
১৯৮৮ সালে সামরিক ইতিহাসবিদ জেমস স্টোকসবারি একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, গণতন্ত্র মূলত দুই ধরণের যুদ্ধে পারদর্শী হয়। একটি ‘ছোট যুদ্ধ’, যেখানে পেশাদাররা লড়েন এবং সাধারণ মানুষের জীবনে তার প্রভাব পড়ে না; অপরটি ‘বড় যুদ্ধ’, যেখানে পুরো সমাজকে একত্রিত হতে হয়। কিন্তু গণতন্ত্র যখন ‘মাঝারি পাল্লার যুদ্ধ’ লড়তে যায়, যেখানে অর্ধেক মানুষ যুদ্ধে যায় আর বাকিরা ঘরে বসে থাকে, তখনই আসল বিপত্তি ঘটে।
বর্তমানে ইরানের বিরুদ্ধে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ ঠিক সেই পথেই এগোচ্ছে। এটি এমন এক যুদ্ধ যা ছোট অপারেশন হিসেবে শুরু হলেও অচিরেই একটি দীর্ঘস্থায়ী ও বিধ্বংসী ‘মাঝারি পাল্লার যুদ্ধে’ রূপ নেওয়ার সব লক্ষণ দেখাচ্ছে।
মনে রাখা ভালো, সমরতাত্ত্বিক কার্ল ভন ক্লজউইটজ বর্ণিত ‘সীমিত যুদ্ধ’ এবং স্টোকসবারির ‘মাঝারি পাল্লার যুদ্ধ’ এক নয়। সীমিত যুদ্ধ পরিকল্পিতভাবে ছোট রাখা হয়। কিন্তু মাঝারি পাল্লার যুদ্ধ হলো এমন এক সংঘাত যা শুরুতে ছোট মনে হলেও ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। গত দুই দশকে আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধ ছিল এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এগুলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতো বিশাল ছিল না, আবার পানামা বা গ্রেনাডা আক্রমণের মতো ছোট ‘পুলিশি অ্যাকশন’ও ছিল না। এই ধরণের যুদ্ধ আমেরিকার প্রেসিডেন্সিয়াল প্রশাসনের সম্মান ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে এবং সরকারের বৈদেশিক নীতির ওপর জনগণের আস্থা নষ্ট করেছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করছেন, ইরান আত্মসমর্পণ না করলে বোমাবর্ষণ চলতেই থাকবে। কিন্তু সমস্যা হলো একটি বিদ্যমান ব্যবস্থা ভেঙে ফেলা সহজ, কিন্তু তার জায়গায় নতুন ও অনুগত একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা অত্যন্ত কঠিন। যদি ইরান অরাজকতার দিকে যায়, তবে পারস্য উপসাগর অস্থির হয়ে পড়বে। ট্রাম্প স্থলসেনা না পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিলেও একবার গৃহযুদ্ধ শুরু হলে বিশেষ বাহিনী পাঠানোর চাপে তিনি এক ফাঁদে পা দেবেন, যা শেষ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নেবে।
মাঝারি পাল্লার যুদ্ধগুলো প্রায়শই সেই জায়গাটি সম্পর্কে ভুল বোঝাবুঝি থেকে তৈরি হয়। ১৯৪৯ সালে চীনে কমিউনিস্টদের ক্ষমতা দখলের কয়েক বছর আগেই মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের চীন বিশেষজ্ঞরা এ বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন। সেই রূঢ় বাস্তবতাকে মেনে নিতে ব্যর্থ হওয়া এবং শুরু থেকেই কমিউনিস্ট শাসনের সাথে (তা যতই নিষ্ঠুর হোক না কেন) বোঝাপড়া না করা পরবর্তীতে কোরিয়া এবং ভিয়েতনাম—উভয় ক্ষেত্রেই কমিউনিজম দমনে আমেরিকার প্রচেষ্টায় প্রভাব ফেলেছিল। একইভাবে, ২০০৩ সালে ইরাকের স্থানীয় সংস্কৃতি এবং পরিস্থিতি সম্পর্কে সম্যক অবগত স্টেট ডিপার্টমেন্টের মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞরা সেখানে মার্কিন সামরিক সংশ্লিষ্টতার বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন।
ইতিহাসবিদ বারবারা তুচম্যানের মতে, আমেরিকা ভিয়েতনামে ব্যর্থ হয়েছিল কারণ তারা ‘ভূ-রাজনীতি’ নিয়ে যতটা ভেবেছিল, স্থানীয় ‘সংস্কৃতি ও রাজনীতি’ নিয়ে ততটা ভাবেনি। ট্রাম্প প্রশাসনও এখন একই ভুল করছে। তাঁরা ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব বা পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে চিন্তিত, কিন্তু ইরানের ভেতরের সামাজিক কাঠামো বা জাতীয়তাবাদ নিয়ে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ উপেক্ষা করছে। যখন কোনো ছোট যুদ্ধ মাঝারি যুদ্ধে রূপ নেয়, তখন বোঝা যায় যে নীতিনির্ধারকেরা সেই অঞ্চলের প্রকৃত অবস্থা বুঝতে ভুল করেছেন।
ইতিহাসের জনক থুসিডাইডিস যুদ্ধ বা সংঘাতের অন্যতম কারণ হিসেবে ‘সম্মান’কে চিহ্নিত করেছিলেন। ট্রাম্পের বেলায় এই তত্ত্ব ফলে বটে। তাঁর ব্যক্তিগত স্বভাব হলো যেকোনো ব্যক্তিগত অপমানের দ্রুত ও হিংস্র প্রতিক্রিয়া জানানো। ২০০৪ সালে ইরাকের ফালুজায় চারজন মার্কিন কন্ট্রাক্টরকে হত্যার পর ‘আমেরিকান সম্মান’ উদ্ধারের নামে যে আক্রমণ চালানো হয়েছিল, তা কেবল প্রাণহানিই বাড়িয়েছিল। বর্তমান সময়েও ড্রোন হামলা বা দূতাবাস অবরোধের মতো ঘটনায় ট্রাম্পের আবেগপ্রবণ প্রতিক্রিয়া একটি ছোট সংঘাতকে বড় যুদ্ধে পরিণত করতে পারে।
সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী কলিন পাওয়েল বলেছিলেন, আমেরিকাকে তখনই যুদ্ধে জড়ানো উচিত যখন সুস্পষ্ট জাতীয় স্বার্থ থাকবে, সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকবে, জনগণের ব্যাপক সমর্থন থাকবে এবং সর্বপোরি একটি ‘এক্সিট স্ট্র্যাটেজি’ বা যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ থাকবে। ট্রাম্প এই ‘পাউয়েল ডকট্রিন’কে উপেক্ষা করছেন। ভেনেজুয়েলা, নাইজেরিয়া বা মেক্সিকোর ড্রাগ কার্টেলগুলোর বিরুদ্ধে তার নেওয়া পদক্ষেপগুলো কোনো সুনির্দিষ্ট দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ছাড়াই চলছে।
বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য এক হাজার বছর টিকে ছিল কারণ তারা সরাসরি যুদ্ধ যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলত। আমেরিকা যখন তার ২৫০তম বার্ষিকী পালন করছে, তখন এটি একের পর এক মাঝারি পাল্লার যুদ্ধের সম্মুখীন। যদি ট্রাম্প এই ফাঁদ থেকে বের হতে না পারেন, তবে মার্কিন জনগণ এবং শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে এক বিরাট ফাটল তৈরি হবে। এই ধরণের বিভাজনই ধীরে ধীরে একটি প্রজাতন্ত্রের মৃত্যু ঘটায়।
ফরেন অ্যাফেয়ার্স থেকে অনুবাদ করেছেন আবদুল বাছেদ

দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পৃথিবীর বুকে টিকে থাকা ছোট্ট সমাজতান্ত্রিক দেশ কিউবার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেপ্তারের পর কিউবাকে ঘিরে ট্রাম্পের আক্রমণাত্মক মন্তব্য দ্বীপরাষ্ট্রটির অস্তিত্বকে সংকটে ফেলেছে।
৪ ঘণ্টা আগে
ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বিশ্বরাজনীতির মেরুকরণ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এক অঞ্চলের উত্তাপ অন্য অঞ্চলের নিরাপত্তাকে সরাসরি হুমকির মুখে ফেলছে। গত মঙ্গলবার দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে-মিউং নিশ্চিত করেছেন, পেন্টাগন দক্ষিণ কোরিয়া থেকে তাদের অত্যন্ত শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘থাড’ এবং
৫ ঘণ্টা আগে
ডোনাল্ড ট্রাম্প ৯ মার্চ ঘোষণা করেছেন, দ্বিতীয় সপ্তাহে পা রাখা ‘তৃতীয় উপসাগরীয় যুদ্ধ’ প্রায় শেষের পথে। ইরানের সামরিক সক্ষমতা ‘গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে’ দাবি করে তিনি জানিয়েছেন, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শিগগির শেষ হবে। ট্রাম্পের আশ্বাস, প্রয়োজনে আমেরিকা নিজেই জাহাজগুলোকে পাহারা দিয়ে হরমুজ প্রণালি পার করে দেবে
৬ ঘণ্টা আগে
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরুর ঘোষণা দেন, তখন থেকে বিশ্বজুড়ে এক চরম বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়েছে। পেন্টাগন থেকে হোয়াইট হাউস—কোথাও ট্রাম্পের এই যুদ্ধের প্রকৃত লক্ষ্য বা সময়সীমা নিয়ে স্পষ্ট কোনো উত্তর নেই। প্রশ্ন উঠেছে, ট্রাম্প কি আদৌ কোনো নির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়
৬ ঘণ্টা আগে