
ইরানে চলমান সংঘাতে দেশটির বিরোধী শক্তি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ইরানে হামলার ঘোষণা দিতে গিয়ে দেশটির জনগণের উদ্দেশে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ‘আপনাদের স্বাধীনতার সময় এসে গেছে। আমরা শেষ করলে আপনারাই আপনাদের সরকার দখল করবেন।’
তবে প্রশ্ন উঠেছে—এই আহ্বান আসলে কাদের উদ্দেশে? ইরানের ভেতরে এবং দেশের বাইরে থাকা বিরোধী শক্তিগুলো অত্যন্ত বিচ্ছিন্ন ও বিভক্ত। ফলে তারা আদৌ ক্ষমতাসীন শাসনব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারবে কি না, তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে।
২০০৯ সালের পর থেকেই দুর্বল বিরোধিতা
২০০৯ সালের ‘গ্রিন মুভমেন্ট’ আন্দোলনের পরই প্রায় ধ্বংস হয়ে যায় ইরানে সংগঠিত রাজনৈতিক বিরোধী শক্তি। সে সময় নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হলে সরকার কঠোর দমন অভিযান চালায়।
বর্তমানে ইরানের প্রতিবাদ আন্দোলনগুলো মূলত ঢিলেঢালা সামাজিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সংগঠিত হয়। ইন্টারনেট বন্ধ না থাকলে এসব আন্দোলন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
এ ছাড়া কুর্দি, আজারি এবং বালুচদের মতো সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে সরকারের বিরোধিতা করে আসছে। কিন্তু তাদের লক্ষ্য এক নয়—কেউ স্বায়ত্তশাসন চায়, কেউ চায় আরও বেশি রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব। তা ছাড়া দেশটির ভেতরের বেশির ভাগ বিরোধী গোষ্ঠীর কাছে কোনো অস্ত্র নেই।

নির্বাসনে থাকা রাজশক্তি ও অন্যান্য
ইরানের বাইরে অবস্থান করা বিরোধী শক্তিগুলোও অত্যন্ত বিভক্ত। বিশেষ করে রাজতন্ত্রপন্থী ও প্রজাতন্ত্রপন্থীদের মধ্যে তীব্র দ্বন্দ্ব রয়েছে। ইরানের সাবেক শাহের ছেলে রেজা পাহলভি নিজেকে বিরোধী আন্দোলনের প্রধান কণ্ঠ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। তিনি ১৯৭৯ সালের বিপ্লবে ক্ষমতাচ্যুত শাহ মোহাম্মাদ রেজা পাহলভির পুত্র।
২০২২ সালে মাশা আমিনি বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠেন রেজা পাহলভি। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত অবস্থায় তিনি অনলাইনে প্রচারণা চালিয়ে ইরানিদের রাস্তায় নামার আহ্বান জানিয়েছিলেন। ‘ইরান ন্যাশনাল কাউন্সিল’ নামে একটি রাজতন্ত্রপন্থী সংগঠনের নেতৃত্ব দেন তিনি। তবে তিনি দাবি করেন, ইরানে আবারও রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা তাঁর একমাত্র লক্ষ্য নয়।
ইরানের ভেতরে রেজা পাহলভির প্রকৃত জনপ্রিয়তা কতটুকু—তা এখনো স্পষ্ট নয়। অনেক বিরোধী গোষ্ঠী তাঁকে সন্দেহের চোখে দেখে, কারণ শাহ আমলের কঠোর শাসন ও গোপন পুলিশ বাহিনীর কথা দেশটির অনেকেরই স্মরণ আছে এখনো।

মরিয়াম রজভি ও এমইকে
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিরোধী সংগঠন হলো ‘পিপলস মোজাহেদিন অর্গানাইজেশন অব ইরান’। এই সংগঠনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন মরিয়ম রজভি।
এই সংগঠনটি অতীতে একটি শক্তিশালী বামপন্থী গোষ্ঠী ছিল এবং একসময় যুক্তরাষ্ট্র এটিকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছিল। ১৯৮০-এর দশকে তারা সাদ্দাম হুসেইনকে সমর্থন জানিয়ে ইরান-ইরাক যুদ্ধে ইরানের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। এই কারণে ইরানের অনেক নাগরিক তাদের বিশ্বাস করে না এবং মনে করে, তারা নিজের দেশের বিরুদ্ধেই লড়াই করেছিল।
এই সংগঠনটির রাজনৈতিক শাখা ‘ন্যাশনাল কাউন্সিল অব রেজিস্ট্যান্স অব ইরান’ বর্তমানে প্যারিসে অবস্থান করছে এবং নিজেকে ইরানের নির্বাসিত সরকার হিসেবে দাবি করে আসছে।

অন্যান্য নির্বাসিত গোষ্ঠী
২০২৩ সালে কয়েকটি প্রবাসী সংগঠন মিলে গঠন করেছিল ‘সলিডারিটি ফর অ্যা সেক্যুলার ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক ইন ইরান’। তারা ইরানে একটি ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে আসছে।
আরেকটি নতুন উদ্যোগ হলো ‘ইরান ফ্রিডম কংগ্রেস’। এই সংগঠনটি সম্প্রতি লন্ডনে বৈঠক করেছে এবং দাবি করছে, তারা দেশের ভেতর ও বাইরে থাকা বিভিন্ন গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করে।
দেশের ভেতরের বিরোধী শক্তি
ইরানের ভেতরে সবচেয়ে সক্রিয় বিরোধিতা দেখা যায় সংখ্যালঘু অঞ্চলগুলোতে। বিশেষ করে, সুন্নি অধ্যুষিত বালুচ ও কুর্দি অঞ্চলে সরকারবিরোধী কার্যক্রম বেশি।
বালুচ বিদ্রোহীরা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কয়েকটি বড় হামলা চালিয়েছে, যার লক্ষ্য ছিল দেশটির ‘ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী’ (আইআরজিসি)।
অন্যদিকে পাঁচটি কুর্দি সংগঠন সম্প্রতি একটি নতুন জোট ঘোষণা করেছে। তবে পাহলভি এই উদ্যোগের সমালোচনা করে বলেছেন—এতে ইরানের ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

নতুন প্রজাতন্ত্রপন্থী উদ্যোগ
সম্প্রতি ইরানের ভেতরের প্রায় ৭০ জন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মিলে একটি নতুন সংগঠন গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন। এর নাম ‘স্ট্র্যাটেজিক কাউন্সিল অব রিপাবলিকানস ইনসাইড ইরান’। তাঁদের পরিচয় প্রকাশ করা না হলেও, তাঁদের নাম পশ্চিমা সরকারগুলোর কাছে পাঠানো হয়েছে। সংগঠনটির নাম থেকেই বোঝা যায়, তাঁরা রাজতন্ত্রপন্থী আন্দোলন থেকে নিজেদের দূরে রাখতে চাইছেন।
প্রতিবাদ আন্দোলনের ধারাবাহিকতা
২০০৯ সালের গ্রিন মুভমেন্টের পর থেকে ইরানে বেশ কয়েকটি বড় বিক্ষোভ হয়েছে। ২০১৯ সালে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে ব্যাপক আন্দোলন হয় সেখানে। ওই আন্দোলনে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে প্রায় তিন হাজার মানুষ নিহত হয়।

২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে আবারও দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লে, সেই আন্দোলনেও শত শত মানুষ নিহত হয়। সর্বশেষ চলতি বছরের শুরুর দিকে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে দেশজুড়ে ব্যাপক মাত্রায় বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। অভিযোগ রয়েছে, গত জানুয়ারিতে এই বিক্ষোভ দমন করতে গিয়ে রাতারাতি ৩০ হাজারের বেশি মানুষ হত্যা করেছে খামেনির নেতৃত্ব দেওয়া বাহিনীগুলো।
অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
তবে বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের বিরোধী শক্তির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো তাদের বিভক্তি এবং নেতৃত্বের অভাব। এই বিরোধী শক্তিগুলো শাসনব্যবস্থাকে উৎখাত করতে পারবে কি না—তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা কর্মকর্তাদেরও। এমনকি দেশটিতে চলমান সামরিক হামলা বিরোধী শক্তিগুলোকে নতুন বিদ্রোহে উৎসাহিত করবে—এমন সম্ভাবনাও খুব কম বলে মনে করা হচ্ছে।
মোদ্দাকথা, ইরানের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন আসবে কি না, তা অনেকটাই নির্ভর করছে দেশের ভেতরের জনগণের আন্দোলন কতটা শক্তিশালী ও সংগঠিত হতে পারে তার ওপর।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের নিপীড়নমূলক ইসলামি শাসনব্যবস্থার অবসান ঘটানোই তাঁর দেশটিতে হামলা চালানোর লক্ষ্য। ইরানি জনগণকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেছেন, তাদের ইরানি শাসকগোষ্ঠীর কঠোর শাসন থেকে মুক্ত করা হবে।
৪ ঘণ্টা আগে
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যখন ইরানের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক সামরিক অভিযান ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ পরিচালনা করছে, তখন আমেরিকার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে আতঙ্ক দানা বেঁধেছে। কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের সন্ত্রাসবাদ ও হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ব্রুস হফম্যানের মতে...
৪ ঘণ্টা আগে
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কেন ইরান আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নিলেন—এই প্রশ্নের উত্তর আপনি সপ্তাহের কোন দিন তাঁকে জিজ্ঞাসা করছেন, তার ওপর ভিত্তি করে বদলে যাবে। গত শনিবার তিনি বলেছিলেন, ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা আর ব্যালিস্টিক মিসাইল যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকি।
৬ ঘণ্টা আগে
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যখন ইরানের ওপর উপর্যুপরি বোমাবর্ষণ করছে, বেইজিং তখন অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। তাত্ত্বিকভাবে, বেইজিং হলো তেহরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। অভিন্ন ইতিহাস ও পশ্চিমাশাসিত বৈশ্বিক ব্যবস্থার বিরোধিতার সূত্রে দেশ দুটি একে অপরের ঘনিষ্ঠ।
৭ ঘণ্টা আগে