
ইরানের জ্বালানি স্থাপনায় হামলার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ‘হঠকারী’ পদক্ষেপ দ্রুত তীব্রতর হয়ে ওঠা যুদ্ধে তেহরানের হাতে উত্তেজনা বৃদ্ধির কৌশলগত সুবিধা তুলে দিয়েছে। লন্ডন থেকে প্রকাশিত মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইকে এমনটাই জানিয়েছেন দুই আরব কর্মকর্তা এমনটাই বলেছেন।
এক আরব কর্মকর্তা মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ‘প্রথমত, হরমুজ প্রণালি নিয়ে ট্রাম্প ইরানকে ভুলভাবে মূল্যায়ন করেছিলেন। তিনি এখনো সেটা ঠিক করতে পারেননি। এখন তিনি জ্বালানি স্থাপনায় ইসরায়েলি হামলার অনুমোদন দিয়ে ইরানের ব্লাফ ধরতে চেয়েছেন। এতে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে অদক্ষ মিত্র হিসেবে তুলে ধরছে।’
সপ্তাহের শুরুতে ইসরায়েলের ইরানের সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে হামলা এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যাকে জ্বালানি বিশ্লেষকেরা বহুদিন ধরে সবচেয়ে ভয়াবহ সম্ভাব্য দৃশ্য হিসেবে বিবেচনা করে আসছিলেন—অত্যন্ত জটিল ও ব্যয়বহুল জ্বালানি উৎপাদন স্থাপনায় পাল্টাপাল্টি হামলা। ইসরায়েলি হামলার জবাবে ইরান কাতারের রাস লাফান প্রাকৃতিক গ্যাস স্থাপনায় বোমা হামলা চালায়। হামলা হয় ইসরায়েলের সর্ববৃহৎ জ্বালানি শোধনাগারেও।
আরেক আরব কর্মকর্তা বলেন, ‘সাউথ পার্সে হামলা একেবারে প্যান্ডোরার বাক্স খুলে দিয়েছে। আরেকটি রেড লাইন বা চূড়ান্ত রেখা অতিক্রম করা হয়েছে। ইরান আগে জানত না যে তারা হরমুজ প্রণালি বন্ধ করতে পারে। এখন তারা সেটা জানে এবং একই সঙ্গে উৎপাদন স্থাপনাও ধ্বংস করতে পারে।’
ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। নিজেদের জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিচ্ছে এবং অন্যান্য দেশের সঙ্গে সমঝোতা করে তাদের যাতায়াত নিশ্চিত করছে। সামুদ্রিক বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান লয়েডস লিস্ট বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, ইরান তাদের আঞ্চলিক জলসীমার ভেতর একটি ‘বাস্তবিক নিরাপদ’ নৌপথ তৈরি করেছে। এক ঘটনায় একটি জাহাজকে পারাপারের অনুমতি দিতে ২০ লাখ ডলার নিয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথ নিরাপদ রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থতা ওয়াশিংটনের জন্য বড় ধরনের অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠছে।
‘ভুল পদক্ষেপ’
ইরান বিশেষজ্ঞ ও মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের বিশিষ্ট কূটনৈতিক ফেলো অ্যালান আয়ার মিডল ইস্ট আইকে বলেন, সাউথ পার্সে ইসরায়েলি হামলা সম্ভবত ট্রাম্পের সেই সিদ্ধান্তের ফল। যার মাধ্যমে তিনি হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার জন্য ইরানকে মূল্য দিতে বাধ্য করতে চেয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘এটি একটি কৌশলগত ভুল ছিল।’
জবাবে ইরান কাতারের গ্যাস স্থাপনা এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের লোহিত সাগর উপকূলের তেল রপ্তানি টার্মিনালে হামলা চালায়। কাতারের ওপর হামলাই সবচেয়ে কার্যকর হয়েছে। এতে দেশটির এলএনজি রপ্তানি সক্ষমতার ১৭ শতাংশ বন্ধ হয়ে গেছে বলে কাতারএনার্জির প্রধান নির্বাহী সাদ আল-কাবি বৃহস্পতিবার রয়টার্সকে জানান। তিনি বলেন, ক্ষয়ক্ষতি মেরামত করতে তিন থেকে পাঁচ বছর সময় লাগবে।
আয়ার আরও বলেন, ‘এই সংঘাতে প্রতিটি ধাপে ইরান ঠিক সেই কাজই করেছে, যা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাবে অভিজ্ঞ ও যুক্তিবাদী পর্যবেক্ষকেরা প্রত্যাশা করতেন।’ তবে তিনি যোগ করেন, ‘আমি নিশ্চিতভাবে বলব না যে ইরানের হাতে উত্তেজনা বৃদ্ধির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ আছে। এতে দুই পক্ষের সমতা বোঝায়, যা বাস্তবে নেই। ইরানের হারানোর কম, তাই তারা ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ নিচ্ছে, কারণ তাদের নেওয়া ছাড়া উপায় নেই।’
ট্রাম্পের অস্বীকার
বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প দাবি করেন, সাউথ পার্সে হামলার বিষয়ে তিনি ‘কিছুই জানতেন না’। যদিও বিভিন্ন গণমাধ্যম জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রকে আগে থেকেই জানানো হয়েছিল। বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে তিনি বলেন, তিনি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোয় আর হামলা না করতে বলেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি তাকে বলেছি, এটা কোরো না এবং সে আর করবে না।’
তবে দুই আরব কূটনীতিক জানান, তাদের রাজধানীগুলোর কোনো সন্দেহ নেই যে যুক্তরাষ্ট্র হামলার অনুমোদন দিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্লেষক ও সাবেক কর্মকর্তারাও ট্রাম্পের অস্বীকার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
‘আমাদের শক্তির সামান্য অংশ’
ইসরায়েলে সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত ও প্রতিরক্ষা দপ্তরের সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ড্যান শ্যাপিরো এক্সে লেখেন, ‘ট্রাম্প যা খুশি বলতে পারেন। কিন্তু আমি বলছি শূন্য, একেবারে শূন্য সম্ভাবনা যে আইডিএফ ওই স্থানে হামলা চালাবে সেন্টকমকে সম্পূর্ণভাবে না জানিয়ে।’ তিনি বলেন, ‘ট্রাম্প জানতেন (এবং অনুমোদন দিয়েছিলেন)। এখন তিনি বুঝতে পারছেন এতে ইরানের উপসাগরীয় জ্বালানি স্থাপনায় (যা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক) হামলার মাধ্যমে বড় ধরনের উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে।’
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি যুক্তরাষ্ট্রের পিছু হটার বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করেন এবং উপসাগরীয় দেশগুলোকেও ইঙ্গিত করে কটাক্ষ করেন, যারা নিজেদের অর্থনৈতিক লাইফলাইন তেল ও গ্যাসে হামলার জন্য ইরানকে তীব্র সমালোচনা করেছিল। তিনি লেখেন, ‘আমাদের অবকাঠামোর ওপর ইসরায়েলের হামলার জবাবে আমরা আমাদের শক্তির সামান্য অংশ ব্যবহার করেছি। সংযমের একমাত্র কারণ ছিল উত্তেজনা কমানোর অনুরোধের প্রতি সম্মান।’
তিনি আরও বলেন, ‘আবার আমাদের অবকাঠামোয় হামলা হলে কোনো সংযম থাকবে না। এই যুদ্ধের অবসান ঘটাতে হলে বেসামরিক স্থাপনার ক্ষতির বিষয়টি সমাধান করতে হবে।’
জ্বালানি সংকটে যুক্তরাষ্ট্র
ইরান এখনো বিপুল পরিমাণ তেল বিক্রি করছে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির পরিণতি নিয়ে তাদের জবাবদিহি করতে হচ্ছে না। অন্যদিকে জ্বালানির দাম বাড়ায় দেশ ও বিদেশে চাপের মুখে ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা জরুরি মজুত থেকে ৪০ কোটি ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়ছে। কিন্তু বিশেষ করে পরিশোধিত জ্বালানি পণ্যের দাম কমানো যাচ্ছে না।
বৃহস্পতিবার মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেন, সমুদ্রপথে ইরানি তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হতে পারে, যা অনেককে বিস্মিত করেছে। তাত্ত্বিকভাবে এতে ক্রেতারা ডলারে তেল কিনতে পারবে। কিন্তু সমালোচকেরা বলছেন, এতে যুক্তরাষ্ট্র যার বিরুদ্ধে লড়ছে সেই দেশই লাভবান হবে। বর্তমানে ইরান তাদের ৯০ শতাংশ তেল চীনের কাছে ডলার ব্যবস্থার বাইরে বিক্রি করে।
বৃহস্পতিবার মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেন, বাড়তি দামের জন্য আমেরিকানদের অভিযোগ করা উচিত নয়। কারণ, বিদেশে পরিস্থিতি আরও খারাপ। তিনি বলেন, ‘গ্যাসের দাম কমানো আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু বাস্তবতা হলো বিদেশে মানুষ আমাদের চেয়ে অনেক বেশি ভুগছে।’
একই দিন যুক্তরাষ্ট্র সরকার দেশটির তেল রপ্তানি বন্ধ করার সম্ভাবনার খবর নাকচ করে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট তেলের দাম বৃহস্পতিবার ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০৬ ডলার ছিল, যা এর আগে ১১৫ ডলারে উঠেছিল। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রকৃত তেলের দাম আরও বেশি। প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে বিকল্প আরও কম। বিশ্ব সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ আসে কাতার থেকে। ইরানের হামলার পর ইউরোপে গ্যাসের দাম প্রায় ২০ শতাংশ বেড়ে গেছে।
দুই আরব কর্মকর্তা জানান, সাম্প্রতিক এই হামলার পাল্টাপাল্টি ঘটনাকে উপসাগরীয় অঞ্চলে একটি মোড় পরিবর্তনের মুহূর্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে। আপাতত মনে হচ্ছে, ইরান ট্রাম্পের দৃষ্টি আকর্ষণে সফল হয়েছে।

প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে মার্কিন নেতারা, এমনকি সম্ভবত জনগণও ইরানকে ‘হাড়ে মজ্জায় দুষ্ট রাষ্ট্র’ হিসেবে দেখে এসেছে। তেহরানের অপরিবর্তিত আমেরিকাবিরোধী আদর্শ এবং ধর্মীয় কঠোর নেতৃত্ব যুক্তরাষ্ট্রের কল্পনায় একে অন্য কঠিন প্রতিপক্ষদের থেকেও আলাদা করে তুলেছে।
৩ ঘণ্টা আগে
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) মুখপাত্র জেনারেল আলী মোহাম্মদ নায়িনিকে হত্যার ঘটনার মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের ‘টার্গেটেড কিলিং’ বা গুপ্তহত্যার কৌশল আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। এই হত্যাকাণ্ড কি কেবল একটি সামরিক জয়, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে কোনো...
৭ ঘণ্টা আগে
ইরাকের মরুভূমি আর আফগানিস্তানের পাহাড় যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীকে শিখিয়েছিল, আপনার সর্বাধুনিক প্রযুক্তি, অস্ত্র থাকতে পারে, কিন্তু যুদ্ধে শেষ কথাটা প্রকৃতপক্ষে ভূগোলই বলে। বহু বছর পর ইরানের উপকূলঘেঁষা জলরাশিও এখন সেই একই পাঠ দিচ্ছে।
১৫ ঘণ্টা আগে
ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের স্বার্থ আসলে কী? এবং তারা কি আদৌ সমন্বিতভাবে এই স্বার্থ হাসিলে কাজ করছে, নাকি এই দুই পক্ষের মধ্যে স্বার্থের সংঘাত আছে? খোলা চোখে দেখে বলা যায়, ইসরায়েল যেভাবে ইরানের অর্থনৈতিক কাঠামো, বেসামরিক কাঠামো লক্ষ্যবস্তু করছে এবং ট্রাম্প যেভাবে ইসরায়েলকে ‘সংযত’ করার চেষ্টা
১ দিন আগে