Ajker Patrika

কেন সারা বিশ্বের নজর এখন ইরানের খার্গ দ্বীপে

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
কেন সারা বিশ্বের নজর এখন ইরানের খার্গ দ্বীপে
স্যাটেলাইটের ছবিতে ইরানের খার্গ দ্বীপ। ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে খার্গ দ্বীপ আবারও আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে ঘিরে চলমান সামরিক ও কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে ছোট এই দ্বীপটির কৌশলগত গুরুত্ব নতুন করে সামনে এসেছে। পারস্য উপসাগরের উত্তরে অবস্থিত সরু এই প্রবালদ্বীপটি দৈর্ঘ্যে মাত্র পাঁচ মাইলের মতো হলেও এটি ইরানের তেল রপ্তানি ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু। একই সঙ্গে এটি বিশ্ব জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থাপনা।

সম্প্রতি দ্বীপটিতে ইরানের সামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা প্রমাণ করেছে, জ্বালানি বাজার, সমুদ্রপথের নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক সামরিক কৌশলের মিলনস্থল হয়ে উঠেছে এই দ্বীপটি।

ইরানের তেল রপ্তানির প্রধান কেন্দ্র

খার্গ দ্বীপ মূলত ইরানের অপরিশোধিত তেল রপ্তানির প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, দেশটির প্রায় ৯০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল এই দ্বীপের টার্মিনাল দিয়ে বিদেশে পাঠানো হয়। ট্যাংকার ট্র্যাকিং ডেটা অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইরানের দৈনিক প্রায় ১৬ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানির মধ্যে প্রায় ১৫ লাখ ৪০ হাজার ব্যারেলই খার্গ দ্বীপের মাধ্যমে পরিবাহিত হয়েছে, যা মোট রপ্তানির প্রায় ৯৬ শতাংশ।

দ্বীপটির অবকাঠামোও অত্যন্ত বড়। এখানে এমন লোডিং টার্মিনাল রয়েছে যা দিনে প্রায় ৭০ লাখ ব্যারেল তেল লোড করার সক্ষমতা রাখে এবং একই সঙ্গে ৮ থেকে ৯টি সুপার ট্যাংকারকে সেবা দিতে পারে। দ্বীপটিতে থাকা ৫০ টিরও বেশি তেল সংরক্ষণ ট্যাংকে প্রায় ৩ কোটি ৪০ লাখ ব্যারেল তেল সংরক্ষণ করা সম্ভব।

তবে এই দ্বীপে তেল উৎপাদন হয় না বললেই চলে। মূলত দক্ষিণ ইরানের স্থলভাগের তেলক্ষেত্র থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল এনে এখানে জমা করা হয় এবং এখান থেকে জাহাজে করে রপ্তানি করা হয়।

ইরানের অন্যান্য তেল রপ্তানি কেন্দ্র তুলনামূলকভাবে ছোট। যেমন—লাভান দ্বীপ দিনে প্রায় দুই লাখ ব্যারেল তেল প্রক্রিয়াকরণ করতে পারে এবং এর সংরক্ষণ ক্ষমতা প্রায় ৫৫ লাখ ব্যারেল। আবার দেশটির সিরি দ্বীপে প্রায় ৪৫ লাখ ব্যারেলের মতো সংরক্ষণ সুবিধা রয়েছে। অন্যদিকে ইরানের মূলভূমির অংশ আসালুয়েহ মূলত গ্যাস কনডেনসেট প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র। এটি তেল রপ্তানি টার্মিনাল হিসেবে ব্যবহৃত হয় না।

ইরান পারস্য উপসাগরের বাইরে বিকল্প রুট তৈরিরও চেষ্টা করছে। দেশটির জাস্ক বন্দরে নির্মাণাধীন একটি টার্মিনাল দিনে প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানির সক্ষমতা পেতে পারে। তবে সেখানে সংরক্ষণ ক্ষমতা মাত্র ২০ লাখ ব্যারেল, যা খার্গ দ্বীপের তুলনায় অনেক কম।

এই কারণে বিশ্লেষকদের মতে খার্গ দ্বীপই ইরানের তেল রপ্তানি ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু।

সামরিক ঘাঁটি হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ

অর্থনৈতিক গুরুত্বের পাশাপাশি দ্বীপটি সামরিক দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই দ্বীপে প্রবেশ অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত এবং এটি পাহারা দেয় ইরানের শক্তিশালী বিপ্লবী ইসলামিক গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)।

আইআরজিসি-এর নৌবাহিনী এখানে বিভিন্ন দ্রুতগতির আক্রমণাত্মক নৌযান মোতায়েন রেখেছে, যার মধ্যে রয়েছে ১১২ তম জোলফাগার সারফেস কমব্যাট ব্রিগেড। এই ইউনিট দ্রুতগতির স্পিডবোট ব্যবহার করে, যেগুলোতে অ্যান্টি-শিপ মিসাইল, রকেট ও নৌমাইন বহনের সক্ষমতা রয়েছে। এসব নৌযান পারস্য উপসাগরে বড় যুদ্ধজাহাজ বা বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে।

দ্বীপের উপকূলে ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার, রাডার, নজরদারি ব্যবস্থা এবং ড্রোন পরিচালনার সুবিধাও রয়েছে। এগুলোর মাধ্যমে পারস্য উপসাগরের উত্তরের সমুদ্রপথে চলাচল নজরদারি করা হয়।

এ ছাড়া ইরানের নিয়মিত নৌবাহিনীও বুশেহর-খার্গ অঞ্চলে টহল কার্যক্রম চালায়। তারা হেলিকপ্টার ও নৌযান ব্যবহার করে সমুদ্র টহল এবং প্রয়োজন হলে মাইন পুঁতে রাখারও প্রস্তুতি রাখে।

হরমুজ প্রণালির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক

খার্গ দ্বীপের কৌশলগত গুরুত্ব সরাসরি যুক্ত রয়েছে হরমুজ প্রণালির সঙ্গে। দ্বীপটির দক্ষিণ-পূর্ব দিকে অবস্থিত এই সংকীর্ণ সমুদ্রপথ পারস্য উপসাগরকে গালফ অব ওমান ও ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ প্রতিদিন এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। সৌদি আরব, ইরাক, কুয়েত, কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে তেলবাহী ট্যাংকারগুলো বৈশ্বিক বাজারে পৌঁছাতে এই পথ ব্যবহার করে।

বৈশ্বিক তেল সরবরাহে ইরানের অংশগ্রহণ মাত্র ৩ থেকে ৪ শতাংশ হলেও হরমুজ প্রণালির তীরবর্তী অবস্থানের কারণে তারা বৈশ্বিক জ্বালানি প্রবাহের অনেক বড় অংশকে প্রভাবিত করার সক্ষমতা রাখে।

ইরানের সামরিক নৌকৌশলে চোরাগোপ্তা যুদ্ধ পদ্ধতির ওপর জোর দেওয়া হয়—যার মধ্যে রয়েছে নৌমাইন, দ্রুতগতির আক্রমণাত্মক নৌযান এবং জাহাজ-বিধ্বংসী মিসাইল। ধারণা করা হয়, ইরানের কাছে দুই হাজার থেকে ছয় হাজার পর্যন্ত নৌমাইন থাকতে পারে। এই মাইনগুলোর অল্প সংখ্যাও যদি সমুদ্রপথে পাতা হয়, তাহলে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হতে পারে।

সাম্প্রতিক মার্কিন হামলার লক্ষ্য

গত শনিবার ভোরে খার্গ দ্বীপে ইরানের সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, এই হামলায় দ্বীপের সামরিক লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করা হয়েছে। তবে ইচ্ছাকৃতভাবে তেল অবকাঠামো অক্ষত রাখা হয়েছে।

ট্রাম্পের ভাষায়—দ্বীপটির সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করা হলেও জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে আঘাত করা হয়নি ‘নৈতিক কারণে’।

মার্কিন হামলায় মূলত ক্ষেপণাস্ত্র নৌযান, স্পিডবোট, ড্রোন, উৎক্ষেপণ কেন্দ্র ও উপকূলীয় ব্যাটারিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। বিশ্লেষকদের মতে, এই হামলার উদ্দেশ্য ছিল সমুদ্রপথে মাইন অপসারণ ও নিরাপদ জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করার জন্য সম্ভাব্য হুমকি কমানো।

হামলার পরও তেল রপ্তানি অব্যাহত

সামরিক হামলার পরও খার্গ দ্বীপে তেল রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বিভিন্ন শিপিং ডেটা অনুযায়ী, হামলার কিছু সময় পরই একটি বৃহৎ তেলবাহী জাহাজ প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল তেল লোড সম্পন্ন করেছে।

খার্গ দ্বীপ অতীতেও বড় সংঘাতের মুখোমুখি হয়েছে। ১৯৮০–এর দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময়ও ইরাকি বাহিনী বারবার এই দ্বীপে বোমা হামলা চালিয়ে তেলের ট্যাংক ধ্বংস করেছিল।

১৯৬০ সালে তেল রপ্তানি শুরু হওয়ার ছয় দশকের বেশি সময় পরও খার্গ দ্বীপ ইরানের প্রধান জ্বালানি প্রবেশদ্বার এবং পারস্য উপসাগরের নিরাপত্তা কাঠামোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে রয়ে গেছে। বিশ্বের বিপুল তেল সরবরাহ যত দিন হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভর করবে, তত দিন ছোট্ট এই দ্বীপটির ভূরাজনৈতিক গুরুত্বও অটুট থাকবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

ইরানের পরমাণু স্থাপনা এখন ধ্বংসস্তূপ, নিরাপদ নৌ চলাচলে আলোচনার পথ খোলা: আরাঘচি

হাদি হত্যা: ফয়সালদের সীমান্ত পার করা ফিলিপ সাংমার স্বীকারোক্তিতে নতুন তথ্য

কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে দুর্বৃত্তের গুলি, কনটেন্ট ক্রিয়েটর নিহত

প্রাকৃতিক দুর্গ ইরান কেন দুর্জেয়, স্থল অভিযানে যেসব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে যুক্তরাষ্ট্র

৫ জেলায় নতুন ডিসি

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত