Ajker Patrika

গাজা গণহত্যা: বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, ইসরায়েলের ৮০ বছরের পরিকল্পনার ফসল

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
গাজা গণহত্যা: বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, ইসরায়েলের ৮০ বছরের পরিকল্পনার ফসল
ফাইল ছবি

গাজায় ইসরায়েলি গণহত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল কয়েক দশ আগেই। এই সত্যটাই ধীরে ধীরে সামনে আসছে এখন। এই বিষয়ে গাজায় দায়িত্ব পালন করা চারজন ইসরায়েলি সেনার সাক্ষ্য শোনা যাক।

সেনা–১: ‘মানবজীবনের কোনো মূল্য ছিল না। আপনি চাইলে হত্যা করতে পারতেন, কোনো আইন ছিল না। কেউ কিছু বলত না। কিন্তু এটা ভালো অনুভূতি দেয় না। এটা মূলত আপনার‍ মানবিকতাকেই হত্যা করে।’ সেনা–২: ‘শুরুতে আমি প্রতিরোধ না করা আরবদের (অর্থাৎ বেসামরিকদের) হত্যা করতে রাজি ছিলাম না। তারপর আমরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাই যে—আমাদের হত্যা করতেই হবে। আমরা ধীরে ধীরে তাদের মানুষ হিসেবে দেখা বন্ধ করার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গেছি।’

সেনা–৩: ‘আমরা কিছু লোককে ধরেছিলাম, সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে তাদের ‘এলিমিনেট’ করি। কিন্তু হত্যা করার পর পেছন ফিরে তাকালে এটাকে হত্যা ছাড়া আর কিছু মনে হয় না।’ সেনা–৪: ‘আমরা গাজার শরণার্থী শিবিরে ঘুরে বেড়াতাম এবং ‘পিউরজ’ চালাতাম...সেখানে থাকা প্রতিটি সৈন্য একটি ‘কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প’ তৈরি করেছিল, এবং সামান্য বিশৃঙ্খলা তৈরি করলেও মানুষকে হত্যা করতে তারা দ্বিধা করত না।’

এসব সাক্ষ্য নতুন কোনো ঘটনা নয়। যারা এসব ফাঁস করেছেন তারা গাজায় বর্তমান, চলমান সংঘাতে দায়িত্বে ছিলেন না। এসব ঘটনা প্রায় ৬০ বছর আগের। গত সপ্তাহে ইসরায়েলি সংবাদপত্র হারেৎজ এগুলো প্রকাশ করে শিরোনাম দেয়, ‘We were ordered to kill—আমাদের হত্যা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।’

১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধ শেষে সাক্ষাৎকার নেওয়া ইসরায়েলি সেনারা কেবল তাদের নিজেদের ও অন্য সহযোগীদের নিয়মিত যুদ্ধাপরাধের বিষয়টি স্বীকারই করেননি, বরং তারা এটাও বলেছেন যে—এসব করা হয়েছিল তাদের কমান্ডারদের নির্দেশে।

ইসরায়েলি সেনাদের এই বর্ণনাগুলো একত্র করে একটি বই প্রকাশিত হয়। নাম দেওয়া হয়—‘The Seventh Day: Soldiers Talk About the Six-Day War. ’ লেখক আভরাম শাপিরা। তবে অনেক সাক্ষ্য এতটাই ভয়াবহ ছিল যে সেগুলো বইয়ে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এগুলোকে শুধু ইতিহাসের বিষয় হিসেবে দেখা উচিত নয়। এসব সাক্ষ্য মনে করিয়ে দেয়, ইসরায়েল বর্তমানে গাজায় যা করছে—ঘরবাড়ি, হাসপাতাল, স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, বেকারি ও সরকারি দপ্তর ধ্বংস করা, লক্ষাধিক ফিলিস্তিনি বেসামরিক মানুষ হত্যা করা এবং ত্রাণ সহায়তা বন্ধ করে জনগণকে অনাহারে রাখা—তা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং দশকব্যাপী এক ধারাবাহিক সামরিক আচরণের অংশ।

ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী গোষ্ঠী হামাস ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজা ‘কনসেনট্রেশন ক্যাম্প’ থেকে একদিনের জন্য বেরিয়ে আসে। গাজায় গণহত্যার ইসরায়েলি আয়োজন সেদিনই শুরু হয়নি। বরং সেদিনটি ছিল ইসরায়েলের দীর্ঘ আগ্রাসনের ইতিহাসের আরেকটি পর্ব মাত্র। বরং সেদিন ইসরায়েল একটি অজুহাত পেয়েছিল পুরনো কাহিনিকে নতুনভাবে জাগিয়ে তোলার। এই কাহিনিতে তারা দশকের পর দশক ধরে ফিলিস্তিনিদের হত্যা ও বিতাড়িত করে আসছে। পার্থক্য শুধু মাত্রা ও সময়ের বিস্তারে।

ওয়াশিংটন এবং অন্যান্য পশ্চিমা রাজধানীগুলো ইসরায়েলকে গাজায় সেই কাজ শেষ করার সময় ও সুযোগ দিয়েছে। আগে আংশিকভাবে করা সম্ভব হলেও এখন ইসরায়েল তা শেষ করার সুযোগ পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ করা আধুনিক গোলাবারুদসহ আজকের তুলনামূলক বেশি সামরিক শক্তির ইসরায়েলকে সেই বাস্তবতা তৈরির সুযোগ দিয়েছে, যা আগে কেবল কল্পনা ছিল—গাজাকে মানচিত্র থেকে মুছে ফেলা।

অনাহারের নীতি

ছয় দিনের যুদ্ধ অর্থাৎ, ১৯৬৭ সালের সেই সময়ের সেনাদের ফাঁস করা বক্তব্য অনুযায়ী, ‘শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করা’ বা ‘সন্ত্রাসীদের নির্মূল করা’ তাদের কাজ ছিল না। এখন ইসরায়েলি নেতারা এই কথা বললেও, তখন ইসরায়েলি সেনাদের কাজ ছিল যুদ্ধের আড়ালে ফিলিস্তিনি বেসামরিক মানুষকে হত্যা ও আতঙ্কিত করা।

অল্প কিছু সেনাই হত্যাযজ্ঞের কারণ বলতে লজ্জা পেয়েছিল। তাদের কাজ ছিল এক ভয়ের শাসন তৈরি করা, যা ইসরায়েলের লক্ষ্য ছিল যত বেশি সম্ভব ফিলিস্তিনিকে তাদের নিজভূমির শেষ অংশ থেকেও বিতাড়িত করা।

এই ভূমিগুলো হলো ১৯৬৭ সালে ইসরায়েলি সেনাদের দখল করা অঞ্চল, পরে যা অবৈধভাবে দখলদারিত্বে পরিণত হয়। এটি দেখা হয়েছিল একটি নতুন সুযোগ হিসেবে—১৯৪৭ ও ১৯৪৮ সালে ব্রিটিশ ম্যান্ডেট প্রত্যাহারের সময় জায়নবাদী মিলিশিয়ারা যে জাতিগত নির্মূল অভিযান শুরু করেছিল, সেটিকে সম্পূর্ণ করার সুযোগ। সেই অভিযানের শেষে প্রায় ৮০ শতাংশ ফিলিস্তিনিকে তাদের ঘরবাড়ি থেকে বিতাড়িত করা হয়, সদ্য ঘোষিত ইহুদি রাষ্ট্রের সীমানার ভেতর থেকে।

অনেকেই প্রতিবেশী দেশ যেমন লেবানন ও সিরিয়ার শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেয়। তবে অনেকে ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনের বাকি অংশ—পশ্চিম তীর, পূর্ব জেরুজালেম ও গাজায়—চলে যান, যা ১৯৪৮ সালে জর্ডান ও মিসরের নিয়ন্ত্রণে থাকার কারণে ইসরায়েলের আগ্রাসন থেকে কিছুটা রক্ষা পেয়েছিল। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধকে ইসরায়েলি নেতৃত্ব দেখেছিল দ্বিতীয় সুযোগ হিসেবে অর্থাৎ, সম্পূর্ণ ফিলিস্তিন দখল ও উপনিবেশ স্থাপনের সুযোগ হিসেবে এবং সামরিক দখলদারিত্ব ও বসতি স্থাপনের মাধ্যমে পুরো অঞ্চল ‘ইহুদি মিলিশিয়া বসতি’ দিয়ে ভরে তোলার পরিকল্পনা হিসেবে।

যুদ্ধের কয়েক সপ্তাহ পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লেভি এশকোল মন্ত্রিসভাকে জানান, কোথা থেকে উচ্ছেদ শুরু করতে হবে। তিনি বলেন, ‘আমরা আগে গাজা খালি করতে আগ্রহী।’ আন্তর্জাতিক চাপের কারণে তিনি স্পষ্ট করেন, এই জাতিগত নির্মূল প্রকাশ্যে নয়, বরং ধীরে ধীরে ও আড়ালে করতে হবে, যাতে নজর কম পড়ে। গাজায় ২০০৭ সালে শুরু হওয়া ১৬ বছরের অবরোধের পূর্বাভাস হিসেবে তিনি প্রস্তাব করেন যে ফিলিস্তিনিদের ‘দমবন্ধ ও বন্দিত্বের’ মাধ্যমে সেখান থেকে বের করে দেওয়া যেতে পারে—যা ইসরায়েল নিজেই তৈরি করছে।

জাতিগত নির্মূলের এই কর্মসূচি আরও দ্রুত এগিয়ে নেওয়া সম্ভব—এমন ইঙ্গিতই তিনি দিয়েছিলেন। তাঁর প্রস্তাব ছিল, ফিলিস্তিনি জনগণকে প্রয়োজনীয় উপকরণ থেকে বঞ্চিত করা, বিশেষ করে পানি থেকে। তিনি বলেন, ‘হয়তো যদি আমরা তাদের পর্যাপ্ত পানি না দিই, তাহলে তাদের আর কোনো বিকল্প থাকবে না, কারণ বাগানগুলো বিবর্ণ হয়ে শুকিয়ে যাবে।’

এই একই মানসিকতার ধারাবাহিকতায়, ৪০ বছর পর ইসরায়েল গাজায় কতটুকু ক্যালরি ঢুকতে দেওয়া হবে—তারও হিসাব কষতে শুরু করে, যাতে সেখানে মানুষ ধীরে ধীরে অপুষ্টির দিকে যায়। কিংবা ২০০৬ সালে ইসরায়েলের শীর্ষ সরকারি উপদেষ্টা ডোভ ওয়েইসগ্লাস যেমন ব্যাখ্যা করেছিলেন, ‘ধারণাটা হলো ফিলিস্তিনিদের ডায়েটে (অনাহারে) রাখা, তবে এমনভাবে নয় যে তারা অনাহারে মারা যায়।’

গাজাকে এই ‘ডায়েটের’ মধ্যে ঠেলে দেওয়ার ১৭ বছর পর যখন হামাস সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য এই অবরুদ্ধ ভূখণ্ড থেকে বেরিয়ে আসে, তখন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং তাঁর জেনারেলরা সেই মুহূর্তটিকে কাজে লাগান। তাঁরা সেই ‘বাগানগুলো’ ধ্বংস করে দেন এবং ‘ডায়েট’কে রূপান্তর করেন পূর্ণমাত্রার অনাহার অবরোধে। এটি এমন এক মানবতাবিরোধী অপরাধ, যার জন্য নেতানিয়াহু এবং তাঁর সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্ত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের ওয়ারেন্টের মুখোমুখি।

বেসামরিকদের লক্ষ্যবস্তু করা

১৯৬৭ সালের অপরাধগুলো বহু আগেই ফিলিস্তিনি ইতিহাসবিদরা বুঝে গিয়েছিলেন, যদিও তাঁদের কথা শোনা হয়নি। পরে ইসরায়েলি ইতিহাসবিদরা ধীরে ধীরে সামরিক নথির অংশবিশেষে প্রবেশাধিকার পাওয়ার পর ঘটনাগুলোর পুনর্গঠন শুরু করেন। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম হারেৎজের নতুন অনুসন্ধান, আকিভত ইনস্টিটিউটেরর গবেষণার ভিত্তিতে, ১৯৬৭ সাল থেকে শুরু হওয়া ফিলিস্তিনিদের ব্যাপক বিতাড়নের নিষ্ঠুরতার বিস্তারিত তুলে ধরেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘এই ঐতিহাসিক অনুসন্ধানে দেখা যায়, ইসরায়েল পশ্চিম তীর, গাজা এবং (সিরীয়) গোলান হাইটস থেকে প্রায় ৩ লাখ আরবকে বিতাড়িত ও উৎখাত করেছে। আর ১৯৪৮ সালের মতোই এই বিতাড়নের মধ্যে ছিল বেসামরিক হত্যা, আরব জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভয় সঞ্চার, লুটপাট এবং শেষ পর্যন্ত ধ্বংসযজ্ঞ।’

১৯৬৭ সালে আবারও বড় সংখ্যায় ফিলিস্তিনিদের বিতাড়িত করার পর, পরবর্তী কাজ ছিল—১৯৪৮ সালের মতোই তাদের আর ফিরে আসতে না দেওয়া। ইসরায়েলি সাংবাদিক ও এমপি উরি আভনেরি জর্ডান ও মিসরের সীমান্তে মোতায়েন সৈন্যদের সাক্ষ্য সংগ্রহ করেছিলেন, যেসব এলাকায় বিতাড়িত ফিলিস্তিনিরা ঠেলে দেওয়া হয়েছিল। সৈন্যদের কাজ ছিল, যে কোনো ফিলিস্তিনি পরিবার নিজেদের বাড়িতে ফেরার চেষ্টা করলে তাদের হত্যা করা।

আভনেরির আত্মজীবনীতে উল্লেখ করা এবং হারেৎজের প্রতিবেদনে উদ্ধৃত এক সৈন্যের ভাষ্য ছিল এমন, ‘আমরা এই সীমান্তগুলো বন্ধ করে দিয়েছিলাম এবং কোনো পূর্ব সতর্কতা ছাড়া গুলি করে হত্যা করার নির্দেশ পেয়েছিলাম। সত্যিই, প্রতি রাতে এমন গুলি চালানো হতো—পুরুষ, নারী ও শিশুদের ওপর—এমনকি চাঁদের আলোতেও। অর্থাৎ, যখন তাদের চিহ্নিত করা সম্ভব ছিল তখনই আমরা গুলি চালাতাম। অর্থাৎ, পুরুষ, নারী ও শিশুদের আলাদা করেও বোঝা যেত।’

ওই সেনা বলেন, ‘সকালে আমরা এলাকায় তল্লাশি চালাতে যেতাম এবং অফিসারের স্পষ্ট নির্দেশে যারা বেঁচে ছিল তাদেরও হত্যা করতাম। লুকিয়ে থাকা মানুষ ও আহতদেরও। হত্যার পর মৃতদেহগুলো মাটি দিয়ে ঢেকে দেওয়া হতো, যতক্ষণ না ট্র্যাক্টর এসে পৌঁছাত।’

আজকের ইসরায়েলি হুইসেলব্লোয়াররা সতর্ক করে বলছেন, এই সামরিক নীতি এখনও অপরিবর্তিত। গত তিন বছরে একাধিক তদন্তে উঠে এসেছে—ইসরায়েল রাষ্ট্র তার অপরাধ আড়াল করতে গোপনে বেসামরিক নিহতদের বুলডোজার দিয়ে গণকবরের মতো জায়গায় মাটি চাপা দিচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

উদাহরণস্বরূপ, এক বছর আগে ত্রাণ নিতে আসা ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলার পর এমনটা করা হয়েছে। আবার ২০২৫ সালের মার্চে অ্যাম্বুলেন্সে হামলা চালিয়ে ১৫ জন ফিলিস্তিনি জরুরি সেবাকর্মীকে হত্যা করার ঘটনাতেও একই প্যাটার্ন অনুসরণ করা হয়েছে।

১৯৬৭ সালে ইসরায়েলের এই ‘শ্যুট-টু-কিল’ নীতিতে অস্বস্তি বোধ করতেন এক সেনা। তিনি তাঁর কমান্ডারের সঙ্গে কথোপকথনের কথা স্মরণ করে বলেন, ‘আমি অফিসারকে জিজ্ঞেস করেছিলাম: যদি আমি শিশুদের কান্না শুনি, তাহলে কি তাদেরও গুলি করব?’ জবাবে বলা হয়েছিল, ‘মেয়েদের মতো আচরণ কোরো না।’

এতে কিছুই অস্বাভাবিক নয়। জানা যায়, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে গাজায় এক বছরের কম বয়সী ১ হাজারের বেশি শিশুকে হত্যা করেছে ইসরায়েল। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ২০২৩ সালের শেষ দিকে আল-নাসের হাসপাতালে অভিযান চালানোর পর পাঁচটি অপরিণত নবজাতককে ইনকিউবেটরে ফেলে যেতে দেয়, ফলে সেগুলো সেখানেই মারা যায় ও পচতে থাকে।

ইসরায়েলি কমান্ডাররা এটাও জানতেন যে, অবরোধে সবচেয়ে আগে মারা যাবে সবচেয়ে দুর্বলরা। খাদ্য, শিশুখাদ্য, আশ্রয় না পাওয়ায় এবং মায়েদের পর্যাপ্ত পুষ্টির অভাবে দুধ উৎপাদন কমে যাওয়ায় শিশুদের অনেকে ঠান্ডায় বা অনাহারে মারা গেছে। এক সৈনিক (সেনা–২) উল্লেখ করেন, ইসরায়েলি সামরিক মতবাদ সৈন্যদের শেখায় ফিলিস্তিনিদের—এমনকি ফিলিস্তিনি শিশুদেরও—‘মানুষ’ হিসেবে দেখা বন্ধ করতে। তাদের জীবনকে মূল্যহীন হিসেবে গণ্য করা হয়।

অতীতের পুনরাবৃত্তি

গত সপ্তাহেও পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি সেনারা আরেক ফিলিস্তিনি শিশুকে হত্যা করেছে। তারা বেথলেহেম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ফাহদ আবু হেইকালকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়। তিনি হেবরন শহরে গাড়ি চালাচ্ছিলেন। এই শহরটি ইসরায়েলের কঠোর সামরিক দখলের অধীনে।

এক সৈন্য ওই শিক্ষক গাড়িটি থামতে শুরু করার সময় খুব কাছ থেকে গুলি চালায়। সেই গুলিতে আবু হাইকাল তাঁর সাত মাস বয়সী সন্তান সামকে হারান। শিশুটি ঘটনাস্থলেই মারা যায়, আর তাঁর মা আহত হন এবং শিশুটিকে কোলে ধরে ছিলেন। গাড়িতে থাকা ১১ বছরের আরেক সন্তান নিজের চোখে ছোট ভাইয়ের রক্তক্ষরণ ও মৃত্যু দেখেন।

ইসরায়েলি সেনারা দশকের পর দশক ধরে ফিলিস্তিনি শিশুদের হত্যা করে আসছে। তবুও ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস ৪০ জন শিশুকে হত্যা করেছে—ইসরায়েলের এই সম্পূর্ণভাবে বানোয়াট দাবির বিরুদ্ধে পশ্চিমা গণমাধ্যম ও রাজনীতিকদের যে একরকম অভিন্ন ক্ষোভ দেখা গেছে, তার সামান্যতম প্রতিফলনও অতীতের এসব ঘটনায় দেখা যায়নি। আসলে সেদিন নিহত হয়েছিল মাত্র একজন ইসরায়েলি শিশু—৯ মাস বয়সী মিলা কোহেন। সেও সাম আবু হায়কালের মতোই তাঁর মায়ের কোলে গুলিবিদ্ধ হয়েছিল।

ইসরায়েলের ১৯৬৭ সালের গাজা ও পশ্চিম তীর থেকে জনগণ উচ্ছেদের অভিযান কোনো হঠাৎ সিদ্ধান্ত ছিল না, কিংবা তাৎক্ষণিকভাবে নেওয়া কোনো পদক্ষেপও ছিল না। হারেৎজের তথ্য অনুযায়ী, এই নীতি বহু বছর আগেই সতর্কভাবে পরিকল্পনা করা হয়েছিল। ১৯৪৮ সাল থেকেই ইসরায়েল অপেক্ষা করছিল এমন একটি মুহূর্তের জন্য, যখন তারা ফিলিস্তিনের ভূখণ্ডের বাকি অংশও দখল করে আরও উচ্ছেদ চালাতে পারবে—যে ভূখণ্ডগুলো ছিল তাদের সহিংস বসতি-ঔপনিবেশিক প্রকল্পের সম্পূর্ণতা অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় শেষ অংশ। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধ—যা মিসর, সিরিয়া ও জর্ডানের বিরুদ্ধে হয়েছিল—সেই কাজের জন্য একটি অজুহাত হিসেবে কাজ করে।

সেই যুদ্ধের সিনিয়র ব্যাটালিয়ন কমান্ডার ইশাই আমরামি পরে স্বীকার করেন, ‘এই জিনিসটি—যা আমি সরাসরি অভিজ্ঞতা করেছি—ছিল ব্যাপক জনগণ স্থানান্তরের একটি প্রচেষ্টা।’ হারেৎজ উল্লেখ করে, ‘এই গল্পে ফিলিস্তিনিরা ছিল নিছক দর্শক। প্রতিরক্ষামন্ত্রী মোশে দাইয়ান তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন, পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিরা যুদ্ধে অংশ নেয়নি এবং এটি তাদের যুদ্ধ ছিল না। তবুও, তারাই এর মূল্য দিয়েছে।’

ইসরায়েল ১৯৪৮ সালের পর যেমন করেছিল, তেমনই আবারও ফিলিস্তিনি সম্প্রদায়গুলোর ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ শুরু করে, যাতে ফিলিস্তিনিদের ফিরে আসার জন্য আর কোনো ঘরবাড়ি অবশিষ্ট না থাকে। তবে হারেৎজের ভাষ্য, ইসরায়েল নিজের দ্রুত সামরিক সাফল্যের কারণেই এক পর্যায়ে পিছু হটতে বাধ্য হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘এটি ছিল সংঘাতের ইতিহাসে বিরল সেই ঘটনাগুলোর একটি, যেখানে ইসরায়েলকে প্রবল আন্তর্জাতিক চাপের কারণে পিছু হটতে বাধ্য করা হয়েছিল।’

তবে এটুকু উল্লেখ না করলেও চলে যে,১৯৬৭ সালের তুলনায় গত তিন বছরে এমন আন্তর্জাতিক চাপ একেবারেই অনুপস্থিত ছিল। ব্রিটেনের কিয়ার স্টারমারের মতো নতুন পশ্চিমা নেতারা—যিনি একসময় মানবাধিকার আইনজীবী হিসেবে পরিচিত ছিলেন—গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের স্পষ্টভাবে ‘ধ্বংসাত্মক’ কর্মসূচিকে ‘আত্মরক্ষা’ হিসেবে বৈধতা দিয়েছেন। ১৯৬০-এর দশকের পূর্বসূরিদের মতো না হলেও আজকের পশ্চিমা নেতারা ও তাদের গণমাধ্যম ইসরায়েলকে কূটনৈতিক সময় ও সুযোগ দিয়েছে এবং একইসাথে অস্ত্র ও গোয়েন্দা সহায়তাও দিয়েছে। যার মাধ্যমে গাজাকে ধ্বংস করা সম্ভব হয়েছে। তাদের সহায়তা ছাড়া এই গণহত্যা সম্ভব হতো না।

এই দায়মুক্তির সাহসে বলীয়ান হয়ে ইসরায়েল ধ্বংসযজ্ঞকে আরও বিস্তৃত করার চেষ্টা করেছে—ইরানে সীমিত সফলতা এবং দক্ষিণ লেবাননে তুলনামূলক বেশি সফলতার মাধ্যমে। যখন পশ্চিমা রাজনীতিক ও গণমাধ্যম গাজার প্রসঙ্গকে আনন্দের সঙ্গে ভুলে যায়, তখনো ইসরায়েল সেখানে নিরবচ্ছিন্ন চাপ ও দুর্ভোগ বজায় রাখে। তথাকথিত ‘ইয়েলো লাইন’—যা ধ্বংসপ্রাপ্ত এই উপত্যকায় ইসরায়েলি সামরিক নিয়ন্ত্রণের সীমারেখা নির্দেশ করে এবং যেখানে ফিলিস্তিনিদের প্রবেশ নিষিদ্ধ—তা ধীরে ধীরে সম্প্রসারিত হয়ে অর্ধেক ভূমি থেকে ৭০ শতাংশে পৌঁছেছে।

গাজার মানুষ বাস্তবিক অর্থেই তাদের ধ্বংসস্তূপে পরিণত মাতৃভূমি থেকে ঠেলে বের করে দেওয়া হচ্ছে। আর ঠিক সেই সময়টাতেই ইসরায়েল তড়িঘড়ি করে তৃতীয় কোনো দেশ—মিসর, অথবা হয়তো সোমালিল্যান্ড—খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে, যারা এই বহিষ্কৃত গাজাবাসীকে গ্রহণ করবে।

প্রসঙ্গ বাদ দেওয়া

মার্কিন মহাকাশবিজ্ঞানী কার্ল সেগান বলিছিলেন, ‘বর্তমানকে বোঝার জন্য অতীত জানা প্রয়োজন।’ ঠিক এই কারণেই পশ্চিমা রাজনীতিক ও গণমাধ্যম অতীতকে সচেতনভাবে বাদ দিয়েছে। ১৯৪৮ ও ১৯৬৭ সালের ইসরায়েলের সহিংস জাতিগত উচ্ছেদের ইতিহাসের মতো প্রেক্ষাপট, যা বর্তমান সময়ে গাজা, পশ্চিম তীর ও দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের আচরণকে ব্যাখ্যা করে—তা এখন আর পশ্চিমা গণমাধ্যমে আলোচিত হয় না।

অতীতবিহীন এক জনমত তৈরি করে পশ্চিমা দর্শকদের সহজেই এমন বিশ্বাসে প্রভাবিত করা হয়েছে যে, ইসরায়েলের নৃশংসতা কেবল ২০২৩ সালের এক দিনের হামাস আক্রমণের প্রতিক্রিয়া এবং তাও নাকি ‘সমানুপাতিক’ প্রতিক্রিয়া।

কিন্তু একটি স্পষ্ট সত্য আড়াল করা হয়েছে—অন্তত আট দশক ধরে ইসরায়েল যেকোনো সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ফিলিস্তিনিদের তাদের মাতৃভূমি থেকে বিতাড়িত করার চেষ্টা করেছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরের হামাস হামলা কোনো মোড় ঘোরানো ঘটনা ছিল না, পশ্চিমা বর্ণনায় যেমনটি দেখানো হয়। ১৯৬৭ সালে—অর্থাৎ হামাস আক্রমণের ৫৬ বছর আগে—এশকোল ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ইসরায়েলের ধীরগতির উচ্ছেদ কর্মসূচিকে দ্রুততর করতে পারে। ভবিষ্যতে এমন একটি মুহূর্ত আসতে পারে, যাকে তিনি ‘অপ্রত্যাশিত বিলাসবহুল সমাধান’ বলে অভিহিত করেছিলেন—যখন ইসরায়েল দ্রুত একটি ফিলিস্তিনিবিহীন ফিলিস্তিন বাস্তবায়ন করতে পারবে।

তিনি বলেন, ‘হয়তো আমরা আরেকটি যুদ্ধ আশা করতে পারি এবং তখন এই সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে। কিন্তু সেটি এক ধরনের লাক্সারি, তবে একটি অপ্রত্যাশিত সমাধান।’

এই হারিয়ে যাওয়া প্রেক্ষাপট যোগ করলে—যেমন হারেৎজ তার নতুন প্রতিবেদনে করেছে—গল্পটি সম্পূর্ণ বদলে যায়। ৭ অক্টোবরের পরের ঘটনাগুলো তখন আর নিছক বর্বরতা হিসেবে দেখা যায় না, বরং দীর্ঘ দশকজুড়ে চলা ইসরায়েলি সহিংসতার বিরুদ্ধে এক ধরনের মরিয়া, শেষ সুযোগের প্রতিক্রিয়া হিসেবে ধরা পড়ে। যার লক্ষ্য ছিল ফিলিস্তিনিদের জীবন এমনভাবে দুর্বিষহ করে তোলা, যাতে তারা হয় দেশ ছেড়ে পালায়, নয়তো সেখানেই ধ্বংস হয়ে যায়—দারিদ্র্য, অবরোধ, অনাহার ও হত্যার মাধ্যমে।

অনুপস্থিত প্রেক্ষাপট যুক্ত করলে, গাজার ভেতরে ইসরায়েলের কথিত ‘প্রতিশোধ’—তাদের গণহত্যামূলক তাণ্ডব—আসলে যা, সেটাই স্পষ্ট হয়ে ওঠে, এটি আট দশক ধরে চলা তাদের জাতিগত নির্মূল অভিযানেরই ধারাবাহিকতা। প্রকৃতপক্ষে, এটি তার চূড়ান্ত অধ্যায়। এর সমাপ্তি-পর্ব।

ইসরায়েলের প্রতিষ্ঠাতা ডেভিড বেন গুরিয়ন ১৯৩৭ সালে, ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার ১১ বছর আগে তাঁর ছেলেকে লিখেছিলেন, ‘আমাদের আরবদের বিতাড়িত করতে হবে এবং তাদের জায়গা নিতে হবে।’ ১৯৪৮ সালের আরবদের তাদের ভূমি থেকে গণহারে উচ্ছেদের সময় লেখা তাঁর একটি ডায়েরিতে বেন গুরিয়ন তাঁর জেনারেলদের মনোভাব সংক্ষেপে লিখেন, ‘যদি আমরা কোনো পরিবারকে অভিযুক্ত করি—তাহলে আমাদের তাদের প্রতি কোনো দয়া না দেখিয়ে ক্ষতি করতে হবে। নারী ও শিশুদের ক্ষেত্রেও কোনো দয়া নয়। নইলে এটি কার্যকর প্রতিক্রিয়া নয়। অভিযানের সময়, দোষী আর নির্দোষের মধ্যে কোনো পার্থক্য করার প্রয়োজন নেই।’

সিনিয়র কমান্ডার মোর্দেখাই মাকলেফ ছিলেন নবগঠিত ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা। তিনি ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ২ বছর পর ১৯৫০ সালে ইসরায়েলের নীতির পেছনের যুক্তি নথিভুক্ত করেন। তিনি লিখেন, ‘গ্যালিলিতে বসবাসকারী ১ লাখ ১৪ হাজার মানুষকে আতঙ্কিত করা ছাড়া বিতাড়িত করা অসম্ভব।’

যদিও আমরা সে সময়কার ফিলিস্তিনি বর্ণনাগুলো উপেক্ষা করি, তবুও এখন পর্যন্ত উন্মুক্ত হওয়া ইসরায়েলি আর্কাইভের ক্ষুদ্র অংশও ইসরায়েলি ইতিহাসবিদদের কাছে ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিনিদের গণহত্যা এবং পরিকল্পিত ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত করেছে। সাম্প্রতিক ইসরায়েলি চলচ্চিত্র ‘তান্তুরা’য়—যে গ্রামে ফিলিস্তিনিদের ওপর ভয়াবহ গণহত্যা চালানো হয়েছিল—সে সময় দায়িত্বে থাকা ইসরায়েলি সেনাদের মধ্যে কিছু বৃদ্ধ ব্যক্তি স্বীকার করেন, আর্কাইভের নথিগুলো সত্য এবং তাঁরা নিজেরাই ফিলিস্তিনি মেয়েদের ধর্ষণের ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছিলেন।

এখানে উল্লেখ করা দরকার, ‘অস্ত্রের মুখে ধর্ষণ’ আজও অব্যাহত। ফিলিস্তিনিদের ওপর নির্যাতনকে ইসরায়েলি মানবাধিকার সংগঠন বিটিসালেম ইসরায়েলের ‘নেটওয়ার্ক অব টর্চার ক্যাম্পস’ বলে আখ্যা দিয়েছে। এই ধরণের ধর্ষণ—যা এখন অনেক ক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত কুকুর ব্যবহার করে করা হয়—এতটাই বিস্তৃত যে তা আর আড়াল করা সম্ভব হচ্ছে না। এমনকি শেষ পর্যন্ত এটি মূলধারার গণমাধ্যম যেমন নিউইয়র্ক টাইমসের নজরেও এসেছে। যার ফলে তীব্র প্রতিবাদ ও নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে মামলা করার হুমকির মতো প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।

ইসরায়েলের আটককেন্দ্রগুলোতে যৌন নির্যাতন এতটাই নিয়মিত যে আন্তর্জাতিক অধিকারকর্মীরা গত মাসে সাইপ্রাসের উপকূলে আন্তর্জাতিক জলসীমায় আটক হওয়ার পর একই ধরনের সংগঠিত ধর্ষণের শিকার হন। তারা গাজার দিকে যাত্রা শুরু করেছিলেন ইসরায়েলের তথাকথিত ‘গণহত্যামূলক অবরোধ’ ভাঙতে।

ইসরায়েল চায় এই ভয়ের বিস্তার ঘটুক—ফিলিস্তিন থেকেই শুরু করে যারা তাদের জনগণের প্রতি সংহতি জানাতে চায়, তাদের পর্যন্ত। পশ্চিমা রাজনীতিক ও গণমাধ্যম প্রায় এই ভয়াবহ অপরাধগুলোর কথা তাদের নিজেদের নাগরিকদের ক্ষেত্রেও উল্লেখ করেনি। কেন? কারণ এসব অপরাধ স্বীকার করলে মানতে হবে যে ইসরায়েলি শাসনের অধীনে ফিলিস্তিনিদের ওপর আরও ভয়াবহ নৃশংসতা চালানো হচ্ছে।

পাহাড়সম অনুযোগ

গাজা কোনো ব্যতিক্রম নয়। এটি ইসরায়েলের আট দশকব্যাপী সামরিক কৌশলেরই সম্পূর্ণ ধারাবাহিক অংশ। পশ্চিমা সমাজ এটা বোঝে না। কারণ, তাদের রাজনৈতিক ও গণমাধ্যম কাঠামো দীর্ঘদিন ধরে সচেতনভাবে মানুষকে এসব জানার সুযোগ থেকে দূরে রেখেছে। পশ্চিমা জনগণ যদি সত্যিই জানতে পারত গত ৮০ বছরের বেশি সময় ধরে ফিলিস্তিনিদের ওপর কী ঘটছে—প্রথমে জায়নবাদী আন্দোলনের মাধ্যমে, পরে ইসরায়েলি রাষ্ট্রের মাধ্যমে—তাহলে হয়তো তারা আরও বড় আকারে প্রতিবাদ মিছিলে যোগ দিত, যা রাজনৈতিকভাবে উপেক্ষা করা অসম্ভব হয়ে উঠত।

পশ্চিমারা যদি জানত আসলে কী ঘটছে, তাহলে তারা হয়তো সেই কর্মীদের সঙ্গে যোগ দিত যারা ইসরায়েলি অস্ত্র কারখানা—যেমন এলবিট সিস্টেমস—নিষ্ক্রিয় করার চেষ্টা করছে, যেগুলো ব্রিটেনসহ পশ্চিমা দেশগুলোতেই খোলাখুলিভাবে পরিচালিত হয়। এর ফলে ফিলিস্তিন ও লেবাননের মানুষের ওপর ব্যবহৃত ড্রোনসহ অন্যান্য অস্ত্রের সরবরাহ ভেঙে পড়তে পারত।

হাজার হাজারের বদলে হয়তো লাখ লাখ মানুষ যুক্তরাজ্যে ‘গণহত্যা বিরোধিতা’ লেখা প্ল্যাকার্ড তুলে ধরত এবং ‘সন্ত্রাসবাদ সমর্থক’ হিসেবে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগার ব্যবস্থাকে অচল করে দিত। ব্রিটেনের তথাকথিত ‘ন্যায়বিচার’ ব্যবস্থাকে হাস্যকর করে তুলত।

অজ্ঞতায় আচ্ছন্ন কিন্তু তথ্য দ্বারা সজ্জিত হলে, আরও বেশি পশ্চিমা মানুষ হয়তো নৌকায় চড়ে একটি নৌবহর গড়ে তুলত, যা গণমাধ্যম উপেক্ষা করতে পারত না। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যদি সত্যিকারের প্রেক্ষাপট জানা থাকত—ইসরায়েলের দশকের পর দশক ধরে চলা হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ ও উচ্ছেদের ধারা—তাহলে পশ্চিমা জনগণ বুঝতে পারত যে, তাদের রাজনৈতিক ও গণমাধ্যম শ্রেণি আসলে নৈতিক কোনো শক্তি নয়। তারা আন্তর্জাতিক আইন ও উদার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার রক্ষকও নয়।

তারা ভণ্ড। আরও সঠিকভাবে বললে, তারা এমন রাজনৈতিক ও আর্থিক কাঠামোর মধ্যে কাজ করে, যা পশ্চিমের একটি ক্ষুদ্র অভিজাত শ্রেণিকে সমৃদ্ধ করে—একটি লাভজনক যুদ্ধযন্ত্রের মাধ্যমে, যা জীবাশ্ম জ্বালানি শিল্পের বিশাল মুনাফা রক্ষা করে।

এই ক্ষমতার কাঠামো ফিলিস্তিনিদের একদিকে ঠেলে দেয় অকাল মৃত্যুর দিকে, আরেকদিকে শরণার্থী শিবির, নির্বাসন বা দারিদ্র্যের দিকে। অন্যদিকে, পশ্চিমে আমাদের ঠেলে দেয় এমন কারাগারে যার কোনো দৃশ্যমান দেয়াল নেই—অজ্ঞতা ও নীরব সহযোগিতার কারাগার, অথবা জ্ঞান থাকলেও অসহায়তার কারাগার। সব ক্ষেত্রেই, আমাদের মানবিক অনুভূতি নিস্তেজ হয়ে যায়। হৃদয় হয় কঠিন হয়ে যায়, নয়তো ভেঙে পড়ে। আমরা যে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, তা ফিলিস্তিনিদের মতোই—এই বন্দিদশা থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজে পাওয়া।

মিডল ইস্ট আইয়ে ফিলিস্তিন গবেষক ও সাংবাদিক জোনথান কুকের লেখা নিবন্ধ থেকে অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত