
মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখতে নৌ-এসকর্ট দেওয়ার পরিকল্পনা বিবেচনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের উদ্যোগ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং সামান্য ভুল সিদ্ধান্তও বড় ধরনের বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে। এমনকি সফল হলেও যুদ্ধের আগের সময়ের তুলনায় এই পথে জাহাজ চলাচল মাত্র ১০ শতাংশ পর্যন্ত ফিরিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর পর থেকে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ইরান ঘোষণা দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল কিংবা তাদের সহযোগী দেশগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যেকোনো জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে।
বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল সরবরাহ এবং বিপুল পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস ও সার এই সরু প্রণালি দিয়েই আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছায়। ফলে এই পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও সংশ্লিষ্ট পণ্যের দাম দ্রুত বেড়ে গেছে।
এই পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজকে নিরাপত্তা দিতে মার্কিন নৌবাহিনীর এসকর্ট পরিকল্পনার কথা বলেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে তিনি জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ন্যাটোর সদস্যদেশগুলো—এমনকি প্রতিদ্বন্দ্বী চীনকেও—এই মিশনে অংশ নিতে আহ্বান জানিয়েছেন। তবে এখন পর্যন্ত কোনো দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে এতে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দেয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, এই অনাগ্রহের পেছনে বড় কারণ হলো অপারেশনের ঝুঁকি ও জটিলতা।
সংকীর্ণ জলপথের বড় চ্যালেঞ্জ
হরমুজ প্রণালির সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশের প্রস্থ মাত্র ১০ মাইল। কিন্তু এর মধ্যেও বড় তেলবাহী ট্যাংকারগুলো চলাচলের জন্য নিরাপদ পথ আরও সীমিত। অনেক ট্যাংকারের দৈর্ঘ্য তিনটি ফুটবল মাঠের সমান।
অস্ট্রেলিয়ার সাবেক নৌ কর্মকর্তা ও গবেষক জেনিফার পার্কার বলেন, যুদ্ধজাহাজগুলোকে ট্যাংকারের চারপাশে অবস্থান নিয়ে সম্ভাব্য ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র বা নৌ-হুমকির দিকে লক্ষ্য স্থির করতে হয়। কিন্তু সংকীর্ণ জায়গার কারণে তা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। এমনকি বিশাল ট্যাংকারগুলো যুদ্ধজাহাজের জন্য ‘ব্লাইন্ড স্পট’ তৈরি করতে পারে।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো প্রতিক্রিয়ার সময়। প্রণালির খুব কাছেই ইরানের উপকূল থাকায় সম্ভাব্য হামলা শনাক্ত হওয়ার পর প্রতিক্রিয়া জানানোর সময় হয়তো খুব কম পাওয়া যাবে।
বহুমাত্রিক সামরিক সমন্বয়ের প্রয়োজন
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু ডেস্ট্রয়ার বা যুদ্ধজাহাজ দিয়ে এই এসকর্ট মিশন চালানো সম্ভব নয়। আকাশে হেলিকপ্টার বা যুদ্ধবিমান প্রস্তুত রাখতে হবে, যাতে ড্রোন বা ছোট নৌযান থেকে আসা হুমকি দ্রুত মোকাবিলা করা যায়।
এ ছাড়া দূরবর্তী অঞ্চল পর্যবেক্ষণের জন্য সতর্কীকরণ বিমান ও নজরদারি ড্রোন প্রয়োজন হবে, যা ইরানের ভেতরে সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ শনাক্ত করতে পারে।
সাবেক মার্কিন নৌ কর্মকর্তা কার্ল শুস্টার বলেন, ইরানের হুমকি অনেকটাই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে। ছোট মাছ ধরার নৌকা বা সাধারণ বাণিজ্যিক নৌযান থেকেও তারা মাইন বা ড্রোন হামলা চালাতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে সিঙ্গাপুরের নিরাপত্তা বিশ্লেষক কলিন কোহ প্রশ্ন তুলেছেন, এই অসংখ্য সম্ভাব্য হুমকি কি সত্যিই সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করা সম্ভব? তাঁর মতে, বাস্তবে তা খুব কঠিন।
যুদ্ধজাহাজের সংখ্যাও বড় সমস্যা
এই মিশনের আরেকটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো যুদ্ধজাহাজের সংখ্যা। একটি মার্কিন ডেস্ট্রয়ার হয়তো এক বা দুটি ট্যাংকারকে এসকর্ট দিতে পারে। তবে অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, একটি ট্যাংকারের জন্য একাধিক যুদ্ধজাহাজ প্রয়োজন হতে পারে।
সামুদ্রিক বিশ্লেষকদের হিসাব অনুযায়ী, ৫ থেকে ১০টি বাণিজ্যিক জাহাজের একটি বহরকে নিরাপদে পার করাতে ৮ থেকে ১০টি ডেস্ট্রয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
মার্কিন নৌবাহিনীর মোট ৭৩টি আর্লে বার্ক-ক্লাস ডেস্ট্রয়ার সক্রিয় রয়েছে। তবে প্রশিক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের কারণে সব সময় এর প্রায় ৬৮ শতাংশ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকে। অর্থাৎ অপারেশনের জন্য কার্যত ৫০টির মতো জাহাজ হাতে আছে তাদের।
কিন্তু এগুলোও বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে রয়েছে। ফলে শুধু একটি এসকর্ট মিশনের জন্য যদি ১০টি ডেস্ট্রয়ার লাগে, তবে দীর্ঘ সময় ধরে এই মিশন চালিয়ে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্যই বড় চাপ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
মাইন হুমকি আরও জটিল
হরমুজ প্রণালিতে মাইন অপসারণও বড় চ্যালেঞ্জ। ইরান বিভিন্ন ধরনের সামুদ্রিক মাইন ব্যবহার করতে পারে; যেমন স্পাইকযুক্ত সংস্পর্শ মাইন, শব্দ বা চৌম্বক সংকেতে বিস্ফোরিত হওয়া মাইন, এমনকি নির্দিষ্টসংখ্যক জাহাজ পার হওয়ার পর বিস্ফোরিত হয় এমন মাইন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আদর্শ পরিস্থিতিতে ট্যাংকার চলাচলের আগে মাইনসুইপার জাহাজ দিয়ে পথ পরিষ্কার করা উচিত। কিন্তু সমস্যা হলো, গত বছর মার্কিন নৌবাহিনী পারস্য উপসাগরে মোতায়েন থাকা তাদের চারটি বিশেষায়িত মাইনসুইপারকে অবসর দিয়েছে। বর্তমানে এই দায়িত্ব পালন করতে পারে এমন জাহাজের সংখ্যা সীমিত।
জাপান বা দক্ষিণ কোরিয়া চাইলে মাইনসুইপার পাঠাতে পারে, তবে সেগুলো তুলনামূলকভাবে হালকা অস্ত্রের হওয়ায় হামলার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
আগের অভিজ্ঞতা বনাম নতুন বাস্তবতা
কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র আগে ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে একই ধরনের হুমকির মুখে সফলভাবে নৌ-অপারেশন পরিচালনা করেছে। সেই সময়ও ইরান দ্রুতগতির নৌকা ও আত্মঘাতী নৌযান ব্যবহার করত।
তবে অন্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনকার পরিস্থিতি ভিন্ন। লন্ডনের কিংস কলেজের গবেষক অ্যালেসিও পাতালানো বলেন, চার দশক আগের তুলনায় এখন পশ্চিমা দেশগুলোর নৌবহর ও সহায়ক কাঠামো অনেক ছোট হয়ে গেছে।
অন্যদিকে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হুতিদের হামলার ঘটনাও দেখিয়েছে যে এসকর্ট থাকলেও বাণিজ্যিক জাহাজ পুরোপুরি নিরাপদ থাকে না।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিতে যদি বৃহৎ সামরিক এসকর্ট মিশন শুরু হয়, তবে তা শুধু সামুদ্রিক নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়; বরং বৈশ্বিক অর্থনীতি, জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক সামরিক ভারসাম্যের জন্যও একটি বড় পরীক্ষায় পরিণত হতে পারে।

পারস্য উপসাগরে চলমান সংঘাতের তৃতীয় সপ্তাহে এসে যুদ্ধের লক্ষ্য ও গতিপ্রকৃতিতে এক আমূল পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। আমেরিকার মূল লক্ষ্য এখন ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা পারমাণবিক চুক্তির গণ্ডি ছাড়িয়ে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট ‘হরমুজ প্রণালি’র নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দিকে মোড় নিয়েছে।
১ ঘণ্টা আগে
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের মাত্র এক বছর পরই ইরানকে আক্রমণ করে বসে প্রতিবেশী দেশ ইরাক। আট বছরের সেই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ইরান কার্যত বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। সেই ট্রমা বা ক্ষত থেকে জন্ম নেয় ‘ফরোয়ার্ড ডিফেন্স’ কৌশল। এর মূল নীতি ছিল শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে নিজের সীমান্তের বাইরে, যাতে ইরানের...
৩ ঘণ্টা আগে
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার প্রভাবে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল ও গ্যাস সরবরাহ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। এই সংকটের ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে এক বিশাল ওলটপালট শুরু হয়েছে, যেখানে রাশিয়া অভাবনীয় মুনাফা অর্জন করলেও এশিয়ার দেশগুলো
১১ ঘণ্টা আগে
এক সপ্তাহ আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ব্রিটেনকে বলেছিলেন, মধ্যপ্রাচ্যে জাহাজ পাঠানোর দরকার নেই। কারণ, তিনি ইতোমধ্যেই ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ‘বিজয়ী’ হয়ে গেছেন। কিন্তু এখন তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ‘বিশেষ’ মিত্র ব্রিটেন, ন্যাটো সদস্য, এমনকি চীনকেও আহ্বান জানাচ্ছেন হরমুজ প্রণালী খুলে দিতে..
১৪ ঘণ্টা আগে