Ajker Patrika

ইরান যুদ্ধ এবং দেশের সংকট মোকাবিলার চ্যালেঞ্জ

যুদ্ধের কারণে আকাশপথে চলাচল ব্যাপকভাবে বিঘ্নিত হওয়ায় পোশাক রপ্তানির প্রচুর জরুরি চালান বিমানবন্দরে আটকা পড়েছে। অন্যদিকে একই কারণে লোহিতসাগর ও সুয়েজ খালসহ উপসাগরীয় গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রুটগুলো কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সমুদ্রপথে পরিবহন নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

অরুণ কর্মকার
আপডেট : ১৪ মার্চ ২০২৬, ০৮: ১৯
ইরান যুদ্ধ এবং দেশের সংকট মোকাবিলার চ্যালেঞ্জ
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাব ইতিমধ্যে পড়তে শুরু করেছে দেশের তৈরি পোশাক খাতে। ছবি: সংগৃহীত

দেশে একটি নতুন সরকারের যাত্রা কেবল শুরু হয়েছে। এই সরকারের কাছে জাতির অনেক প্রত্যাশা। তার মধ্যে সামাজিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন, জীবনযাত্রার ব্যয়ভার কমানো এবং তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার বিষয় আছে। এর বাইরে আরও অনেক কিছুরই প্রত্যাশা আছে। তবে সরকার তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে যে আন্তরিক, তা বোঝা যাচ্ছে ফ্যামিলি কার্ড উদ্বোধন করার মধ্য দিয়ে।

এমনিতেই দেশ অনেক সমস্যায় জর্জরিত। আগে থেকেই এসব সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে এবং চলে এসেছে। অর্থনীতির ভঙ্গুর অবস্থা—বিপুল পরিমাণ ঋণের বোঝা, বিনিয়োগে মন্দা, এডিপি বাস্তবায়নে স্থবিরতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং সীমাহীন বেকারত্ব প্রভৃতি। এই পরিস্থিতির মধ্যে যখন নতুন সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেল, ঠিক তখনই শুরু হলো ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ সামরিক হামলা। ফলে তার প্রভাব শুধু বাংলাদেশকে নয়, সারা পৃথিবীকে এক নতুন বাস্তবতায় ফেলে দিয়েছে।

এই যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশ জ্বালানি সংকটের মধ্যে পড়েছে। এমনিতেই আমাদের জ্বালানি খাত সাত-আট বছর ধরে আমদানিনির্ভর। পরিশোধিত-অপরিশোধিত তেল, এলএনজি, কয়লা প্রভৃতি আমাদের আমদানি করতে হয়। আবার এসব পণ্যের চাহিদা দিন দিন বেড়েই চলছে। কারণ, দেশের নিজস্ব জ্বালানি সম্পদের অনুসন্ধান ও আহরণ নেই বললেই চলে।

আমাদের বর্তমান জ্বালানি আমদানি সম্পূর্ণই মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর। চলমান যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে স্বাভাবিকভাবে জ্বালানির সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। কত দিন বন্ধ থাকবে, তা-ও অনিশ্চিত। কারণ, যুদ্ধ বন্ধের কোনো সম্ভাবনা আপাতত দেখা যাচ্ছে না। কারণ, ইতিমধ্যে দুবার ইরান তাদের দেওয়া যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছে। সর্বশেষ ইরানের প্রেসিডেন্ট যুদ্ধবিরতির জন্য তিনটি শর্ত আরোপ করেছেন।

সুতরাং পরিস্থিতি বিবেচনায় জ্বালানির স্বাভাবিক সরবরাহ কবে পাওয়া যাবে, তা বলা যাচ্ছে না। অথচ সেই জ্বালানির ওপরই নির্ভরশীল আমাদের বিদ্যুৎ, সার ও খাদ্য উৎপাদন। নির্ভরশীল আমাদের শিল্প-কলকারখানাসহ সমগ্র উৎপাদন খাত। এই উৎপাদন খাতের সঙ্গে আবার সম্পৃক্ত রপ্তানি বাণিজ্য। সুতরাং জ্বালানির স্বাভাবিক সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়া মানে সবকিছুর মধ্যে অনিশ্চয়তা দেখা দেওয়া। তবে সরকারের চেষ্টায় কোনো ত্রুটি নেই। সরকার একদিকে যেমন রেশনিং করে জ্বালানি সাশ্রয়ের পদক্ষেপ নিয়েছে, তেমনি মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে সম্ভাব্য অন্যান্য উৎস থেকে জ্বালানি আমদানির চেষ্টা করছে। হরমুজ প্রণালিতে বাংলাদেশের জ্বালানিবাহী জাহাজ নিরাপদ রাখার জন্য সরকার যেমন ইরানের সহায়তা চেয়েছে, তেমনি ভারতের কাছে চুক্তির বাইরেও অতিরিক্ত কিছু পরিমাণ জ্বালানি চেয়েছে। এই দুই জায়গায় সরকার ইতিবাচক সাড়াও পেয়েছে। চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারের আন্তরিকতা বোঝা গেছে, রাশিয়া থেকে তেল আমদানির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অনুমতি চাওয়ার মধ্য দিয়ে।

তবে এই অনুমতি চাওয়ার বাধ্যবাধকতা করার ঘটনাটি ঘটিয়েছে বিগত অন্তর্বর্তী সরকার। তারা ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড’ নামের একটি বাণিজ্য চুক্তি করেছে ক্ষমতা ছাড়ার দুই সপ্তাহ আগে। এ কারণে আজ রাশিয়ার জ্বালানি আমদানির জন্য তাদের অনুমতি চাইতে হচ্ছে। এই প্রসঙ্গে বলতে হয়, নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী দায়িত্ব পাওয়ার পর বলেছিলেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় প্রতিশ্রুতি হলো ‘বাংলাদেশ আর কারও কথার অধীনে থাকবে না’। হয়তো তিনি ঠিকই বলেছেন। কথার অধীনে থাকবে না। তবে অনুমতি নিয়ে চলতে হবে। এটা শুধু জ্বালানির ক্ষেত্রে নয়, আমদানি বাণিজ্যসহ আরও অনেক অনেক ক্ষেত্রে কথাটির সত্যতা আছে। কিন্তু কথা হলো, সরকার যতই আন্তরিক চেষ্টা চালাক না কেন, যুদ্ধ বন্ধ না হলে জ্বালানির সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়াটা প্রায় অসম্ভব।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাব ইতিমধ্যে পড়তে শুরু করেছে দেশের তৈরি পোশাক খাতে। যুদ্ধের কারণে আকাশপথে চলাচল ব্যাপকভাবে বিঘ্নিত হওয়ায় পোশাক রপ্তানির প্রচুর জরুরি চালান বিমানবন্দরে আটকা পড়েছে। অন্যদিকে একই কারণে লোহিতসাগর ও সুয়েজ খালসহ উপসাগরীয় গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রুটগুলো কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সমুদ্রপথে পরিবহন নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ফলে দেশে রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস পোশাক খাতে বন্ধ্যা পরিস্থিতি সৃষ্টির আশঙ্কা করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। তাঁরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এখন শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তা নয়, বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করেছে। বিশেষ করে প্রায় আট মাস ধরে রপ্তানি খাত নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির চাপে রয়েছে। তার মধ্যে নতুন এই পরিস্থিতি অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে বলে মনে করছেন তাঁরা। চলতি অর্থবছরে রপ্তানি আয় ৩ দশমিক ২ শতাংশ কমেছে, বিপরীতে জানুয়ারি পর্যন্ত আমদানি ব্যয় বেড়েছে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ।

বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তি আমাদের জন্য আরেকটি বড় ফাঁদ। এই চুক্তি কার্যকর হলে বছরে সরকারের প্রায় ১ হাজার ৩২৭ কোটি টাকার আমদানি শুল্ক রাজস্ব হারানোর আশঙ্কা রয়েছে বলে জানিয়েছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। একই সঙ্গে এই চুক্তির কারণে বাংলাদেশের জন্য বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) আওতাভুক্ত অন্যান্য দেশকেও একই ধরনের সুবিধা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি হতে পারে, যা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে মনে করছে সিপিডি।

এই চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা প্রায় সাড়ে ৪ হাজার পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিতে হবে। এ ছাড়া আগামী পাঁচ থেকে দশ বছরের মধ্যে আরও ২ হাজার ২১০ ধরনের পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়ার কথা রয়েছে। চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে নির্দিষ্ট কিছু পণ্য কেনার শর্ত থাকায় সরকারের ব্যয়ও বাড়তে পারে। এ কারণে চুক্তিটির রাজস্ব আয় ও সরকারি ব্যয়ের ওপর প্রভাব সরকারকে পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করা দরকার। যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনার পর এই আলোচনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

এমনিতেই দেশে অভ্যন্তরীণ ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ পরিস্থিতি খুব খারাপ। সরকারের রাজস্ব ঘাটতি প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। ফলে সরকারকে ব্যাংকিং খাতের ওপর বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে। চলতি অর্থবছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকার ব্যাংকিং খাত থেকে ৫৯ হাজার ৬৫৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। বিপরীতে ব্যাংকবহির্ভূত ঋণ ও বৈদেশিক সহায়তা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। সরকার ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ায় আর্থিক খাতে ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাচ্ছে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নেও ধীরগতি দেখা যাচ্ছে।

গত বৃহস্পতিবার থেকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশন শুরু হয়েছে। সেখানে যেটুকু রাজনৈতিক উত্তাপ ছিল আপাতত সেটাকে গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হিসেবে দেখা যেতে পারে। তবে সংসদের কার্যক্রম নিয়ে গুরুতর কিছু রাজনৈতিক প্রশ্ন সৃষ্টি হয়েছে। ভবিষ্যতে রাজনীতির উত্তাপ কতটা বাড়ে তা সময়ই বলে দেবে। তবে বাংলাদেশের প্রতিটি সরকারকেই এই বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে মাথা ঘামাতে হয়।

অরুণ কর্মকার, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

জাল সনদে ১২৮ শিক্ষক, ফেরত দিতে হবে টাকা

রাত থেকে গণপরিবহনে তেল নেওয়ার সীমা থাকছে না: সড়কমন্ত্রী

‘সামান্তারা বিক্রি হয়’ মন্তব্য শাহরিয়ারের, ক্ষমা চাইতে বললেন এনসিপি নেতারা

মধ্যপ্রাচ্যের পথে ২৫০০ মেরিন সেনা, স্থল অভিযানের ইঙ্গিত পেন্টাগনের

মাথাবিহীন লাশটি বরিশালের গোপালের, মাথার খোঁজে নদীতে তল্লাশি

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত