ইরান যুদ্ধকে ঘিরে বেশ বেকায়দায় পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলার প্রতিক্রিয়ায় হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে ইরান। এরপর এই প্রণালি খোলা রাখার জন্য মিত্রদের সাহায্য চেয়েও পাচ্ছেন না মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কোনো মিত্র তাঁর মুখে ওপর না করে দিয়ে বলেছে, তারা যুদ্ধে জড়াবে না। কেউ আবার শান্তির কথা বলে পিছিয়ে গেছে। যদিও যুদ্ধ শুরুর আগে মনে হয়নি যে মিত্ররা ট্রাম্পের পাশে থাকবে না। তবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পণ্যবাহী জাহাজের চলাচল নিশ্চিত করতে গিয়ে স্বার্থের দ্বন্দ্বই এখন সামনে চলে এসেছে।
হরমুজের নিরাপত্তা প্রথমে যুক্তরাষ্ট্র একাই নিশ্চিত করতে চেয়েছিল। তবে এই অবস্থান থেকে সরে মিত্রদের কাছে সহায়তা চেয়েছিলেন ট্রাম্প। তবে মিত্ররা তাঁর আহ্বান সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করে গত রোববার ট্রাম্প হুঁশিয়ারি উচ্চারণ দিয়েছেন, পশ্চিমাদের সামরিক জোট ন্যাটোর জন্য এই আচরণ ভালো ফল বয়ে আনবে না। পরে গত মঙ্গলবার তিনি বলেন, ‘ন্যাটো, জাপান বা দক্ষিণ কোরিয়া- কারও সাহায্যই আমাদের প্রয়োজন নেই। আমরা বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিধর রাষ্ট্র। তবে তাদের উচিত ছিল আমাদের সঙ্গে যোগ দেওয়া। তারা আহাম্মকের মতো সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’
প্রণালি বন্ধের জেরে দুই সপ্তাহের ব্যবধানে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ৭৩ মার্কিন ডলার থেকে ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে। তারপরও ট্রাম্প মিত্রদের পাশে পাচ্ছেন না। কারণ, ইউরোপীয় ইউনিয়নের আশঙ্কা, তাদের অংশগ্রহণ যুদ্ধের পরিধি ব্যাপক করবে, যা বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার জন্য ভয়াবহ হুমকি হতে পারে। জার্মানি সরাসরি ট্রাম্পের প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছে। রোমানিয়া জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের চেয়ে কৃষ্ণসাগরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তার দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ইরানের সঙ্গে ইইউ কোনো যুদ্ধে জড়ায়নি বলে উল্লেখ করেছে লুক্সেমবার্গ। তারা বলছে, দেশটি বড়জোর যুক্তরাষ্ট্রকে যোগাযোগ বা প্রযুক্তিতে কিছু সহায়তা করতে পারে। ফ্রান্স প্রথমে হরমুজের নিরাপত্তায় নৌবহর পাঠাতে রাজি হয়েছিল। তবে পরে তারা জানায়, পরিস্থিতি শান্ত হওয়া পর্যন্ত তারা অপেক্ষা করবে। অপরদিকে স্পেন তো সমালোচনা করে বলেই দিয়েছে, এই হামলার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যকে আরও অস্থিতিশীল করা হলো।
যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আর্থিক ও সামরিকভাবে তার মিত্ররা যতটা নির্ভরশীল, সে বিবেচনায় মিত্রদের এভাবে বেঁকে বসার ঘটনা বিস্ময়কর বটে! যেমন, ন্যাটোর আর্থিক ব্যয়ের অর্ধেক যুক্তরাষ্ট্র একাই বহন করে। আবার দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের নিরাপত্তায় সহায়তা দিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। এ ক্ষেত্রে মিত্রদের থেকে সহযোগিতা পাওয়াটাই স্বাভাবিক মনে হলেও, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সূত্র কিন্তু ভিন্ন কথাই বলে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ বলে, স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থায় কারও সঙ্গে জোট করা মানেই তার আহ্বানে যেকোনো যুদ্ধে যোগ দেওয়া নয়।
এর ব্যাখ্যায় মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী গ্লেন স্নাইডারের শরণাপন্ন হওয়া যেতে পারে। তাঁর ‘জোটগত রাজনীতিতে নিরাপত্তা সংকট (সিকিউরিটি ডিলেমা ইন অ্যালায়েন্স পলিটিকস)’ প্রবন্ধ অনুযায়ী, নিরাপত্তার জন্য একাধিক দেশ জোটবদ্ধ হলেও, প্রত্যেকেই দুটি বিষয় নিয়ে শঙ্কায় থাকে। প্রথমত দুর্দিনে মিত্ররা তাকে ভুলে যাবে কি না এবং দ্বিতীয়ত, অযথা কোনো যুদ্ধে জড়িয়ে যেতে বাধ্য হয় কি না। ইরান ইস্যুতে মূলত দ্বিতীয় শঙ্কাতেই ভুগছে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররা। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ডাকে সাড়া দিয়ে যদি মিত্ররা সেনা সহায়তা পাঠায়, তারা নিজেরাও জড়িয়ে যেতে পারে এক দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে, যার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দায় টানতে হবে ওই দেশগুলোকেই। পরিস্থিতি বেশি বেহাত হলে একটি বিশ্বযুদ্ধ বেঁধে যাওয়াও অসম্ভব নয়। মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্টিফেন এম ওয়াল্ট এ বিষয়ে বলেছেন, জোটসঙ্গীরা এমন যুদ্ধে জড়াতে চায় না, যা তারা পারতপক্ষে এড়াতে পছন্দ করে।
এ ছাড়া, সাধারণত একটি রাষ্ট্র যুদ্ধে জড়ায় কোনো হুমকি ঠেকাতে অথবা নির্দিষ্ট কোনো স্বার্থ আদায়ে। এ বিষয়ে ‘হুমকির ভারসাম্য (ব্যালেন্স অব থ্রেট)’ তত্ত্ব দিয়েছেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্টিফেন এম ওয়াল্টজ। তিনি বলেছেন, কোনো রাষ্ট্র তার বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সব হুমকির মধ্যে ভারসাম্য বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়।
ভৌগোলিকভাবে ইরান অধিকাংশ মার্কিন মিত্রের জন্য মারাত্মক কোনো হুমকি নয়। যেমনটা বলা যায় জাপান বা দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে চীন বা উত্তর কোরিয়া প্রধান মাথাব্যথার কারণ। আবার ইউরোপীয় দেশগুলোর প্রধান শত্রু রাশিয়া। ইরান তাদের জন্য একটি বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে জ্বালানি তেলের পরিবহন দীর্ঘ মেয়াদে বন্ধ রেখে। তবে রাষ্ট্র সাধারণত সরাসরি অস্তিত্বের হুমকিতে না পড়লে যুদ্ধে জড়াতে চায় না। জার্মান প্রতিরক্ষামন্ত্রী তো গত সোমবার বলেই দিয়েছেন, ‘এটা আমাদের যুদ্ধ না, আর আমরা এটা শুরুও করিনি।’
যুদ্ধ শুরু করা যতটা সহজ, এর পরিধি ও গতিপথ নিয়ন্ত্রণ ঠিক ততটাই কষ্টসাধ্য। মার্কিন অর্থনীতিবিদ থমাস শেলিং বলেছেন, যুদ্ধ একবার বড় হওয়া শুরু করলে (এসকেলেশান) এটি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। শেষ পর্যন্ত বিষয়টি পরিণত হয় টিকে থাকার লড়াইয়ে, যেখানে প্রত্যেকেই চায় তার প্রতিপক্ষকে হার স্বীকার করতে।
এই আশঙ্কা থেকেই ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার গত সোমবার বলেছেন, তিনি কোনো বৃহত্তর যুদ্ধে জড়াতে আগ্রহী নন। বিশেষজ্ঞ ভালি নাসর সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের সঙ্গে কোনো সংঘাত সীমিত পরিসরে থাকার সম্ভাবনা কম। পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়েই এর প্রভাব পড়বে।
এ ছাড়া, বিশ্বের অনেক দেশ চাইলেই কোনো যুদ্ধে জড়াতে পারে না। অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তাকে পররাষ্ট্র সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হয়। মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রবার্ট পুটনাম তার ‘দুই ধাপের ক্রীড়াতত্ত্ব (টু লেভেল গেম থিওরি)’ আলোচনায় বলেছেন, দেশের শাসকদের পররাষ্ট্রনীতি এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতির মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হয়। দেশীয় রাজনীতির উল্টো পথে গিয়ে কোন আন্তর্জাতিক বোঝাপড়ায় গেলে তা হিতে বিপরীত হবে।
বাস্তববাদী ঘরানার বিশ্লেষকেরা বলেন, রাষ্ট্র কেবল নিজের স্বার্থ ছাড়া অন্য কিছু নিয়ে মাথা ঘামায় না। মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জন জে মার্শমেয়ার বলেছেন, যেসব দেশ বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তার করতে চায় (যেমন যুক্তরাষ্ট্র), দূরবর্তী কোনো দেশের মুখোমুখি অবস্থান নেওয়ার চেয়ে কার্যকরী পন্থা হবে আঞ্চলিক কোনো শক্তিকে দিয়ে সে কাজ করিয়ে নেওয়া।
এই ‘অফশোর ব্যালেন্সিং’ পন্থার কথা বিবেচনা করলে সহজেই বোঝা যায়, ইউরোপ বা এশিয়ার কোনো দেশের মধ্যপ্রাচ্য সংকটে জড়ানোর কোনো কৌশলগত কারণ নেই। যুক্তরাষ্ট্র আসলে কী স্বার্থে এই যুদ্ধে জড়িয়েছে সেটাও স্পষ্ট নয়। কারণ, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর বলেছিলেন, ইসরায়েলি হামলার প্রতিশোধ হিসেবে মার্কিন সেনাদের ওপর ইরান বড় ধরনের পাল্টা আঘাত হানতে পারে- এমন ‘আসন্ন হুমকি’র গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতেই ইরান জুড়ে আগাম হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র নিজেই নিজের স্বার্থে এই যুদ্ধে জড়িয়েছে কি না, সংশয় রয়েছে। ফলে তার মিত্ররা কেন এই যুদ্ধে জড়াবে সেই প্রশ্ন থেকেই যায়। আর যুদ্ধের যে ব্যয় সেই খরচ কোত্থেকে আসবে সেটাও প্রশ্ন। এ ছাড়া ইউক্রেন যুদ্ধে জেরবার ইউরোপের জন্যও আরেকটি যুদ্ধের চাপ নেওয়া কঠিন। দিন শেষে শুধু মিত্র বিবেচনায় নয়, স্বার্থটাও মুখ্য হয়ে উঠছে এই যুদ্ধে।

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের ডামাডোলে বাংলাদেশে জেট ফুয়েলের মূল্য বৃদ্ধি পেল গত দশ দিনে দুই দফায় ১০০ টাকা। বর্তমানে অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইট চলাচলের জন্য প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের মূল্য দাঁড়িয়েছে ১৯৪ টাকা ১৮ পয়সা। এর আগে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরী কমিশন (বিইআরসি) গত ৮ মার্চ প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের মূল্য....
২ ঘণ্টা আগে
মানুষ তথ্য পেতে চায় তাঁর আশপাশসহ সমাজে-রাষ্ট্রে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কী ঘটছে, তা জানতে। তথ্যপিপাসা মানুষের মজ্জাগত আকাঙ্ক্ষা। আমরা তথ্য সংগ্রহ করি মূলত বইপত্র, অন্যের মাধ্যমে ও সংবাদমাধ্যম থেকে।
১৭ ঘণ্টা আগে
আজ থেকে ২৬ বছর আগে আমার শিক্ষকতাজীবনের সূচনা। সেই দীর্ঘ পথচলার নানা বাঁক, অভিজ্ঞতা আর পরিবর্তনের সাক্ষী আমি। শিক্ষকজীবনের বর্ষপূর্তিতে শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে পেয়েছিলাম আ ন ম এহছানুল হক মিলন—তৎকালীন এক তরুণ, উদ্যমী শিক্ষা প্রতিমন্ত্রীকে।
১৭ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশে চাকরি, পাসপোর্ট, লাইসেন্সসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সেবাপ্রাপ্তির জন্য পুলিশ ভেরিফিকেশন একটি বাধ্যতামূলক প্রক্রিয়া। তবে এ প্রক্রিয়া নিয়ে নানা অভিযোগ ও সমালোচনা রয়েছে। অভিযোগ আছে, অনেক সময় অর্থের বিনিময়ে পুলিশ ভেরিফিকেশন ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক হয়ে যায়।
১৭ ঘণ্টা আগে