
নেপালের সাম্প্রতিক সাধারণ নির্বাচনে বড় ধরনের চমক সৃষ্টি করেছে তরুণ প্রজন্মের পছন্দের দল রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি)। বিশেষ করে জেন-জি বা নতুন প্রজন্মের ভোটারদের সমর্থনে দলটি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। এই নির্বাচনের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা হলো কাঠমান্ডুর সাবেক মেয়র বালেন্দ্র শাহ—যিনি সাধারণত ‘বলেন’ নামেই পরিচিত—তাঁর বড় জয়। আরএসপির সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে তিনি ঝাপা-৫ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হারিয়েছেন নেপালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপালের (ইউএমএল) প্রধান কে পি শর্মা ওলিকে। দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী এই নেতাকে পরাজিত করা শুধু একটি নির্বাচনী ফল নয়, বরং নেপালের রাজনীতিতে প্রজন্মগত পরিবর্তনের একটি শক্ত বার্তা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আন্দোলন। জেন-জি প্রজন্মের অংশগ্রহণে শুরু হওয়া ধারাবাহিক বিক্ষোভ ও গণ-আন্দোলনের চাপেই গত ৯ সেপ্টেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ওলির সরকার ক্ষমতা হারায়। সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায়ই পরে নির্বাচনে নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থানের পথ তৈরি করে দেয়।
নেপালের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ ‘হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস’-এর ২৭৫ জন সদস্য নির্বাচনের জন্য বৃহস্পতিবার দেশজুড়ে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে ভোটাররা দুটি ব্যালটে ভোট দেন। এর মধ্যে ১৬৫টি আসনে সরাসরি ভোটের মাধ্যমে প্রতিনিধি নির্বাচিত হয় এবং বাকি ১১০টি আসনে সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব বা পিআর পদ্ধতিতে সদস্য নির্বাচন করা হয়। প্রত্যক্ষ নির্বাচনের ফলাফলে দেখা গেছে, আরএসপি একাই ১১২টি আসনে জয় পেয়েছে। নেপালের নির্বাচনী ইতিহাসে এটি একটি নজিরবিহীন সাফল্য হিসেবে ধরা হচ্ছে।
নেপালের এই নির্বাচনী ফলাফল দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে। অনেক বিশ্লেষক বলছেন, এই নির্বাচনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো তরুণদের উত্থান। দীর্ঘদিন ধরে যে রাজনৈতিক কাঠামো পুরোনো নেতৃত্বের হাতে ছিল, সেখানে নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধিরা শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পেরেছেন। এই পরিবর্তন শুধু নির্বাচনী ফলাফলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি নেপালের সমাজ, রাজনীতি এবং মানুষের মানসিকতার একটি বড় পরিবর্তনের প্রতিফলন। এই বাস্তবতা বুঝতে গেলে নেপালের অভিজ্ঞতাকে শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনার সঙ্গে তুলনা করে দেখা জরুরি।
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে গত কয়েক বছরে গণ-আন্দোলন বা গণ-অভ্যুত্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। শ্রীলঙ্কা ও নেপালে জনগণের বড় ধরনের আন্দোলনের পর রাজনৈতিক পরিবর্তন এসেছে। সেই পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্বও উঠে এসেছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, যদি শ্রীলঙ্কা ও নেপালে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া শক্তিগুলো পরে নির্বাচনে সফল হতে পারে, তাহলে বাংলাদেশে কেন তা ঘটেনি? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে প্রথমেই বুঝতে হবে—এই তিন দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা এক নয়।
নেপালের সাম্প্রতিক নির্বাচনে তরুণদের উত্থানকে কোনো আকস্মিক ঘটনা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। এটি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অসন্তোষের ফল। নেপালে বহু বছর ধরে একই ধরনের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ঘুরেফিরে ক্ষমতায় এসেছে। জনগণের একটি বড় অংশের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়েছিল যে পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলো উন্নয়ন, স্বচ্ছতা বা কর্মসংস্থানের প্রশ্নে নতুন কোনো পথ দেখাতে পারছে না। ফলে তরুণদের মধ্যে একটি নতুন রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়। তারা শুধু প্রতিবাদ করতে চায়নি, বরং রাজনীতির ভেতরে প্রবেশ করে পরিবর্তন আনতে চেয়েছে। সাম্প্রতিক নির্বাচনে সেই মানসিকতারই প্রতিফলন দেখা গেছে।
এই জায়গায় নেপালের অভিজ্ঞতা শ্রীলঙ্কার সঙ্গে কিছুটা মিল পাওয়া যায়। শ্রীলঙ্কায় ২০২২ সালের ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে দেয়। খাদ্য, জ্বালানি ও ওষুধের ঘাটতি সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি করে। সেই ক্ষোভ একসময় গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। মানুষের চাপের মুখে সরকার ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সেই আন্দোলনের পরেও দেশটির রাষ্ট্রীয় কাঠামো সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়েনি। সংবিধান বহাল ছিল, প্রশাসনিক কাঠামোও পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে যায়নি। ফলে রাজনৈতিক পরিবর্তন হলেও রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা বজায় ছিল।
নেপালেও অনেকটা একই ধরনের রাজনৈতিক সংযম দেখা গেছে। সেখানে আন্দোলনের পর একটি অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। সেই সরকার মূলত নির্বাচন আয়োজনের পরিবেশ তৈরি করার দিকে মনোযোগ দেয়। তারা দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করেনি। এই ধরনের সংযম রাজনীতিতে একটি আস্থার পরিবেশ তৈরি করে। ফলে যখন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তখন মানুষ মনে করেছে যে তারা একটি তুলনামূলক স্বাভাবিক রাজনৈতিক পরিবেশে ভোট দিচ্ছে। এই পরিবেশ তরুণ প্রার্থীদের জন্যও একটি সুযোগ তৈরি করে দেয়।
নেপালের নির্বাচনে তরুণদের সাফল্যের পেছনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো সামাজিক পরিবর্তন। গত এক দশকে নেপালের শিক্ষিত তরুণদের সংখ্যা বেড়েছে। বিদেশে কাজ করা বা পড়াশোনা করা তরুণদের একটি বড় অংশ দেশে ফিরে নতুন ধরনের রাজনীতি নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে। তারা দেখেছে যে পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দুর্নীতি, দলীয়করণ এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্ষমতার প্রভাব অনেক বেশি। তাই তারা রাজনীতিতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং আধুনিক প্রশাসনের দাবি তুলেছে। নির্বাচনে তাদের এই অবস্থান অনেক তরুণ ভোটারের সমর্থন পেয়েছে।
এখানে বাংলাদেশের বাস্তবতা অনেকটাই আলাদা। বাংলাদেশেও তরুণেরা রাজনীতিতে সক্রিয়, কিন্তু সেই অংশগ্রহণ কখনোই স্বাধীন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে গড়ে ওঠেনি। তাদের যোগ্যতা-মেধা-সততা নিয়েও প্রশ্ন আছে। তাদের মধ্যে অহমিকা, প্রতিশোধপরায়ণতা, রাতারাতি ধনী হওয়ার নেশা, বিলাসী জীবনযাপন ইত্যাদি প্রবণতা দেখা গেছে। ফলে মানুষ তাদের আস্থায় নেয়নি। তাদের রাজনৈতিক দর্শনও মানুষকে হতাশ করেছে। তারা মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী দল, মতকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছে। এমনকি যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ঐক্যও করেছে। ফলে তারা নতুন প্রজন্মের মধ্যেই নতুন ইমেজ তৈরি করতে পারেনি।
নেপালের নির্বাচনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মানুষের মধ্যে পরিবর্তনের প্রতি আস্থা তৈরি হওয়া। দীর্ঘদিন ধরে চলা রাজনৈতিক অস্থিরতার পর মানুষ নতুন নেতৃত্বকে একটি সুযোগ দিতে চেয়েছে। তরুণদের মধ্যে অনেকেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তারা প্রশাসনে স্বচ্ছতা আনার কথা বলেছে এবং উন্নয়নকে স্থানীয় মানুষের প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত করার কথা বলেছে। এই ধরনের প্রতিশ্রুতি ভোটারদের মধ্যে একটি নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছে।
শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রেও দেখা গেছে যে আন্দোলনের পর মানুষের মধ্যে একটি মানসিক পরিবর্তন তৈরি হয়েছিল। মানুষ পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির বাইরে গিয়ে নতুন নেতৃত্বকে সুযোগ দিতে আগ্রহী হয়েছে। যদিও বাস্তবতা সব সময় প্রত্যাশার সঙ্গে মেলে না, তবু সেই মুহূর্তে জনগণের মানসিকতায় একটি পরিবর্তন দেখা গিয়েছে।
বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা এখানে ভিন্ন রকম। তরুণদের নেতৃত্বাধীন দল সমাজে কোনো রকম ইতিবাচক প্রভাব তৈরি করতে পারেনি। সমাজ বদলের স্বপ্ন দেখানোর পরিবর্তে তারা নিজেরাই রাতারাতি বদলে গিয়েছে। তারা নিজেরাই প্রশাসক বনে গেছে। তাদের অহংকারী কথা, ধমক দেওয়া বক্তৃতা, মব সৃষ্টি, দামি পোশাক পরা, ছোটখাটো কাজে হেলিকপ্টার ব্যবহার—এসব করে সবাইকে চমকে দিয়েছে। তাদের কথায় ও কাজে বড় বেশি মিলও খুঁজে পাওয়া যায়নি।
আসলে গণ-অভ্যুত্থান বা বড় আন্দোলন কোনো রাজনৈতিক শক্তিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্ষমতায় নিয়ে আসে না। মানুষের আস্থা অর্জন করতে হয় দীর্ঘ সময় ধরে। সেই আস্থা তৈরি হয় রাজনৈতিক আচরণ, নীতি এবং বাস্তব কাজের মাধ্যমে। নেপালের সাম্প্রতিক নির্বাচন দেখিয়েছে যে যখন মানুষ মনে করে নতুন নেতৃত্ব পরিবর্তন আনতে পারে, তখন তারা সেই নেতৃত্বকে সুযোগ দিতে প্রস্তুত থাকে।
সব মিলিয়ে নেপালের সাম্প্রতিক নির্বাচন শুধু একটি দেশের রাজনৈতিক ঘটনা নয়। এটি দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে নতুন প্রজন্মের সম্ভাবনার একটি ইঙ্গিত। তরুণেরা যদি সংগঠিতভাবে রাজনীতিতে অংশ নেয় এবং বাস্তব সমস্যার সমাধানের দিকে মনোযোগ দেয়, তাহলে ভবিষ্যতে এই অঞ্চলের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও বড় পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। তবে সেই পরিবর্তন টেকসই হবে কি না, তা নির্ভর করবে নতুন নেতৃত্ব কতটা দায়িত্বশীল এবং কতটা সৎভাবে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারে, তার ওপর।
লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট

১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ সম্পূর্ণ মওকুফের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। নতুন সরকার গঠনের মাত্র ১০ দিনের মধ্যেই কৃষকদের জন্য বড় ধরনের স্বস্তির এ ঘোষণা এসেছে। শস্য, ফসল, মৎস্য ও পশুপালন খাতের কৃষকেরা এ সুবিধার আওতায় আসবেন।
৯ ঘণ্টা আগে
খবরটি কদিন আগের। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার সাবেক সহকারী একান্ত সচিব মোয়াজ্জেম হোসেনের আপন বড় ভাই অতি অল্প সময়ে ২ কোটি টাকার মালিক হয়েছেন।
৯ ঘণ্টা আগে
আলোচনা চলা অবস্থায় সাফল্যের আভাসের মধ্যে কোনো উসকানি ছাড়াই ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা সামরিক আগ্রাসনের ৯ দিন পেরিয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল প্রথম দিনের বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি, তাঁর নিরাপত্তা উপদেষ্টা আলী শামখানি, সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান...
১ দিন আগে
চলছে অমর একুশে বইমেলা, কিন্তু প্রচারমাধ্যম জানান দিচ্ছে সেখানে বইয়ের ক্রেতা নেই। বইপাঠে এ দেশের মানুষের অনীহা এমন মাত্রায় পৌঁছেছে যে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি-বেসরকারি লাইব্রেরিগুলো পাঠকশূন্য হয়ে পড়েছে।
১ দিন আগে