
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান অগ্নিকুণ্ডে ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের হঠাৎ আবির্ভাব আন্তর্জাতিক মহলে অনেককেই চমকে দিয়েছে। যে দেশটি নিজেই তার সীমানার দুই প্রান্তে ভারত ও আফগানিস্তানের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী দ্বন্দ্বে লিপ্ত, সেই দেশটির ‘শান্তি রক্ষাকারী’ হিসেবে আবির্ভূত হওয়াকে অনেকেই ‘অপ্রত্যাশিত’ বলে মনে করছেন। তবে একটু গভীর বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই পদক্ষেপের পেছনে রয়েছে পাকিস্তানের গভীর অর্থনৈতিক বাধ্যবাধকতা, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ এবং বৈশ্বিক পর্যায়ে হারানো প্রভাব পুনরুদ্ধারের তীব্র আকাঙ্ক্ষা।
পাকিস্তানের এই কূটনৈতিক তৎপরতার কেন্দ্রে রয়েছে সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বর্তমান সুসম্পর্ক। ট্রাম্পের ‘প্রিয়’ ফিল্ড মার্শাল হিসেবে মুনিরের পরিচিতি ওয়াশিংটনে পাকিস্তানের জন্য এক নতুন দরজা খুলে দিয়েছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান অত্যন্ত সুকৌশলে ট্রাম্পের আস্থা অর্জন করেছে। ২০২৫ সালের পাকিস্তান-ভারত সংকটের সময় ট্রাম্পের ‘কূটনৈতিক হস্তক্ষেপের’ স্বীকৃতিস্বরূপ পাকিস্তান তাঁকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন দেয়। এ ছাড়া কাবুলে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সময় সাহায্য এবং মোস্ট ওয়ান্টেড অপরাধীদের হস্তান্তরের মতো পদক্ষেপগুলো ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ইসলামাবাদের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। তবে প্রশ্ন হলো, এই ব্যক্তিগত রসায়ন কি ইরান-আমেরিকার দীর্ঘদিনের গভীর ‘অবিশ্বাস’ এবং উভয়ের সর্বোচ্চ পর্যায়ের দাবিগুলোকে প্রশমিত করতে যথেষ্ট?
পাকিস্তানের মধ্যস্থতা প্রচেষ্টার সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হলো এর ভঙ্গুর ও বিপর্যস্ত অর্থনীতি। দেশটি তার প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেলের একটি বিশাল অংশের জন্য সরাসরি পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল।
ইরান যদি হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়, তবে পাকিস্তানের অর্থনীতি কার্যত অচল হয়ে পড়বে। মার্চ মাসেই পাকিস্তান সরকার পেট্রল ও ডিজেলের দাম ২০ শতাংশ বৃদ্ধি করেছে।
পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে, জ্বালানি বাঁচাতে সরকারি কর্মচারীদের জন্য সপ্তাহে ৪ দিন কর্মদিবস ঘোষণা করা হয়েছে। করাচি আইবিএ-র রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ফারহান সিদ্দিকী বলেন, ‘যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে পাকিস্তানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ অকল্পনীয়ভাবে বেড়ে যাবে।’
এ ছাড়া পাকিস্তানের নীতিনির্ধারকদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অভ্যন্তরীণ জনমত। পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ ঐতিহাসিকভাবেই প্রবলভাবে ইরানপন্থী। সম্প্রতি মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর পর করাচি ও লাহোরের রাস্তায় যে জনস্রোত দেখা গেছে, তা ইসলামাবাদের নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা। করাচিতে মার্কিন কনস্যুলেটে হামলার চেষ্টা প্রমাণ করে যে জনমত কতটা উত্তেজিত।
অন্যদিকে, সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের ২০২৪ সালের প্রতিরক্ষা চুক্তি দেশটিকে এক কঠিন উভয়সংকট ফেলেছে। এই চুক্তিতে বলা হয়েছে, ‘যেকোনো এক দেশের ওপর আক্রমণ মানেই অন্য দেশের ওপর আক্রমণ।’
নিরাপত্তা ঝুঁকিও এখানে বড় বিবেচ্য বিষয়। যদি সৌদি আরব যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে এবং পাকিস্তানকে সাহায্য করতে বলে, তবে পাকিস্তানের পশ্চিমা সীমান্ত (ইরান ও আফগানিস্তান সীমান্ত) সম্পূর্ণ অরক্ষিত হয়ে পড়বে। যেখানে পাকিস্তান বর্তমানে আফগানিস্তানের সঙ্গে ‘অল-আউট ওয়ার’ বা সর্বাত্মক যুদ্ধে লিপ্ত। একই সময়ে আরেকটি নতুন ফ্রন্টে যুদ্ধে জড়ানোর ক্ষমতা বা ইচ্ছা পাকিস্তানের নেই।
উচ্চ-ঝুঁকি, বেশি লাভ
আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যানের মতে, পাকিস্তানের এই কূটনীতি মূলত একটি ‘ডাবল এজড সোর্ড’ বা দুধারী তলোয়ার।
যদি পাকিস্তান ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কোনো ধরনের সমঝোতা করতে পারে, তবে এটি দেশটিকে বিশ্ব কূটনীতির শীর্ষে নিয়ে যাবে। এটি প্রমাণ করবে যে ভারতের তুলনায় পাকিস্তান অনেক বেশি সাহসী এবং অপ্রথাগত কূটনৈতিক খেলা খেলতে সক্ষম।
আর যদি এই উদ্যোগ ব্যর্থ হয়, তবে পাকিস্তানকে ‘সরল’ বা ‘নাদান’ হিসেবে অভিযুক্ত হতে হবে। সমালোচকেরা বলতে পারেন, দুই পক্ষ যখন নিজেদের পরবর্তী বড় আক্রমণের ছক কষছিল এবং সময় নিচ্ছিল, পাকিস্তান তখন কেবল সেই ‘ব্রিদিং স্পেস’ বা অবকাশ তৈরিতে সাহায্য করেছে।
বহুমুখী নীতি
পাকিস্তান বুঝতে পেরেছে যে বর্তমান বিশ্বে কেবল এক পক্ষ নিয়ে টিকে থাকা অসম্ভব। তাই তারা ‘হেজিং’ বা বহুমুখী ভারসাম্য রক্ষার নীতি গ্রহণ করেছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার বর্তমানে চীন সফরে রয়েছেন। দেশটির মূল লক্ষ্য হলো—আমেরিকার বন্ধু হওয়া সত্ত্বেও যেন ইরানের চোখে তারা ‘প্রো-আমেরিকান’ বা ‘প্রো-ইসরায়েলি’ হিসেবে চিহ্নিত না হয়। পাকিস্তানের নিজস্ব কোনো মার্কিন ঘাঁটি না থাকা এবং ইরানের সঙ্গে ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক বন্ধন তাদের এই মধ্যস্থতায় একটি বাড়তি গ্রহণযোগ্যতা দিচ্ছে।
পাকিস্তান বর্তমানে একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম সুতোর ওপর দিয়ে হাঁটছে। একদিকে ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বজায় রাখা, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক রক্ষা—এই দুইয়ের ভারসাম্য রক্ষা করা প্রায় অসম্ভব একটি মিশন। তবে এই ‘হাই-স্টেক ডিপ্লোমেসি’ যদি সফল হয়, তবে পাকিস্তান বিশ্বমঞ্চে তার হারানো প্রভাব ফিরে পাবে। আর যদি ব্যর্থ হয়, তবে দেশটির অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক সংকট নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি থেকে যাবে। শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান ‘শান্তিদূত’ হিসেবে ইতিহাস গড়বে কি না, তা সময়ের কাঠগড়ায় ঝুলে আছে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান-আমেরিকা যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি নিয়ে এক চাঞ্চল্যকর ও বিতর্কিত কৌশল গ্রহণ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। হোয়াইট হাউসের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বরাতে জানা গেছে, বিশ্বের জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান ধমনি ‘হরমুজ প্রণালি’...
১১ ঘণ্টা আগে
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়ে কৌশলগত একটি এলাকার কারণে বেকায়দায় পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ভূ-কৌশলগত সুবিধা কাজে লাগিয়ে বহুগুণ শক্তিধর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে খানিকটা জিম্মিদশার মধ্যে ফেলে ইরান। ট্রাম্প আলোচনার প্রস্তাব দিলেও খুব একটা সাড়া মিলছে না ইরানের তরফ থেকে।
২১ ঘণ্টা আগে
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যৌথ হামলার প্রথম চার সপ্তাহে ইরানের অন্তত চারটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্র ও অন্তত ২৯টি উৎক্ষেপণ ঘাঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ইরানের সামরিক কৌশলের মূল ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্টের বিশ্লেষণ ও বিশেষজ্ঞদের পর্যা
১ দিন আগে
ইসরায়েলের বৃহত্তম তেল শোধনাগার হাইফার বাজানে ইরান ও হিজবুল্লাহ আজ সোমবার হামলা চালিয়েছে। হামলার পর বাজান ওয়েল রিফাইনারি বা তেল শোধনাগারে আগুন জ্বলতে দেখা যায়। এর আগে, গতকাল রোববার ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলীয় নেগেভ মরুভূমিতে অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ শিল্প এলাকা নেওত হোভাভের একটি কারখানায়ও হামলা হয়।
১ দিন আগে