Ajker Patrika

আল-জাজিরার বিশ্লেষণ /ইরানের স্বল্পস্থায়ী যুদ্ধের দুর্বলতা ও দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের শক্তিমত্তা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ১০ মার্চ ২০২৬, ১৫: ৫৩
ইরানের স্বল্পস্থায়ী যুদ্ধের দুর্বলতা ও দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের শক্তিমত্তা
জনসাধারণের জন্য প্রদর্শিত ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের ডামি। ছবি: এএফপি

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছিলেন, তেহরান দুই দশকের বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধগুলোকে গভীরভাবে অধ্যয়ন করেছে। উদ্দেশ্য এমন এক ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যার ফলে রাজধানী বোমায় বিধ্বস্ত হলেও সারা দেশ লড়াই চালিয়ে যেতে পারবে। এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি কেবল স্থিতিস্থাপকতার কথা বলেননি; তিনি আসলে ইরানের প্রতিরক্ষা মতবাদের মূল যুক্তিই তুলে ধরছিলেন।

এই মতবাদের কেন্দ্রে রয়েছে ইরানি সামরিক চিন্তাবিদদের ভাষায় ‘বিকেন্দ্রীকৃত মোজাইক প্রতিরক্ষা।’ এর ভিত্তি একটি মূল ধারণা—যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের সঙ্গে যেকোনো যুদ্ধে ইরান হয়তো শীর্ষ কমান্ডারদের হারাতে পারে, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ধ্বংস হতে পারে, যোগাযোগ নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়তে পারে, এমনকি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও অকার্যকর হয়ে যেতে পারে। তবু দেশটির যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা থাকতে হবে।

এর অর্থ হলো—অগ্রাধিকার কেবল তেহরানকে রক্ষা করা নয়, এমনকি সর্বোচ্চ নেতৃত্বকে রক্ষা করাও নয়। বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা টিকিয়ে রাখা, যুদ্ধ ইউনিটগুলোকে কার্যকর রাখা এবং একটি মাত্র ভয়াবহ হামলায় যেন যুদ্ধ শেষ হয়ে না যায়, তা নিশ্চিত করা। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে বোঝা যায়, ইরানের সামরিক বাহিনী স্বল্পমেয়াদি যুদ্ধের জন্য তৈরি হয়নি। এটি গড়ে তোলা হয়েছে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের জন্য।

মোজাইক প্রতিরক্ষা মতবাদ কী

মোজাইক প্রতিরক্ষা একটি ইরানি সামরিক ধারণা। এটি সবচেয়ে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসির সঙ্গে। বিশেষ করে সাবেক কমান্ডার মোহাম্মদ আলি জাফারির সময় এই ধারণা গুরুত্ব পায়। তিনি ২০০৭ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত এই বাহিনীর নেতৃত্ব দেন। এই ধারণার মূল লক্ষ্য হলো রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা কাঠামোকে একক কমান্ড চেইনে কেন্দ্রীভূত না রেখে বহু আঞ্চলিক ও আংশিক স্বায়ত্তশাসিত স্তরে সংগঠিত করা। কারণ, একক কমান্ড কাঠামোতে সব ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত থাকলে একটি ‘ডিক্যাপিটেশন স্ট্রাইক’ বা নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে আঘাতের মাধ্যমে পুরো ব্যবস্থাকে পঙ্গু করে দেওয়া সম্ভব।

এই মডেলের অধীনে আইআরজিসি, বাসিজ, নিয়মিত সেনাবাহিনীর ইউনিট, ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনী, নৌবাহিনীর সক্ষমতা এবং স্থানীয় কমান্ড কাঠামো মিলিয়ে একটি বিতরণকৃত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। এর এক অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও অন্য অংশগুলো কাজ চালিয়ে যেতে পারে। শীর্ষ নেতারা নিহত হলেও কমান্ড চেইন পুরোপুরি ভেঙে পড়ে না। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলেও স্থানীয় ইউনিটগুলো নিজেদের কর্তৃত্ব ও সক্ষমতা নিয়ে পদক্ষেপ নিতে পারে।

এই মতবাদের দুটি প্রধান লক্ষ্য রয়েছে। প্রথমত, ইরানের কমান্ড ব্যবস্থাকে সামরিক শক্তি দিয়ে ভেঙে ফেলা কঠিন করে তোলা। দ্বিতীয়ত, যুদ্ধক্ষেত্রকে দ্রুত নিষ্পত্তি করা কঠিন করে তোলা, যাতে ইরান একটি বহুস্তরীয় যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়। সেখানে থাকবে নিয়মিত প্রতিরক্ষা, অনিয়মিত যুদ্ধ, স্থানীয় জনসমাগমভিত্তিক প্রতিরোধ এবং দীর্ঘমেয়াদি ক্ষয়যুদ্ধ। এ কারণেই ইরানের সামরিক চিন্তায় যুদ্ধকে কেবল অগ্নিশক্তির প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখা হয় না। বরং এটি ধৈর্য ও সহনশীলতার পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত হয়।

কেন ইরান এই মডেল গ্রহণ করল

এই মডেলের দিকে ইরানের ঝোঁক তৈরি হয় মূলত ২০০১ সালে আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসন এবং ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের পর সৃষ্ট আঞ্চলিক ধাক্কাগুলো থেকে। ইরাকে সাদ্দাম হোসেনের শাসনের দ্রুত পতন ইরানের কৌশলগত চিন্তায় গভীর প্রভাব ফেলেছিল বলে মনে করা হয়। তেহরান দেখেছিল, অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত একটি রাষ্ট্র যখন বিপুল আমেরিকান সামরিক শক্তির মুখোমুখি হয় তখন কী ঘটে। কমান্ড কাঠামোতে আঘাত করা হয়, পুরো ব্যবস্থা ভেঙে যায়, এবং শাসনব্যবস্থা দ্রুত পতন ঘটে।

ফলে ইরান তার সামরিক কাঠামোকে আরও কেন্দ্রনির্ভর করার পরিবর্তে ছড়িয়ে দেওয়ার পথে হাঁটে। যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের প্রচলিত সামরিক শক্তির সমতুল্য হওয়ার ধারণা না নিয়ে তারা বরং সেই শক্তির মুখে টিকে থাকার উপায় খুঁজতে শুরু করে। ইরানের সামরিক মতবাদ ধরে নেয়, যেকোনো আক্রমণকারী বাহিনীর কাছে অনেক উন্নত প্রযুক্তি, আকাশশক্তি এবং গোয়েন্দা সক্ষমতা থাকবে। ইরানের কৌশলগত চিন্তায় এর জবাব হলো সমমুখী সংঘর্ষ নয়। বরং শত্রুর সুবিধাগুলো বিঘ্নিত করা, সংঘাত দীর্ঘায়িত করা এবং যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার খরচ বাড়িয়ে দেওয়া।

যুদ্ধে এটি কীভাবে কাজ করবে

বাস্তবে এই মতবাদ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য ভিন্ন ভিন্ন ভূমিকা নির্ধারণ করে। নিয়মিত সেনাবাহিনী বা আরতেশ প্রথম আঘাতটি গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুত থাকে। তাদের সাঁজোয়া, যান্ত্রিক এবং পদাতিক বাহিনী শত্রুর অগ্রযাত্রা ধীর করার জন্য প্রাথমিক প্রতিরক্ষা লাইন হিসেবে কাজ করবে এবং যুদ্ধক্ষেত্রকে স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করবে।

বিমান প্রতিরক্ষা ইউনিটগুলো গোপন অবস্থান, প্রতারণামূলক কৌশল এবং বাহিনী ছড়িয়ে রাখার মাধ্যমে শত্রুর আকাশ আধিপত্য যতটা সম্ভব সীমিত করার চেষ্টা করবে। এরপর সংঘাতের পরবর্তী পর্যায়ে আইআরজিসি এবং বাসিজ আরও গভীর ভূমিকা নেবে। তাদের কাজ হবে বিকেন্দ্রীকৃত অভিযান, অতর্কিত হামলা, স্থানীয় প্রতিরোধ, সরবরাহ লাইনে বিঘ্ন সৃষ্টি এবং ভৌগোলিক বৈচিত্র্যময় এলাকায় নমনীয় অভিযান চালিয়ে যুদ্ধকে ক্ষয়যুদ্ধে পরিণত করা। এর মধ্যে থাকবে শহরাঞ্চল, পর্বত অঞ্চল এবং দূরবর্তী এলাকা।

এই জায়গাতেই বাসিজ বাহিনী বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নির্দেশে এই বাহিনী প্রথম গঠিত হয়। পরে এটিকে আইআরজিসির যুদ্ধকালীন কাঠামোর সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করা হয়। ২০০৭ সালের পর বাসিজ ইউনিটগুলোকে ইরানের ৩১টি প্রদেশজুড়ে একটি প্রাদেশিক কমান্ড ব্যবস্থার অধীনে আনা হয়, যাতে স্থানীয় কমান্ডাররা ভৌগোলিক অবস্থা ও যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি অনুযায়ী বেশি স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

এই স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনই এই মতবাদের কেন্দ্রে রয়েছে। এর অর্থ হলো—ওপরের নেতৃত্ব দুর্বল হয়ে গেলেও নিচের স্তর থেকে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব। স্থলযুদ্ধের বাইরে নৌবাহিনীও তাদের ভূমিকা রাখে উপসাগরীয় অঞ্চল এবং হরমুজ প্রণালীর আশপাশে ‘অ্যান্টি-অ্যাক্সেস’ কৌশলের মাধ্যমে। তাদের লক্ষ্য দ্রুতগতির আক্রমণ নৌকা, মাইন, জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র এবং বিশ্বের অন্যতম সংবেদনশীল জ্বালানি করিডোরে বিঘ্ন সৃষ্টির হুমকির মাধ্যমে চলাচলকে ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যয়বহুল করে তোলা।

ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনী, বিশেষ করে আইআরজিসি নিয়ন্ত্রিত ইউনিটগুলো একই সঙ্গে প্রতিরোধ এবং গভীর আঘাত হানার সক্ষমতা হিসেবে কাজ করে। এগুলোর লক্ষ্য শত্রুপক্ষের অবকাঠামো ও সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষতির বোঝা চাপিয়ে দেওয়া। এরপর আসে ইরানের বিস্তৃত আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে থাকা মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠী ও অংশীদার বাহিনী, যাদের ভূমিকা হলো যুদ্ধক্ষেত্রকে বিস্তৃত করা এবং নিশ্চিত করা যে ইরানের সঙ্গে কোনো যুদ্ধ যেন কেবল ইরানের ভূখণ্ডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে।

শত্রুকে একটি ফ্রন্ট বিচ্ছিন্ন করে একটি কমান্ড কাঠামো ধ্বংস করার সুযোগ না দিয়ে, ইরান চেষ্টা করে যুদ্ধকে সময়, ভূগোল এবং সংঘাতের বহুস্তরে ছড়িয়ে দিতে। যুদ্ধ তখন আর একটি মাত্র যুদ্ধক্ষেত্র নয়; হয়ে ওঠে দীর্ঘ, বিস্তৃত এবং জটিল এক সংঘাতের জাল।

সময় কেন গুরুত্বপূর্ণ

এই মতবাদের সবচেয়ে স্পষ্ট প্রকাশগুলোর একটি অর্থনৈতিক দিক থেকেও যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সামরিক দিক থেকেও। ধরা যাক, একটি শাহেদ ড্রোন তৈরি করতে সাধারণভাবে ২০–৩০ হাজার ডলার খরচ হয় বলে ধারণা করা হয়। কিন্তু সেটিকে ভূপাতিত করতে খরচ অনেক বেশি হতে পারে, কারণ এতে প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র ও সমন্বিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ব্যয় যোগ হয়।

এই অসম ব্যয়ই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি সময়কে একটি কৌশলগত অস্ত্রে পরিণত করে। যদি এক পক্ষ কম খরচে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র তৈরি করতে পারে, আর অন্য পক্ষকে সেই হুমকি ঠেকাতে তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করতে বাধ্য করে, তাহলে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করাটাই হয়ে ওঠে চাপ সৃষ্টির একটি কৌশল। লক্ষ্য সবসময় তাৎক্ষণিকভাবে যুদ্ধক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করা নয়। বরং লক্ষ্য হলো এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করা, যেখানে প্রতিটি হুমকি প্রতিহত করার খরচ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অসহনীয় হয়ে ওঠে।

এই কারণেই ইরানের সামরিক মতবাদে সহনশীলতা, অস্ত্র মজুদ, বিকেন্দ্রীকরণ এবং ক্ষয়যুদ্ধের ওপর এত জোর দেওয়া হয়। এর মূল ধারণা হলো, শক্তিশালী পক্ষটি শেষ পর্যন্ত হয়তো ক্রমাগত উত্তেজনা ও সংঘাত চালিয়ে যাওয়ার মূল্যকে অতিরিক্ত ব্যয়বহুল বলে মনে করতে পারে।

দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ তত্ত্বের প্রভাব

ইরানের এই মতবাদ কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক শূন্যতা থেকে তৈরি হয়নি। এর সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ মিল রয়েছে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের সেই তত্ত্বের, যা সবচেয়ে বেশি পরিচিত মাও সেতুংয়ের সঙ্গে। চীনে জাপানি আগ্রাসনের সময় মাও যুক্তি দিয়েছিলেন, দুর্বল পক্ষকে শক্তিশালী শত্রুকে দ্রুত পরাজিত করতে হবে এমন নয়। বরং তারা প্রাথমিক শক্তির অসমতা টিকে থেকে মোকাবিলা করতে পারে, সংঘাতকে দীর্ঘায়িত করতে পারে, শত্রুর সরবরাহব্যবস্থা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছাকে ধীরে ধীরে ক্ষয় করতে পারে, এবং সময়ের সঙ্গে শক্তির ভারসাম্য বদলে দিতে পারে।

ইরানের মতবাদ মাওয়ের মডেলের সরাসরি অনুকরণ নয়। তবে এর মূল ধারণা একই—যুদ্ধ কেবল শুরুতে দুই পক্ষের সামরিক সক্ষমতার তুলনায় নির্ধারিত হয় না। সময়, সহনশীলতা, অভিযোজনক্ষমতা এবং প্রথম ধাক্কা টিকে থাকার ক্ষমতাও এর গতিপথ নির্ধারণ করে। এই যুক্তি বিংশ শতাব্দীর বহু সংঘাতে প্রভাব ফেলেছে—ভিয়েতনাম থেকে আলজেরিয়া, আবার আফগানিস্তান পর্যন্ত। সামরিকভাবে শক্তিশালী শত্রুর মুখোমুখি হওয়া অপেক্ষাকৃত দুর্বল রাষ্ট্র ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধ ব্যাখ্যা করতে বিশ্লেষকেরা আজও এই তত্ত্বকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন।

ইরানের ভেতরে এই চিন্তাধারা কে বিকাশ ঘটিয়েছিলেন

এই চিন্তার সঙ্গে যুক্ত সবচেয়ে পরিচিত আদর্শিক ব্যক্তিদের একজন হলেন হাসান আব্বাসি। তিনি এক কট্টরপন্থী সমরকৌশলবিদ, যাকে প্রায়ই আইআরজিসির অসম যুদ্ধ ও দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত তত্ত্বের অন্যতম প্রধান চিন্তাবিদ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। আব্বাসির গুরুত্ব শুধু সামরিক ধারণায় সীমাবদ্ধ নয়। তিনি কৌশলগত চিন্তাকে আদর্শিক বর্ণনার সঙ্গে যুক্ত করেন। ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধকে কেবল সামরিক প্রয়োজন হিসেবে দেখা হয় না। এটিকে একটি রাজনৈতিক ও সভ্যতাগত সংগ্রাম হিসেবেও তুলে ধরা হয়, যেখানে সমাজ, বিশ্বাস এবং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে একসঙ্গে চাপ সহ্য করে টিকে থাকার জন্য প্রস্তুত থাকতে হয়।

এতে করে এই মতবাদ যুদ্ধক্ষেত্রের পরিকল্পনার চেয়ে অনেক বিস্তৃত হয়ে ওঠে। এটি রাষ্ট্রের সহনশীলতা সংগঠিত করার একটি পদ্ধতিতে রূপ নেয়। অন্যদিকে মোহাম্মদ আলি জাফরি এই চিন্তাগুলোর অনেকটিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাঁর নেতৃত্বে বিকেন্দ্রীকৃত প্রতিরক্ষা, স্থানীয় কমান্ড কাঠামো, অনিয়মিত প্রতিক্রিয়া এবং ছড়িয়ে থাকা প্রতিরোধ সক্ষমতার মতো ধারণাগুলো আইআরজিসির কাঠামোর মধ্যে আরও গভীরভাবে প্রোথিত হয়।

চতুর্থ উত্তরসূরি বলতে কী বোঝায়

যুদ্ধকালীন এই যুক্তির সবচেয়ে স্পষ্ট প্রকাশ সম্ভবত উত্তরসূরি নির্ধারণের পরিকল্পনায় দেখা যায়। নিজের হত্যাকাণ্ডের আগে সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনি নাকি ইরানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও বেসামরিক পদে একাধিক পূর্বনির্ধারিত উত্তরসূরি নিশ্চিত করতে। জানা যায়, প্রতিটি শীর্ষ পদে সর্বোচ্চ চারজন পর্যন্ত বিকল্প উত্তরসূরি নির্ধারণ করা হয়েছিল। এখান থেকেই ‘চতুর্থ উত্তরসূরি’ ধারণার জন্ম।

এর উদ্দেশ্য ছিল কেবল শীর্ষে একজন উত্তরাধিকারী নির্ধারণ করা নয়। বরং পুরো ব্যবস্থার মধ্যে স্তরে স্তরে উত্তরসূরির কাঠামো তৈরি করা, যাতে কোনো নেতা হত্যাকাণ্ড, নিখোঁজ হওয়া বা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার ফলে রাষ্ট্রযন্ত্র অচল হয়ে না যায়। যদি প্রথম উত্তরসূরি দায়িত্ব নিতে না পারেন, তাহলে দ্বিতীয়, তৃতীয় বা চতুর্থ ব্যক্তিও যেন সঙ্গে সঙ্গে প্রস্তুত থাকেন।

একই সময়ে একটি সংকীর্ণ অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠীকে নাকি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার অনুমতিও দেওয়া হয়েছিল, যদি শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এটিই আসলে মোজাইক প্রতিরক্ষার একই যুক্তির প্রতিফলন: পুরো ব্যবস্থাকে কোনো একক কেন্দ্র বা নোডের ওপর নির্ভরশীল হতে দিও না। এমনভাবে কাঠামো গড়ে তোলো, যাতে বড় ধাক্কা লাগার পরও রাষ্ট্র তার কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারে।

এখন এটি কেন গুরুত্বপূর্ণ

কারণ, এই মতবাদ ইঙ্গিত দেয়, ইরান সম্ভবত সেই ধরনের যুদ্ধের জন্যই প্রস্তুতি নিচ্ছিল, যেটি তাদের প্রতিপক্ষ দ্রুত ভেঙে দিতে চেয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে দ্রুত আধিপত্য প্রতিষ্ঠা, নির্ভুল লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত এবং নেতৃত্বকে নির্মূল করার কৌশলের ওপর নির্ভর করেছে। সেই ধারণায় কমান্ড সেন্টার, যোগাযোগ অবকাঠামো ও শীর্ষ নেতাদের ধ্বংস করলে একটি ব্যবস্থার দ্রুত পতন বা অন্তত কৌশলগত অচলাবস্থা তৈরি হওয়ার কথা।

ইরানের জবাব ছিল এই ফলাফল এড়ানোর জন্য ব্যবস্থা তৈরি করা। এতে ব্যবস্থাটি অজেয় হয়ে যায় না। কিন্তু এর মানে হলো, এটি শুরু থেকেই বড় ধরনের ক্ষতি ও বিশৃঙ্খলার সম্ভাবনা মাথায় রেখে তৈরি করা হয়েছে। ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য এতে অতিরিক্ত স্তর, বিকেন্দ্রীকরণ এবং সাংগঠনিক সহনশীলতা যুক্ত করা হয়েছে।

এই পদ্ধতি শুধু বাইরের হুমকি থেকেই তৈরি হয়নি। ইরানের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ ইতিহাসও এতে প্রভাব ফেলেছে। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর নতুন সরকার সশস্ত্র বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর সহিংস চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল মুজাহেদিন–ই–খালক, যাদের হত্যাকাণ্ড ও বোমা হামলা নেতৃত্বকেন্দ্রিক একটি ব্যবস্থার দুর্বলতাকে প্রকাশ করে দেয়।

এ ছাড়া, ইরান–ইরাক যুদ্ধের আট বছরের ক্ষয়যুদ্ধও একই শিক্ষা দেয়। দীর্ঘ সেই সংঘাত ইসলামী প্রজাতন্ত্রকে শুধু সামরিক সমাবেশ ও সহনশীলতার অভিজ্ঞতাই দেয়নি, বরং দীর্ঘ যুদ্ধের মধ্যেও কীভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হয়, সেটিও শিখিয়েছে।

ধাক্কা সহ্য করার জন্য নির্মিত একটি মতবাদ

সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনা করলে একটি সহজ উপসংহার সামনে আসে: ইরানের কৌশল সংক্ষিপ্ত সময়ের সংঘর্ষের জন্য তৈরি ছিল না। বরং তাদের কৌশল এমন এক যুদ্ধের কথা মাথায় রেখে তৈরি করা হয়েছে, যেখানে কমান্ডাররা নিহত হতে পারেন, যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে, অবকাঠামোতে আঘাত আসতে পারে এবং কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব চাপে পড়তে পারে। তবু রাষ্ট্র, সশস্ত্র বাহিনী এবং বৃহত্তর নিরাপত্তা ব্যবস্থা কার্যক্রম চালিয়ে যাবে।

এটাই মোজাইক প্রতিরক্ষার মূল তাৎপর্য। এটি শুধু সামরিক কৌশল নয়; এটি টিকে থাকার একটি তত্ত্ব। এই ধারণা ধরে নেয় যে—শত্রু আকাশে আধিপত্য বিস্তার করতে পারে, প্রথম আঘাত হানতে পারে এবং শক্তিশালী আক্রমণ চালাতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে এটি ধরে নেয়, যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করা সম্ভব, সেটিকে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব, এবং দ্রুত জয়ের আশা ব্যাহত করার মতো ব্যয়বহুল করে তোলা সম্ভব।

‘চতুর্থ উত্তরসূরি’ ধারণাটি এখানেই এসে মিলে যায়। এটি ইরানের সংঘাত–দৃষ্টিভঙ্গির একটি জানালা খুলে দেয়। সেখানে ধারণা হলো, পুরো ব্যবস্থা যেন ধাক্কা শোষণ করতে পারে, যুদ্ধের মাঝেই নিজেকে পুনর্গঠন করতে পারে এবং সময়কে নিজের প্রতিরক্ষার অংশে পরিণত করতে পারে। সেই অর্থে কোনো নেতার মৃত্যু—এমনকি খামেনির মতো কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্বের মৃত্যুও—এই লড়াইয়ের সমাপ্তি নির্দেশ করার জন্য তৈরি করা হয়নি। বরং এই মতবাদ এমনভাবেই নির্মিত হয়েছে, যাতে সেটি সেই মৃত্যুকেও অতিক্রম করে টিকে থাকতে পারে।

অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

সিঙ্গাপুর সফরের আগের দিন সাবেক গভর্নরের পিএস কামরুলসহ দুজনের বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা

নেতানিয়াহু নিহত বা গুরুতর আহত হওয়ার দাবি ইরানি গণমাধ্যমের, ‘গুজব’ বলে উড়িয়ে দিচ্ছে ইসরায়েল

ইরান যুদ্ধ থেকে ‘প্রস্থানের পথ’ খুঁজছে ইসরায়েল

বাঁচা-মরার লড়াইয়ে সব ধ্বংসের পথ বেছে নেবে তেহরান

হরমুজ প্রণালিতে যুদ্ধজাহাজ পাঠাচ্ছে ফ্রান্স

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত