Ajker Patrika

বিজেপিতে না গিয়ে কেন ‘অস্তিত্বহীন’ দলে ভিড়ছেন তৃণমূলের বিদ্রোহীরা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ১৫ জুন ২০২৬, ১২: ১৫
বিজেপিতে না গিয়ে কেন ‘অস্তিত্বহীন’ দলে ভিড়ছেন তৃণমূলের বিদ্রোহীরা
স্পিকার ওম বিড়ালর সঙ্গে তৃণমূলের বিদ্রোহী এমপিরা। ছবি: সংগৃহীত

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে হারের পর থেকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেসে (টিএমসি) ভাঙন দেখা দেয়। এবার সেই ভাঙন সরাসরি আঘাত হানল লোকসভায়। দলটির ২৮ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে ২০ জনই আনুষ্ঠানিকভাবে দল ছাড়ার কথা জানিয়েছেন। আর দলত্যাগের কারণে তৈরি হওয়া আইনি জটিলতা এড়াতে এই বিদ্রোহী গোষ্ঠীটি ত্রিপুরার একটি স্বল্পপরিচিত দল ‘ন্যাশনালিস্ট সিটিজেনস পার্টি’র সঙ্গে একীভূত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

গতকাল রোববার লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার সঙ্গে দেখা করে একটি চিঠি দেওয়ার পর ২০ সংসদ সদস্য এই বড় ঘোষণা দেন। এই বিদ্রোহী অংশটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রবীণ তৃণমূল নেত্রী ও লোকসভার সদস্য কাকলি ঘোষ দস্তিদার। স্পিকারের হাতে চিঠি তুলে দেওয়ার পর সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আমাদের পক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন রয়েছে। আমরা এখন থেকে এনডিএ জোটের শরিক হিসেবে সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি এবং সংসদে আলাদাভাবে বসব।’

তবে, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় তৃণমূলের বিদ্রোহী বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের পথ না ধরে কাকলি ঘোষ দস্তিদাররা এবার তৃণমূলে থেকেই নিজেদের ‘আসল তৃণমূল’ বলে দাবি না করে লোকসভার বিদ্রোহীরা বেছে নিলেন নতুন দল—ন্যাশনালিস্ট সিটিজেনস পার্টি অব ইন্ডিয়া (এনসিপিআই)। প্রায় অচেনা এবং কার্যত অস্তিত্বহীন একটি দলেই যাচ্ছেন তাঁরা। প্রশ্ন উঠছে—বিধানসভায় বিদ্রোহীরা যে পথ দেখিয়েছিলেন, লোকসভায় কেন সেই পথে হাঁটলেন না তাঁরা?

তৃণমূলের বিদ্রোহ দুই জায়গাতেই—বিধানসভা এবং লোকসভা, তবে চরিত্রে পার্থক্য আছে। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় বিদ্রোহীরা শুধু ‘তৃণমূল’ নাম ব্যবহারই করেননি, বিরোধী বেঞ্চেও বসার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। অন্যদিকে লোকসভায় বিদ্রোহীরা নরেন্দ্র মোদির দল বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোট এনডিএকে সমর্থনের কথা ঘোষণা করেছেন। এই দুই ভিন্ন অবস্থান নেওয়া তৃণমূলের দুটি অংশকে এক ছাতার নিচে আনা আদৌ সম্ভব কি না, সেই প্রশ্ন শুরু থেকেই ছিল। এই পরিস্থিতি নিয়ে আইন বিশেষজ্ঞদের মত কী?

প্রথম দিক: ভিন্ন পরিস্থিতি ও সতর্কতা

বিধানসভা দলে বিদ্রোহের পরের পরিস্থিতি দেখে সতর্ক হয়েছেন লোকসভার বিদ্রোহীরা। লোকসভায় ভাঙন স্পষ্ট হওয়ার আগেই বিধানসভায় তৃণমূল বিধায়কদের মধ্যে বিদ্রোহ দেখা দেয়। দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গিয়ে বিদ্রোহীরা বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরিষদীয় দলনেতা নির্বাচন করেন। তিনিই এখন বিধানসভার বিরোধী দলনেতা। তৃণমূলের অধিকাংশ বিধায়কের সমর্থনও তাঁর সঙ্গে আছে। তবে বিষয়টি আদালতে গড়িয়েছে। দল থেকে বহিষ্কৃত কেউ কীভাবে বিরোধী দলনেতা হতে পারেন—এই প্রশ্ন তুলে তৃণমূল হাই কোর্টে মামলা করেছে। মামলাটি এখনো বিচারাধীন। এই আইনি ঝুঁকি এড়াতেই লোকসভার বিদ্রোহীরা সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন বলে মত।

সিপিএমের প্রবীণ নেতা ও নির্বাচনী আইন বিষয়ে অভিজ্ঞ রবীন দেব বলেন, হয়তো সেই কারণেই বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনা করে বিদ্রোহীরা নিজেদের ‘আসল তৃণমূল’ না বলে অন্য দলে মিশে যাওয়ার কৌশল নিয়েছেন।

দ্বিতীয় দিক: নেপথ্যে নয়, প্রকাশ্যেই বিজেপি

পুরো প্রক্রিয়ার নিয়ন্ত্রণ যে বিজেপির হাতে—এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। বিদ্রোহী সংসদ সদস্যদের প্রথম বৈঠক হয়েছে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবের বাসভবনে। এরপর গত ছয়-সাত দিনে একাধিক বৈঠক হয়েছে, যার বেশির ভাগই ভূপেন্দ্র যাদবের বাড়িতেই। গতকাল রোববারও সেখানে বৈঠক হয়, উপস্থিত ছিলেন বিজেপি নেতা নিশিকান্ত দুবে। বিজেপি নেতাদের বাড়িতে বৈঠক হলেও বিদ্রোহীদের মধ্যে কোনো গোপনীয়তা নেই। তবে বিজেপি প্রকাশ্যে এ বিষয়ে মন্তব্য করেনি।

তবে বিজেপি এদের দলে নেওয়ার আগ্রহ দেখাচ্ছে না, বরং রাজনৈতিক কাজে ব্যবহার করতে চাইছে—এমন মতও রয়েছে। সিপিএম নেতা ও আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যের মতে, বিজেপির লক্ষ্য বিভিন্ন বিল পাস করাতে তৃণমূলের বিদ্রোহী সংসদ সদস্যদের ভোট পাওয়া। সেই উদ্দেশ্যে তারা বিদ্রোহীদের সম্পূর্ণভাবে দলে না নিয়েই আলাদা কাঠামো তৈরি করছে।

তৃতীয় দিক: দলের নিয়ন্ত্রণ পাওয়া কঠিন

লোকসভায় সংসদীয় দলে মমতার নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হলেও দলীয় সংগঠনের নিয়ন্ত্রণ বিদ্রোহীদের হাতে আসবে না—এই আশঙ্কাই তাদের নতুন দলে যেতে বাধ্য করেছে বলে ধারণা। কারণ, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পরিস্থিতি বুঝে দলের সব সাংগঠনিক কমিটি পুনর্গঠন করেন এবং নিজের ঘনিষ্ঠদের বসান।

তৃণমূলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী দলটি চেয়ারপারসনকেন্দ্রিক। নির্বাচন কমিশনের কাছে জমা সংবিধান অনুযায়ী দলের সর্বোচ্চ ক্ষমতা জাতীয় কর্মসমিতির হাতে, যা কার্যত চেয়ারপারসন-নির্ভর। ফলে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা চাইলেও দলীয় প্রতীক, তহবিল বা সংগঠনের নিয়ন্ত্রণ পাওয়া কঠিন। বিজেপির মুখপাত্র ও প্রবীণ আইনজীবী স্বপন দাস বলেন, বিদ্রোহীরা দলীয় নাম বা প্রতীক পাওয়ার আইনি লড়াইয়ে সুবিধা পাবেন না। কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ও বলেন, এভাবে কেউ নিজেদের তৃণমূল বলতে পারে না। তাঁর দাবি, এরা তৃণমূল নয়, বিজেপির সহায়ক ভূমিকা নিচ্ছে।

চতুর্থ দিক: মমতা কংগ্রেসে ফিরে গেলে বাড়তি ঝুঁকি

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দলত্যাগ বিরোধী আইন। যদি কংগ্রেস ও তৃণমূল একীভূত হতো, তাহলে বিদ্রোহীরা আইনের আওতায় পড়তে পারতেন। সম্প্রতি কংগ্রেস ও তৃণমূলের সম্ভাব্য মিশনের গুজব ছড়ালেও পরে কংগ্রেস তা নাকচ করে দেয়।

বর্তমানে তৃণমূলের ২৮ জন সংসদ সদস্য আছেন লোকসভায়। দলত্যাগ বিরোধী আইন এড়াতে দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন দরকার, যা বিদ্রোহীদের হাতে আছে বলে দাবি করা হচ্ছে। স্বপনের মতে, যদি মমতা কংগ্রেসে যোগ দেন, তখন সংসদ সদস্যদের নিয়ন্ত্রণ আরও জটিল হয়ে যাবে। কংগ্রেসের ৯৮ জন সাংসদের সঙ্গে তৃণমূলের ২৮ জন যোগ হলে মোট সংখ্যা দাঁড়াবে ১২৬। তখন দুই-তৃতীয়াংশের হিসাব বদলে যাবে। সেই কারণেই বিদ্রোহীরা আগেভাগে স্পিকারের কাছে চিঠি দিয়ে থাকতে পারেন।

এই ঘটনার প্রথম প্রকাশ ঘটে গত সোমবার। কাকলি ঘোষ দস্তিদার ও শতাব্দী রায়ের নেতৃত্বে প্রায় ২০ জন সংসদ সদস্য বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। তখনই মমতা ও অভিষেক ছিলেন দিল্লিতে ইন্ডিয়া জোটের বৈঠকে। এক সপ্তাহের মধ্যেই বিদ্রোহীরা নতুন দলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন।

নতুন দল ন্যাশনালিস্ট সিটিজেনস পার্টি অব ইন্ডিয়া (এনসিপি) সম্পর্কে শুরুতে খুব কম মানুষই জানতেন। এটি ত্রিপুরাভিত্তিক দল। তবে ত্রিপুরার রাজনৈতিক মহলেও এই দলের নাম প্রায় অচেনা। জানা গেছে, কাকলি, শতাব্দী, সায়নী ঘোষরা যে দলে যাচ্ছেন সেটি মূলত পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া জেলায় নিবন্ধিত। নির্বাচন কমিশনের তালিকা অনুযায়ী এটি ২০২৩ সালে আরইউপিপি তালিকাভুক্ত একটি অস্বীকৃত রাজনৈতিক দল।

এই দলটি ২০২৩ সালের ত্রিপুরা বিধানসভা নির্বাচনে দুটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল—কৈলাসহর ও চউমানু। প্রতীক ছিল কলমের নিব ও সাত রশ্মির চিহ্ন। কোনো আসনেই জিততে পারেনি। কৈলাসহর কেন্দ্রে পেয়েছিল মাত্র ২৮৬ ভোট এবং চউমানু কেন্দ্রে ৫৩৬ ভোট। রাজনৈতিক বাস্তবতার এই জটিল সমীকরণে তৃণমূলের বিদ্রোহ এখন শুধু দলীয় নয়, আইন, কৌশল ও ক্ষমতার বহুস্তরীয় লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে—যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্তই ভবিষ্যতের রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে দিতে পারে।

তথ্যসূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা ও এনডিটিভি

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত