Ajker Patrika

যে কারণে ইরানকে বাঁচাতে আসছে না চীন

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
যে কারণে ইরানকে বাঁচাতে আসছে না চীন
রাশিয়ার কাজানে ১৬তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেকশিয়ান এবং চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং। ছবি: আজকের পত্রিকা

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যখন ইরানের ওপর উপর্যুপরি বোমাবর্ষণ করছে, বেইজিং তখন অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। তাত্ত্বিকভাবে, বেইজিং হলো তেহরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। অভিন্ন ইতিহাস ও পশ্চিমাশাসিত বৈশ্বিক ব্যবস্থার বিরোধিতার সূত্রে দেশ দুটি একে অপরের ঘনিষ্ঠ। এ ছাড়া চীনের জ্বালানি নিরাপত্তাও ইরানের ওপর নির্ভরশীল। ২০২৫ সালে চীনের মোট তেল আমদানির ৫৫ শতাংশের বেশি এসেছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে (যার ১৩ শতাংশ সরাসরি ইরান থেকে)। এই তেলের সিংহভাগই আসে হরমুজ প্রণালি দিয়ে, যার নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে।

সাম্প্রতিক এই যুদ্ধ ইরানের তেল সরবরাহ ব্যাহত করবে এবং পুরো পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের উৎপাদন সংকটে ফেলবে—এই আশঙ্কায় অনেক বিশ্লেষক মনে করেছিলেন, বেইজিং হয়তো তেহরানকে বাঁচাতে এগিয়ে আসবে। কেউ কেউ তো সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ বা অন্তত রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মতো ড্রোন ও খুচরা যন্ত্রাংশ দিয়ে তেহরানকে সহায়তার সম্ভাবনাও দেখেছিলেন।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, চীন এই যুদ্ধে জড়ানোর কোনো লক্ষণই দেখাচ্ছে না। কেন চীন ইরানের জন্য আঙুল তুলবে না, তার কারণগুলো অত্যন্ত গভীর ও কৌশলগত। থিংকট্যাংক স্টিমসন সেন্টারের চায়না প্রোগ্রামের পরিচালক ইউন সান সেসব বিষয় চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছেন।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের ইসরায়েল আক্রমণের পর থেকে তেহরানের আঞ্চলিক শক্তি ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বেইজিংয়ের মোহভঙ্গ হতে শুরু করেছে। চীনের কৌশলবিদেরা মনে করেন, ইরান আসলে একটি ‘কাগুজে বাঘ’। ২০২১ সালে স্বাক্ষরিত ২৫ বছর মেয়াদি ৪০০ বিলিয়ন ডলারের কৌশলগত চুক্তিটির খুব সামান্যই বাস্তবায়িত হয়েছে, কারণ, তেহরান সব সময় ভয় পেয়েছে যে, চীনের প্রভাব তাদের সার্বভৌমত্বকে খর্ব করবে।

বেইজিংয়ের হিসাবে, ইরানের জনসংখ্যা ইসরায়েলের চেয়ে দশ গুণ ও সৌদি আরবের চেয়ে তিন গুণ বেশি হলেও এর জিডিপি ইসরায়েলের চেয়ে কম এবং সৌদি আরবের মাত্র ২৫ শতাংশ। চীন মনে করে, ইরান এত দিন প্রক্সি বা ছদ্মযুদ্ধ ব্যবহার করে নিজের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা ঢেকে রেখেছিল, যা বর্তমান সংঘাতে ফাঁস হয়ে গেছে।

চীনা পর্যবেক্ষকদের কাছে ইরানের রণকৌশল এখন হাসির খোরাকে পরিণত হয়েছে। ২০২০ সালে কাসেম সোলেইমানি বা ২০২৪ সালে সিরিয়ায় ইরানি দূতাবাসে হামলার পর তেহরান যে প্রতিশোধ নিয়েছিল, তা ছিল অত্যন্ত দুর্বল। বিশেষ করে, ২০২৫ সালের ১২ দিনের যুদ্ধের সময় ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগে কাতার বা যুক্তরাষ্ট্রকে আগাম সতর্কবার্তা দেওয়াকে চীনা নেটিজেনরা ‘পারফরমেটিভ রিটেলিয়েশন’ বা সাজানো প্রতিশোধ বলে বিদ্রূপ করেছে। বেইজিংয়ের চোখে, ইরান একদিকে পশ্চিমাদের সঙ্গে যুদ্ধের আস্ফালন দেখায়, আবার তলে তলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সমঝোতার জন্য ব্যাকুল হয়ে থাকে—এই দ্বিচারিতা চীনের আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দিয়েছে।

চীন আগেও দেখেছে, কীভাবে ইরান তার ‘প্রতিরোধের অক্ষ’-এর সদস্য বা মিত্রদের বিপদের মুখে একা ছেড়ে দেয়। ২০২৪ সালের শেষে যখন হামাস ও হিজবুল্লাহ প্রায় ধ্বংস হওয়ার পথে, তখন ইরানের ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ জারিফ তাদের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকার কথা অস্বীকার করেন। ২০২৫ সালের এপ্রিলে ইয়েমেনে মার্কিন বোমাবর্ষণের সময় ইরান তার সামরিক কর্মকর্তাদের সরিয়ে নেয় এবং হুতি মিত্রদের ভাগ্যকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেয়। যারা নিজের মিত্রদের রক্ষা করতে পারে না, তাদের ওপর চীন ভরসা রাখতে পারছে না।

চীনা সংবাদমাধ্যমগুলো প্রকাশ্যে সমালোচনা না করলেও বেইজিংয়ের নীতিনির্ধারক মহল তেহরানের অপশাসন ও ব্যাপক দুর্নীতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা রাখে। ইসরায়েল যেভাবে ইরানের নিরাপত্তাব্যবস্থার গভীরে অনুপ্রবেশ করেছে এবং একের পর এক পরমাণুবিজ্ঞানী ও সামরিক নেতাদের হত্যা করছে, তা প্রমাণ করে, স্বয়ং ইরানি কর্মকর্তাদের মধ্যেই তাঁদের ব্যবস্থার প্রতি আস্থা নেই। যে প্রশাসন তার নিজের কর্মকর্তাদের কাছেই বিশ্বস্ত নয়, চীন তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে ঝুঁকি নিতে রাজি নয়।

চীনের এই হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ ডোনাল্ড ট্রাম্প। ২০২৬ সালের মার্চের শেষে ট্রাম্প ও সি জিন পিংয়ের একটি বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। আট বছরের তিক্ত প্রতিযোগিতার পর দুই পরাশক্তির মধ্যে একটি বড় ধরনের সমঝোতার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বেইজিং কোনোভাবেই চায় না মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ তাদের ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনার পরিবেশ নষ্ট করুক।

চীনের কাছে ইরান একটি আদর্শিক বন্ধু নয়, বরং একটি বড় তেলের আড়তমাত্র। ২০২৫ সালে চীনের জ্বালানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে নবায়নযোগ্য শক্তি তেলের চেয়ে এগিয়ে গেলেও বিমান চালানো বা রাসায়নিকশিল্পে তেল এখনো অপরিহার্য। চীনের হাতে যে তেলের রিজার্ভ আছে, তা দিয়ে স্বল্পমেয়াদি সংকট কাটানো সম্ভব, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ বেইজিংয়ের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিতে পারে।

এখানেই বেইজিংয়ের আসল মাথাব্যথা। যদি যুদ্ধের কারণে ‘হরমুজ প্রণালি’ বন্ধ হয়ে যায়, তবে চীনের তেল আমদানির অর্ধেক পথ রুদ্ধ হয়ে যাবে। তাই চীন বর্তমানে তেহরানকে চাপ দিচ্ছে, যাতে তারা কোনোভাবেই এই প্রণালি বন্ধ না করে। যদি মধ্যপ্রাচ্যের তেল সরবরাহ সত্যিই বন্ধ হয়, চীন রাশিয়ার দিকে ঝুঁকে পড়বে (যারা বর্তমানে ১৭% তেল সরবরাহ করে), কিন্তু কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতাকেও চীন বিপজ্জনক মনে করে।

আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, বেইজিং এখন আর ইরানে শাসন পরিবর্তন বা ‘রেজিম চেঞ্জ’-কে যমদূত মনে করছে না। চীনের কাছে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বড় নয়, তেলের প্রবাহ অব্যাহত থাকাই বড় কথা। চীনের নীতিনির্ধারকেরা মনে করেন, যুদ্ধের পর যদি ইরানে কোনো নতুন নেতৃত্ব আসে, যারা উগ্র সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা বাদ দিয়ে অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে মন দেবে, তবে চীনের জন্য সেই ইরানই হবে আদর্শ অংশীদার।

যদি বাশার আল-আসাদ বা নিকোলা মাদুরোর মতো ইরানের বর্তমান শাসন দ্রুত ভেঙে পড়ে, তবে চীন খুব একটা আফসোস করবে না। বেইজিং ইতিমধ্যে ইসলামিক রিপাবলিকের বর্তমান নেতৃত্বের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। তাদের বর্তমান লক্ষ্য হলো যুদ্ধের পর যারা ক্ষমতায় আসবে, তাদের সঙ্গে কীভাবে তেলের প্রবাহ ঠিক রাখা যায়, তার পথ খোঁজা।

বেইজিং কেবল তখনই তার নিষ্ক্রিয়তা কাটাতে পারে, যদি যুদ্ধটি অত্যন্ত দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং এর ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার সম্পূর্ণ ধসে পড়ে। যদি ইরান সত্যিই প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে এবং মার্কিন-ইসরায়েলি জোটকে দীর্ঘ মেয়াদে আটকে দেয়, তবে বেইজিং হয়তো ড্রোন বা প্রযুক্তি দিয়ে পরোক্ষ সহায়তা দিতে পারে, যেমনটি তারা রাশিয়ার ক্ষেত্রে করেছে। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত ইরান তার সক্ষমতা প্রমাণ করতে পারছে না, ততক্ষণ চীন মাঠের বাইরে থেকে তামাশা দেখাই শ্রেয় মনে করছে।

সংক্ষেপে বলতে গেলে, চীন ইরানের বন্ধু নয়, বরং গ্রাহক। একজন গ্রাহক যেমন তাঁর দোকানদার বিপদে পড়লে অন্য দোকান খোঁজে, কিন্তু দোকানদারকে বাঁচাতে নিজের প্রাণ বা ব্যবসা বাজি রাখে না, চীনের ভূমিকাও ঠিক তেমন। বেইজিংয়ের জন্য ইরানের শাসনব্যবস্থার স্থায়িত্বের চেয়ে তেলের ট্যাংকারের নিরাপদ যাতায়াত অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত