Ajker Patrika

ক্রেতার কাছে পৌঁছানোর আগেই নষ্ট আম, সুন্দরবন কুরিয়ারের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড়

বদলগাছী (নওগাঁ) প্রতিনিধি 
ক্রেতার কাছে পৌঁছানোর আগেই নষ্ট আম, সুন্দরবন কুরিয়ারের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড়
বদলগাছী ডাকবাংলো মোড়ে সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসের সামনে ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দারা জড়ো হয়ে ক্ষতিপূরণ চাচ্ছেন। ছবি: আজকের পত্রিকা

নওগাঁর বদলগাছীতে আম মৌসুমের ব্যস্ত সময়ে সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসের বিরুদ্ধে সময়মতো আম সরবরাহ না করার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) স্বীকৃত নাক ফজলি আম ক্রেতার কাছে পৌঁছানোর আগেই পচে নষ্ট হচ্ছে। এতে ব্যবসায়ীরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন, ক্ষুব্ধ হচ্ছেন ক্রেতারাও।

গতকাল শনিবার দুপুরে বদলগাছী ডাকবাংলো মোড় এলাকায় সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসের অফিসের সামনে গিয়ে দেখা যায়, ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকজন ব্যক্তি ক্ষতিপূরণের দাবিতে বাগ্‌বিতণ্ডায় জড়িয়েছেন। তাঁদের অভিযোগ, সময়মতো আম সরবরাহ না হওয়ায় আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি ব্যবসায়িক সুনামও নষ্ট হচ্ছে।

আজ রোববারও বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগী কুরিয়ার সার্ভিসের অফিসে গিয়ে অভিযোগ ও বিরক্তি প্রকাশ করেন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, বদলগাছী ডাকবাংলো মোড় এলাকায় অবস্থিত সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে পাঠানো অনেক আম নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাচ্ছে না। কয়েক দিন ধরে প্রতিষ্ঠানটির প্রোপ্রাইটর রায়হান হোসেনের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ আসছে।

বদলগাছী সদরের বাসিন্দা সাজ্জাদুল ইসলাম পলাশ জানান, ৭ জুন তিনি ঢাকার উত্তরায় থাকা এক আত্মীয়ের কাছে দুই মণ নাক ফজলি আম পাঠান। আট দিন পার হলেও আমগুলো গন্তব্যে পৌঁছেনি। তিনি বলেন, ‘আম পাঠানোর পর থেকে প্রতিদিন খোঁজ নিচ্ছি। কিন্তু এখনো কোনো সঠিক তথ্য পাচ্ছি না। আমের কী অবস্থা, সেটাও জানি না।’

অনলাইনভিত্তিক আম বিক্রয় প্রতিষ্ঠান ‘বদলগাছী ম্যাঙ্গো সেল বাজার’-এর উদ্যোক্তা এস এম মোস্তাকিম জানান, কয়েক বছর ধরে তিনি দেশের বিভিন্ন জেলায় অনলাইনে আম সরবরাহ করছেন। কিন্তু এবার কুরিয়ারসেবার কারণে সবচেয়ে বেশি অভিযোগের মুখে পড়তে হচ্ছে তাঁকে।

এস এম মোস্তাকিম বলেন, ‘ক্রেতারা সময়মতো আম না পেয়ে ফোনে অভিযোগ করছেন। অনেকেই পচা আম পেয়েছেন। এতে আমার ব্যবসার বড় ক্ষতি হয়েছে। নিয়মিত ক্রেতাদের একটি অংশও হারাতে বসেছি।’

ঢাকার বনশ্রী এলাকার চাকরিজীবী শ্রী অমিত কুমার জানান, ৮ জুন তিনি অনলাইনে ৪০ কেজি নাক ফজলি আমের অর্ডার দেন। পাঁচ দিন পর আম হাতে পেয়ে দেখেন, অধিকাংশ আম পচে কালো হয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘যে আমের জন্য অপেক্ষা করেছি, তা আর খাওয়ার উপযোগী ছিল না। এখন ক্ষতিপূরণ চাইব কার কাছে, সেটাই বুঝতে পারছি না।’

ঢাকার কারওয়ান বাজার এলাকার চাকরিজীবী সরদার মেহেদী হাসানও একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান। তাঁর ভাষ্য, প্রায় ১০ দিন আগে বদলগাছী থেকে তাঁর শ্বশুর ৫২ ক্যারেট আম পাঠান। কিন্তু বুকিংয়ের কোনো টোকেন দেওয়া হয়নি। পরে নির্ধারিত ঠিকানার পরিবর্তে অন্য শাখায় আম পাঠানো হয়। তিনি বলেন, ‘এত ভোগান্তির পর আম হাতে পেয়েও স্বস্তি পাইনি। প্রায় অর্ধেক আমই নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। এমন অব্যবস্থাপনা মেনে নেওয়া যায় না।’

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, শুধু আম নয়, বিভিন্ন ধরনের পার্সেলও প্রায়ই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পৌঁছায় না। অনেক ক্ষেত্রে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সরবরাহের কথা বলা হলেও চার থেকে সাত দিন পর্যন্ত পার্সেল বিভিন্ন শাখায় পড়ে থাকে। দ্রুত পচনশীল কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে এর নেতিবাচক প্রভাব সবচেয়ে বেশি।

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, নাক ফজলি আম বদলগাছীর অন্যতম পরিচিত জিআই পণ্য। অনলাইনভিত্তিক বিপণনের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এই আমের বাজার সম্প্রসারিত হয়েছে। তবে পরিবহনব্যবস্থার দুর্বলতা অব্যাহত থাকলে ক্রেতাদের আস্থা কমে যাওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে পুরো অঞ্চলের আমের ব্যবসা।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসের বদলগাছী শাখার প্রোপ্রাইটর রায়হান হোসেন বলেন, ‘কিছু সমস্যা হয়েছে। যাদের আম এখনো পৌঁছায়নি, তারা আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। তাদের ক্ষতিপূরণ দিতে চেয়েছি।’

বদলগাছী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইসরাত জাহান ছনি বলেন, সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসের অব্যবস্থাপনা ইতিমধ্যে প্রশাসনের নজরে এসেছে। অভিযোগ পেয়ে শাখাটি সরাসরি পরিদর্শন করা হয়েছে এবং প্রথম অবস্থায় সতর্ক করা হয়েছে। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে আম সংরক্ষণ ও পরিবহনে অব্যবস্থাপনার অভিযোগ এলে তাঁর বিরুদ্ধে ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ, ২০০৯ আইনে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে।

ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের দাবি, দ্রুত তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া না হলে শুধু কয়েকজন ব্যবসায়ী নয়, ক্ষতির মুখে পড়বে বদলগাছীর বহুল পরিচিত নাক ফজলি আমের বাজারও।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত