Ajker Patrika

ফরিদপুর ও পিরোজপুর: পাউবোর জমিতে বাড়ি-খামার

হাসান মাতুব্বর, ফরিদপুর ও তামিম সরদার, পিরোজপুর
আপডেট : ১৭ মে ২০২৬, ০৭: ০৬
ফরিদপুর ও পিরোজপুর: পাউবোর জমিতে বাড়ি-খামার
পিরোজপুরের নাজিরপুরের ঝনঝনিয়ায় পাউবোর অধিগ্রহণ করা জলাশয় ভরাট করে গড়ে তোলা গরুর খামার। ছবি: আজকের পত্রিকা

ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ১১ শতাংশ জমি সবজি চাষের শর্তে ইজারা নিয়ে চারতলা ভিতের দোতলা ভবন নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। শর্ত ভঙ্গ করায় ইজারা বাতিল করে ভবনটি অপসারণের জন্য পাউবো নোটিশ দিলেও দেড় বছরেও তা উচ্ছেদ হয়নি। এমনকি ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় তিনি বর্তমানে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন বলে স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ তুলেছেন।

এদিকে পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার ঝনঝনিয়া মৌজায় পাউবোর অধিগ্রহণ করা একটি জলাশয় ভরাট করে গরু মোটাতাজাকরণ খামার নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। এতে পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে আশপাশের শত শত হেক্টর কৃষিজমি ক্ষতির মুখে পড়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষকেরা।

আলফাডাঙ্গায় পাউবোর অধিগ্রহণ করা জমি ইজারা নিয়ে ভবন নির্মাণের অভিযোগ ওঠা ব্যক্তির নাম মো. জাকির হোসেন শেখ। তিনি উপজেলার গোপালপুর বাজারের বেড়িবাঁধ সংলগ্ন এলাকায় এই বাড়ি নির্মাণ করেন।

পাউবো সূত্রে জানা গেছে, কয়েক বছর আগে শাকসবজি চাষের শর্তে ১১ শতাংশ জমি লিজ নিয়েছেন জাকির হোসেন। তবে শর্ত ভঙ্গ করায় তাঁর লিজ বাতিল করা হয়। এরপর ২০২৪ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ফরিদপুর পাউবোর তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী পার্থ প্রতিম সাহা স্বাক্ষরিত একটি উচ্ছেদ নোটিশ দেন জাকিরকে।

নোটিশে উল্লেখ করা হয়, পাউবোর অধিগ্রহণ করা তিনটি দাগের ১১ শতাংশ জমি জাকিরকে সাময়িক শাকসবজি চাষাবাদে ইজারা দেওয়া হয়। কিন্তু ইজারার নিয়ম ও শর্তাবলি ভঙ্গ করায় তাঁর ইজারা বাতিল করা হয় এবং অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে নেওয়ার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু নিয়ম ও শর্তবহির্ভূত স্থাপনা নির্মাণ অপসারণে মৌখিকভাবে বলার পরেও অপসারণ করেননি। পাশাপাশি ওই নোটিশে কাজী মঈনুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তির লিজ নেওয়া ১৬ শতাংশ জমি দখলের অভিযোগের বিষয়ে উল্লেখ করা হয়।

নোটিশের সূত্র ধরে কাজী মঈনুল ইসলামের সঙ্গে কথা হয়। মঈনুল ইসলাম বলেন, ‘২০০২ সালে আমি পাউবো থেকে জমি লিজ নিয়ে বাড়ি করেছি। তবে শর্ত ভঙ্গ করে পাকা স্থাপনা করিনি। আমার এই জায়গার কিছু অংশ দখলে নিয়েছেন জাকির হোসেন। এ ছাড়া ২০০৭ সালে আমার লিজের জমিতে এলজিইডির মাধ্যমে একটি পাকা রাস্তাও করে নিয়েছেন। বর্তমানে জাকির হোসেন শেখের সহায়তায় স্থানীয় নূর আলম খান নামের এক ব্যক্তি নিজের জায়গা দাবি করে ওই রাস্তায় বালু ফেলে টিনের ছাপরা ঘর তুলেছেন। আমার লিজ তো বাতিল করা হয়নি। তাহলে কীভাবে তিনি জায়গা তাঁর বলে দাবি করেন? জাকিরের এক ভাই পুলিশ সদস্য। সেই সুবাদে তিনি এলাকায় ক্ষমতা দেখাচ্ছেন।’

ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গার গোপালপুর বাজার এলাকায় বেড়িবাঁধের পাশে পাউবোর জমিতে নির্মিত দোতলা ভবন। ছবি: আজকের পত্রিকা
ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গার গোপালপুর বাজার এলাকায় বেড়িবাঁধের পাশে পাউবোর জমিতে নির্মিত দোতলা ভবন। ছবি: আজকের পত্রিকা

সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, পাউবোর ওই জায়গায় দোতলা ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। প্রথমে বোঝার উপায় নেই যে, এটি দোতলা ভবন। তবে ভবনের পেছনের অংশে গেলে তা দৃশ্যমান হয় দোতলা ভবন। এর নিচতলায় পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন জাকির। এ ছাড়া সড়কসংলগ্ন ওপরের অংশে প্রায় ২০ মিটার কংক্রিটের ঢালাই ছাদে একাধিক দোকানঘর নির্মাণ করেছেন। ওই ভবনটি চারতলা ফাউন্ডেশনে গড়ে তোলা হয়েছে বলে একাধিক সূত্রে জানা যায়।

সরেজমিনে আরও দেখা যায়, ওই ভবনের কয়েক গজ দূরেই মসজিদের জন্য নির্ধারিত জায়গার দুই পাশে বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে এবং দখলকৃত রাস্তার ওপরে বালু ফেলে টিনের একটি ছাপরা ঘর নির্মাণ করা হয়েছে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জাকির হোসেন শেখ দাবি করেন, তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ খারিজ হয়েছে। এ ছাড়া পাকা রাস্তার ওপরে বালু ফেলে ও টিনের ছাপরা উঠিয়ে দখলের বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না বলে মন্তব্য করেন।

ফরিদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিব হোসেন বলেন, ‘উচ্ছেদের বিষয়ে জেলা প্রশাসনের কাছে ম্যাজিস্ট্রেট চেয়ে আবেদন করেছি। কিন্তু আমাদের ম্যাজিস্ট্রেট না দেওয়ায় উচ্ছেদ করা সম্ভব হয়নি। ম্যাজিস্ট্রেট দেওয়া হলে উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে আমাদের জায়গাগুলো উদ্ধার করা সম্ভব হবে। এ ছাড়া ওই এলাকায় লিজ নবায়ন না হওয়ায় একটি চক্র প্রভাব খাটিয়ে অন্যদের জায়গাও দখলে নিচ্ছেন বলে আমরা অভিযোগ পেয়েছি। এসব বিষয়ে দ্রুতই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

অপর দিকে পিরোজপুরের নাজিরপুরের ঝনঝনিয়া মৌজায় ‘সাতলা বাগদা বেড়িবাঁধ প্রকল্প’ এলাকার ৯৫ শতাংশ জলাশয় ২০১৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত মাছ চাষের লক্ষ্যে তিন বছরের জন্য ইজারা দেয় পাউবো। মো. নাঈম মোল্লা ও মো. শাহিন মোল্লা ওই জমি ইজারা নিয়ে বালু দিয়ে ভরাট করে সেখানে গরু মোটাতাজাকরণ খামার নির্মাণ করেছেন।

স্থানীয় কৃষক মো. মঞ্জু শেখ বলেন, জলাশয়টির সঙ্গে খাল ও নদীর সংযোগ থাকায় আগে ইরি-বোরো মৌসুমে সহজেই সেচের পানি জমিতে প্রবেশ করত। কিন্তু বর্তমানে পানি চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ায় খাল থেকে জমিতে পর্যাপ্ত পানি পৌঁছাচ্ছে না। অপর দিকে বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়ে ফসল নষ্ট হচ্ছে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে কৃষকেরা ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন।

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক সোহরাব ফকিরসহ একাধিক ব্যক্তি জানান, প্রায় তিন মাস আগে পাউবোর এক কর্মকর্তা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করলেও এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

অভিযোগের বিষয়ে নাঈম মোল্লা ও শাহিন মোল্লার মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তাঁরা তা ধরেননি।

পাউবোর পিরোজপুর কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী নুসাইর হোসেন বলেন, ‘নাজিরপুর উপজেলার ঝনঝনিয়া মৌজায় অধিগ্রহণ করা একটি জলাশয় ভরাট করার অভিযোগ রয়েছে। সেটি গোপালগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নিয়ন্ত্রিত। আমরা বিষয়টি গোপালগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষকে অবহিত করব।’

পাউবোর গোপালগঞ্জ কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আনিছ হায়দার খান বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা ছিল না। সরেজমিনে কর্মকর্তা পাঠিয়ে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত