
পাকিস্তান, মিসর ও তুরস্ক যৌথভাবে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রধান ব্যাক-চ্যানেল মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এ বিষয়টি নয়াদিল্লির জন্য এক তীব্র কৌশলগত ধাক্কা। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ব্যক্তিগত নেতৃত্বে ভারতকে অপরিহার্য ‘বিশ্বগুরু’ হিসেবে তুলে ধরা এবং পাকিস্তানকে কূটনৈতিকভাবে একঘরে করার ওপর যে সরকার তার সুনাম দাঁড় করিয়েছে—এই ঘটনা তাদের জন্য নিছক রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিপর্যয় ছাড়া কিছু নয়।
স্বাধীন ভারতের কূটনৈতিক ইতিহাসে এটি অন্যতম অপমানজনক মুহূর্ত। এটি মোদির পররাষ্ট্রনীতির দিকনির্দেশনাহীন উচ্চকিত প্রদর্শনকে উন্মোচিত করে। ভারতের জন্য এটি কেন বড় ধাক্কা, তার কারণগুলো নিচে দেওয়া হলো—
১. মোদির ‘পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করা’ নীতির পতন
এক দশক ধরে মোদির পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি ছিল—পাকিস্তানকে কূটনৈতিকভাবে অপ্রাসঙ্গিক করে তোলা। দেশটিকে বেপরোয়া, বিচ্ছিন্ন এবং দায়িত্বশীল আঞ্চলিক নেতৃত্ব দিতে অক্ষম রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরা। কিন্তু মধ্যস্থতার এই খবর প্রমাণ করে যে সেই কৌশল ভয়াবহভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
যখন ঝুঁকি সর্বোচ্চ—যেমন একটি বৈশ্বিক পরাশক্তি ও আঞ্চলিক শক্তির মধ্যে সংঘাত ঠেকানো, তখন যুক্তরাষ্ট্র মোদির নয়, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের দ্বারস্থ হয়েছে। এটি স্পষ্ট সংকেত যে পাকিস্তান এখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ পিভট রাষ্ট্র, কূটনৈতিকভাবে অপ্রাসঙ্গিক নয়। অথচ পাকিস্তানকে ‘অচ্ছুত’ বানানোর ভারতের প্রচেষ্টা উপেক্ষা করেছে সেই নেতারাই, যাদের সমর্থন পাওয়ার দাবি মোদি করেন।
এতে বর্তমানে ইসলামাবাদ ন্যারেটিভের দিক থেকে ও কৌশলগত সুবিধা পেয়েছে। আর ইরান নিয়ে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার চাপে ভারত নিজেই কোণঠাসা এবং মূলত নিজের জ্বালানি সরবরাহ রক্ষায় ব্যস্ত। পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার জোরালো দাবির পরও বাস্তবে যখন নেতৃত্ব দেওয়ার সময় এসেছে, তখনই বরং ভারতকেই বিচ্ছিন্ন দেখা যাচ্ছে।
২. মোদির ব্যক্তিগত অপমান
বিশ্বব্যাপী যদি এই ন্যারেটিভ প্রচারিত হয়, ‘পাকিস্তান উত্তেজনা প্রশমনে সহায়তা করছে’ এবং ‘ভারত হরমুজ প্রণালি ও শুল্ক নিয়ে উদ্বিগ্ন’, তবে নিজেকে বৈশ্বিক সংকট ব্যবস্থাপনায় কেন্দ্রীয় শক্তি হিসেবে তুলে ধরা এক নেতার জন্য এটি রাজনৈতিক অপমান। মোদি বহু বছর ধরে নিজেকে বিশ্বশান্তির দূত ও ‘বিশ্বগুরু’ হিসেবে তুলে ধরেছেন। অথচ নিজের অঞ্চলের সংকটে ভারত কোথাও নেই।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের কারণে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে বড় যে বাস্তব ব্যাক-চ্যানেল কাঠামো তৈরি হয়েছে, তা আঙ্কারা, কায়রো ও ইসলামাবাদকে ঘিরে, নয়াদিল্লিকে নয়। মুনিরকে অগ্রাধিকার দেওয়া মোদির সেই ন্যারেটিভকেই ভেঙেচুরে দেয় যে বিশ্ব তাঁর কথা শোনে। এ ঘটনায় বোঝা যায়, কঠিন মধ্যস্থতার সময় বিশ্ব মোদিকে হয় অতিরিক্তভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রতি অনুগত মনে করে, নয়তো জটিল বিরোধে নিরপেক্ষ ভূমিকা নেওয়ার মতো বিচক্ষণ বলে মনে করে না।
৩. ভারতের বিশ্বাসযোগ্যতা ও আঞ্চলিক প্রভাবের ক্ষয়
যখন নয়াদিল্লি ইরান-সম্পর্কিত প্রতিটি পদক্ষেপ মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়াতে হিসাব করে নিচ্ছে, আর পাকিস্তান একই সময়ে ওয়াশিংটন ও তেহরান উভয়ের কাছেই সংবেদনশীল বার্তা বহনের জন্য গ্রহণযোগ্য, তখন ভারতের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন ক্ষয়প্রাপ্ত বলে মনে হওয়া স্বাভাবিক।
তেহরান পাকিস্তানের ভূমিকা মেনে নিয়েছে, এমনকি সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের সাম্প্রতিক নিরাপত্তা সমঝোতাকেও স্বাগত জানিয়েছে। এতে বোঝা যায়, ইরান ইসলামাবাদকে কার্যকর যোগাযোগমাধ্যম হিসেবে দেখছে, আর মোদির সঙ্গে যোগাযোগ সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে আনুষ্ঠানিক ফোনকল ও বিবৃতিতে। ভারত ইরানি তেল আমদানি বন্ধ করেছে, বিনিয়োগের গতি কমিয়েছে এবং ইরানের চীন ও পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকে পড়া ঠেকাতে কিছুই করেনি।
বর্তমান সংকটে ভারতের প্রধান অগ্রাধিকার জ্বালানি সরবরাহ ও ভারতীয় নাগরিকদের সুরক্ষা, সংঘাতের রাজনৈতিক সমাধান নির্ধারণ নয়। এতে ভারতকে উদ্যোগী নয়, বরং প্রতিক্রিয়াশীল ও ঝুঁকি এড়ানো দেশ হিসেবে দেখা যাচ্ছে। ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার ওপর মোদির বাজি ধরার ফলে তেহরানে ভারতের বহু বছরের সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়েছে।
৪. যুক্তরাষ্ট্র-ভারত কৌশলগত অংশীদারত্বের ভঙ্গুরতা
হাইপ্রোফাইল রাষ্ট্রীয় সফর ও প্রবাসী সমাবেশে জমকালো অনুষ্ঠান সত্ত্বেও, যুক্তরাষ্ট্রের পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকে পড়া ভারতের আঞ্চলিক প্রভাবের ওপর অনাস্থার বড় প্রমাণ। মোদি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টদের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ককে এমন বাস্তবতায় রূপ দিতে পারেননি, যেখানে পশ্চিম এশিয়ার স্থিতিশীলতার জন্য ভারতই প্রথম যোগাযোগের কেন্দ্র হবে।
ইরান ও রাশিয়া থেকে তেল কেনা নিয়ে শুল্ক ও চাপের রাজনীতি দেখিয়ে ট্রাম্প আরও পরিষ্কার করেছেন, ভারতকে প্রায়ই ছোট খেলোয়াড় হিসেবে দেখা হয়, সহযোগী নয়। গত মে মাসে পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হতে ভারতের ওপর চাপ দেওয়ার ঘটনাও এই ধারণা জোরদার করেছে যে ১৪০ কোটির দেশটিকে উদ্যোগী নয়, বরং নির্দেশ মেনে চলা পক্ষ হিসেবে দেখা হয়। এতে মনে হয়, যুক্তরাষ্ট্র ভারতের দিকে অস্ত্র ও পণ্যের ক্রেতা এবং চীনের ভারসাম্য রক্ষাকারী হিসেবে তাকায়, জটিল কূটনীতির গুরুতর খেলোয়াড় হিসেবে নয়।
৫. ইসলামাবাদের দ্বিমুখী কূটনৈতিক সুবিধা
পাকিস্তানের সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে উন্নত সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে উচ্চপর্যায়ে প্রবেশাধিকার পেয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এতে বর্তমান সংকটে ইসলামাবাদকে বিশ্বাসযোগ্য নিরাপত্তা মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তুলে ধরেছে। পেন্টাগন ও ইরানের নিরাপত্তা মহলেও পাকিস্তানকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।
ভারত পাকিস্তানকে এড়িয়ে মধ্য এশিয়ায় পৌঁছাতে ইরানের চাবাহার বন্দরে বিপুল বিনিয়োগ করেছে। কিন্তু তেহরান ও ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক আলোচনায় ভারত বাদ পড়ায় এই প্রকল্পের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব প্রশ্নের মুখে পড়েছে। যদি শান্তি প্রতিষ্ঠায় পাকিস্তান ভূমিকা রাখে, তবে ইরানি নেতৃত্বের সদিচ্ছা অর্জন করবে ইসলামাবাদ—যা ভারতের প্রো-ইসরায়েল অবস্থানের কারণে দুর্বল হয়েছে।
৬. নতুন এক কূটনৈতিক ত্রয়ীর উত্থান
ভারতের কিছু গণমাধ্যমে এটি দাবি করা হয়, ভারতই যুদ্ধ থামাতে সক্ষম। কিন্তু বাস্তবে পাকিস্তান, তুরস্ক ও মিসরই এই সংকটময় সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান করছে। এই তিন দেশের সমন্বয় ভারতকে বাইরে রেখে একটি নতুন মধ্যশক্তির জোট গঠনের ইঙ্গিত দেয়। গাজা, লোহিত সাগর, ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি) এবং সুন্নি সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র হিসেবে তেহরানের কাছে গ্রহণযোগ্যতা—সব মিলিয়ে এই ত্রয়ী ভারতের জন্য শুভ লক্ষণ নয়।
ইসরায়েলের প্রতি মোদির দৃঢ় সমর্থন ও পাকিস্তানবিরোধী বক্তব্য উল্টো ফল দিয়েছে। পাকিস্তানকে এই ত্রয়ীর নেতৃত্ব নিতে দিয়ে ভারত কার্যত গ্লোবাল সাউথ বা বৈশ্বিক দক্ষিণে নেতৃত্বের সুযোগ হারিয়েছে। এটি এমন এক পররাষ্ট্রনীতির ফল, যা বাস্তব আঞ্চলিক কূটনীতির চেয়ে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রদর্শনকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।
এ ঘটনা তথাকথিত ‘মোদি নীতি’র প্রত্যাখ্যান হিসেবে দেখা হচ্ছে। ব্যক্তিগত সম্পর্ক, বিদেশি সম্মাননা এবং বিশ্বনেতাদের সঙ্গে সৌহার্দ্যের প্রদর্শনের ওপর নির্ভরশীল পররাষ্ট্রনীতি বাস্তব ভূরাজনীতিতে এক শূন্যতা তৈরি করেছে। সেই শূন্যস্থান পূরণ করেছে পাকিস্তান, দুটি যুদ্ধে লিপ্ত বড় দেশের মধ্যে সেতুবন্ধন হয়ে। এক উদীয়মান শক্তি হিসেবে নিজেদের দেখাতে চাওয়া ভারতের জন্য সংকটে জর্জরিত পাকিস্তানের কাছে কৌশলগতভাবে পরাস্ত হওয়া গভীর জাতীয় অস্বস্তির কারণ—এবং এর দায় শেষ পর্যন্ত বর্তাবে গত ১২ বছর ধরে দেশ শাসন করা নেতার ওপর।
অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান

সাম্প্রতিক সময়ে সোনা ও রুপার দামের মহাধসের ফলে মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বাজার থেকে প্রায় ২ ট্রিলিয়ন বা ২ লাখ কোটি ডলার মুছে গেছে। আপাতদৃষ্টিতে বিষয়টিকে সামষ্টিক অর্থনীতির যুক্তিবিরোধী মনে হতে পারে। তবে একে কেবল বাজারের একটি সাধারণ বিচ্যুতি হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বরং একে বাজারের এমন এক কাঠামোগত....
২ ঘণ্টা আগে
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক আলোচনার প্রস্তাব ইসরায়েলি রাজনৈতিক ও সামরিক মহলে তীব্র বিভ্রান্তি ও গভীর হতাশার সৃষ্টি করেছে। ট্রাম্পের এই আকস্মিক মন্তব্য এমন একসময়ে এল যখন ইসরায়েল নিজেকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ‘পুরোধা’ হিসেবে দাবি করে আসছিল।
৩ ঘণ্টা আগে
পারস্য উপসাগরে যখন কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ যুদ্ধের দামামা বাজছে, ঠিক তখনই ওয়াশিংটন এবং তেহরান থেকে আসছে সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী বার্তা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করছেন যে পর্দার আড়ালে অত্যন্ত ‘ফলপ্রসূ’ আলোচনা চলছে এবং ১৫টি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ঐকমত্য হয়েছে।
২০ ঘণ্টা আগে
বিশ্ববাজারে কয়েক দিন ধরে মূল্যবান ধাতু সোনা ও রুপার দামে বড় ধরনের পতন লক্ষ করা যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম প্রায় ২ দশমিক ৩৬ শতাংশ এবং রুপার দাম ৪ দশমিক ৫২ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। শক্তিশালী মার্কিন ডলার এবং ট্রেজারি বন্ডের ইল্ড (সুদ) বৃদ্ধি পাওয়ায় নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে পরিচিত...
২ দিন আগে