Ajker Patrika

ধাতুর বাজার থেকে উধাও ২ ট্রিলিয়ন ডলার, সোনার ওপর আস্থা তলানিতে কেন

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
ধাতুর বাজার থেকে উধাও ২ ট্রিলিয়ন ডলার, সোনার ওপর আস্থা তলানিতে কেন

সাম্প্রতিক সময়ে সোনা ও রুপার দামের মহাধসের ফলে মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বাজার থেকে প্রায় ২ ট্রিলিয়ন বা ২ লাখ কোটি ডলার মুছে গেছে। আপাতদৃষ্টিতে বিষয়টিকে সামষ্টিক অর্থনীতির যুক্তিবিরোধী মনে হতে পারে। তবে একে কেবল বাজারের একটি সাধারণ বিচ্যুতি হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বরং একে বাজারের এমন এক কাঠামোগত পরিবর্তনের বিন্দু হিসেবে বোঝা উচিত, যেখানে অস্থির বাজারগুলো নিরাপদ বিনিয়োগের ওপর থেকে মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস কমিয়ে দিচ্ছে।

পশ্চিম এশিয়ায় যখন গত কয়েক দশকের মধ্যে অন্যতম ভয়াবহ সামরিক সংঘাত–উত্তেজনা চলছে, তখন ভূ-রাজনৈতিক যুক্তিতে নিরাপদ আশ্রয়ের চাহিদা বাড়ার কথা থাকলেও উল্টো মূল্যবান ধাতুগুলোর ব্যাপক দরপতন হয়েছে। ঐতিহাসিক আচরণের এই বিপরীত চিত্র একটি গভীর পরিবর্তনের সংকেত দেয়—বৈশ্বিক সম্পদের দাম নির্ধারণে এখন ভূ-রাজনীতির জায়গা দখল করে নিয়েছে মুদ্রার তারল্য।

যুদ্ধ থেকে সুদহারের ধাক্কা

এই পতনের তাৎক্ষণিক কারণ ছিল ভূ-রাজনৈতিক। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানি অবকাঠামোতে মার্কিন-ইসরায়েল হামলা এবং হরমুজ প্রণালী (যেখান দিয়ে বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল ও এলএনজি সরবরাহ হয়) বন্ধের হুমকির ফলে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলে প্রায় ৫০ ডলার বেড়ে ১১৯ ডলারের উপরে উঠে যায়।

পরিহাসের বিষয় হলো—ঐতিহাসিকভাবে এমন পরিস্থিতিতে সোনার দাম বাড়ার কথা। কিন্তু বাজার এই ধাক্কাটিকে অন্যভাবে গ্রহণ করেছে। জ্বালানির দাম বাড়লে মূল্যস্ফীতি বাড়ে, যার ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো আরও কঠোর মুদ্রানীতি গ্রহণ করে। এটি সুদের হার বাড়িয়ে দেয়, ফলে সোনার মতো কোনো মুনাফা না দেওয়া সম্পদ ধরে রাখার খরচ বেড়ে যায় এবং দামের ওপর চাপ তৈরি হয়।

এই প্রক্রিয়াটি একটি আমূল পরিবর্তনকে তুলে ধরে। তেল এখন আর সরাসরি সোনার দাম নিয়ন্ত্রণ করে না; এটি এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে কাজ করে। তেলের চড়া দাম এই বার্তাই দিচ্ছে যে সুদহার দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চপর্যায়ে থাকবে, যা সোনার মূল্যস্ফীতি রোধকারী আকর্ষণকে অকেজো করে দিয়েছে। যুদ্ধের তীব্রতা বাড়লেও সোনা একদিনে প্রায় ৩ দশমিক ৮ শতাংশ এবং রুপার দাম ৭ শতাংশের বেশি পড়ে গেছে। যেখানে সোনার অবস্থান সবচেয়ে শক্তিশালী হওয়ার কথা ছিল, সেখানে এটি ‘নিরাপদ আশ্রয়’ হওয়াতে ব্যর্থ হয়েছে।

সোনার জায়গা নিল মুনাফাযোগ্য নিরাপত্তা

বৈশ্বিক মুদ্রা ব্যবস্থার পরিবর্তনই এই পতনের মূল কারণ। কেভিন ওয়ারশ মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের নতুন চেয়ারপার্সন হিসেবে মনোনীত হওয়ায় বাজার ধারণা করছে যে—মুদ্রার সরবরাহ কঠোরভাবে কমানো হবে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ১০ বছর মেয়াদী বন্ডের মুনাফা ৪ দশমিক ৩ শতাংশ এবং ৩০ বছর মেয়াদী বন্ডের মুনাফা ৪ দশমিক ৮ শতাংশে পৌঁছেছে।

এটি নিরাপত্তার ধারণাকে বদলে দিয়েছে। সোনা কোনো বাড়তি মুনাফা দেয় না, তাই এটি এখন এমন সরকারি বন্ডের সাথে পাল্লা দিচ্ছে যা ৪-৫ শতাংশ নিশ্চিত মুনাফা দেয়। এখন নিরাপত্তা মানে কেবল ‘সম্পদের মূল্য রক্ষা’ নয়, বরং ‘মূল্য রক্ষার পাশাপাশি মুনাফা অর্জন।’ এমন পরিস্থিতিতে ভূ-রাজনৈতিক সংকটও মানুষকে সোনার দিকে টানতে পারছে না; মানুষ এখন ভয়ের চেয়ে মুনাফাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

ধসের নেপথ্যে কারিগরি কারণ

সামষ্টিক অর্থনীতি পতনের দিক নির্দেশ করলেও, এই পতনের তীব্র গতি ব্যাখ্যা করে বাজারের ভঙ্গুর কাঠামো এবং ঋণের মাধ্যমে বিনিয়োগ (লিভারেজ)। ২০২৫ সালে সোনার দাম যখন ৬০ শতাংশ বেড়েছিল, তখন প্রচুর ফটকা কারবারি এবং অ্যালগরিদমভিত্তিক কৌশল এতে যুক্ত ছিল। দাম যখন কমতে শুরু করল, তখন পুরো ব্যবস্থাটি হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল। নির্দিষ্ট কিছু স্তরের নিচে দাম নামতেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে কেনাবেচা শুরু হয় এবং বিনিয়োগকারীরা লোকসান ঠেকাতে বাধ্য হয়ে সম্পদ বিক্রি করতে থাকেন। রুপার ক্ষেত্রে একদিনে রেকর্ড ৩৬ শতাংশ পতন হয়। কারণ এটি একদিকে যেমন বিনিয়োগের মাধ্যম, অন্যদিকে শিল্প কারখানায় ব্যবহৃত ধাতু—তাই মন্দার আশঙ্কায় এর চাহিদা দ্রুত কমেছে।

ডলার বর্জন নীতির ব্যর্থতা

সোনা যখন নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ব্যর্থ হলো, তখন প্রশ্ন ওঠে পুঁজি কোথায় গেল? উত্তরটি হলো—মার্কিন ডলারের আধিপত্য। সংকটের সময়ে ডলারের সূচক বেড়েছে এবং পুঁজি মার্কিন ট্রেজারি বন্ডে ফিরে গেছে। এটি প্রমাণ করে যে—বিপদের সময়ে বিনিয়োগকারীরা কেবল নিরাপত্তাই চায় না, বরং বড় আকারের তারল্যও চায়, যা কেবল মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থাই দিতে পারে। ‘ডি-ডলারাইজেশন’ বা ডলার বর্জন করার গল্পটি এই জরুরি তারল্য সংকটের চাপে সাময়িকভাবে থমকে গেছে।

প্রযুক্তি খাত ও ধাতুর আন্তঃসম্পর্ক

ধাতুর বাজারের এই পতনকে আলাদাভাবে দেখা যাবে না। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রযুক্তি খাতের কোম্পানিগুলোর প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলার বাজারমূল্য হারানোর ঘটনার সাথে এটি সরাসরি যুক্ত। সোনা অনেক সময় বড় প্রতিষ্ঠানের পোর্টফোলিওতে নগদ টাকার বিকল্প হিসেবে কাজ করে। যখন শেয়ার বাজারে ধস নামে, তখন মার্জিন কল বা ঋণের বাধ্যবাধকতা মেটাতে বিনিয়োগকারীরা একই সাথে সোনাও বিক্রি করে দেয়। এর ফলে সব বাজারে একসাথে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে।

প্রাতিষ্ঠানিক সংগ্রহ বনাম সাধারণ মানুষের প্রস্থান

দামের এই বিশাল পতনের মাঝেও একটি বিশেষ পার্থক্য দেখা গেছে। ২০২৫ সালে বিশ্বের ৯৫ শতাংশ কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের সোনার মজুদ বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছে এবং তারা প্রায় ১ হাজার টনের বেশি সোনা কিনেছে। অন্য দিকে, দাম কমতে দেখে সাধারণ ও খুচরা বিনিয়োগকারীরাই বেশি আতঙ্কিত হয়ে সোনা বিক্রি করেছেন। অর্থাৎ, বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে এটি কেবল দামের একটি সাময়িক সংশোধন, কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে এটি ছিল বড় ধাক্কা।

২০২৬ সালের মার্চের এই ধস বিশ্ববাজারের অনিশ্চয়তা মোকাবিলার ধরনে তিনটি প্রধান পরিবর্তন এনেছে: ১. ভূ-রাজনৈতিক সংকেতের চেয়ে মুদ্রানীতি এখন বেশি প্রভাবশালী। ২. ঋণের ওপর ভিত্তি করে করা বিনিয়োগ বাজারের অস্থিরতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয় এবং ৩. মার্কিন ডলার ব্যবস্থা এখনো সংকটের সময় চূড়ান্ত ভরসা হিসেবে টিকে আছে।

সোনা তার নিজস্ব মূল্য হারায়নি। যা বদলে গেছে তা হলো—নিরাপদ সম্পদের তালিকায় এর অবস্থান। ৪ শতাংশ সুদহার এবং যান্ত্রিক কেনাবেচার এই পৃথিবীতে যুদ্ধ হলেই সোনার দাম বাড়বে—এই প্রথাগত ধারণা আর কার্যকর নয়। ২ ট্রিলিয়ন ডলারের এই ক্ষতি সোনার ব্যর্থতা নয়, বরং আধুনিক অর্থ ব্যবস্থায় ‘নিরাপত্তা’র সংজ্ঞা নতুন করে নির্ধারণের ফল।

তথ্যসূত্র: এনডিটিভি

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

তেহরানে প্রস্তাব পৌঁছে দিয়েছে ওয়াশিংটন, পর্যালোচনা করছে ইরান

এক-এগারোর আলোচিত সাবেক জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী গ্রেপ্তার

ঈদ শেষে আত্মীয়ের বাড়ি থেকে ফেরার পথে একই পরিবারের ৩ জন নিহত

ইরানের ভবিষ্যৎ নেতা হিসেবে স্পিকার গালিবাফকে বিবেচনা করছে যুক্তরাষ্ট্র

ম্যাচ চলা অবস্থায় মারা গেলেন ভারতীয় সাকিব

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত