
চলছে অমর একুশে বইমেলা, কিন্তু প্রচারমাধ্যম জানান দিচ্ছে সেখানে বইয়ের ক্রেতা নেই। বইপাঠে এ দেশের মানুষের অনীহা এমন মাত্রায় পৌঁছেছে যে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি-বেসরকারি লাইব্রেরিগুলো পাঠকশূন্য হয়ে পড়েছে। বইয়ের তাকে ধুলাবালু জমতে জমতে বইগুলো উই, ইঁদুর আর তেলাপোকার খাদ্যে পরিণত হচ্ছে। পুরোনো ও ঐতিহ্যবাহী বহু লাইব্রেরি ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। এ দেশের মানুষ কেন বইবিমুখ? তাদের বইয়ের কাছে আনার উপায় কী? এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রেরই বা করণীয় কী? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই এ লেখা।
‘বই’ কথাটি উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে সুই-সুতোয় গাঁথা কিংবা আঠায় মলাটবদ্ধ কাগজের পাতা; যাতে মুদ্রিত, লিখিত বা অঙ্কিত থাকে মানুষের ভাবনা-কল্পনা তথা অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানের বিচিত্র উপাদান। সময়ের বিবর্তনের প্রযুক্তির উৎকর্ষের সঙ্গে বইয়েরও উৎকর্ষ সাধিত হয়েছে। একসময়ে যা তালপাতা, চামড়া কিংবা ভূর্জপত্রে লেখা হতো, মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কারের পর তা বাহারি কালি আর কাগজে মুদ্রিত হয়। বর্তমানে তা রূপ নিয়েছে ইলেকট্রনিক বা ডিজিটাল ফরম্যাটে। বইয়ের জন্য এখন আর ছুটতে হয় না লাইব্রেরি কিংবা পুস্তক-বিপণিতে, স্ক্রিনে টাচ করলেই চোখের পলকে সামনে চলে আসে বইয়ের পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা!
মানবসভ্যতায় বই এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে তা নিয়ে রচিত হয়েছে অনেক আপ্তবাক্য। কেউ বলেছেন, একটি ভালো বই হলো বর্তমান ও চিরকালের জন্য সবচেয়ে উৎকৃষ্ট বন্ধু। কারও মতে, বই হলো এমন এক মৌমাছি, যা অন্যদের সুন্দর মন থেকে মধু সংগ্রহ করে পাঠকের জন্য নিয়ে আসে। অনেকে বইয়ের শ্রেষ্ঠত্ব নিরূপণ করে তা পড়া এবং কেনার প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন। সৈয়দ মুজতবা আলী বলেছেন, বই কিনে কেউ দেউলিয়া হয় না। দেকার্তে বলেছেন, ভালো বই পড়া মানে গত শতাব্দীর সেরা মানুষদের সঙ্গে কথা বলা। বই নিয়ে অনেক রসাত্মক কথাও প্রচলিত আছে। বিশেষ করে, বই চুরি হওয়া এবং ধার নেওয়া বিষয়ে। পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি চুরি হওয়া বই হলো বাইবেল। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বই ধার নিলে কেউ ঠিকমতো ফেরত দিতে চায় না, দিলেও তা যেমন ছিল তেমন থাকে না। এ কারণে বলা হয়ে থাকে, বই এবং বউ অন্যের কাছে দিতে নেই, কারণ উভয়ই নষ্ট-ভ্রষ্ট হয়ে ফেরত আসে। বইয়ের যে এত গুরুত্ব, তা অন্য জাতি বুঝলেও বাঙালি আজও বুঝতে পারেনি। সে জন্য তারা সব দিক থেকে পিছিয়ে রয়েছে।
বই পড়ায় বাঙালির পিছিয়ে পড়ার মাত্রা কতটা প্রবল, তা উঠে এসেছে সাম্প্রতিক সময়ের এক জরিপে। জরিপটি পরিচালনা করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘সিইও ওয়ার্ল্ড ম্যাগাজিন’। এতে বাংলাদেশের মানুষের পাঠাভ্যাসের যে চিত্র সামনে এসেছে, তা খুবই হতাশাব্যঞ্জক। জানা গেছে, বিশ্বের ১০২টি দেশের মধ্যে পাঠাভ্যাসে বাংলাদেশের স্থান ৯৭তম। বইপড়ার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকেরা যেখানে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৩৫৭ ঘণ্টা ব্যয় করে, সেখানে আমাদের দেশের মানুষ ব্যয় করে গড়ে মাত্র ৬২ ঘণ্টা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন প্রচারমাধ্যমে এ নিয়ে চলছে তুমুল আলোচনা। রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের ব্যক্তিরাও বিষয়টি নিয়ে ভাবিত। ভাবনার বিষয়ই বটে। এ সুযোগে বইয়ের জগতের একজন মানুষ হিসেবে নিজের কিছু অভিজ্ঞতা, ভাবনা ও মতামত তুলে ধরার লোভ সংবরণ করতে পারলাম না।
একসময় জ্ঞান আহরণ ও বিনোদনের প্রধান মাধ্যম ছিল বই। ফলে পড়তে জানা মানুষ সময় পেলে বই পড়ত। পড়তে না জানা লোকেরাও অন্যের বইপড়া শুনে নিজের জ্ঞানস্পৃহা নিবারণ করত। তথ্যপ্রযুক্তির উন্নতি ও অবাধ প্রবাহে মানুষের জ্ঞান আহরণ এবং বিনোদনের চমকপূর্ণ সব উপায় (ফেসবুক, ইউটিউব ইত্যাদি) উদ্ভাবন, সামাজিক-রাজনৈতিক অবক্ষয় প্রভৃতি কারণে বইপাঠের প্রতি মানুষের আগ্রহ কমেছে। এ ছাড়া সর্বত্র জ্ঞানের চেয়ে অর্থের আধিপত্য এবং সনদসর্বস্ব শিক্ষা এ দেশের মানুষকে বইবিমুখ করেছে। বাড়ির ড্রয়িংরুমে মূল্যবান আসবাব আর দামি শো-পিস স্থান পেলেও বইয়ের কোনো স্থান নেই! চায়ের দোকান, জুয়ার আসর, নেশাদ্রব্য আর মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে আসক্ত হয়ে ধ্বংস হচ্ছে নতুন প্রজন্ম। এর ফলে বাইরে চাকচিক্য ও ঠাটবাট বাড়লেও মানুষের ভেতরটা ক্রমে ক্ষয়িষ্ণু হতে হতে অন্তঃসারশূন্য সমাজ গড়ে উঠছে, যা রাষ্ট্রকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিচ্ছে। এ থেকে পরিত্রাণ পেতে রাষ্ট্রকেই এগিয়ে আসতে হবে। কেননা, আমাদের দেশে বইপাঠ বিষয়ে রাষ্ট্রীয় কোনো পলিসি নেই। ফলে রাষ্ট্র পরিচালিত গ্রন্থাগার অধিদপ্তর, গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তর প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান থাকলেও সেগুলো কেবল কর্তাব্যক্তিদের তালিকামতো বই কিনে রাষ্ট্রীয় অর্থের শ্রাদ্ধ করছে বটে, কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। তাই রাষ্ট্রের প্রথম কাজ বইপাঠের কার্যকর পলিসি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠানকে জনগণের দোরগোড়ায় নিয়ে যেতে হবে। এমন সব উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে, যা কেবল কাগজে-কলমে নয়, বাস্তবে মানুষকে বইমুখী করতে সহায়ক হবে।
স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠদান ও পরিচালনার ব্যক্তিগত দুই যুগের বেশি সময়ের অভিজ্ঞতার আলোকে বলতে পারি, রাষ্ট্র দায়িত্ব নিয়ে কার্যকর কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করলে মানুষকে বইমুখী করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে প্রথম যে কাজটি করতে হবে তা হলো—প্রতিটি স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসায় লাইব্রেরি স্থাপন, লাইব্রেরিয়ান নিয়োগ ও প্রতিদিনের রুটিনে কমপক্ষে এক ঘণ্টা লাইব্রেরিতে পড়া বাধ্যতামূলক করা। প্রতি সপ্তাহে লাইব্রেরিতে পঠিত বই ও পত্রিকার (যেগুলো সিলেবাসের বাইরে) ওপর কুইজ চালু এবং পরীক্ষার ফলে তা থেকে নির্দিষ্ট হারে নম্বর যোগ করতে হবে। প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক চালু আছে গ্রামের এমন পর্যায়ের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এ ধরনের কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলাম। তাতে আশানুরূপ ফল পাওয়া গিয়েছিল। সাহিত্য, ইতিহাস, সমাজ, ধর্ম, রাজনীতি, অর্থনীতি, বিজ্ঞান, দর্শন প্রভৃতি বিষয়ে বইপাঠে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ ও কৌতূহল দেখে বিস্মিত হয়েছি। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও লক্ষ করেছি, সিলেবাসের বাইরে বই নির্ধারণ করে তা থেকে ক্লাস টেস্ট ও অ্যাসাইনমেন্ট গ্রহণ করলে শিক্ষার্থীরা বাধ্য হয়ে বই পড়ে। কিন্তু এতে একটি বিষয় লক্ষ করেছি, তা হলো, ছোটবেলা থেকে সনদসর্বস্ব শিক্ষা গ্রহণে অভ্যস্ত শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার বৈতরণি পার হওয়ার জন্য বাধ্য হয়ে কিছু বই পড়ে বটে, তবে তা তাদের অভ্যাসে পরিণত হয় না। তাই শুরু করতে হবে শৈশব থেকে, একেবারে শিশু শ্রেণিতে ভর্তির পর থেকে।
সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে পরিচালিত লাইব্রেরিগুলোতে পাঠক যাতে আসে, সে জন্য বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। শিক্ষার্থীরা যাতে এসব লাইব্রেরিতে পড়তে আসে সে জন্য শিক্ষকদের সঙ্গে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরে মসজিদভিত্তিক বইপাঠ কার্যক্রম গ্রহণ করা যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে মসজিদগুলোতে লাইব্রেরি স্থাপন করে মানসম্পন্ন বই সরবরাহ করতে হবে। সমাজে মসজিদের ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের বিশেষ প্রভাব রয়েছে। তাঁদের বেতন-ভাতা প্রদানপূর্বক সে প্রভাব কাজে লাগাতে হবে। মক্তবে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি অন্য বইপাঠে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ সৃষ্টি করলে, তার সুফল পাওয়া যাবে। এ ছাড়া নামাজের সময় মুসল্লিদের এ বিষয়ে সচেতন করা যেতে পারে। সরকারি উদ্যোগে গ্রাম-মহল্লায় লাইব্রেরি স্থাপন করে তাতে বই সরবরাহ, রক্ষণাবেক্ষণ ও পঠন-পাঠনের ব্যবস্থা করতে হবে। পার্ক, শপিং মল, এমনকি বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশন এবং লঞ্চঘাটের যাত্রী ছাউনিতে বুক কর্নার স্থাপন করে বইপাঠের ব্যবস্থা করতে হবে। ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশনসহ রাষ্ট্রীয় সব অফিসে ছোট্ট লাইব্রেরি স্থাপন করতে হবে। এভাবে বইপাঠকে সামাজিক কর্মসূচি হিসেবে গ্রহণ করলে ভালো ফল পাওয়া যাবে।
প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বইপাঠ বিষয়ে বিভিন্ন প্রতিযোগিতা আয়োজন করে পুরস্কার প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে। এ ছাড়া বছরের শুরুতে বইপাঠ সপ্তাহ আয়োজন করে বই নিয়ে নানা এবং বইপাঠের উপকারিতার বিষয়ে সমাজের বিশিষ্টজনদের নিয়ে আলোচনা সভাসহ বছরব্যাপী কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। রাষ্ট্রীয় প্রচারমাধ্যমগুলোতে বইপাঠ বিষয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠান প্রচারের ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অভিভাবক সমাবেশ করে অভিভাবকদের সচেতন করতে হবে, যাতে বাড়িতে তাঁরা সন্তানদের বইপাঠে অভ্যস্ত করেন। শিক্ষকদের গাইডবই ছেড়ে মূল বই ও অন্যান্য বই প্রাত্যহিক পাঠ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। শিক্ষার্থীদের বইমুখী করার মূল দায়িত্ব তাঁদেরই গ্রহণ করতে হবে।
এভাবে রাষ্ট্র যদি কার্যকর পলিসি গ্রহণ করে বাস্তবসম্মত সব উদ্যোগ গ্রহণ করে তবে বইপাঠে মানুষ আগ্রহী হবে। কেবল বক্তব্য-বিবৃতি দিয়ে নয়, রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রত্যক্ষ উদ্যোগ গ্রহণ দ্বারাই নতুন প্রজন্মকে বইমুখী করা সম্ভব। এসব উদ্যোগ যত তাড়াতাড়ি গ্রহণ করা যাবে, তত দ্রুত জাতির কল্যাণ সাধিত হবে।
লেখক: অধ্যাপক, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

আলোচনা চলা অবস্থায় সাফল্যের আভাসের মধ্যে কোনো উসকানি ছাড়াই ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা সামরিক আগ্রাসনের ৯ দিন পেরিয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল প্রথম দিনের বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি, তাঁর নিরাপত্তা উপদেষ্টা আলী শামখানি, সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান...
২০ ঘণ্টা আগে
নেপালে রাজতন্ত্র বিলোপের পরে ক্ষমতাসীন দলগুলো জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারায় সেখানকার রাজনীতিতে একধরনের অস্থিরতা বিরাজমান ছিল। দুর্নীতিসহ নানা ধরনের সংকটে জনগণ ক্ষুব্ধ ছিল। জনগণের সেই ক্ষোভ কাজে লাগিয়ে এবারের নির্বাচনে জেন-জিদের...
২০ ঘণ্টা আগে
ওবায়দুল হক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক। তিনি কর্মরত আছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে। সম্প্রতি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলা, ইসরায়েলের উদ্দেশ্য, ইরানের সঙ্গে চীন ও রাশিয়ার মিত্রতা ইত্যাদি নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা...
২ দিন আগে
মানবসভ্যতার সঙ্গে কাগজ ও বই ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যখন কাগজ ছিল না তখন তালপাতায় লেখা হতো, তালপাতার পুঁথি এখনো অনেক জাদুঘরে গেলে দেখা যায়। তারও আগে মানুষ কিসে লিখত? হয় পাথরে না হয় গুহার দেয়ালে। অনেক জাদুঘরে শিলালিপির দেখা আমরা পাই।
২ দিন আগে