Ajker Patrika

বুমেরাং হয়েছে ইরানের ‘ফরোয়ার্ড ডিফেন্স’

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
বুমেরাং হয়েছে ইরানের ‘ফরোয়ার্ড ডিফেন্স’
ইরানে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে অন্তত ৬ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ছবি: এএফপি

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের মাত্র এক বছর পরই ইরানকে আক্রমণ করে বসে প্রতিবেশী দেশ ইরাক। আট বছরের সেই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ইরান কার্যত বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। সেই ট্রমা বা ক্ষত থেকে জন্ম নেয় ‘ফরোয়ার্ড ডিফেন্স’ কৌশল। এর মূল নীতি ছিল শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে নিজের সীমান্তের বাইরে, যাতে ইরানের মাটিতে যুদ্ধ না পৌঁছায়। নিষেধাজ্ঞার কারণে শক্তিশালী প্রথাগত সেনাবাহিনী গঠন করা কঠিন ছিল বলে তেহরান জোর দেয় অপ্রতিসম বা ‘অ্যাসিম্যাট্রিক’ যুদ্ধের ওপর। তারা লেবানন, ইরাক, সিরিয়া, গাজা ও ইয়েমেনে সশস্ত্র গোষ্ঠী তৈরি করে একটি ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ গড়ে তোলে।

তবে এই কৌশল বুমেরাং হয়ে দাঁড়িয়েছে ইরানের জন্য। কয়েক দশক ধরে আমেরিকা-ইসরায়েলের সঙ্গে ছায়াযুদ্ধ বা প্রক্সি লড়াই শেষমেশ তেহরানের আকাশে ডেকে এনেছে ভয়াবহ যুদ্ধ। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সরাসরি হামলা করেছে মার্কিন-ইসরায়েলি বিমানবাহিনী। ফলে বর্তমানে ইরান এমন এক বিপদের মুখে দাঁড়িয়েছে, যা আগে কখনো দেখা যায়নি। ওয়াশিংটনের লক্ষ্য স্পষ্ট, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করা, ক্ষেপণাস্ত্র ও সামরিক সক্ষমতা কমিয়ে দেওয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে তেহরানের গড়ে তোলা সশস্ত্র নেটওয়ার্ক গুঁড়িয়ে দেওয়া।

এমনটি মনে করছেন থিংকট্যাংক চ্যাথাম হাউসেরৎ মিডল ইস্ট অ্যান্ড নর্থ আফ্রিকা প্রোগ্রামের পরিচালক ড. সানাম ওয়াকিল।

ওয়াকিলের মতে, লেবাননের হিজবুল্লাহ ছিল ইরানের ‘ফরোয়ার্ড ডিফেন্স’ মডেলের প্রথম ও সফল উদাহরণ। পরে ২০০৩ সালে ইরাকে সাদ্দাম হোসেনের পতন হলে তেহরানের জন্য বাগদাদে প্রভাব বিস্তারের পথ খুলে যায়। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ এবং ইয়েমেনের হুতি আন্দোলন এই নেটওয়ার্ককে আরও বিস্তৃত করে। গত দশকের মাঝামাঝি সময়ে ইরানি কর্মকর্তারা গর্ব করে বলতেন, তাঁরা বাগদাদ, দামেস্ক, বৈরুত ও সানা—এই চার আরব রাজধানী নিয়ন্ত্রণ করছেন।

তেহরানের কাছে যা ছিল প্রতিরক্ষা, আরব দেশগুলোর কাছে তা ছিল আগ্রাসন। এই নেটওয়ার্ক ইসরায়েলকে ঘিরে ফেলার সুযোগ দিলেও এর মাশুল ছিল ভয়াবহ। ২০২০ সালে কাসেম সোলেইমানির হত্যাকাণ্ড এই নেটওয়ার্কের সমন্বয়ে বড় আঘাত হানে। কিন্তু চূড়ান্ত মোড় ঘুরিয়ে দেয় ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের ইসরায়েল আক্রমণ। ইসরায়েল বুঝতে পারে, শুধু দমানোর নীতি আর কাজ করবে না; তারা এখন ইরানের পুরো আঞ্চলিক নেটওয়ার্ককে নির্মূল করার পথে হাঁটে।

যে কৌশল যুদ্ধকে ইরানের সীমান্ত থেকে দূরে রাখার জন্য তৈরি করা হয়েছিল, সেটিই এখন ইরানকে সরাসরি যুদ্ধের মুখে টেনে এনেছে। সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদের পতন এবং হিজবুল্লাহ ও হুতিদের ওপর ক্রমাগত সামরিক চাপ ইরানের এই ‘অক্ষ’কে রক্ষণাত্মক অবস্থানে ঠেলে দিয়েছে। যে নেটওয়ার্ক ছিল ইরানের শক্তির উৎস, এখন সেটিই তাদের দুর্বলতার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই যুদ্ধ যেভাবেই শেষ হোক—সমঝোতা বা শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন—ইরান নিশ্চিতভাবে আগের চেয়ে অনেক বেশি দুর্বল হয়ে পড়বে। ইসরায়েলি ও মার্কিন হামলায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা, সামরিক অবকাঠামো এবং রেভল্যুশনারি গার্ডের সম্পদ ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দশকের পর দশক নিষেধাজ্ঞায় জর্জরিত ইরানের অর্থনীতি এখন পুনর্গঠন ও যুদ্ধের ভারে আরও বিপর্যস্ত হবে।

ইরানের এই দুর্বলতা হয়তো প্রতিবেশী আরব দেশগুলোর জন্য স্বস্তির কারণ হবে। তবে ইরান আঞ্চলিক রাজনীতি থেকে একেবারে হারিয়ে যাবে না। শাসনব্যবস্থা যদি কোনোভাবে টিকে থাকে, তবে তেহরানকে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সম্পূর্ণ নতুন কোনো কৌশলের কথা ভাবতে হবে। কয়েক দশকের বিনিয়োগে গড়া ‘ফরোয়ার্ড ডিফেন্স’ আজ ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হওয়ার পথে, যা মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রকে এক নতুন ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এনসিপি নেতারা গণভোট নিয়ে অর্ধেক বুঝেছেন: আইনমন্ত্রী

ইসরায়েলে শব্দের ১২ গুণ গতির ‘ড্যান্সিং মিসাইল’ নিক্ষেপ ইরানের, বৈশিষ্ট্য কী

র‍্যাবের নতুন ডিজি আহসান হাবীব, এসবি প্রধান নুরুল আমিন, সিআইডি প্রধান মোসলেহ উদ্দিন

সাত বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন উপাচার্য, ইউজিসিতে নতুন চেয়ারম্যান

আটক ৩ ট্যাংকার ফেরত দিলে ভারতকে হরমুজে যাতায়াতের সুযোগে দেবে ইরান

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত