
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়ে কৌশলগত একটি এলাকার কারণে বেকায়দায় পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ভূ-কৌশলগত সুবিধা কাজে লাগিয়ে বহুগুণ শক্তিধর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে খানিকটা জিম্মিদশার মধ্যে ফেলে ইরান। ট্রাম্প আলোচনার প্রস্তাব দিলেও খুব একটা সাড়া মিলছে না ইরানের তরফ থেকে। আলোচিত সেই এলাকাটি হরমুজ প্রণালি। হরমুজকে তুরুপের তাস বানিয়ে সর্বশেষ চালটি চেলেছে ইরান; এই এলাকা দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের কাছ এখন টোল আদায় করতে চাইছে তারা। এক হিসাবে দেখা গেছে, সেখানে টোল চালু হলে মাসে প্রায় ৬০ কোটি মার্কিন ডলার আয় হবে ইরানের।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যৌথ অভিযান শুরু করে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। বিগত এক মাসে যৌথ হামলায় ইরানের জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাতে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, হামলায় এ পর্যন্ত ২১৬ শিশুসহ মোট ২ হাজার ৭৬ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১ হাজার ৭৬৭ শিশুসহ সাড়ে ২৬ হাজার মানুষ। জবাবে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনায় পালটা হামলা চালিয়ে আসছে ইরান। এসব হামলার পাশাপাশি তারা কাজে লাগিয়েছে নিজেদের ভৌগোলিক ও কৌশলগত সুবিধা। যুদ্ধ শুরুর কয়েক দিনের মধ্যেই জ্বালানি তেল পরিবহনের অন্যতম পথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয় তারা।
স্বাভাবিকভাবেই, হরমুজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বব্যাপী জ্বালানি পরিবহনে ব্যাপক ব্যাঘাত ঘটে। কারণ বিশ্বজুড়ে ২০ শতাংশ জ্বালানি এই রুট দিয়ে যায়। হরমুজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এশিয়ায় দেখা দিয়েছে ব্যাপক জ্বালানি সংকট। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে তেলের স্থাপনা ও শিল্প এলাকায় হামলা চালিয়েছে ইরান। হামলার জেরে উপসাগরীয় দেশগুলো তেল ও গ্যাসের উৎপাদন কমিয়ে দেয়। আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়তে থাকে তেলের দাম। দ্য গার্ডিয়ান জানায়, গত শুক্রবার ব্যারেলপ্রতি তেলের দাম ছিল ১১২ মার্কিন ডলার, যা যুদ্ধ শুরুর আগে ছিল ৭৩ ডলার।
অবস্থা বেগতিক দেখে মিত্রদের সহায়তায় হরমুজ খুলতে চেয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সে আশায় গুড়ে বালি দিয়ে মিত্ররা তাঁর মুখের ওপর না করে। এরপর ইরানকে শায়েস্তা করতে পদাতিক বাহিনী পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয় মার্কিন প্রশাসন। সিএনএনের খবরে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যে ইতিমধ্যে সাড়ে তিন হাজার সেনা পাঠিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ওই অঞ্চলে আগে থেকেই অর্ধলাখ সেনা মোতায়েন ছিল। গতকাল রোববার ওয়াশিংটন পোস্টের এক খবরে বলা হয়, মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন কয়েক সপ্তাহ ধরে ইরানে স্থল অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে। মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস ত্রিপোলিও সেখানে পাঠানো হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান যুদ্ধের গতিপথ নিয়ন্ত্রণে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখবে। ভৌগোলিক কারণে এই প্রণালির অবস্থান এমন যে, এই স্থানের নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারলে যে কোনো পরাশক্তিকেই সর্বাত্মক হামলার আগে দুবার ভাবতে হবে। এই বিষয়টি মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী নিকোলাস জে স্পাইকম্যানের ‘রিমল্যান্ড’ তত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়। স্পাইকম্যানের মতে, যে দেশ ‘রিমল্যান্ড’ নিয়ন্ত্রণ করবে, তারাই বিশ্বের হর্তাকর্তা হবে। মোটা দাগে, ইউরেশিয়া অঞ্চলের উপকূলীয় এলাকাকে তিনি বলেছেন রিমল্যান্ড। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, কথিত রিমল্যান্ডের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলো হচ্ছে পশ্চিম ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া এবং পূর্ব এশিয়া। এর কেন্দ্রে রয়েছে পারস্য উপসাগর। এই পারস্য উপসাগরের সঙ্গে ওমান উপসাগরকে সংযোগকারী জলপথ হচ্ছে হরমুজ প্রণালি। তাই এই রিমল্যান্ডের কেন্দ্র অর্থাৎ হরমুজ নিয়ন্ত্রণের কারণেই সামরিকভাবে বহুগুণ শক্তিশালী যুক্তরাষ্ট্রকে নাস্তানাবুদ করতে পারছে ইরান।
এই সুবিধার জোরেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দিনে দিনে কৌশলগতভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে যাচ্ছে ইরান। গত সপ্তাহে সমঝোতার জন্য ইরানকে ১৫ দফা সংবলিত প্রস্তাব পাঠিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে ইরান নিজেরাই কিছু শর্ত জুড়ে দিয়েছে। এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো—হরমুজে ইরানের সার্বভৌমত্ব মেনে নিতে হবে এবং এখান দিয়ে জাহাজ পরিচালনা করতে টোল দিতে হবে ইরানকে। সিএনএন জানায়, ইরানের দাবি মেনে নিলে, কেবল তেলবাহী জাহাজ থেকেই প্রতি মাসে আয় হবে প্রায় ৬০ কোটি মার্কিন ডলার।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়ায় ইরানের প্রস্তাব মেনে নেওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। তারা স্থল অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে। সংশ্লিষ্ট মার্কিন কর্মকর্তাদের বক্তব্য থেকে ধারণা করা হচ্ছে, মার্কিন প্রশাসনের পরিকল্পনায় খারগ দ্বীপের দখল নেওয়ার বিষয়টি থাকতে পারে। ইরানের ৯০ শতাংশ তেল রপ্তানি হয় এখান থেকে। আবার হরমুজ নিয়ন্ত্রণের জন্য অন্যতম কৌশলগত স্থান খারগ। এ ছাড়া হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি অন্যান্য উপকূলীয় অঞ্চলে অভিযান চালানোর বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন কর্মকর্তারা। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রাম্প এই অভিযানের অনুমতি দিলে এবং এই অভিযান শুরু হলে মার্কিন বাহিনী ইরানি ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র, স্থলভাগের গোলাবর্ষণ এবং ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইসসহ নানা রকম হুমকির মুখে পড়বে। ইরানি পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সতর্ক করে বলেছেন, ‘আমাদের যোদ্ধারা স্থলপথে মার্কিন সৈন্যদের অপেক্ষায় রয়েছে। তাদের আগুনে পুড়িয়ে মারা হবে এবং এই অঞ্চলে তাদের মিত্রদের চরম শাস্তি দেওয়া হবে।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্থল অভিযান চালিয়ে ইরানের কাছ থেকে হরমুজের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া সম্ভব নয়। কারণ এক খারগ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টাতেই তাদের অনেক বেশি ভাবনাচিন্তা করতে হচ্ছে। অথচ খারগ ছাড়াও ইরানের শাসনাধীনে রয়েছে এমন ৩০টি দ্বীপ, যেগুলো ব্যবহার করে সহজেই হরমুজের নিরাপত্তা দিতে পারে তেহরান। চীনের সান ইয়াত সেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক এনাতুল্লাহ ইয়াজদানি এবং মা ইয়ানঝি এই দ্বীপমালার নাম দিয়েছেন, ‘আর্চ ডিফেন্স’।
‘পারস্য উপসাগরে অবস্থিত ইরানি দ্বীপমালার ভূরাজনৈতিক ও ভূ-কৌশলগত গুরুত্ব’ নামের প্রবন্ধে ইয়াজদানি এবং ইয়ানঝি লিখেছেন, আবু মুসা, গ্রেটার তুনব, লেসার তুনব, হেঙ্গাম, কেশম, লারাক এবং হরমুজ দ্বীপ হচ্ছে ইরানের ‘আর্চ ডিফেন্স’। আর আবু মুসা, গ্রেটার তুনব, লেসার তুনব হচ্ছে হরমুজ নিয়ন্ত্রণে তুরুপের তাস। এগুলোর নিজেদের মধ্যে দূরত্ব কম। আবার এগুলোর অবস্থান এমন যে, পারস্য উপসাগর দিয়ে জাহাজ পরিবহন করতে হলে, কাছ ঘেঁষে যেতেই হবে। তাই এসব দ্বীপ থেকে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) খুব সহজেই ড্রোন, মাইনসহ আরও অন্য অস্ত্র দিয়ে যেকোনো জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে। ইরানের কর্মকর্তারা এসব দ্বীপকে বলেন তাঁদের দেশের ‘নিশ্চল এবং ডোবানো অসম্ভব ধরনের বিমানবাহী রণতরী’।
এখান একটি বিষয় বলা দরকার পঞ্চদশ শতাব্দীতে পর্তুগিজ নাবিক আলবুকার্ক ভারত মহাসাগর ও পারস্য উপসাগরে পর্তুগিজ উপনিবেশ স্থাপনে সবচেয়ে বেশি অভিযান চালিয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, বাব এল মান্দেব, হরমুজ ও মালাক্কা যে দেশ নিয়ন্ত্রণ করবে, তাঁদের হাতে থাকবে বিশ্বের শাসনক্ষমতা। প্রসঙ্গত, হরমুজ আবার বাকি দুই প্রণালির মাঝামাঝি অঞ্চলে। তাই হরমুজ হয়ে উঠেছে আধিপত্য বিস্তারের অন্যতম চাবিকাঠি। প্রশ্ন উঠছে, হরমুজ নিয়ে এত এত ভবিষ্যৎ বাণী এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্টদের আমলে হরমুজ নিয়ে কৌশলগত পরিকল্পনাগুলো কেন আমল নিলেন না ট্রাম্প? এসব পরিকল্পনা বা বাণী আমলে না নেওয়ার কারণ কী ইসরায়েলের জোরাজুরি নাকি অজ্ঞতা?

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যৌথ হামলার প্রথম চার সপ্তাহে ইরানের অন্তত চারটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্র ও অন্তত ২৯টি উৎক্ষেপণ ঘাঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ইরানের সামরিক কৌশলের মূল ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্টের বিশ্লেষণ ও বিশেষজ্ঞদের পর্যা
৮ ঘণ্টা আগে
ইসরায়েলের বৃহত্তম তেল শোধনাগার হাইফার বাজানে ইরান ও হিজবুল্লাহ আজ সোমবার হামলা চালিয়েছে। হামলার পর বাজান ওয়েল রিফাইনারি বা তেল শোধনাগারে আগুন জ্বলতে দেখা যায়। এর আগে, গতকাল রোববার ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলীয় নেগেভ মরুভূমিতে অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ শিল্প এলাকা নেওত হোভাভের একটি কারখানায়ও হামলা হয়।
৯ ঘণ্টা আগে
সাম্রাজ্যগুলোর পতন শুরুর কিছু নির্দিষ্ট কারণ আছে। সাম্রাজ্যের পতন তখনই শুরু হয়—যখন তাদের সামরিক বিস্তার রাজনৈতিক কৌশলকে ছাড়িয়ে যায়, যখন অর্থনৈতিক ভিত দুর্বল হয় এবং যাদের দমন করতে চায়, তারা দীর্ঘ সময় ধরে টিকে থেকে সেই প্রভাবশালী শক্তিকেও অতিক্রম করে যায়।
১৩ ঘণ্টা আগে
ই-৩ সেন্ট্রি মূলত বোয়িং ৭০৭/৩২০-এর একটি পরিবর্তিত সংস্করণ, যার ওপরে একটি ঘূর্ণায়মান রাডার ডোম থাকে। এর রাডারের ক্ষেত্র ৩৭৫ কিলোমিটারের বেশি। এটি আকাশযুদ্ধের কমান্ড ও কন্ট্রোল সেন্টার হিসেবে কাজ করে এবং বিরতিহীনভাবে ৮ ঘণ্টা উড়তে পারে।
১ দিন আগে