Ajker Patrika

দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন /যুদ্ধ ঠেকাতে গ্রহণযোগ্য প্রস্তাব দিয়েছিল ইরান, ‘অভিভূত’ হয়েছিল ব্রিটিশরা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
যুদ্ধ ঠেকাতে গ্রহণযোগ্য প্রস্তাব দিয়েছিল ইরান, ‘অভিভূত’ হয়েছিল ব্রিটিশরা
যুক্তরাজ্যের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জোনাথন পাওয়েল। ছবি: আনাদোলু

ব্রিটেনের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জোনাথন পাওয়েল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শেষ দফার আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন। তিনি মনে করেছিলেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে তেহরানের দেওয়া প্রস্তাব যুদ্ধের দিকে দ্রুত ধাবিত হওয়া ঠেকানোর মতো যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এমনটাই উঠে এসেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে।

সূত্রগুলোর মতে, ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে জেনেভায় আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছিল বলে পাওয়েল মনে করেছিলেন এবং ইরানের তরফ থেকে ছাড় দিয়ে প্রস্তাবিত চুক্তিকে তিনি ‘অপ্রত্যাশিত’ বলে আখ্যা দেন। অথচ, আলোচনা শেষ হওয়ার দুই দিন পর এবং ভিয়েনায় পরবর্তী প্রযুক্তিগত বৈঠকের তারিখ নির্ধারণ হওয়ার পরই যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল ইরানের ওপর হামলা চালায়।

পাওয়েল আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন এবং আলোচনার অগ্রগতি সম্পর্কে তাঁর ঘনিষ্ঠ জ্ঞান ছিল বলে তিনটি সূত্র নিশ্চিত করেছে। একটি সূত্র জানায়, তিনি জেনেভার কোলোনিতে ওমানের রাষ্ট্রদূতের বাসভবনের ভবনের ভেতরেই আলোচনার উপদেষ্টা হিসেবে অবস্থান করছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আলোচনায় জ্যারেড কুশনার এবং ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ অংশ নেওয়ায় তাদের দক্ষতা নিয়ে ব্যাপক উদ্বেগ ছিল। এই কারিগরি বিষয়ে এই দুজনের পর্যাপ্ত জ্ঞানের অভাবের বিষয়টিই পাওয়েলের উপস্থিতির কারণ হিসেবে দেখা হয়।

কুশনার ও উইটকফ আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রসিকে কারিগরি পরামর্শ দেওয়ার জন্য জেনেভা আলোচনায় আমন্ত্রণ জানান। তবে পরে কুশনার দাবি করেন, তিনি ও উইটকফ ‘এই বিষয়গুলোর ওপর যথেষ্ট গভীর বোঝাপড়া’ রাখেন। পরমাণু বিশেষজ্ঞরা পরে বলেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে উইটকফের মন্তব্যগুলো মৌলিক ভুলে ভরা ছিল।

পাওয়েল দীর্ঘদিন ধরে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করেছেন। একটি সূত্র জানায়, তিনি যুক্তরাজ্যের মন্ত্রিপরিষদ দপ্তর থেকে একজন বিশেষজ্ঞ সঙ্গে নিয়ে যান। এক পশ্চিমা কূটনীতিক বলেন, ‘জোনাথন মনে করেছিলেন একটি চুক্তি সম্ভব, তবে ইরান এখনো পুরোপুরি সেখানে পৌঁছায়নি, বিশেষ করে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে তাদের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর পরিদর্শনের প্রশ্নে।’

জেনেভা আলোচনায় অংশগ্রহণকারীদের কাছ থেকে ব্রিফিং পাওয়া এক সাবেক কর্মকর্তা বলেন, ‘উইটকফ ও কুশনার কোনো মার্কিন কারিগরি দল সঙ্গে আনেননি। তাঁরা গ্রসিকেই বিশেষজ্ঞ হিসেবে ব্যবহার করেছেন, কিন্তু সেটি তাঁর কাজ নয়। তাই জোনাথন পাওয়েল নিজের দল নিয়ে এসেছিলেন। ইরান যে প্রস্তাব টেবিলে তুলেছিল, তা দেখে ব্রিটিশ দল বিস্মিত হয়।’

ওই কূটনীতিক বলেন, ‘এটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তি ছিল না, তবে অগ্রগতি ছিল এবং এটিই ইরানের চূড়ান্ত প্রস্তাব হওয়ার সম্ভাবনা কম ছিল। জেনেভার অগ্রগতির ভিত্তিতে পরবর্তী দফা আলোচনা এগোবে বলে ব্রিটিশ দল আশা করেছিল।’

পরবর্তী বৈঠকটি ২ মার্চ সোমবার ভিয়েনায় হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু তা আর হয়নি। তার দুই দিন আগেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল পূর্ণমাত্রার হামলা শুরু করে। জেনেভায় অনুষ্ঠিত আগের বৈঠকসহ এসব আলোচনায় পাওয়েলের উপস্থিতি আংশিকভাবে ব্যাখ্যা করে যে, কেন যুক্তরাজ্য সরকার ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের হামলাকে সমর্থন দিতে অনীহা দেখায়। এই অনীহা যুক্তরাজ্য-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ককে নজিরবিহীন চাপে ফেলেছে।

যুক্তরাজ্য ইউরোপের ওপর ইরানের আসন্ন ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কোনো জোরালো প্রমাণ দেখেনি, কিংবা ইরান পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে যাচ্ছে এমন প্রমাণও পায়নি। এই প্রথম স্পষ্ট হলো যে ব্রিটেন এত ঘনিষ্ঠভাবে আলোচনায় জড়িত ছিল এবং তাই কূটনৈতিক পথ শেষ হয়ে গেছে কি না, সে বিষয়ে তাদের নিজস্ব মূল্যায়নের ভিত্তি ছিল। বরং যুক্তরাজ্যের দৃষ্টিতে হামলাটি ছিল অবৈধ ও অকালপক্ব, কারণ পাওয়েলের বিশ্বাস ছিল যে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ তখনো খোলা ছিল। মূল প্রশ্ন ছিল, ইরান কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে আশ্বস্ত করবে যে তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে না।

ডাউনিং স্ট্রিট জেনেভা আলোচনায় পাওয়েলের উপস্থিতি বা তাঁর মতামত সম্পর্কে মন্তব্য করতে অস্বীকার করেছে।

জেনেভায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পরোক্ষ আলোচনা মধ্যস্থতা করছিলেন ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর বিন হামাদ আল বুসাইদি। উপসাগরীয় কূটনীতিকরা জানাননি কী ভিত্তিতে পাওয়েল আলোচনায় প্রবেশাধিকার পেয়েছিলেন। তবে টনি ব্লেয়ারের চিফ অব স্টাফ হিসেবে কাজ করার সময় থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের কারণে এটি সম্ভব হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। পরে যুক্তরাজ্যের কর্মকর্তারা জানান, ইরান প্রস্তাবিত চুক্তিকে স্থায়ী করতে প্রস্তুত ছিল এবং ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তির মতো এতে কোনো মেয়াদোত্তীর্ণ ধারা বা ‘সানসেট ক্লজ’ বা ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সূর্যাস্ত আইনের মতো বাধ্যতামূলক শর্ত থাকত না।

ইরান আরও সম্মত হয়েছিল যে, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার তত্ত্বাবধানে নিজেদের ভূখণ্ডেই ৪৪০ কেজি উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত নিম্ন মাত্রায় নামিয়ে আনা হবে। ভবিষ্যতে আর এমন উচ্চমাত্রার ইউরেনিয়ামের মজুত তৈরি করা হবে না বলেও তারা রাজি হয়।

চূড়ান্ত বৈঠকে ইরান দেশীয়ভাবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে ৩ থেকে ৫ বছরের বিরতি দিতে রাজি হয়। কিন্তু বিকেলের বৈঠকে ট্রাম্পের সঙ্গে পরামর্শের পর যুক্তরাষ্ট্র ১০ বছরের বিরতি দাবি করে। বাস্তবে ২০২৫ সালে সমৃদ্ধকরণ স্থাপনাগুলো বোমাবর্ষণে ধ্বংস হওয়ায় ইরানের পক্ষে দেশীয়ভাবে সমৃদ্ধকরণ চালানো সম্ভবই ছিল না। ইরান একটি ‘অর্থনৈতিক সুবর্ণ সুযোগ’ও প্রস্তাব করেছিল, যাতে ভবিষ্যৎ বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচিতে যুক্তরাষ্ট্র অংশ নিতে পারে।

এর বিনিময়ে ইরানের ওপর আরোপিত প্রায় ৮০ শতাংশ অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হতো, যার মধ্যে কাতারে জব্দ থাকা সম্পদও অন্তর্ভুক্ত ছিল। ২০২৫ সালের আলোচনায় ইরান এই দাবিই তুলেছিল। ওমানি মধ্যস্থতাকারীর মতে, উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের শূন্য মজুত রাখার প্রস্তাব ছিল একটি বড় অগ্রগতি, যা চুক্তিকে নাগালের মধ্যে এনে দিয়েছিল।

কুশনার আলোচনাস্থল ছেড়ে যাওয়ার সময় ট্রাম্প চুক্তিটি স্বাগত জানাবেন এমন ধারণা দিয়েছিলেন কি না, নাকি মার্কিন আলোচকেরা জানতেন যুদ্ধ এড়াতে ট্রাম্পকে রাজি করাতে অসাধারণ কিছু প্রয়োজন হবে, সে বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনা রয়েছে। আলোচনার বিষয়ে অবগত এক উপসাগরীয় কূটনীতিক বলেন, ‘আমরা উইটকফ ও কুশনারকে ইসরায়েলের স্বার্থে কাজ করা ব্যক্তি হিসেবে দেখেছি, যারা এমন এক প্রেসিডেন্টকে যুদ্ধে টেনে নিয়েছে যিনি আসলে সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে চান।’

মঙ্গলবার ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ওয়েলশ জাতীয়তাবাদী দল প্লেইড কামরুর এমপি লিজ সেভিল রবার্টস ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপারের কাছে প্রশ্ন করার সময় দ্য গার্ডিয়ানের এই প্রতিবেদনটি উল্লেখ করেন। স্যাভিল রবার্টস বলেন, ‘মনে হচ্ছে কূটনৈতিক পথ তখনো কার্যকর ছিল এবং ইউরোপের ওপর আসন্ন ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বা ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের কোনো প্রমাণ ছিল না। তাহলে কি সেই সময় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান সম্ভব ছিল? যদি তা হয়, তবে প্রাথমিক মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলা কি অকালপক্ব ও অবৈধ ছিল না?’

কুপার জবাবে বলেন, ‘পারমাণবিক আলোচনাকে ঘিরে কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় যুক্তরাজ্য সমর্থন দিয়েছিল। আমরা এটিকে গুরুত্বপূর্ণ পথ বলে মনে করতাম এবং এটি অব্যাহত থাকুক সেটিই চেয়েছিলাম। প্রাথমিক মার্কিন হামলার বিষয়ে আমরা যে অবস্থান নিয়েছিলাম, সেটির এটিও একটি কারণ।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত