Ajker Patrika

পৌষ সংক্রান্তিতে কালীগঞ্জে আড়াই শ বছরের ঐতিহ্যবাহী ‘জামাই মেলা’

মো. রিয়াদ হোসাইন কালীগঞ্জ (গাজীপুর)
আপডেট : ১৫ জানুয়ারি ২০২৬, ১০: ৩২
পৌষ সংক্রান্তিতে কালীগঞ্জে আড়াই শ বছরের ঐতিহ্যবাহী ‘জামাই মেলা’
কালীগঞ্জ উপজেলার জামালপুর ইউনিয়নের বিনীরাইল এলাকায় মেলার মূল আকর্ষণ বিশাল আকৃতির সব মাছ। ছবি: আজকের পত্রিকা

পৌষের হাড়কাঁপানো শীত উপেক্ষা করে ভোরের আলো ফোটার আগেই মানুষের পদচারণে মুখর হয়ে ওঠে গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার জামালপুর ইউনিয়নের বিনীরাইল এলাকা। উপলক্ষ আড়াই শ বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী মাছের মেলা, যা স্থানীয়ভাবে ‘জামাই মেলা’ নামে পরিচিত। পঞ্জিকা অনুযায়ী বুধবার পৌষ সংক্রান্তি উপলক্ষে বসেছে উত্তর জনপদের অন্যতম বৃহৎ এই মাছের মেলা।

মেলার মূল আকর্ষণ বিশাল আকৃতির সব মাছ। কয়েক শ বছরের রীতি অনুযায়ী, এই মেলা উপলক্ষে আশপাশের গ্রামের জামাইরা শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতে আসেন। আর শ্বশুরবাড়িতে বড় মাছ নিয়ে যাওয়াটা এখানে আভিজাত্য ও ঐতিহ্যের প্রতীক। শুধু জামাইরা নন, শ্বশুরেরাও মেতে ওঠেন বড় মাছ কিনে জামাইকে আপ্যায়ন করার প্রতিযোগিতায়।

মেলায় মাছের পসরা সাজিয়ে বসেছেন শত শত বিক্রেতা। তাঁদের একজন সিলেট বড়লেখা থেকে আসা শৈবাল দাস। তিনি এবার নিয়ে এসেছেন ৩০ থেকে ৪৫ কেজি ওজনের বেশ কয়েকটি বাঘাড় এবং বিশাল আকৃতির চিতল মাছ। শৈবাল দাস বলেন, ‘আমি তিন দিন ধরে প্রস্তুতি নিয়ে বড়লেখা থেকে এখানে এসেছি। এবার বাঘাড় আর আইড় মাছের চাহিদা খুব বেশি। ৪৫ কেজি ওজনের একটি বাঘাড় মাছের দাম হাঁকছি ৬৫ হাজার টাকা। ক্রেতারা ভিড় করছেন। আশা করছি, দুপুরের মধ্যেই সব বিক্রি হয়ে যাবে।’

৪৫ কেজি ওজনের একটি বাঘাড়। ছবি: আজকের পত্রিকা
৪৫ কেজি ওজনের একটি বাঘাড়। ছবি: আজকের পত্রিকা

ময়মনসিংহ থেকে মেলায় মাছ নিয়ে এসেছেন আরেক বিক্রেতা সিয়াম হোসেন। তাঁর স্টলে শোভা পাচ্ছে বড় বড় রুই, কাতল আর বোয়াল মাছ। সিয়াম বলেন, ‘ময়মনসিংহের বিভিন্ন হাওর ও নদী থেকে সেরা মাছগুলো সংগ্রহ করে এখানে এনেছি। বিনীরাইলের মেলার নাম সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। এখানে মাছ বিক্রি করার চেয়ে উৎসবের আমেজটা উপভোগ করা যায় বেশি। গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার ক্রেতার সংখ্যা অনেক বেশি মনে হচ্ছে।’

মেলায় আসা দর্শনার্থীদের ভিড় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন আয়োজকেরা। ঢাকার উত্তরা থেকে মেলায় এসেছেন মোহাম্মদ আলী। তিনি বলেন, ‘প্রতিবছর এই দিনটির জন্য অপেক্ষায় থাকি। এখানে শুধু মাছ কেনাই বড় কথা নয়, এই যে বিশাল এক কর্মযজ্ঞ আর হাজার হাজার মানুষের মিলনমেলা, এটি দেখতেই বেশি ভালো লাগে। এবার মেলায় মাছের সরবরাহ যেমন প্রচুর, তেমনি মাছের বৈচিত্র্য দেখেও মুগ্ধ হয়েছি।’

মেলায় বড় মাছ দরদাম করছিলেন স্থানীয় এক জামাই সৈকত হোসেন। তিনি বলেন, ‘আমি এবারই প্রথম শ্বশুরবাড়িতে মাছ নিয়ে যাব। তাই সেরা মাছটা কেনার চেষ্টা করছি। ১৮ কেজি ওজনের একটি কাতল মাছ পছন্দ হয়েছে। বিক্রেতা দাম চেয়েছেন ২২ হাজার টাকা। জামাই হিসেবে বড় মাছটি নিয়ে শ্বশুরবাড়িতে ঢুকতে পারা একটা আলাদা গর্বের বিষয়।’

১৮ কেজি ওজনের একটি কাতল মাছ। বিক্রেতা দাম চেয়েছেন ২২ হাজার টাকা। ছবি: আজকের পত্রিকা
১৮ কেজি ওজনের একটি কাতল মাছ। বিক্রেতা দাম চেয়েছেন ২২ হাজার টাকা। ছবি: আজকের পত্রিকা

আয়োজক কমিটি সূত্রে জানা যায়, ব্রিটিশ শাসনামলে শুরু হওয়া এই মেলা এখন সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উৎসবে সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন এই এলাকার সব ধর্মের মানুষের সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে। মাছ ছাড়াও মেলায় আসবাব, খেলনা, মিষ্টি ও কুটির শিল্পের বিভিন্ন পণ্যের স্টল বসেছে।

বংশপরম্পরায় চলে আসা মেলাটি আজ তার ২৬০ বছর পূর্ণ করার পথে। আধুনিকতার ছোঁয়ায় অনেক ঐতিহ্য হারিয়ে গেলেও বিনীরাইলের এই মাছের মেলা আজও তার স্বকীয়তা ও জৌলুশ বজায় রেখেছে, যা গাজীপুরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত