Ajker Patrika

ব্যাপক হামলার পরও ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা দমানো সম্ভব নয় যেসব কারণে

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
ব্যাপক হামলার পরও ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা দমানো সম্ভব নয় যেসব কারণে
ইরানের একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা। ছবি: আইআরজিসি

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যৌথ হামলার প্রথম চার সপ্তাহে ইরানের অন্তত চারটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্র ও অন্তত ২৯টি উৎক্ষেপণ ঘাঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ইরানের সামরিক কৌশলের মূল ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্টের বিশ্লেষণ ও বিশেষজ্ঞদের পর্যালোচনা।

যুদ্ধ শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বিভিন্ন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হাজার হাজার হামলা চালিয়েছে। ওয়াশিংটন পোস্টের এই বিশ্লেষণে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিগুলোর ক্ষয়ক্ষতির একটি বিস্তৃত চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে এই কর্মসূচির ওপর এর প্রভাবও বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

স্যাটেলাইট চিত্র এবং ইরানি সামরিক ও প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এসব হামলায় ভূপৃষ্ঠের উৎক্ষেপণ অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে। ভূগর্ভে সংরক্ষিত ক্ষেপণাস্ত্রে পৌঁছানোর পথ সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। নতুন ক্ষেপণাস্ত্র দ্রুত উৎপাদনের সক্ষমতাও থমকে গেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি।

থিংক ট্যাংক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের মিসাইল ডিফেন্স প্রজেক্টের পরিচালক টম কারাকো বলেন, ‘তারা এখনো ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ছে। এটিই একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক।’

কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি পুরোপুরি ধ্বংস করা সম্ভব নয়। কারণ, অতীতেও হামলার পর ইরান দ্রুত পুনর্গঠন করেছে। পাশাপাশি বিদেশি সরবরাহ শৃঙ্খলের মাধ্যমে ধ্বংস হওয়া উৎপাদন যন্ত্রপাতি পুনরায় সংগ্রহ করার সক্ষমতাও তাদের রয়েছে। এ ছাড়া মোবাইল বা ভ্রাম্যমাণ ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা ব্যবহৃত হচ্ছে, যার সংখ্যা অজানা।

আরেক থিংক ট্যাংক কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের ননরেসিডেন্ট স্কলার নিকোল গ্রাজেভস্কি বলেন, ইরানের ‘শাসনব্যবস্থা টিকে থাকলে দেশটি তাদের ক্ষেপণাস্ত্র কৌশলে মৌলিক কোনো পরিবর্তন আনবে বলে আমি মনে করি না।’ তিনি বলেন, ‘ক্ষেপণাস্ত্রই আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত প্রতিরোধ হিসেবে থাকবে এবং এটিই সামরিক কৌশলের ভিত্তি।’

ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংস করাকে এই যুদ্ধের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে চিহ্নিত করেছে। গত ১৯ মার্চ এক ব্রিফিংয়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ‘কারখানা এবং উৎপাদন লাইনগুলো ধ্বংস হয়েছে, যেগুলো তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন কর্মসূচিকে চালিত করে।’ একই দিনে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ভান্ডার ‘ব্যাপকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে।’

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এখন পর্যন্ত তারা যে সব নির্দিষ্ট ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে, সেগুলোর সব তথ্য প্রকাশ করেনি। ব্রিফিংয়ে হেগসেথ আরও জানান, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে প্রতিবেশী দেশগুলোর বিরুদ্ধে ইরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ৯০ শতাংশ কমে গেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান ড্যান কেইন স্বীকার করেছেন, ইরানের এখনো ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা রয়েছে।

এরপর, গত ২১ মার্চ ইসরায়েল দাবি করে, প্রথমবারের মতো ইরান ভারত মহাসাগরে অবস্থিত যুক্তরাজ্য-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক ঘাঁটি ডিয়েগো গার্সিয়ার দিকে মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে, যার দূরত্ব প্রায় ২ হাজার মাইল।

উৎপাদন কেন্দ্রগুলোতে হামলা

ইরানি সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের উৎপাদন, উন্নয়ন ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা পরিচালিত হয় একাধিক কেন্দ্রের সমন্বয়ে। এসব কেন্দ্র তত্ত্বাবধান করে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এবং ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চারটি স্থাপনা—খোজির, পারচিন, হাকিমিয়েহ এবং শাহরুদ সামরিক কমপ্লেক্স ক্ষেপণাস্ত্রের জ্বালানি উৎপাদন করে। এসব স্থাপনা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই ক্ষতি গত বছরের জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধ কিংবা ২০২৪ সালের অক্টোবরে ইসরায়েলের হামলার তুলনায় বেশি।

এই স্থাপনাগুলোতেই গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্র প্রপেলান্ট তৈরি করা হয় এবং অস্ত্রগুলো ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত করা হয়। জেমস মার্টিন সেন্টার ফর ননপ্রলিফারেশন স্টাডিজের সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট জিম লামসন বলেন, ‘প্রপালশন না থাকলে ক্ষেপণাস্ত্র কোথাও যেতে পারবে না।’

ওয়াশিংটন পোস্টের অনুরোধে স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করা চার বিশেষজ্ঞ জানিয়েছেন, এই ক্ষয়ক্ষতির ফলে ইরানের স্বল্প ও মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন আপাতত বন্ধ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যতক্ষণ না পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলো পুনর্গঠন করা হচ্ছে। স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, তেহরানের ঠিক পূর্বে অবস্থিত খোজির ক্ষেপণাস্ত্র কমপ্লেক্সের চারটি প্রধান এলাকায় যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের হামলা হয়েছে। জেমস মার্টিন সেন্টার ফর ননপ্রোলিফারেশন স্টাডিজের রিসার্চ অ্যাসোসিয়েটস স্যাম লেয়ার বলেন, ইসরায়েলি–মার্কিন হামলায় লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে এমন উৎপাদন ব্যবস্থা, যেখানে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় কঠিন (সলিড) ও তরল (লিকুইড) জ্বালানি তৈরি হয়।

ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রথমে আকাশের অনেক উচ্চতায় নিক্ষেপ করা হয়, তারপর অত্যন্ত উচ্চ গতিতে আবার মাটিতে ফিরে আসে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের ভান্ডারে থাকা এসব ক্ষেপণাস্ত্র হয় কঠিন, নয়তো তরল জ্বালানিতে চলে। এর মধ্যে কঠিন জ্বালানি সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়—সাধারণত স্বল্প-পাল্লার অস্ত্রে এবং যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এটি বেশি কার্যকর। অন্যদিকে, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রে বেশি ব্যবহৃত হয় তরল জ্বালানি। তবে এতে জ্বালানি ভরার প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ হওয়ায় এগুলো আক্রমণের ঝুঁকিতে বেশি থাকে।

২৪ মার্চ তোলা স্যাটেলাইট ছবির বিশ্লেষণে দেখা যায়, খোজির কমপ্লেক্সে অন্তত ৮৮টি স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে। উত্তর-পূর্ব ইরানে অবস্থিত আইআরজিসির শাহরুদ উৎপাদন কমপ্লেক্সে কঠিন জ্বালানির গবেষণা, উন্নয়ন এবং ব্যাপক উৎপাদন হয়। স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, এই স্থাপনাটিও যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের ব্যাপক হামলার শিকার হয়েছে। এতে অন্তত ২৮টি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।

তেহরানের পূর্বে অবস্থিত পারচিন সামরিক কমপ্লেক্স কঠিন জ্বালানি উৎপাদন হয়। সেখানে ১২ মার্চের ছবিতে ১২টি স্থাপনায় হামলার চিহ্ন দেখা গেছে। রাজধানীর উপকণ্ঠে হাকিমিয়েহ সামরিক কমপ্লেক্স-এ ১৪ মার্চের ছবিতে দেখা যায়, ১৯টি স্থাপনায় হামলা হয়েছে। এর মধ্যে তরল জ্বালানি ও লঞ্চার তৈরির স্থাপনাও রয়েছে।

ইসরায়েলি–মার্কিন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ইরানে খোজির ক্ষেপণাস্ত্র কমপ্লেক্স। ছবি: সংগৃহীত
ইসরায়েলি–মার্কিন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ইরানে খোজির ক্ষেপণাস্ত্র কমপ্লেক্স। ছবি: সংগৃহীত

নিরাপত্তা গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান জেনসের চিত্র বিশ্লেষক শন ও’কনর ইমেইলে দ্য পোস্টকে জানান, যদি ইরান ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা পুনর্গঠন করতে না পারে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা কৌশল হারিয়ে যাবে।

ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ঘাঁটিতে হামলা

স্যাটেলাইট ছবির বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অন্তত ২৯টি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ঘাঁটিতে বিমান হামলা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার সক্ষমতা মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। ইরানে ঠিক কতটি উৎক্ষেপণ ঘাঁটি রয়েছে তা নির্দিষ্টভাবে জানা না গেলেও বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, সংখ্যা প্রায় ৩০ টির মতো।

এসব ঘাঁটির বেশির ভাগেই পাহাড়ের ভেতর সুড়ঙ্গ কেটে তৈরি করা হয়েছে ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র সংরক্ষণাগার। স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় এসব সুড়ঙ্গের প্রবেশপথের অনেকগুলোই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, ফলে যেখানে ক্ষেপণাস্ত্র রাখা হয় সেখানে প্রবেশ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। স্যাম লেয়ার বলেন, ‘এই হামলাগুলো কার্যক্রমকে উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যাহত করবে। ঘাঁটির অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় এখন উৎক্ষেপণ যন্ত্র প্রস্তুত করতে বেশি সময় লাগবে, ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কাছে এগুলো শনাক্ত ও ধ্বংস করার জন্য বেশি সময় থাকবে।’

বিশ্লেষক ল্যামসনের মতে, মধ্য ও পশ্চিম ইরানের ঘাঁটিগুলো ইসরায়েলের বিরুদ্ধে মাঝারি পাল্লার হামলার জন্য ব্যবহার করা হয়। আর পারস্য উপসাগর উপকূলবর্তী ঘাঁটিগুলো ব্যবহার করা হয়েছে উপসাগরীয় দেশগুলোর বিরুদ্ধে স্বল্প-পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার জন্য। পারস্য উপসাগরের উপকূলে অবস্থিত খোরগু ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিতে অন্তত দুইবার যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের হামলা হয়েছে বলে স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে। এতে অন্তত ১৫টি স্থাপনা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে এবং দুটি সুড়ঙ্গ প্রবেশপথ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

পশ্চিম ইরানে অবস্থিত ইমাম আলি ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে, মাটির ওপরে থাকা ৯টি স্থাপনা এবং অন্তত দুটি সুড়ঙ্গ প্রবেশপথে হামলা হয়েছে। এতে ভূগর্ভস্থ অস্ত্রভান্ডারে প্রবেশ বাধাগ্রস্ত হয়েছে বলে জানান জেনস-এর ও’কনর।

তবে অনেক বিশেষজ্ঞই মনে করেন, এই প্রভাব স্থায়ী নাও হতে পারে। জেনসের আরেক বিশ্লেষক জেরেমি বিনি বলেন, ‘স্থায়ীভাবে এসব ঘাঁটি অচল করে দেওয়া কঠিন। তাত্ত্বিকভাবে এগুলো নিষ্ক্রিয় করা সম্ভব, কিন্তু ইরান আবারও খনন করে এবং মেরামত করে এগুলো সচল করে তুলবে।’

তথ্যসূত্র: ওয়াশিংটন পোস্ট

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত