ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে দেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রম চাঙা হয়ে ওঠায় অর্থনীতিতে সাময়িক হলেও কিছুটা স্বস্তির হাওয়া বইছে। প্রথা অনুযায়ী, কেনা নতুন জামা-জুতা ও আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র ছাড়াও খাদ্য, পর্যটন, জাকাত ও পরিবহন খাতের মতো বিভিন্ন বিষয় মিলিয়ে এবারের ঈদ অর্থনীতির আকার দাঁড়াচ্ছে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা। একটি নির্দিষ্ট সময় ঘিরে এই নগদ লেনদেনের আকার সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ।
ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, গত কয়েক বছরের তুলনায় এবারের ঈদে বাজারে স্বস্তি ফিরেছে, যা অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যে নতুন গতি সঞ্চার করছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তাদের বেতন-বোনাস, রেমিট্যান্সের অর্থ, মন্ত্রী-এমপিদের দান এবং ব্যবসায়ীসহ ধনী ব্যক্তিদের জাকাত বিতরণকে কেন্দ্র করে ঈদে অর্থনীতির গতি বাড়ছে। তাঁদের ভাষায়, চলমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি না থাকলে এবং বিনিয়োগ পরিস্থিতির উন্নতি এবং কর্মসংস্থান বাড়লে এ অর্থনীতির আকার ভবিষ্যতে আরও বাড়বে।
বাংলাদেশ দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতি নাজমুল হাসান মাহমুদ আজকের পত্রিকাকে বলেছেন, এবারের ঈদে তাঁদের প্রত্যাশা ২ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার কেনাবেচা করার। ইতিমধ্যে ১ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা হয়েছে, যা গত ছয় বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতির তথ্যমতে, এবার নতুন পোশাক পণ্য বিক্রি বাবদ বেচাকেনা হতে পারে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার। ব্যবসায়ীরা বলছেন, রমজানের শুরু থেকেই বিক্রি বাড়তে থাকে, তবে ঈদের আগের সপ্তাহে বেশি বিক্রি হয়।
সেমাই, চিনি, দুধ, মসলা, বাদামসহ বিভিন্ন ঈদকেন্দ্রিক খাদ্যপণ্যে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকার বেচাকেনা হচ্ছে। পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীরা বলেছেন, ঈদের আগের কয়েক দিনে এই চাহিদা আরও বাড়ে। শুধু মসলার বাজারেই প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকার কেনাবেচা হচ্ছে।
গাড়ি খাতে প্রায় ৫ থেকে ৮ হাজার কোটি টাকা, গয়না খাতে ৫ থেকে ৮ হাজার কোটি টাকার বেচাকেনা হচ্ছে। পাশাপাশি দেশি-বিদেশি পর্যটনেও হাতবদল হয় ১৫ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা। ঈদের ছুটিতে দেশের বহু পর্যটনকেন্দ্র পুরো বুকড হয়ে যায়।
এসব খাতের বাইরে মন্ত্রী-এমপিদের বরাদ্দের অর্থ ও জাকাত ফান্ডের অর্থ অর্থনীতিতে যুক্ত রয়েছে। জাকাত ফান্ড থেকে এ বছর ন্যূনতম ৫০ হাজার কোটি টাকা অর্থনীতিতে যুক্ত হচ্ছে। দেশের ৩০০ সংসদ সদস্যদের পক্ষ থেকে শাড়ি, থ্রি-পিসসহ বেশ কিছু পোশাক ও খাদ্যপণ্য এলাকার অসহায়, গরিব ও দুস্থদের জন্য দেওয়া হয়েছে।
সূত্র জানায়, ঈদের বাকি দুই থেকে তিন দিন বাকি থাকতেই ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকার কেনাবেচা হয়েছে। এর আগের বছর ২০২৫ সালে ঈদের কেনাবেচা হয়েছিল ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা।
নির্বাচিত বোর্ড না থাকায় এ বছর ঈদে ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা নিয়ে কোনো গবেষণা করেনি ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই। সংগঠনটির সর্বশেষ সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে অর্থনীতিতে যুক্ত হয়েছে ১ লাখ ৮৭ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধু নতুন পোশাক কেনাকাটায় প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। ভোগ্যপণ্যের বাজারে বাড়তি যুক্ত হয়েছে ৩১ হাজার কোটি টাকা। ধনীদের দেওয়া জাকাত ও ফিতরার মাধ্যমে যোগ হচ্ছে প্রায় ৬৮ হাজার কোটি টাকা।
তবে ভোগ্যপণ্যের বাজারের সার্বিক চাঙাভাবের মধ্যেও সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। দেশের জনপ্রিয় ফ্যাশন হাউস ‘রঙ বাংলাদেশ’ এর প্রধান নির্বাহী সৌমিক দাস বলেন, ‘বেচাকেনা খুব বেশি সন্তোষজনক না, যদিও গত বছরের তুলনায় ভালো। মূল্যস্ফীতির কারণে পণ্যের দাম বেড়েছে। বিপরীতে মধ্যবিত্তদের আয় কমেছে। মূল্যস্ফীতি কমলে বিক্রি আরও বেশি হতো।’
৫০ হাজার কোটি টাকার জাকাত
সরকারি ও বেসরকারি তথ্য অনুসারে, এবারের ঈদে ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি যাকাত অর্থনীতিতে যুক্ত হবে। ইসলামী অর্থনীতিবিদ যুক্তরাষ্ট্রের নিউ অরলিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. কবীর হাসান বলেছেন, ইসলামী নিয়ম অনুসারে এ দেশে যাঁদের ওপর জাকাত ফরজ, তাঁরা সবাই ঠিকভাবে জাকাত দিলে এর অঙ্ক দাঁড়াবে অন্তত ১ লাখ কোটি টাকা।
জানতে চাইলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর জাকাত ম্যানেজমেন্টের (সিজেডএম) আর্থিক কর্মকর্তা (সিএফও) মশিউর রহমান আজকের পত্রিকা বলেন, ‘আমাদের দেশে ফরমাল-ইনফরমাল দুভাবে জাকাত দেওয়া হয়। গত বছর যে পরিমাণ জাকাত আদায় হয়েছে, এই বছরও সেই পরিমাণে আদায় হবে।’
বড় উৎস রেমিট্যান্স
বরাবরই ঈদের সময় বিদেশ থেকে কর্মীদের টাকা পাঠানো অনেক বাড়ে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ১ মার্চ থেকে ১৪ মার্চ পর্যন্ত সময়ে প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন ২২০ কোটি ডলার। এ অঙ্ক আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৩৫ শতাংশ বেশি। ২০২৫ সালের একই সময় রেমিট্যান্স এসেছিল ১৬২ কোটি ডলার।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুপপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘মূলত ঈদের কারণে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স আসার পরিমাণ বেড়েছে। ঈদের পর এ প্রবাহ কমে আসতে পারে।’
বেতন-বোনাসের বিপুল অর্থ
সরকারের তথ্যমতে, ঈদ উপলক্ষে ১৪ লাখ সরকারি কর্মীকে বেতন-বোনাস দেওয়া হয় প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা। বেসরকারি শ্রমিকদের মধ্যে বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, বিটিএমইএসহ তৈরি পোশাক শ্রমিকদের বেতন ও বোনাস বাবদ ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া রয়েছে অন্যান্য খাতের কারখানার শ্রমিকদের বেতন-বোনাস।
পরিবহন ও অন্যান্য
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ঈদের সময় ৩ থেকে ৪ কোটি যাত্রী যাতায়াত করে। ফলে টিকিট কেনাবেচা পরিবহন খাত থেকে অর্থনীতিতে যুক্ত হয় ৭০০ থেকে ১ হাজার কোটি টাকা।
বেসরকারি তথ্য অনুসারে, রমজান মাসে খোদ রাজধানীতে ইফতারসামগ্রী বিক্রি হয়েছে ১৩৪ কোটি টাকার। সারা দেশে বিক্রি হয় ১৫০ কোটি টাকার বেশি। আর আতর-টুপির বাজার হয় ৩০০ কোটি টাকার।
বিশেষজ্ঞরা যা বলেন
গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘এবারের ঈদ মানুষের জন্য তুলনামূলকভাবে স্বস্তির। কারণ রাজনৈতিক সরকার এখন ক্ষমতায়, যেখানে মব ভায়োলেন্স নেই। তবে আর্থিক পরিস্থিতি এখনো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দ্রুত বাড়ার মতো স্বাভাবিক না। সরকারের নজরদারি আরও বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে চাহিদা অনুসারে আরও বাজার সৃষ্টি করা দরকার।’
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান বুর্যোর (বিবিএস) ঈদকেন্দ্রিক অর্থনীতির একটি সঠিক হিসাব থাকা উচিত বলে মত দেন এই অর্থনীতিবিদ।
রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ আবু ইউসুফ বলেন, ‘বছরব্যাপী খাদ্য এবং খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের যে ব্যবসা তার প্রায় ৪০ শতাংশই বিক্রি হয় ঈদের সময়। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা এই উপলক্ষে সর্বাত্মক প্রস্তুতি নেয়।’

ঈদ উপলক্ষে সরকারি ছুটির হিসাব অনুযায়ী ব্যাংকপাড়ায় ছুটি শুরু হয়েছে। তবে বিশেষ প্রয়োজনে আজ ১৮ মার্চ ও আগামীকাল ১৯ মার্চ কিছু এলাকায় খোলা থাকবে কিছু বাণিজ্যিক ব্যাংকের শাখা। এই দুই দিন সকাল ১০টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত লেনদেন চালু থাকবে।
৬ ঘণ্টা আগে
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এককভাবে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের প্রধান রপ্তানি গন্তব্য। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই বাজারে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক—রপ্তানির পরিমাণ কিছুটা বেড়েছে, তবে আগের মতো আয় বৃদ্ধি পাচ্ছে না। এর মূল কারণ হলো দেশটির ক্রেতারা বাংলাদেশের প্রতি ইউনিট পোশাকের দাম ২ শতাংশের বেশি কমিয়ে দিয়েছে।
১৪ ঘণ্টা আগে
পবিত্র রমজান মাস বিবেচনায় চলতি মার্চে বিশেষ প্রচেষ্টায় লোডশেডিং সহনীয় পর্যায়ে রাখা গেলেও আগামী মাসে (এপ্রিল) গরম বাড়লে লোডশেডিং বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। কারণ, এপ্রিলে গরম বাড়লে বিদ্যুতের চাহিদাও বাড়বে। কিন্তু উৎপাদন সেই অনুপাতে বাড়বে কি না, তা নিশ্চিত নয়।
১৪ ঘণ্টা আগে
ইলেকট্রনিকস জায়ান্ট ওয়ালটনের চলমান ডিজিটাল ক্যাম্পেইনে গাজীপুর, নীলফামারী, টাঙ্গাইল ও সিলেটের বিভিন্ন অঞ্চলের আরও ২৭ জন ক্রেতার হাতে ওয়ালটন পণ্য কিনে পাওয়া উপহারের ফ্রিজ, টিভিসহ বিভিন্ন পণ্য তুলে দেওয়া হয়েছে। উপহারপ্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছেন গাজীপুরের ৪, নীলফামারীর ১০, টাঙ্গাইলের ৫, এবং সিলেটের ৮ জন...
২০ ঘণ্টা আগে