ত সংবেদনশীল। দেশটির প্রেসিডেন্ট রিস্যেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ইতিমধ্যেই সিরিয়ায় কুর্দি শক্তির উত্থান ঠেকাতে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন।

বিশ্লেষকদের মতে—ইরানে যদি দুর্বল কিন্তু টিকে থাকা একটি শাসনব্যবস্থা গড়ে ওঠে, তবে তারা সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে আপসের পথও খুঁজতে পারে। তখন কুর্দি, বালুচ বা খুজেস্তানের আরবদের মতো গোষ্ঠীগুলো সীমিত স্বায়ত্তশাসন পেতে পারে।

সব মিলিয়ে, ইরানের কুর্দিরা রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও নিকট ভবিষ্যতে তারা এককভাবে দেশটির ইসলামি শাসনব্যবস্থাকে বড় সামরিক চ্যালেঞ্জে ফেলতে পারবে—এমন সম্ভাবনা এখনো অনিশ্চিত বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

মালয়েশিয়া থেকে বাংলাদেশি জোবাইদুল আমিনকে যুক্তরাষ্ট্রে ধরে নিয়ে গেছে এফবিআই

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে চীনা স্যাটেলাইট ইরানের নীরব ঢাল

ভারতকে চীনের মতো শক্তিশালী শত্রু হতে দেবে না যুক্তরাষ্ট্র

ইরান যুদ্ধে পালানটিরের ‘মেভেন’ যেন ১২ ঘণ্টায় ৯০০ আজরাইল

জর্ডানে গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন রাডার ধ্বংস করেছে ইরান: সিএনএনের অনুসন্ধান

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত