Ajker Patrika

অভাগা রাইয়ান

সম্পাদকীয়
অভাগা রাইয়ান

সদরঘাটে লঞ্চ দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছিলেন সোহেল ফকির। ঈদের আনন্দ সবার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার জন্য বাবা, সন্তানসম্ভবা স্ত্রীসহ যাচ্ছিলেন বরিশালে। গত ১৭ মার্চের কথা সেটা। ঈদুল ফিতরের সেই আনন্দ আর অন্যদের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নিতে পারেননি সোহেল ও তাঁর বাবা মিরাজ ফকির। দুর্ঘটনা তাঁদের জীবনকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। সেই সোহেলের স্ত্রী পুত্রসন্তানের মা হয়েছেন। ছেলের নাম রাখা হয়েছে রাইয়ান। বাবা সোহেলই ছেলের জন্য এই নাম রেখে যান।

ঢাকার সদরঘাটে ট্রলার থেকে লঞ্চে উঠছিলেন সোহেলরা। কিন্তু সেখানেই তাঁরা দুর্ঘটনার শিকার হন। ঘটনাস্থলেই নিহত হন সোহেল। বাবা মিরাজ ফকির ভেসে যান বুড়িগঙ্গায়, পরদিন তাঁর লাশ পাওয়া যায়।

কত তুচ্ছ কারণে একটি পরিবারের সব আনন্দ নিমেষেই দুঃখে পরিণত হয়, এই ঘটনা তারই একটি উদাহরণ। মানুষের জীবনের মূল্য ঈদের সময় শূন্যে এসে ঠেকে। মানুষও নিয়ম না মেনে যেভাবেই হোক, লঞ্চে ওঠার প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে। ঈদের সময় ফেসবুক বা ইউটিউবেও এ রকম দুঃসাহসিক পারাপারের কনটেন্ট দেখা যায়। এ রকম অনিয়ম যে কত বড় সর্বনাশ করতে পারে, তার ভূরি ভূরি নমুনা থাকলেও প্রশাসন নির্বিকার।

আমরা বলতে চাইছি, সড়ক, নৌ, রেল আর আকাশপথ নিরাপদ করার জন্য অবশ্যই সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোকে সজাগ থাকতে হবে। লঞ্চে ওঠার প্রতিযোগিতার কথা যদি বলা হয়, তাহলে শুরুতেই বলতে হয়, যাত্রীরা তো ঘাটে নোঙর করা লঞ্চেই উঠবে। ঘাট থেকে ছেড়ে যাওয়ার পর লঞ্চে ওঠার নিয়ম কেন থাকবে? কেন মানুষ ট্রলারে করে লঞ্চে উঠবে? কনটেন্ট ক্রিয়েটররা এই দৃশ্য ধারণ করে অনেক ‘ভিউ’র মালিক হতে পারেন, কিন্তু সেটা যে অন্যায়, এ কথা নিয়ে কেউ এগিয়ে আসেন না।

রাইয়ানের বাবা আর ফিরবেন না। তিনি তাঁর অনাগত শিশুর মুখ দেখে যেতে পারেননি। একটি সুখী পরিবার অকস্মাৎ ট্র্যাজিক পরিণতি মেনে নিতে বাধ্য হলো। এই মা ও শিশুর দিন কী করে কাটবে এখন, সে কথা কে বলবে? কিছু ক্ষতিপূরণের কথা চলছে যদিও, কিন্তু সেই ক্ষতিপূরণের টাকায় কি দরিদ্র এই পরিবার নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবে?

রাইয়ান নিজের বাবাকে দেখতে পাবে না কোনো দিন। হয়তো মায়ের মুখে শুনবে বাবার কথা। আপাতত রাইয়ান আছে তার নানাবাড়িতে। সেটাও অভাব-অনটনের সংসার। এখানে কেমন ভবিষ্যৎ তার জন্য অপেক্ষা করছে, তা কেউ জানে না। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসাকে আমরা মৌলিক অধিকার বলে মনে করে থাকি। পিতৃহারা এই রাইয়ান কি এই অধিকারগুলোর সংস্পর্শে আসতে পারবে?

আমাদের দেশে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা মৌলিক অধিকার হিসেবে কি বাস্তবে রয়েছে? রাজনীতির মাঠ গরম করার সময় রাজনৈতিক দলগুলো মৌলিক অধিকারের কথা বলে থাকে বটে, কিন্তু আদতে সেই সুফল সবার ভাগ্যে জোটে না।

রাইয়ানের মতো অভাগাদের নিরাপদ জীবনের গ্যারান্টি কে দেবে?

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত