Ajker Patrika

মানুষ, মুনাফা ও মনুষ্যত্বের দ্বন্দ্ব

বাপ্পাদিত্য চৌধুরী প্রবাল
মানুষ, মুনাফা ও মনুষ্যত্বের দ্বন্দ্ব
ছবি: এআই

মানবসভ্যতার অগ্রযাত্রা মূলত কৌতূহল, জ্ঞান, শ্রম ও উদ্ভাবনের সমন্বিত ফল। আগুন আবিষ্কার থেকে শুরু করে আধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) পর্যন্ত—প্রতিটি স্তরে মানুষ নিজের জীবনকে সহজ, নিরাপদ ও উন্নত করার চেষ্টা চালিয়েছে। কিন্তু এই দীর্ঘ অগ্রযাত্রার ভেতরেই আজ একটি মৌলিক প্রশ্ন অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক—এই দুর্বার অগ্রগতির কেন্দ্রে কি মানুষ, নাকি মুনাফা? আর এই প্রশ্নের মধ্যেই জন্ম নিয়েছে ‘মানুষ, মুনাফা ও মনুষ্যত্বের এক কাল্পনিক, তবে চিরবাস্তব দ্বন্দ্ব’।

বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা মূলত বাজারনির্ভর অর্থনীতির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এখানে উৎপাদন, বিনিয়োগ ও ভোগ—সবকিছুই মুনাফার হিসাব দ্বারা পরিচালিত হয়। স্বাভাবিকভাবে মুনাফা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। কিন্তু সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন এই মুনাফা অর্জনের প্রতিযোগিতা মানবিক মূল্যবোধকে বাদ দেয়। তখন ‘মানুষ’ আর উদ্দেশ্য থাকে না; মানুষ হয়ে ওঠে কেবল মাধ্যম। আজকের বাস্তবতায় আমরা দেখতে পাই—খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এমনকি আবাসন পর্যন্ত ক্রমেই বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত হয়েছে। ভেজাল খাদ্য, ভেজাল ওষুধ, ব্যয়বহুল চিকিৎসাব্যবস্থা এবং কোচিং-নির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা সাধারণ মানুষের জীবনে চাপ সৃষ্টি করছে। একদিকে জীবনমান উন্নতির কথা বলা হলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই মানুষের মৌলিক অধিকার হয়ে উঠছে ক্রয়যোগ্য পণ্যের সমতুল্য। এই বাস্তবতা শুধু অর্থনৈতিক নয়, গভীরভাবে নৈতিক সংকটের জন্মের দিচ্ছে। কারণ, যখন মুনাফা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পায়, তখন ন্যায্যতা, মানবিকতা এবং দায়িত্ববোধ অনেক সময় পেছনে পড়ে যায়। ফলে সমাজে বৈষম্য বাড়ে, অসহায় মানুষের সুযোগ সংকুচিত হয় এবং ধনী-গরিব ব্যবধান বিরাট রূপ নেয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বারবার সতর্ক করেছে যে অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যশিল্প এবং অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবারের ব্যবহার মানুষের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াচ্ছে। একইভাবে ইউনেসকো শিক্ষাব্যবস্থায় মানবিক ও নৈতিক শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরলেও বাস্তবে অনেক দেশে শিক্ষা এখন পরীক্ষাকেন্দ্রিক প্রতিযোগিতা ও বাজারনির্ভর প্রশিক্ষণে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে মুনাফা স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয় একটি উপাদান। কোনো ব্যবসা বা শিল্পপ্রতিষ্ঠান টিকে থাকতে হলে তাকে অবশ্যই আয় করতে হবে। কিন্তু সমস্যার মূল জায়গা হলো—এই মুনাফা যখন ‘মানবকল্যাণ বা মানব উন্নতি’ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তখন উন্নয়ন আর মানুষের জন্য থাকে না; বরং মানুষের ওপর চাপ সৃষ্টির একটি কাঠামোতে পরিণত হয়।

করপোরেট সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও এই দ্বন্দ্ব সুস্পষ্ট। অনেক বড় প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন ও বিপণনে দক্ষতা বাড়াতে গিয়ে শ্রমিকের অধিকার, পরিবেশ সুরক্ষা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা উপেক্ষা করে। ফলে একদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও অন্যদিকে শ্রমিক শোষণ, পরিবেশদূষণ এবং সামাজিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পায়। পরিবেশগত সংকটও এই মুনাফাকেন্দ্রিক ব্যবস্থার একটি বড় পরিণতি। অতিরিক্ত শিল্পায়ন, বন উজাড়, নদীদূষণ এবং কার্বন নিঃসরণ আজ বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে বর্তমানের মুনাফা অর্জনের এই প্রবণতা মানবিকতার সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। প্রযুক্তির অগ্রগতিও এই দ্বন্দ্বকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন এবং ডিজিটাল অর্থনীতি একদিকে উৎপাদনশীলতা বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে অনেক সাধারণ শ্রমিকদের কর্মসংস্থানকে অনিশ্চিত করছে। ফলে সমাজে নতুন ধরনের অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হচ্ছে, যা আবার ধীরে ধীরে মানবিক সংকটকে তীব্র করছে। তাহলে সমাধান কী?

উন্নয়নের ধারণাকে যদি পুনঃ সংজ্ঞায়িত করা যায়, তাহলে মানুষ, মুনাফা ও মনুষ্যত্বের মধ্যে ভারসাম্য আনা সম্ভব। ব্যবসা ও অর্থনীতি অবশ্যই থাকবে, কিন্তু তার কেন্দ্রবিন্দু হতে হবে মানুষ, মানুষের উন্নতি। মুনাফা হবে মাধ্যম, মানবকল্যাণ হবে লক্ষ্য। এই পরিবর্তনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে শিক্ষাব্যবস্থা। শিক্ষা যদি কেবল দক্ষতা ও চাকরিমুখী না হয়ে নৈতিকতা, সহমর্মিতা এবং দায়িত্ববোধ গড়ে তোলে, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আরও মানবিক হবে। একই সঙ্গে করপোরেট জগতে সামাজিক দায়বদ্ধতা বাস্তবায়ন এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কঠোর নীতিমালা মুনাফাকেন্দ্রিক অমানবিক প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

এ ছাড়া ভোক্তাদের সচেতনতা বৃদ্ধি, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থা এবং ন্যায্য বাণিজ্যনীতি প্রতিষ্ঠা করাও অত্যন্ত জরুরি। কারণ, একটি সমাজ তখনই ভারসাম্যপূর্ণ হয়, যখন সেখানে অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং মানবিক মূল্যবোধ একসঙ্গে এগিয়ে চলে। শেষ পর্যন্ত বলা যায়, মানুষ, মুনাফা ও মনুষ্যত্ব একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং তারা পরস্পর নির্ভরশীল। মুনাফা ছাড়া অর্থনীতি টিকে না, কিন্তু মনুষ্যত্ব ছাড়া সেই অর্থনীতি মানবতার জন্য হুমকি হয়ে ওঠে। তাই প্রকৃত উন্নয়ন হলো সেই পথ, যেখানে অর্থনৈতিক অগ্রগতি মানুষের কল্যাণকে শক্তিশালী করে, দুর্বল করে না। একটি সভ্য সমাজের পরিমাপ তার সম্পদে নয়, বরং সে সমাজ কতটা মানবিক—তার গভীরতাতেই নিহিত।

লেখক: শিক্ষার্থী, মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত